পহেলা বৈশাখ উদযাপন ও আমাদের এক দিনের বাঙালীপনা !


ছবি:১লা বৈশাখের মঙ্গল শুভাযাত্রা

সংস্কৃতি একটি বেশ বড় প্লাটফর্ম। কোন ভৌগলিক অঞ্চলে আবহমান কাল ধরে চলমান জীবনযাত্রার আনুসাঙ্গিক সব কিছুই গাদাগাদি করে জায়গা করে নেয় এর ছাদের নিচে।এক বাক্যে যেমন একে সঙ্গায়িত করা দুষ্কর,তেমনি এর প্রকৃত সরুপ উদঘাটন করাও বেশ জটিল বিষয়।
কিছুটা এভাবে বলা যায়-
একটি নির্দিষ্ট ভৌগলিক এলাকার মানুষের জীবন যাত্রার সামগ্রীক প্রতিচ্ছবিই হলো সংস্কৃতি।
এটি একটি বৈশিষ্ট সুচক সামাজিক উপাদান। যে কোন জাতির আত্মপরিচয়ের প্রধান ধারক হিসাবে কাজ করে সে জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি।
প্রাচিন কালে একটি ভৌগলিক পরিবেশের মানুষ নিজেদের জীবন যাপনের সমগ্র উপাদান গ্রহন করত কেবল মাত্র তাদের নিজস্ব পরিচিত প্রকৃতিক পরিবেশ থেকে। আর প্রাকৃতিক পরিবেশ ভৌগলিক ভাবে সবসময় সতন্ত্র।যার ফলে তাদের ভাষা, পোশাক-পরিচ্ছদ, শিল্প কলা, বিবাহ রিতি,সামাজিক আচরন, খাদ্যাবাস, ইত্যাদি সবকিছুই আরেকটি ভৌগলিক পরিবেশ থেকে আলাদা।
আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে তাকালেও দেখা যাবে পৃথিবীর অন্য কোন দেশ বা ভৌগলিক পরিবেশ থেকে ভিন্ন সংস্কৃতি লালিত হচ্ছে।এখানকার জল-হাওয়ায় এখানকার সংস্কৃতি পরিবেশের সাথে খাপ খেয়ে পুষ্টি গ্রহন করে থাকে।আবার এদের মধ্যেও পরিবেশগত ভিন্নতার জন্য সৃষ্টি হয়েছে কিছুটা বৈচিত্র।
আমরা যারা বাংলা ভাষা-ভাষী আছি মুটামুটি একই প্রাকৃতিক পরিবেশেই জীবন যাপন করছি। আমাদের সার্বিক আচরন বলতে গেলে মুটামুটি এক। অর্থাৎ জীবনাচরনের যেসকল উপাদান এক হলে একটি একক সংস্কৃতি বলতে পারা যায় অনেকটা সে রকম।একে আবার পৃথক ভাবে নামাকরনও করা হয়েছে যা কালের গর্ভে অনেক আগেই জন্ম লাভ করেছিল হয়তো ভিন্ন কোন রুপে,সময়ের হাত ধরে যা বর্তমান রুপে প্রতিয়মান।

বাঙালী সংস্কৃতি।
মানে বাংলা ভাষীদের সংস্কৃতি।
আবহমান কাল ধরে এই বাংলা ভাষী মানুষ যে সকল বৈশিষ্ট সূচক কর্মকান্ডগুলোকে প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার সাথে অঙ্গীভুত করে নিয়েছে তা নিয়েই উদ্ভাসিত আমাদের বাঙালী সংস্কৃতি।
বাঙালী সংস্কৃতির প্রধান ও অনন্য বৈশিষ্টই হলো এর ভাষা । বাংলা ভাষা।এটিই আমাদের সকল কর্মকান্ডের জ্বালানী স্বরুপ।
সুদূর অতীত থেকে নিকট অতীতের দিকে তাকালে দেখা যাবে এই বাংলা ভাষা ভাষী অঞ্চলের মানুষের জীবন যাপন পদ্ধতি অন্যদের থেকে বেশ ভিন্নতর যেমন-


ছবি:গাঁয়ের পথে একতারা হাতে উদাসী বাউল

গায়ের পথে উদাসী বাউলের একতারা হাতে গান গাওয়া,মাথায় মাতাল পরে,কাধেঁ গামছা নিয়ে লাঙল গরু দিয়ে হাল চাষ,মাথায় ঘোমটা দিয়ে গায়ের বধুদের নদী থেকে জল আনতে যাওয়া,নারীদের কাপড় এবং পুরুষের ধুতি ফতোয়া পড়া,রাত জেগে ধপাস ধপাস শব্দ করে ঢেকিতে ধান বানা,পাড়ায় পাড়ায় কবি গানের আসর,সন্ধায় কুপি বাতির আলোয় সুর করে পুঁথি পাঠ,চৈত্রের শেষ দিনে চৈত্র সংক্রান্তি পালন ,বৈশাখের প্রথম দিনে নতুন বছরকে বরন ,হালখাতা,হেমন্তের নবান্ন,জৈষ্ঠের প্রথম দিনে পানিতে ফুল ফল ভাসিয়ে বর্ষাকে বরন করা এমনি হাজারো কর্মকান্ড বাঙালীদের বৈশিষ্ট সুচক।

প্রাকৃতিক পরিবেশের সব কিছুর মত সংস্কৃতিও বিবর্তনশীল। সময়ের হাত ধরে জীবন যাত্রার মানোন্নয়নের তাগীদে সংস্কৃতিতে ঘটে বহুবিধ সংযোজন বিয়োজন। এবং এটাই সাভাবিক ।আমাদের বাঙালী সংস্কৃতিও বিবর্তনের অনুকূল পথেরই যাত্রী।

বিশ্বায়নের এই যুগে স্যাটেলাইটের কল্যানে আমরা আজ বিশ্বের সকল দেশের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথেই পরিচিত হচ্ছি খুব সহজে।শুধু তাই নয়,আমরাও এখন অপেক্ষাকৃত উন্নত বৈশিষ্ট সম্পন্ন জীবন যাপন পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হতে শুরু করেছি।এর ফলে আমাদের অনুন্নত বৈশিষ্টের জীবন যাপন পদ্ধতি ধীরে ধীরে সময়ের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে ক্রমশ পেছনে পরে যাচ্ছে। যেমন-

এখন আমরা পালের নৌকায় চলিনা,রাইস মিলের বদৌলতে ঢেকি এখন জাদুঘরে স্থান পেয়েছে,হাডুডুকে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে দিয়েছে ক্রিকেট,ফুটবল,হকি,টেনিস ইত্যাদি ।একতারা হাতে বাউল তো এখনকার মানুষ স্বপ্নেও দেখেনা,মাটির কলসি কাখে করে গায়ের বধুরা আর নদীর ঘাটে যায়না।শাড়ি,ধুতি পড়াও কমে যাচ্ছে,পুঁথি পাঠ,কবি গান আজকের প্রজন্মের কাছে একেবারেই অপরিচিত একটি ব্যাপার। এভাবেই আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদের নিজেদের সংস্কৃতিকে।

ইদানিং আমাদের এসব সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডগুলো অনেকটা বিজ্ঞাপনের মত তুলে ধরা হচ্ছে নতুন প্রজন্মের কাছে। অনেকটা পেকেট জাত খাবারের মত, কিংবা চিরিয়াখানায় অতি যত্নে রাখা জন্তুদের মত। আর এ বিজ্ঞাপনের জন্য ১লা বৈশাখকে শুভ দিন হিসাবে ধার্য করা হয়েছে।
বাংলা নতুন বছরের ১ম দিন পহেলা বৈশাখ। মঙ্গল শুভাযাত্রার মাধ্যমে শুরু হয় নববর্ষ উদযাপনের কর্মকান্ড। শুভা যাত্রায় লালপেরে সাদা শাড়ি পরে নারীরা আর পাজামা-পাঞ্জাবী,কিংবা ধুতি-ফতোয়া পরে পুরুষেরা অংশ নেয়। সাথে ঢেকি ,কুলা,মাছ ধরার বাশঁ দিয়ে তৈরি উপকরন যেমন চাই,কোচ,পল ইত্যাদি,হাত পাখার বিশাল প্রতিকি সংস্করন,কারো মাথায় মাথাল,কাধেঁ লাঙল-জোয়াল,গায়ের বধু বহনকারি পালকি,মুখে বিভিন্ন মুখোস সহ বাঙালী সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান থাকে।মনে হয় এরাই প্রকৃত বাঙালী। বাঙালী সংস্কৃতির সবচেয়ে উজ্জল দিক হলো অসাম্প্রদায়ীকতা। এ বিষয়টি পুর্ণতা লাভ করে এই দিনে।কেউ মনে করেনা এটি হিন্দুদের উৎসব,মুসলিমদের উৎসব,খৃষ্টাসদের উৎসব,বৌদ্ধদের উৎসব কিংবা অন্য কোন সম্প্রদায়ের উৎসব। সবাই বর্ষবরন অনুষ্টানকে নিজের মনে করে।
শুভাযাত্রার পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আয়োজন করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের।যেখানে পরিবেশিত হয় বাঙালী বৈশিষ্ট সূচক বিভিন্ন বিষয় যেমন- বাউল গান, কবিগান,বাঙালী নৃত্য ইত্যাদি। চারদিক যেন মুখরিত থাকে কবি গুরুর সেই বিখ্যাত গানের সুরে-

“এসো হে বৈশাখ এসো এসো”

পাশাপাশি বসে বৈশাখী মেলা। মেলায় নাগর দোলা,মাটির হাড়ি পাতিল ,খেলনার দোকান, সাথে থাকে পান্থা ইলিশের দোকান। লালপেরে সাদা শাড়ি পরে কপালে লাল টিপ হাতে এক গাছি চুড়ি পরে মেলায় জমায়েত হয় বাঙালী রমনীরা ,সাথে পুরুষেরা ও তাদের সহজাত বাঙালী পোশাকে সজ্জিত হয়ে তাদের পাশে অবস্থান নেয়। পুরো দিনটিই একটি পরিপুর্ণ বাঙালীত্বের ডিসপ্লেতে পরিনত হয়।

আজ আমরা যেভাবে ১লা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন করছি, এবং বাঙালী সংস্কৃতিকে তুলে ধরার ,প্রচার করার একটি মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করছি তার জন্মদাতা হলেন মুগল সম্রাট আকবর। আকবরই প্রথম বাংলা সনের প্রবর্তন করেন।আর এ দিনটিকে এভাবে আবিস্কার করার পেছনে ছিল অন্য কারন । বকেয়া খাজনা পরিশোধ করার জন্য ঐদিন কৃষকদের নিমন্ত্রন করে নেয়া হত সম্রাটের প্রাসাদে আর কিছু মিষ্টি মুখের বিনিময়ে তারা সম্রাটের হাতে তুলে দিত সারা বছরের কষ্টার্জিত অর্থের একটি অংশ। তখন আজকের মত বাঙালী সংস্কৃতি প্রকাশের মিডিয়া হিসাবে কাজ করত না ১লা বৈশাখ।
কিন্তু আজ আমরা এই দিনটিকে বিশেষ ভাবে বাঙালীপনার মাধ্যমে উদযাপন করি।


ছবি:রমনার বটমুলে ছায়ানট কর্তৃক আয়োজিত ১লা বৈশাখ উদযাপন ।

১লা বৈশাখের এত সব আয়োজনের পেছনের কারন কি?
আমাদের সংস্কৃতিকে লালনে পালনে নতুন প্রজন্ম তথা আধুনিক প্রজন্মকে প্ররোচিত করা,অতিত বাঙালী জিবন কেমন ছিল তা স্বরন করা,বিশ্বের বুকে বাঙালী সংস্কৃতিকে তুলে ধরা।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কি এই একটি দিন ছাড়া অন্য কোন দিন আমাদের এই সাংস্কৃতিক আচরন গুলো চর্চা করি? আমাদের মনে প্রাণে কি এই সংস্কৃতির প্রতি কোন টান অনুভব করি?
আমার মনে হয় কেউ করিনা।মুহুর্তের আবেগের জন্য আমরা মুহাবিষ্ট হয়ে শুধুমাত্র বৈশাখী উৎসবে ঝাপিয়ে পরে স্বপ্ন দেখি মাত্র।
বৈশাখের ২য় দিনেই আমাদের গায়ে বাঙালীত্বের গন্ধও থাকেনা। আমাদের খানা-পিনা,পোশাক পরিচ্ছদ,সংগীত,খেলাধুলা সব কিছুই বাঙালিত্ব বর্জিত হয়ে যায়।যদি এমনটাই হয় তাহলে কি লাভ একদিনের বাঙালী সেজে অভিনয় করার।অনেকটা আমাদের দেশের এক শ্রেনীর হিন্দুদের সপ্তাহের কোন এটি বিশেষ দিনে নিরিমিষ খাওয়ার মত,অথবা মুসলিমদের বছরে এক মাস রোজা রাখার মত।দুটোই সংযম শেখানোর উদ্দেশ্যে করা হয়।কিন্তু বাস্তবে সারা সপ্তাহ বা সারা বছর সংযম চর্চার ধারে কাছেও থাকেনা ।
হায়রে বাঙালীর সংস্কৃতি চর্চা !অনুষ্ঠান সর্বস্ব এই আয়োজন কিসের জন্য? বিজ্ঞ পাঠকের কাছে আমার সবিনয় জিজ্ঞাসা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 60 = 62