ধর্মহীন শিশুর মানসিকতা ও সেক্যুলার পেরেন্টিং

সমাজ একদিনেই বিজ্ঞান-মনস্ক হয়ে ওঠে না। প্রজন্মের ধারাবাহিকতায় শিক্ষা, সংস্কৃতির পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজ পরিবর্তিত হয়। শিশু ঠিক কিভাবে বিজ্ঞানমনস্ক হবে তা নির্ভর করে তার বেড়ে ওঠার উপর। ধর্মহীন মা-বাবা তাদের সন্তানদের ধর্মের প্রতি বিদ্বেষী বা অশ্রদ্ধাশীল করে তুলছেন না তো ? ধার্মিকের প্রতি বিদ্বেষী করে তুলছেন না তো ? ছোট ছোট কোমলমতি শিশুদের মনে ঘৃণার, হিংসার বীজ রোপণ করছেন না তো? মনুষ্যত্ব, ভালোবাসা এসবের সংজ্ঞা ওরা ঠিক মতো বুঝতে পারছে তো? ধর্মহীনতা কি “সংশয়বাদী” প্রজন্মের জন্ম দিচ্ছে? “সংশয়বাদীতা” একটি শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য পজেটিভ নাকি নেগেটিভ তা ভাববার বিষয়। ধর্মহীন তরুণ প্রজন্ম তাদের সংশয় দূর করার জন্য, সঠিক উত্তর খুঁজে পাওয়ার জন্য ঠিক কতখানি প্রস্তুত?

শিশুর মানসিক বিকাশ নির্ভর করে তার পরিবারের উপর। মূল্যবোধ, নৈতিকতাবোধ, শিক্ষার হাতে খড়ি হয় মা বাবার কাছেই। কোনটা নিয়ম, কোনটা অনিয়ম এসব শিক্ষা মা বাবার কাছ থেকেই ছেলেমেয়রা ছোটবেলা থেকে একটু একটু করে শিখে বড় হয়। কাকে ভালোবাসতে হবে, কাকে অপরাধী বলতে হবে এসবের শিক্ষা মা বাবা কে দেখেই শিখে ওরা। কিন্তু ধর্মান্ধতার মাঝে ধর্মহীনতা বা বিজ্ঞান মনস্ক হওয়ার শিক্ষা ঠিক কিভাবে শিখবে শিশুরা?

ছোট বেলা থেকেই বেড়ে ওঠা স্বভাবিক না হলে, হঠাত করে ওর মাঝে ধর্মহীনতার ধারনা জন্মালে মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে পারে। এমনকি মানসিক অপরাধ বোধও জন্ম নিতে পারে। ওর বন্ধু কে হবে, কাদেরই বা বন্ধু বানাবে এসব ব্যাপারে সংশয়ে ভোগে। ও নামাজ না পড়ে, পূজা না করে পাপের আংশীদার হচ্ছে না তো, এমন প্রশ্ন বেড়ে ওঠা শিশুর মনে আসাটাই স্বাভাবিক। মুসলমান বন্ধুটি নামাজ পড়ে, হিন্দু বন্ধুটি মন্দিরে যায় কিন্তু ও তো এসব করে না । ওর যদি মসজিদে যেতে ইচ্ছে করে যাবে, মন্দিরে যেতে ইচ্ছে করে যাবে। ইতিহাস অবশ্যই জানবে। কিন্তু ও ঠিক কখন এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তরটা খুঁজে পাবে? সেটার জন্য ওকে প্রস্তুত করাটা জরুরী। ঠিক কিভাবে এসব ব্যাপারে ওকে প্রস্তুত করা যায় সেটাই চিন্তার বিষয়! ধর্মহীন পরিবেশে মুসলমানকে বেস্ট ফ্রেন্ড বানানো যাবে কিনা কিংবা হিন্দু কে বেস্ট ফ্রেন্ড বানানো যাবে কিনা এসব নিয়ে দ্বিধায় ভোগাটাই শিশুর জন্য স্বাভাবিক। আর এই দ্বিধাই অনেক সময় বাচ্চার মানসিক রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কিভাবে শিশুকে ধর্মান্ধতা থেকে রক্ষা করা যায়? এক কথায় উত্তর হচ্ছে “শিক্ষা” । মা বাবা যদি সঠিক শিক্ষা দিয়ে বাচ্চাটিকে বড় করে তুলতে পারেন সেক্ষেত্রে শিশু বিজ্ঞান মনস্ক হয়েই বেড়ে উঠবে। ছোট বেলা থেকেই ছেলেমেয়েকে জিজ্ঞাসাবাদ মননে গড়ে তুলতে হবে। অন্যান্য বিষয়ের মত “ধর্ম” একটি সাধারণ “ইতিহাস” হিসেবে ওদের জানার সুযোগ করে দিতে হবে। কল্পনা ও বিজ্ঞানের পার্থক্য ওদের ধীরে ধীরে জানাতে হবে। ভাষার প্রয়োগে, আচার আচরণে সঠিকভাবে ওদের কাছে সঠিক ভাবগাম্ভীর্য তুলে ধরতে হবে। যেমন, “মিথ্যা বললে গুনাহ হয়” কিংবা “মিথ্যা বলা পাপ” এসব কথার পরিবর্তে বলা যেতে পারে “মিথ্যা তোমার মনুষ্যত্ব ও চরিত্র কে নষ্ট করে, তোমাকে অন্যের কাছে অগ্রহনযোগ্য করে তোলে” “মিথ্যা বললে তোমাকে কেউ ভালোবাসবে না” প্রভৃতি। এ নিয়ে বেশ কিছু গবেষণাপত্র রয়েছে যাকে বলা হয় “ সেকুলার পেরেন্টিং (Secular Parenting)”। একটি শিশুর মাঝে ঠাস করেই উমুক ধর্ম খারাপ, উমুক ধর্ম পালন করা যাবে না, উমুক ধর্ম মানেই ধ্বংস এরকম ধারনা না দিয়ে শিশুদের একটু একটু করে ইতিহাস বলে বলে সত্য বুঝতে দিতে হবে। ভারতীয় গবেষকদের বেশ কিছু গবেষণা পত্রে কিছু কিছু মজার বিষয় দেখা যায়; ছেলে মেয়েরা খুব আগ্রহ সহকারে ওদের দেব দেবীর ইতিহাস শোনে এবং এসব ছোট ছোট সোনামনিরা সুন্দর সুন্দর যুক্তি দিয়ে তা নিজেরাই খন্ডন করে, ওদের কাছে এসব ইতিহাস অনেকটা ঠাকুমার ঝুলির মত কিংবা হ্যারী পর্টারের মত। পশ্চিমাদের গবেষণা পত্রগুলো আরো মজার, ফ্যান্টাসীতে ভরপুর। তবে আমার দেখা গবেষণা পত্রগুলোতে একটা বিষয়কেই বার বার জোর দেয়া হয়েছে , সেটা হচ্ছে “পারিবারিক শিক্ষা” যেখানে সংমিশ্রণ থাকে শ্রদ্ধাবোধ, মূল্যবোধ, নৈতিকতাবোধ। একটি শিশুর মানসিক বিকাশে ভালোবাসার বিকল্প নেই।

ধর্মহীনতা মানেই কি অন্য ধর্মের প্রতি রাগ বা ক্ষোভের বিদ্বেষ ছড়ানো? শিশুরা বা তরুণ প্রজন্ম এই রাগ, ক্ষোভ থেকে ঠিক কি শিখছে ? ভাষাগত দক্ষতা ও বিজ্ঞানমনস্ক আলোচনার মাধ্যমে ধর্মের ধর্মান্ধতা তুলে ধরা উচিৎ নয়? যারা ইতিহাস বুঝবে, জানবে তারা এমনিতেই ধর্মান্ধতা জেনে যাবে না? নতুন প্রজন্ম ধর্ম পরিহার করে মানুষ বিদ্বেষী হচ্ছে? ধর্মান্ধতা কে ঘৃণা করার পাশাপাশি মানুষের প্রতিও ঘৃণাবোধ তৈরি হচ্ছে ওদের? বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া বা ধর্মহীন হওয়া মানেই কি মনুষ্যত্বকে কিংবা শ্রদ্ধাবোধকে বিসর্জন দেয়া? শিশুদের বড় করছি ঘৃণা আর হিংসা বোধ দিয়ে?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

41 + = 46