বন্দীর বক্তব্য প্রকাশ, মানুষের সন্দেহ, সজীব ওয়াজেদের আস্থা

জনাব তৌফিক ইমরোজ খালিদী, গ্রেফতারকৃত সাংবাদিক শফিক রেহমানের কিছু বক্তব্য আপনার সম্পাদনায় বিডিনিউজ২৪.কম প্রকাশ করেছে। শফিক রেহমানের এই কথাগুলো আপনি কোথা থেকে পেলেন? শফিক রেহমান আপনাকে বলেছে? আপনার রিপোর্টারকে বলেছে? আপনার রিপোর্ট অনুযায়ী শফিক রেহমান রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় এসব কথা বলেছেন। আপনি কি সেসময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন? তাহলে আপনি এই বক্তব্যগুলো কিসের ভিত্তিতে প্রকাশ করছেন? আপনি কি যাচাই (ইন্ডিপেনডেন্টলি ভেরিফাই) করে দেখেছেন এগুলো আদৌ তিনি বলেছেন কিনা? কিভাবে যাচাই করলেন? আগামীকাল কিংবা ভবিষ্যতে কখনও আপনি কি স্বীকার করবেন, শফিক রেহমানের বক্তব্যগুলো যাচাই ছাড়া প্রকাশ করে আপনি ভূল করেছিলেন? “একটা মারাত্মক ভুল! সাংবাদিকতা জীবনের একটি বড় ভুল!”

কথাগুলো আপনাকে কেন বলছি নিশ্চয় আপনি তা অনুধাবন করছেন। যাচাই বাছাই ছাড়া এভাবে একজন ধৃত ব্যক্তির বক্তব্য প্রকাশের দায়ে ভবিষ্যতে যদি আপনার বিরুদ্ধে সপ্তাহ খানেকের মাধ্যে ৮৩ টি মামলা হয়ে যায় – আপনার কেমন লাগবে? দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে আপনি সেইসব মামলায় হাজিরা দেবেন এবং সেই সুযোগ নিয়ে সরকার ও বাদীপক্ষের উকিল যৌথভাবে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের নামে আপনাকে যাচ্ছেতাই অপমান করবে! একবার ভাবুন দেখি আপনার কেমন লাগবে? দেশের প্রথিতযসা একজন সাংবাদিককে এভাবে নাজেহাল ও অপমানিত হতে দেখলে আমার কিন্তু ভাল লাগবে না। আমার ভাল লাগেনি মাহফুজ আনামকে নাজেহাল করার বিষয়টি। আপনি ব্যক্তি বিদ্বেষ প্রসুত কিংবা অন্য কোনও কারণে মাহফুজ আনামকে দোষি হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। এসব করতে গিয়ে আপনি বাংলাদেশের মিডিয়ার বাস্তব অবস্থা এবং সংবাদ-সূত্রের গুঢ় বাস্তবতাসমূহ সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন।

খালিদী ভাই, কিছু কারণে আপনাকে দূর থেকে শ্রদ্ধা করি। ভবিষ্যতে আপনাকেও এভাবে নাজেহাল করা হলে, আর কেউ করুক বা না করুক, আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী প্রতিবাদ করব। যেভাবে মাহফুজ আনামের ক্ষেত্রে করেছি। আমরা সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা তথা মানুষের বাক স্বাধীনতার পক্ষে কর্মী। এই মৌলিক বিষয়ে আপনি, আমি, মাহফুজ আনামসহ বাক স্বাধীতনতার সকল কর্মী এক সাথে দাঁড়াতে না পারলে গণমানুষের বাকরুদ্ধ হয়। ক্ষতিটা এখানেই।

ক্রসফায়ারের গল্প যাচাই ছাড়াই সাংবাদিকরা প্রকাশ করে। এসব ভাল সাংবাদিকতা নয়। ঘটনাটি কি ঘটেছিল তা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে এবং সম্ভব হলে ছবি ও ভিডিও চিত্র ধারণ করে ঘটনার প্রকৃত বিবরণ প্রকাশ করা উচিৎ। আমরা বাংলাদেশে সেটা করতে পারছিনা এবং সেখানেই আমাদের সাংবাদিকতার দুর্বলতা। ভবিষ্যতে আমাদের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কেউ যদি হয়রানী করতে চায়, মিডিয়ার রিপোর্টকে চ্যালেঞ্জ করতে চায় -আমরা কি দায় এড়াতে পারব?

ওয়ান ইলেভেনের সময় শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের চরিত্র হননমূলক স্বীকারোক্তি যাচাই ছাড়াই জনসমক্ষে প্রকাশ করাটা সঠিক সাংবাদিকতা হয়নি। মাহফুজ আনাম একথা স্বীকার করেছেন। অন্যরা এখনও স্বীকার করেনি। সংবাদপত্রগুলো হাওয়া থেকে পাওয়া বক্তব্যগুলো ছেপেছিল। রেডিও এবং টেলিভিশনগুলো সেই বক্তব্যের ধারণকৃত অডিও সম্প্রচার করেছিল। কিছুদিন আগে যেমন মাহমুদুর রহমান মান্নার কিছু হাওয়া থেকে পাওয়া বক্তব্য আপনি প্রকাশ করেছিলেন এবং কিছু ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া সেই ভয়েজ সম্প্রচার করেছিল। কারা করেছিল ভয়েজ রেকর্ড? কোথা থেকে এসেছিল এসব? দায়টা কিন্তু সকলের। দুর্ভাগ্য যে, সংকটের সময় সেই দায় গ্রহণের যুথবদ্ধ অবস্থান দেখা যায়না। আমরা সবাই সমাজের বিশিষ্টজন!

প্রধানমন্ত্রী তনয় সজীব ওয়াজেদ জয় তার ফেসবুক পেজে বিডিনিউজের সংবাদটি পোষ্ট করেছেন। রিপোর্টে শফিক রেহমানের যেসব বক্তব্য এসেছে সেগুলো তিনি উদ্ধৃত করেছেন এবং শেষে প্রশ্ন রেখেছেন, “এই ঘটনা নিয়ে আর কি কেউ মিথ্যা বলার চেষ্টা করবেন?” তার মানে তিনি বিডিনিউজে প্রকাশিত বক্তব্যগুলো অবিসংবাদিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

ভবিষ্যতে যদি মাহফুজ আনামের মত তৌফিক ইমরোজ খালিদী তার ভুল স্বীকার করেন! ভবিষ্যতে যদি তিনি বলেন, শফিক রেহমানের বক্তব্যগুলো যাচাই না করে প্রকাশ করা তার ভুল হয়েছিল তখন কি বলবেন জয়? তখন যদি খালিদী সাহেবের বিরুদ্ধে ঝাকে ঝাকে মামলা দেয়া শুরু হয় তখন কি তিনি তার পাসে দাঁড়াবেন। তিনি রাজনৈতিক নেতা। আশা করি দাঁড়াবেন। কিন্তু বাস্তবতাগুলো তিনি সময় থাকতেই অনুধাবন করবেন এটা প্রত্যাশা করি।

শফিক রেহমান রং বদলকারী। তিনি ভাল মানুষ নন। অপসাংবাদিকতা, তথ্যের অপলাপ, ইতিহাস বিকৃতি এবং অপরাজনীতিতে তিনি জড়িত। এরকম মানুষ স্বার্থের জন্য সব ধরণের অপকর্ম করতে পারে। আমি বিশ্বাস করি তথ্য প্রমাণ ছাড়া সরকার তাকে গ্রেফতার করেনি। বিশেষ করে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যখন অন্য একটি দেশের নাম উচ্চারণ করে সেখান থেকে তথ্য পেয়েছেন বলে দাবি করছেন, তখন সেটাকে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। নিজেদের আত্মবিশ্বাস না থাকলে তারা এরকমভাবে বলতে পারতেন না। বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্রকে অপহরণ ও গুম করার অপচেষ্টার মত গর্হিত অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে তিনি গ্রেফতার হয়েছেন। তবুও প্রথম দফায় আমার সন্দেহ হয়েছিল সরকার বুঝি তাকে নিয়ে রাজনীতি করছে; ভুল রাজনীতিতে পা রাখছে। এরকম অনেক মানুষই সন্দেহ করেছে এবং গ্রেফতারটা ভালভাবে নেয়নি। অনেকে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে গ্রেফতারের প্রতিবাদ করেছে। এরা বিএনপি/জামাতের লোক নয়। তবুও একজন বয়স্ক সাংবাদিক গ্রেফতার হয়েছে বিধায় প্রতিবাদ করেছে। তিনি দুর্জন হলেও তার গ্রেফতার সঠিক হয়েছে কিনা এবিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে।

মানুষ কেন সন্দেহ পোষণ করে? মানুষের বিশ্বাসহীনতার মূল কোথায়? আইনের শাসন, আইনের সমদৃষ্টি ও সুবিচার বিষয়ে মানুষ কি পুরোপুরি অাস্থাশীল ? কেন নয়? এর মূল কারণ, মানুষ প্রতিনিয়ত আইনের সমদৃষ্টি দেখছে না। প্রতিনিয়ত নানা পদের মিথ্যাচার দেখছে। ক্রস ফায়ারের গল্প, স্বীকারোক্তির গল্প, আইএস আছে, আইএস নাই ইত্যাদি নানারকম গল্প শুনছে – যেগুলো তাদের বিশ্বাস হচ্ছেনা।বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির পর কথিক তদন্ত সহায়ক তানভীর হাসান জোহা নিখোঁজ হয়, নানাবিধ গল্প তৈরি হয় এবং একসময় তাকে পাওয়া যায়, সোহাগী জাহান তনু হত্যার পর নিহত মেয়েটির ছোট ভাইয়ের বন্ধু মিজানুর রহমান সোহাগ নিখোঁজ হয়, তাকে নিয়ে গল্প তৈরি হয় এবং কিছুদিন পর আবার তাকে পাওয়া যায়, কিছু মানুষ হারিয়ে যায়, কোনও দিন উদ্ধার হয়না, গল্পের পর গল্পই কেবল তৈরি হয়। এসব গল্পের সত্যাসত্য নিয়ে মানুষের সন্দেহ বাড়ে। মামলা, স্বীকারোক্তি ও গল্পসমূহের প্রতি গণআস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে। সরকারের নিজের লোকরাও সরকারের কথায় সন্দেহ পোষণ করছে। ফলে রাখাল বালকের মত সরকার যখন চিৎকার করে সত্য কথা বলছে সেগুলোও তারা বিশ্বাস করছেনা। এতে অপরাধী ও দুর্বৃত্তদের সুবিধা হচ্ছে। এরকম অবস্থা আগের সরকারের সময়ও হয়েছিল।

আওয়ামীলীগের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কান্ডারীর প্রতি অনুরোধ রাখব, মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার মত যথোপযুক্ত নেতৃত্ব দিন। দেশের মানুষকে আইনের শাসন উপহার দিয়ে তাদের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে ভুমিকা রাখুন। কোনও মিডিয়াকে প্রতিপক্ষ করবেন না। মিডিয়া আপনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়। মিডিয়াকে ওয়াচডগ হিসেবে সাহসের সাথে দায়িত্ব পালন করতে দিন। সামগ্রিক স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হোক। তাহলেই কেবল এধরণের ঘটনা নিয়ে আর কেউ সন্দেহ প্রকাশ করবে না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

35 − = 26