উলফগ্যাং পাউলি থেকে পটলডাঙার টেনিদা আত্মা, ঈশ্বর এবং অর্থহীনতা প্রসঙ্গে

লেখাটা লিখেছেন ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তবাদী সমিতির সাধারন সম্পাদক দেবাশীষ ভট্ট্যাচার্য (দেবাশীষ দাদা)
আমি কথা বাড়াবো না।সরাসরি লেখায় যাই।

উলফগ্যাং পাউলি থেকে পটলডাঙার টেনিদা
আত্মা, ঈশ্বর এবং অর্থহীনতা প্রসঙ্গে
দেবাশিস্‌ ভট্টাচার্য

“Das ist nicht nur nicht richtig, es ist nicht einmal falsch!” কথাটা বলেছিলেন জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী উল্‌ফ্‌গ্যাং পাউলি, তাঁর নিজস্ব মাতৃভাষায় । তাঁর এক সহকর্মী বিজ্ঞানী তাঁর কাছে আসেন এক তরুণ গবেষকের কাজ নিয়ে — পাউলিকে তার ওপর মন্তব্য করতে হবে, এই ছিল অনুরোধ । পাউলি পড়ে দেখলেন, কাজটি অতিশয় খাজা, আলোচনার যোগ্যই নয় । ঘোলাটে চিন্তা আর কথাবার্তা পাউলি একদম সইতে পারতেন না, ওই রকম লক্ষণ দেখলেই রসালো সব মন্তব্য করতেন । কাজেই, তার পরেই তাঁর ওই অমোঘ মন্তব্য । তিনি নিজেও বোধহয় জানতেন না, তাঁর ওই চটজলদি মন্তব্যটি কালে কালে বিজ্ঞান ও যুক্তির চর্চায় এক প্রবাদের আসন দখল করবে । এর ইংরেজি তর্জমাটা হচ্ছে — “That is not only not right, it is not even wrong.” সাদা বাংলায় বললে, “ ‘ঠিক’ হওয়া তো দূরের কথা, এমন কি, এ জিনিস ‘ভুল’ বলে আখ্যা পাবারও অযোগ্য” । কথাটায় কেমন যেন একটা গণ্ডগোল আছে, তাই না ? ‘ভুল’ বলে আখ্যা পেতে আবার ‘যোগ্যতা’ লাগবে কেন ? কোনও কথা ‘ঠিক’ হতে গেলে তার একটা যোগ্যতা নিশ্চয়ই লাগে, কিন্তু ভুলের আবার যোগ্যতা কীসের ? ‘ঠিক’ হবার যোগ্যতা যে কিনা পূরণ করতে পারেনি, তাকেই তো বলি ‘ভুল’ ! ওই যে “not even wrong” কথাটা, ওই কথাটা দিয়ে তাহলে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন বিজ্ঞানীপ্রবর পাউলি – এমন কিছুও আছে যা ভুলের চেয়েও খারাপ ? সে আলোচনায় এগোতে গেলে আগে জানা চাই কোনও কথা কখন কখন ‘ঠিক’ হয় । দীর্ঘদিন যাবৎ পণ্ডিতেরা খুঁটিয়ে সবদিক বিচার করে দেখেছেন, মোটামুটি দুভাবে তা হতে পারে । প্রথমত, কোনও বস্তু বা ধারণার মধ্যে ইতিমধ্যে লুকোনো আছে এমন তথ্য ঘুরিয়ে বলা বা তা যদি সহজে বোঝা না যায় তো তাকে সর্বসমক্ষে টেনে বার করা । যেমন – “মানুষ হল মানুষই”, “দুয়ে দুয়ে চার”, “গরুর চারটি পা”, “ত্রিভুজের তিনটি বাহু”, এই রকম । এগুলোকে দর্শনশাস্ত্রের পরিভাষায় বলে ‘অ্যানালিটিক’ বা বিশ্লেষণী বাক্য । এ রকম কথা সত্যি হতে বাধ্য, কারণ এখানে আসলে নতুন কোনও তথ্য জানান হচ্ছে না, ‘মানুষ’, ‘দুই’, ‘গরু’, ‘ত্রিভুজ’ এইসব ধারণাগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যে লুকিয়ে থাকা সত্যগুলোকে শুধু চোখে আঙুল দিয়ে দেখান হচ্ছে মাত্র । গণিত ও যুক্তিবিদ্যার প্রায় সমস্ত কথাই এই অর্থে ও এইরকম ভাবে ‘ঠিক’ । প্রশ্ন হতে পারে, যা আগে থেকে জানা আছে সেই সব কথা বলে আবার কার কী লাভ হতে পারে ? একটু ভাল করে ভাবলে বোঝা যাবে, হ্যাঁ, লাভ আছে বই কি ! কোনও একটি ধারণার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সব সত্যকে তো আর সব সময় এমনিতে বোঝা যায় না । এক্স আর ওয়াই-এর দুটো সমীকরণের মধ্যে যে এক্স আর ওয়াই-এর দুটো নির্দিষ্ট মান লুকিয়ে আছে সেটা সমীকরণ দুটোকে চোখে দেখলেই যে বোঝা যায় তা কিন্তু না, ওটা কষ্ট করে অঙ্ক কষে বার করতে হয় । ওই রকম এক একটা উঁচুদরের ‘লুকিয়ে থাকা’ সত্যকে খুঁজে বার করতে আজও গণিতজ্ঞ ও যুক্তিবিদ্‌দের মাথার ঘাম পায়ে পড়ে । দ্বিতীয়ত, আরও এক ধরনের ‘ঠিক’ কথা আছে, যাকে দর্শনশাস্ত্রের পরিভাষায় বলে ‘সিন্থেটিক’ বা সংশ্লেষণী বাক্য । প্রকৃতিবিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলো সব এই ধরনের । “গ্রহরা সূর্যের চারিদিকে উপবৃত্তাকার পথে ঘোরে”, “চুম্বকের বিপরীত মেরু পরস্পরকে আকর্ষণ করে”, “প্যারাসিটামল জ্বর সারাতে পারে” জাতীয় কথাগুলো এর উদাহরণ । গ্রহ, চুম্বক বা প্যারাসিটামল-এর প্রাথমিক ধারণার মধ্যে কিন্তু এ তথ্যগুলো মোটেই লুকিয়ে ছিল না, ওইসব জিনিসের ওপর অনেক খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে তবেই এসব কথা আলাদাভাবে জানা গেছে । ওইসব বস্তুর সম্পর্কে যে পুরোনো ধ্যান-ধারণা, তার সঙ্গে এভাবে পাওয়া নতুন জ্ঞান যুক্ত হয়ে তাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে, তাই এই প্রক্রিয়া ‘সিন্থেটিক’ । কাজেই, সত্য বা ‘ঠিক’ কথা বলবার উপায় হল এই দুরকমের – ‘অ্যানালিটিক’ এবং ‘সিন্থেটিক’ । বড় বড় বৈজ্ঞানিক সত্য আবিষ্কারের ক্ষেত্রে এই দুরকম উপায়ই বেশ জটিল নানা প্রক্রিয়ায় মিলেমিশে কাজ করে । আর এই দুটো উপায়ের একটাও যদি ঠিকমত না মানা হয়, তখনই হয় ‘ভুল’ । কীভাবে ? এবং কখনই বা তার, পাউলির ভাষায়, এমনকি ‘ভুল’ বলে আখ্যা পাবার যোগ্যতাটুকুও থাকে না ? সুনির্দিষ্ট উদাহরণ সহযোগে সেটা ভাববার চেষ্টা করা যাক । ধরুন, আমি হঠাৎ-ই দাবি করে বসলাম – “দুই-য়ে দুই-য়ে পাঁচ হয়”, “কাক ডাকে কুহু কুহু”, “হোমিওপ্যাথি ক্যান্সার (বা অন্য কোনও রোগ) সারাতে পারে”, এবং “পৃথিবী হল অনন্ত সাগর দিয়ে ঘেরা এক চমৎকার সমতল বাগান” । আজকের দিনে আমরা জানি যে এই দাবিগুলো ঠিক না, নানা নির্ভরযোগ্য উপায়ে এগুলোকে ভুল বলে প্রমাণ করা যায় । যেমন, ‘দুই’ সংখ্যাটা এবং ‘যোগ’-এর প্রক্রিয়াকে ম্যাথমেটিক্যাল লজিক-এর সাহায্যে বিশ্লেষণ করে দেখান যায় যে ফলাফল চারই হতে বাধ্য, অসংখ্য কাককে পর্যবেক্ষণ করে যাচাই করা সম্ভব যে ওরা মোটেই কুহু কুহু ডাকে না, ক্যান্সার (বা অন্য কোনও রোগের) রোগীদের ওপর হোমিওপ্যাথির ওষুধ নিয়ে ডাব্‌ল্‌ ব্লাইন্ড কন্ট্রোল্ড ট্রায়াল করে দেখান যায় যে তার বিন্দুমাত্র কার্যকারিতা নেই, এবং, পর্যটক ম্যাজেলানের স্টাইলে নৌকো করে পৃথিবীকে সম্পূর্ণ বেড় দিয়ে আবার একই জায়গায় ফিরে এসে (এবং আরও অসংখ্য নানা পদ্ধতিতে) প্রমাণ করা যায় যে পৃথিবী সমতল নয় আর সাগরও নয় অসীম । এই যে “ভুল বলে প্রমাণ করা” যাচ্ছে, এই কথাটা এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ । এই দাবিগুলোর মধ্যে সে সুযোগ থেকে যাচ্ছে, যেহেতু দাবিগুলো স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট । সমস্যা হচ্ছে, সব ধরনের ভুল কথা কিন্তু সেরকম নয়, সব ক্ষেত্রে এভাবে ভুল প্রমাণের সুযোগ নেই । এর এক মজার উদাহরণ হচ্ছে, “ভগবান (বা আল্লা বা গড বা …… ইত্যাদি ইত্যাদি) যা করেন মঙ্গলের জন্য” । শোনা যায়, এক ট্রাক ড্রাইভার নাকি কথাটা খুব বিশ্বাস করত আর বিশ্বশুদ্ধু সক্কলকে বলে বেড়াত । তারপর যখন এক প্রচণ্ড পথ-দুর্ঘটনায় তার পা দুটো বাদ হয়ে গেল তখন তার শুভানুধ্যায়ীরা তাকে জিজ্ঞেস করল, যে, ঈশ্বর এই অ্যাক্সিডেন্ট-টি ঘটিয়ে জগতের ঠিক কোন মঙ্গলটি করলেন । উত্তরে নাকি সে হেসে বলেছিল, কেন, তার জুতো কেনার খরচ তো চিরতরে বেঁচে গেছে ! এখানে ট্রাক ড্রাইভারের ঐশ্বরিক দাবিটিকে সরাসরি ভুল বলে প্রমাণ করা গেল না, যেহেতু ‘মঙ্গল’ শব্দটির অর্থের মধ্যে বিস্তর ধোঁয়াশা রয়েছে – ঠিক কীসে মঙ্গল হয় সে বিষয়ে ড্রাইভারের সঙ্গে অন্যদের মতামতের গুরুতর তফাত আছে (এই লেখায় আরও পরের দিকে আমরা দেখতে পাব যে ‘ঈশ্বর’ বা ‘ভগবান’ জাতীয় শব্দগুলোর মধ্যে আরও অনেক বেশি ধোঁয়াশা আছে) । অর্থের মধ্যে যদি এই রকম ধোঁয়াশা না থাকে তো ভুলটা নিছক ভুলই, আর যদি ধোঁয়াশা ঢুকে পড়ে তাহলেই সে আর নিছক ভুল থাকে না, সে হয়ে যায় ‘ভুল’ বলে আখ্যা পাবারও অযোগ্য । পাউলির ভাষায় — “নট ইভেন রং” ! এই ধরনের মজার উদাহরণ আরও দিতে পারি কিন্তু তার আর দরকার নেই, বিষয়টা বোধহয় বোঝা গেছে । শুধু এখানে বলা দরকার, ধর্মীয় দর্শনের চর্চায় যত রকমের তত্ত্বকথা পাওয়া যায় তার সবটাই হল এই রকম — “নট ইভেন রং” ! হ্যাঁ, এটা স্বীকার করতে হবে যে ধর্মতত্ত্বের বাইরেও এর দেখা পাওয়া যায় । আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তা, যুক্তিবাদী দর্শনচর্চা বা এমনকি বিজ্ঞানেও এরকম দুচারটে “নট ইভেন রং” যে একেবারেই নেই তা নয় — শিল্প-সাহিত্যসৃষ্টিতে তো একটু বেশিমাত্রাতেই আছে, এবং পরোক্ষে কখনও কখনও তারা কাজেকর্মে বেশ সুবিধেও করে দেয় । যেমন, কোনও বিশেষ একটি বা একগুচ্ছ প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানকে এক বৃহত্তর প্রেক্ষিতে দাঁড় করান, অজানা কোনও বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া শুরু করবার উপযোগী একটি মঞ্চ তৈরি করে দেওয়া, শৈল্পিক ব্যঞ্জনা তৈরি করা, এইসব । তবে, ধর্মীয় তত্ত্বের সঙ্গে তার অন্তত দুটো গুরুতর পার্থক্য আছে । প্রথমত, এই সমস্ত ক্ষেত্রে “নট ইভেন রং” জাতীয় উপাদান থাকে অল্প, এবং তার ভূমিকাও গৌণ । দ্বিতীয়ত, এক্ষেত্রে তার ভূমিকাটা হচ্ছে জ্ঞানচর্চা ও শৈল্পিক উপলব্ধিকে সাহায্য করা । অপরদিকে, ধর্মীয় তত্ত্বের ক্ষেত্রে কিন্তু “নট ইভেন রং” জাতীয় উপাদানই প্রধান এবং প্রায় একশো শতাংশ, আর তার ভূমিকাটা হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানচর্চা হতে না দিয়েও গভীর জ্ঞানলাভের এক ভুয়ো তৃপ্তি সৃষ্টি করা । “ব্রহ্ম সত্য জগত মিথ্যা”, “পরমদয়াল রক্ষা করবেন”, “আত্মার বিনাশ নেই”, এই ধরনের যে কোনও কথাই হল গিয়ে ওই গোত্রের । কখনও কখনও অবশ্য “নট ইভেন রং” একটু কায়দা করে সত্য বাক্যের আকারেও উপস্থাপিত হতে পারে, যা বিভ্রান্তিকর । যেমন, ওল্ড টেস্টামেন্টের এক্সোডাস অংশে মোজেস-বর্ণিত সেই বিখ্যাত দৈববাণী – “আই অ্যাম দ্যাট আই অ্যাম” । প্রথম দর্শনে মনে হবে বুঝি এ হল স্রেফ “আলু হল গিয়ে আলু” বা “পাথর হল গিয়ে পাথর” গোছের লজিক্যাল আইডেন্টিটি বা যুক্তিবৈজ্ঞানিক অভেদ (এবং সেই হেতু একটি ‘অ্যানালিটিক্যাল ট্রুথ’ বা বিশ্লেষণী সত্য), কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ হল মোজেসের তরফ থেকে একটি মরমীয়া উপলব্ধির দাবি । তিনি আসলে তাঁর অনুগামীদের বলতে চাইছেন যে, তিনি পাহাড়ের উচ্চ শিখরে উঠে স্বয়ং ঈশ্বর বা জিহোভাকে প্রত্যক্ষ করেছেন, তবে ঠিক কী প্রত্যক্ষ করেছেন সেটা বলা যাবে না কারণ জিহোভা অনির্বচনীয়, এবং জিহোভা অনির্বচনীয় কারণ তিনি যে অনির্বচনীয় সেটা জিহোভা নিজেই বলে দিয়েছেন ! পাক্কা “নট ইভেন রং”, বুঝতেই পারছেন ।

প্রশ্ন হতে পারে, আত্মা আর ঈশ্বর নিয়ে লিখতে গিয়ে হঠাৎ পাউলি সাহেবের ওই ছুটকো মন্তব্য নিয়ে লেগে পড়লাম কেন । আসলে, আত্মা আর ঈশ্বর ‘প্রমাণ’ করবার জন্য যখনই কোনও গুরুগম্ভীর প্রাণান্তকর চেষ্টা দেখি, তখনই পাউলির এই কথাটা একবার না একবার মনে পড়ে যাবেই । এই সব গুরুগম্ভীর লেখায় প্রায়শই আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে টেনে আনা হয় । দামী কেকের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা মহার্ঘ্য শুকনো ফল ও বাদামের মতই এসব লেখায় এক ইঞ্চি অন্তর অন্তর গুঁজে দেওয়া হয় পদার্থবিদ্যা, তথ্যপ্রযুক্তি ও আরও নানা ধরনের বিজ্ঞান থেকে খামচে নেওয়া ভারি ভারি পারিভাষিক শব্দ । রিলেটিভিটি, আনসার্টেন্টি প্রিন্সিপ্ল, ওয়েভ ফাংশান কোলাপ্স, গড জিন, গ্যেডেলের ইনকমপ্লিটনেস থিওরেম, শ্রোয়েডিংগারের বেড়াল, সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার এবং আরও আরও যা খুশি তাই । বিজ্ঞানের কাজ যে কোনও বিষয়কে স্পষ্ট ও স্বচ্ছ করে তোলা, মনের ধোঁয়াশা কাটানো । কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই সমস্ত লেখায় মনের ধোঁয়াশা কেটে না গিয়ে আরও বেড়ে ওঠে, এবং প্রায়শই লেখকের উদ্দেশ্যও তাই । ‘ঈশ্বর’ ও ‘আত্মা’-র কনসেপ্টকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য স্নায়ুবিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা ও তথ্যপ্রযুক্তিকে টেনে আনার যে অস্বচ্ছ উদ্যোগ মাঝে মাঝেই দেখতে পাই তা বোধহয় ওই রকম ধোঁয়াটেপনারই আদর্শ দৃষ্টান্ত । মুক্তচিন্তা ও মুক্ত লেখালেখিতেও হয়ত ঘোলাটেপনা এবং ধোঁয়াটেপনার খানিক অধিকার দিতে হয়, না হলে অনেক সময় ভুল ধরবার জন্য পেতে রাখা ঘন জালটিতে সত্যও আটকে যেতে পারে । কিন্তু অতি অবশ্যই, সে ঘোলাটেপনা এবং ধোঁয়াটেপনা যুক্তির মূল কাঠামোকে আঁকড়ে থাকবে, এবং তার একমাত্র উদ্দেশ্য হতে হবে অভাবিত প্রশ্ন ও সম্ভাবনার জন্য খানিক জায়গা ছেড়ে রাখা, জ্ঞানলাভের ভুয়ো তৃপ্তিকে প্রশ্রয় দেওয়া নয় । সত্যি বলতে কী, ধর্মীয় কুসংস্কারের চর্চার সঙ্গে কোয়ান্টাম, হার্ডওয়্যার, সফ্টওয়্যার এইসব শব্দ চালাকি করে ঘেঁটেঘুঁটে মিশিয়ে দিলে তাতে যুক্তিবাদী মুক্তচিন্তার অভ্যাসের যথেষ্টই ক্ষতি হয়, বিশেষত যদি খ্যাতিমান লেখকেরা সে কাজে নামেন । তখন যুক্তিবাদী লেখকদেরও বাধ্য হয়ে নামতে হয় তার বিরোধিতায় । তাঁরাও সেইসব বিজ্ঞানের তত্ত্ব ও তথ্য ঘেঁটেঘুঁটে দেখাবার চেষ্টা করেন যে সেগুলো মোটেই আত্মা বা ঈশ্বর জাতীয় ধ্যান-ধারণাকে সমর্থন করে না । সেই প্রেক্ষিতেই আমার এই লেখা । বৈজ্ঞানিক নানা ধারণা ও পরিভাষার অপব্যবহার হলে সেইসব ধারণা ও পরিভাষা আলোচনায় উঠে আসবেই — সেটা হয়ত এক অর্থে অপরিহার্যও । তবু আমি এখানে এইটাই দেখাবার চেষ্টা করব যে, আত্মা ও ঈশ্বরের অসারতা প্রতিপাদনের জন্য অত্যাধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বা ‘লিডিং এজ সায়েন্স’-কে টেনে আনার কোনওই প্রয়োজন নেই । কারণ, স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞান, ভাষাজ্ঞান ও কিঞ্চিৎ মানবিকবিদ্যা সহযোগে সামান্য দার্শনিক বিচারই তার জন্য যথেষ্ট (অবশ্য তাই বলে যে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নিয়ে এখানে একটাও মন্তব্য করব না, এমনটাও আবার নয় কিন্তু) ।

প্রথমে আত্মার কথাই ধরা যাক । ‘আত্মা’ কিন্তু আমাদের বিজ্ঞানচর্চা থেকে উঠে আসা কোনও ব্যাপার নয়, এ হল স্রেফ বহুদিন ধরে চলে আসা একটি মিথ্যে ধারণামাত্র । আধুনিক বিজ্ঞান তাকে প্রমাণই বা করতে যাবে কোন দুঃখে, আর নাকচ করার কষ্টই বা শুধু শুধু স্বীকার করতে যাবে কেন ? আমি যদি হঠাৎ বলি, আমার ছাদে রোজ রাতে গোলাপী হাতিরা সব ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়, এবং ধুতি পাঞ্জাবি পরা কাঁকড়াবিছেরা ক্রিস্ট্যালের গ্লাসে জ্যোৎস্না-রস পান করতে করতে মহানন্দে গল্পগুজব করে, অমনি দলে দলে বৈজ্ঞানিক তা প্রমাণ বা নাকচ করতে নেমে পড়বেন ? কেন, তাঁদের হাতে খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই বুঝি ? তবে হ্যাঁ, এসব কথা এভাবে দুম করে বলে দেওয়ার কিছু বিপদও হয়ত থাকতে পারে । এ থেকে আবার কেউ কেউ ভেবে নিতে পারেন যে, ‘আত্মা’ বোধহয় তাহলে বিজ্ঞানের আওতার বাইরের এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার । না, একদমই না । বরং, কালচারাল অ্যানথ্রোপলজি বা সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের গবেষণার মধ্যে দিয়ে এই মিথ্যে ধারণাটির প্রকৃত স্বরূপ ও তার আবির্ভাবের কারণ বিষয়ে অনেক কিছুই জানা গেছে ও যাবে । আসলে, ‘আত্মা’-র ধারণাটি হল ‘প্রসেস’ বা প্রক্রিয়াকে ‘সাবস্টেন্স’ বা বস্তু বলে ভুল করবার একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত । প্রাণ বা মন যে আছে সেটা দেখতেই পাচ্ছি, অথচ দেহ সম্পর্কে যা জানা আছে তা দিয়ে তাকে ব্যাখ্যা করতে পারছি না, অতএব ওগুলো নিশ্চয়ই দেহের মধ্যে ঢুকে থাকা এক সূক্ষ্ম বস্তু — এইরকম এক যুক্তিশৃঙ্খল হয়ত আদিম মানুষের চিন্তাকে চালিত করেছিল । জীবিতের তুলনায় সদ্যমৃত মানুষের (বা অন্য প্রাণির) দৈহিক তফাৎ কিছুই বোঝা যায় না, অথচ সে আর সাড়া দেবে না, কথা বলবে না, ভালবাসবে না, এমনকি রাগও করবে না । তাহলে নিশ্চয়ই কোনও এক রহস্যময় সূক্ষ্ম বস্তু আছে, যার নাম দেওয়া যাক ‘আত্মা’ — দেহের মধ্যে তার থাকা বা না থাকাই তফাৎটা গড়ে দিচ্ছে ! আধুনিক মানুষ জানে যে বাইরে থেকে দেখতে এক হলেও আসলে জীবিত ও মৃত দেহের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ, এবং ওই দৈহিক তফাতটাই হল প্রাণ-মন থাকা বা না থাকারও কারণ, কিন্তু আদিম মানুষের পক্ষে তা বোঝা অসম্ভব ছিল । তারা না জানত শব-ব্যবচ্ছেদবিদ্যা, না বুঝত আধুনিক শারীরবিদ্যা ও কোষতত্ত্ব, না ছিল তাদের হাতে মাইক্রোস্কোপ । তারা তাই বুঝতে পারে নি যে প্রাণ-মন হল আসলে ‘দেহ’ নামক এক মহা জটিল বস্তু-সমবায়ের ‘ফাংশন’ বা ক্রিয়া — জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার পারিপার্শ্বিকের সাথে বিভিন্ন স্তরে অবিরাম চলতে থাকা এক আশ্চর্য মিথষ্ক্রিয়া । এই অতি গভীর ও সমৃদ্ধ প্রক্রিয়াকেই প্রাচীন মানুষ দেখেছিল এক সূক্ষ্ম বস্তু রূপে । এমন নয় যে তারা আমাদের চেয়ে বোকা ছিল । তারা জানত, ভেতরে ঢুকে থাকা বস্তু অন্য বস্তুর ধর্মকে পালটে দিতে পারে । কলসীর ভেতরে জল ঢাললে তার ওজন বেড়ে যায়, আবার তা বার করে নিলে সে ওজন কমেও যায় । জলের মধ্যে নুন বা চিনি মেশালে স্বাদ নোনতা বা মিষ্টি হয়ে যায়, আবার নানা প্রক্রিয়ায় আলাদা করে নিলে সে স্বাদ চলেও যায় । কাজেই, ‘আত্মা’ নামক সূক্ষ্ম বস্তু ঢুকে পড়ে দেহে প্রাণ-মন সঞ্চার করবে আর বেরিয়ে গিয়ে তাকে মড়া বানিয়ে দেবে, এ চিন্তা তাদের কাছে খুব বেশি অসম্ভব বলে মনে হয় নি । তাছাড়া, আমাদের ভাষারও আবার একান্ত নিজস্ব কিছু কেরামতি আছে যা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে । আমরা ‘রামচন্দ্র বনে গেল’ আর ‘সূর্য অস্ত গেল’ একই কায়দায় বলি, ফলে জড়বস্তুর ওপরেও যেমন চৈতন্য ও ইচ্ছাশক্তি আরোপিত হয়, তেমনি আবার প্রক্রিয়ার ওপরেও বস্তুত্ব আরোপিত হয় । যখন আমরা বলি ‘প্রাণ-বায়ু বেরিয়ে গেল’, তখন আমরা আসলে না জেনে ঠিক ওই কাজটাই করে থাকি । শুধু যে ধর্ম ও লোকবিশ্বাসের ক্ষেত্রেই এ ধরনের ভুল হয়েছিল এমন নয়, এমনকি খোদ বিজ্ঞানের ইতিহাসেও এ ধরনের দৃষ্টান্ত আছে । ‘ফ্লোজিস্টন’-এর তত্ত্ব বোধহয় তার মধ্যে সবচেয়ে নাম করা । বস্তুর ‘পুড়ে যাওয়া’ ব্যাপারটা যে আসলে আবহমণ্ডলের সাথে মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে তার এক নাটকীয় রূপান্তর-প্রক্রিয়া, সেটা ফরাসী রসায়নবিদ ল্যাভয়সিয়র প্রথম বুঝিয়ে বলেন অষ্টাদশ শতকে । তার আগে ভাবা হত, বস্তু ততক্ষণই পোড়ে যতক্ষণ তার মধ্যে ‘ফ্লোজিস্টন’ নামে এক ধরনের অদৃশ্য দাহ্য পদার্থ থাকে (এবং তা ফুরিয়ে গেলেই আগুন নিভে যায়) । এই যে ‘পুড়ে যাওয়া’ নামক এক অজানা প্রক্রিয়াকে আর একটি অজানা অদৃশ্য বস্তুর ঘাড়ে চাপানো, আর বেঁচে থাকা ব্যাপারটাকে ‘আত্মা’ নামক এক অতিসূক্ষ্ম সত্তার ঘাড়ে চাপানো, দুটোরই ভেতরকার মৌলিক যুক্তিকাঠামোটা কিন্তু একই । প্রাচীন মানুষের ক্ষেত্রে এইসব ভুল দোষের ছিল না, বরঞ্চ এগুলো তাদের চিন্তাশীলতা, অনুসন্ধিৎসা ও কল্পনাশক্তিরই প্রমাণ । কিন্তু শিক্ষিত আধুনিক মানুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের ভুল ক্ষমার অযোগ্য । আমরা যদি সত্যিই মুক্তচিন্তার চর্চা করতে চাই তো এইসব বিষয়ে সঠিক তথ্য জানা এবং স্বচ্ছ যুক্তিসম্মত ধারণা ও চিন্তা-পদ্ধতি গঠনের জন্য পরিশ্রম করতে হবে । সব কিছুকেই বিজ্ঞান দিয়ে বুঝতে হয়, কিন্তু ঠিক কোন বিজ্ঞানটা কোথায় খাটবে সে বিষয়ে একটা ধারণা থাকতে হবে — যেখানে ভাষাবিজ্ঞান আর সমাজবিজ্ঞান লাগবে সেখানে পদার্থবিদ্যা আর তথ্যপ্রযুক্তির কথা পাড়লে তো সবটাই এক বিশুদ্ধ প্রলাপে পর্যবসিত হবে ! মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ও কোয়ান্টাম শূন্যতার সাথে আত্মার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই । যদি এইটা ভেবে নেন যে এগুলো প্রমাণিত হয়েছে বলেই আত্মাও প্রমাণিত হবে তো সেটা খুবই বিপজ্জনক ব্যাপার, কারণ ওই একই যুক্তিতে কিন্তু আপনার মাথার শিং আর পায়ের ক্ষুরও প্রমাণিত হয়ে যাবার সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে । তথ্যপ্রযুক্তির যুগের আরেকটি নতুন আধ্যাত্মিক উপসর্গ হচ্ছে, দেহ ও আত্মার ধারণা-যুগ্মের প্রাচীন দ্বৈততাকে ‘হার্ডওয়্যার’ ও ‘সফটওয়্যার’ জাতীয় মেটাফর বা রূপক দিয়ে প্রকাশ করতে চাওয়া (আর কে না জানে, বিশ্বাসীর কাছে ‘প্রকাশ’ মানেই ‘প্রমাণ’) । কম্পিউটরের ‘হার্ডওয়্যার’ নামক বস্তুখণ্ডটি যেমন ‘সফটওয়্যার’ নামক অ-বস্তুর স্পর্শ ছাড়া অচল, ঠিক তেমনি আমাদের ‘দেহ’ নামক বস্তুখণ্ডটিও ‘আত্মা’ নামক অ-বস্তুর স্পর্শ ছাড়া অচল – কাজেই, আত্মা আসলে হল গিয়ে এক রকমের ‘সফটওয়্যার’ – চিন্তাসূত্রটা বোধহয় এক্ষেত্রে এরকম । কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আত্মাকে ‘সফটওয়্যার’ বলে ভাববার মধ্যে গভীর দার্শনিক অন্তর্দৃষ্টির চেয়ে তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে নানা অস্বচ্ছ ধ্যানধারণার ছাপই বেশি । আত্মা নাকি ‘নিরালম্ব বায়ুভূত’, অর্থাৎ, শূন্যে ঝুলে থাকে, এবং ওই অবস্থাতেই নানা তুচ্ছ ও নিন্দনীয় কাজ করে থাকে । মানে, লোকের বাড়িতে ঢিল পাটকেল ছোঁড়া, হঠাৎ হঠাৎ অকারণে দরজা-জানলা খোলা বা বন্ধ করা, স্থানে অস্থানে হাজির হয়ে ভদ্রলোকেদের কাজকর্মে অসুবিধে করা, এইসব আর কী । ‘সফটওয়্যার’-এর সঙ্গে তার তফাতটা হচ্ছে, একে তো সফটওয়্যার অত অভদ্র নয়, আর তার ওপর সফটওয়্যার মোটেই শূন্যে ভেসে থাকে না, বৈদ্যুতিন স্মৃতিভাণ্ডারে সঞ্চিত থাকে । এই ‘বৈদ্যুতিন স্মৃতিভাণ্ডার’ আসলে বিশেষভাবে তৈরি এক কঠিন বস্তুখণ্ড মাত্র । সেখান থেকে তা আমাদের কম্পিউটর বা মোবাইলে কপি বা ডাউনলোড হয় বৈদ্যুতিক বা আলোকীয় তরঙ্গ মারফত — এর মধ্যে ভৌতিক রহস্য কিছুই নেই । সবচেয়ে বড় কথা, সফটওয়্যার হচ্ছে পরপর সাজিয়ে রাখা কতকগুলো তথ্য ও নির্দেশ মাত্র, আর প্রাণ-মন হচ্ছে এক স্বনিয়ন্ত্রিত ও স্বরক্ষাকারী জটিল প্রক্রিয়া । প্রাণ ও মন হল বাস্তব প্রাকৃতিক ঘটনা, সুতরাং তাকে ব্যাখ্যা করার জন্য আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে টেনে আনা নিশ্চয়ই স্বাগতম । প্রাণ, মন, আবেগ, চৈতন্য, স্মৃতি – এগুলোকে প্রকৃতিবিজ্ঞানের সাহায্যে বোঝবার প্রচেষ্টা তো সবসময়ই চলছে, নানা ছোটবড় অগ্রগতিও প্রায় রোজই ঘটছে । ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায় সে নিয়ে অতি চমৎকার সব লেখালেখিও নিয়মিতই হচ্ছে । কিন্তু তার বদলে আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে যদি টেনে আনা হয় প্রাণ-মন সম্পর্কে প্রাচীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যানধারণাকে যাথার্থ্য সরবরাহ করার জন্য, তো আমাদের আপত্তিটা সেখানেই । বিজ্ঞানের অন্যতম কাজ হল কুসংস্কারের স্বরূপ, উদ্ভব ও বিবর্তনকে বোঝা — তাকে প্রতিষ্ঠা করা বা প্রশ্রয় দেওয়া নয় ।

এবারে আসা যাক ঈশ্বর-প্রসঙ্গে । ঈশ্বর বা আল্লাহ্‌-র অনস্তিত্ব প্রমাণের জন্যও কোয়ান্টাম তত্ত্বের (বা অন্য যে কোনও জটিল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের) কোনও প্রয়োজন নেই, শুধু এইটুকু বুঝতে পারলেই হয় যে ‘ঈশ্বর’ বা ওই জাতীয় শব্দগুলো আসলে অর্থহীন শব্দ । ভাষা-দার্শনিকেরা ‘অর্থ’ কাকে বলে তাই নিয়ে অনেক চিত্তাকর্ষক আলোচনা করেছেন । তাঁরা দেখিয়েছেন, এমন অনেক বাক্য আছে যা অর্থপূর্ণ বাক্যের আকারে লেখা হলেও আসলে অর্থহীন এবং সেইহেতু বিভ্রান্তিকর । যেমন, “রাজমিস্ত্রি বাড়ি বানিয়েছে” এবং “ঈশ্বর ব্রহ্মাণ্ড বানিয়েছেন” বাক্যদুটির আকার একই রকম হলেও শুধুমাত্র প্রথমটিই অর্থপূর্ণ, দ্বিতীয়টি নয়, যেহেতু ‘রাজমিস্ত্রি’ এবং ‘বাড়ি’ কী জিনিস সেটা আমরা খুব নির্দিষ্টভাবে জানি, অথচ “ঈশ্বর” কী জিনিস তা আমরা মোটেই জানি না, এবং গোটা একটা “ব্রহ্মাণ্ড” যে ঠিক কী জিনিস সে বিষয়ে শুধু কিছু আবছা আন্দাজ মাত্র করতে পারি । প্রথম বাক্যটি জ্ঞান বৃদ্ধি করে, কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যটি আসলে কোনও অর্থপূর্ণ বার্তা বহন না করেই ভুয়ো জ্ঞানের এক প্রতারণামূলক তৃপ্তি সৃষ্টি করে (এবং সেইহেতু তার অর্থহীনতাকে লুকিয়ে রাখতে পারে) । সেটা সম্ভব হয় “ঈশ্বর” শব্দটির পরিচিতি ও ‘প্রেস্টিজ’-এর জন্য । কিন্তু যদি ওই শব্দটিকে এমন এক শব্দ (বা শব্দগুচ্ছ) দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা যায় যা একই রকম অর্থহীন অথচ তার ওইরকম কোনও ‘প্রেস্টিজ’ নেই, তখনই ধরা পড়ে যায় এর হাস্যকর অর্থহীনতা । ধরা যাক, “ঈশ্বর” বাদ দিয়ে তার জায়গায় লেখা হল “হাবলু-গাবলু প্রেমে পাগলু গঙ্গাফড়িং”, তাতে বাক্যটির তথ্যমূল্য বিন্দুমাত্র পরিবর্তিত হবে না (কারণ ‘ঈশ্বর’ শব্দটি ব্যবহার করেও ব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে এর চেয়ে বেশি তথ্য জানা যাচ্ছিল না), অথচ বাক্যটি পড়লেই হাসি পাবে । “হাবলু-গাবলু প্রেমে পাগলু গঙ্গাফড়িং ব্রহ্মাণ্ড বানিয়েছেন” ! কী, শুনতে কেমন লাগছে ? শুনে একটুও সম্ভ্রম জাগছে না, তাই তো ? কাজেই, “ঈশ্বর ব্রহ্মাণ্ড বানিয়েছেন (বা চালাচ্ছেন)” — এ ধরনের বিবৃতি আসলে, “ব্রহ্মাণ্ড কীভাবে হল বা কীভাবে চলছে সেটা আমি জানি না” — এই কথাটা বলবার (কিম্বা না বলবার) এক গুরুগম্ভীর অথচ প্রতারণামূলক কায়দা । কারুর কী এ বিশ্লেষণে কোনও আপত্তি আছে ?

শেষ করার আগে একটা কথা ভাল করে বলে নিতে চাই । আত্মা বা ঈশ্বর গোছের ধ্যানধারণাগুলো যখন আদিম মানুষ প্রথম তৈরি করে তখন সেগুলো ছিল অজ্ঞতাবশত ভুল, এবং নিছক ভুলই । কিন্তু যখনই সেসব দিয়ে বিরাটকায় দর্শন-তন্ত্র বানান হল, এবং অনিবার্য নানা বেয়াড়া প্রশ্নের জবাব দেবার জন্য এগুলোকে বানিয়ে নেওয়া হল পণ্ডিতি তর্কের হাতিয়ার হিসেবে, তখনই শুরু হল অর্থহীনতার চাষ । সেটাই অবশ্য স্বাভাবিক । কারণ, সিরিয়াস তত্ত্বচর্চার উদ্দেশ্য যদি হয় ভুলকে সংশোধন না করে তাকে আরও বেশি বেশি প্রতিষ্ঠা দেওয়া, তাহলে সে তত্ত্বচর্চার ও ছাড়া অন্য কোনও পরিণতি তো আর সম্ভব না । কাজেই, ‘ভুল’-এর সঙ্গে ‘অর্থহীন’-এর তফাতটা খুব ভাল করে বোঝা দরকার । জ্ঞানচর্চায় ভুল অনিবার্য এবং ভুলকে ক্রমাগত সংশোধন করার মধ্য দিয়েই জ্ঞান এগোয় । তবে, অর্থহীনতার ক্ষেত্রে কিন্তু সংশোধনের প্রশ্ন ওঠে না । । ঐশ্বরিক সৃষ্টিতত্ত্ব আসলে ‘আদিম সনাতন ধেড়ে ইঁদুরেরা হেগে হেগে জগত সৃষ্টি করেছে’ বা ‘আমাদের ভটচাজ ফ্যামিলির জাঁদরেল পূর্বপুরুষেরাই আসলে পানের পিক ফেলে ফেলে জগত সৃষ্টি করেছে’ জাতীয় তত্ত্বের চেয়েও খারাপ । ওগুলো শুধুই ভুল (কারণ ব্রহ্মাণ্ড মোটেই ওভাবে সৃষ্টি হয় নি), কিন্তু অর্থহীন নয়, যেহেতু ইঁদুর-হাগা এবং ভটচাজ বংশের সুনির্দিষ্ট বাস্তব অস্তিত্ত্ব (এবং সেইহেতু অর্থও) আছে । অথচ ঐশ্বরিক সৃষ্টিতত্ত্ব অর্থহীন, যেহেতু ‘ঈশ্বর’ এই কথাটির কোনও সুনির্দিষ্ট বাস্তব অর্থ নেই । যদি বলি “বাঘ হল এক তৃণভোজী প্রাণি”, তো সেটা ভুল, কারণ কথাটা বুঝতে অসুবিধে নেই, এবং তাকে সুনির্দিষ্টভাবে ভুল প্রমাণ করতেও অসুবিধে নেই (ক্ষুধার্ত বাঘের সামনে এক চাপড়া ঘাস এবং এক চাঙড় মাংস পাশাপাশি ফেলে দিলেই সেটা অনায়াসে বোঝা যাবে)। কিন্তু যদি বলি, “বাঘ হল এক চতুর্ভুজাকৃতি অনাবিল নিদ্রালুতা”, সেটা হল নিখাদ অর্থহীনতা, এবং সেইহেতু এর সত্যি-মিথ্যে প্রমাণের প্রশ্নই ওঠে না । কবিতায় অবশ্য সফলভাবে এই ধরনের অর্থহীন বাক্যের অর্থপূর্ণ প্রয়োগ সম্ভব, তবে সে কথায় আপাতত এখানে বোধহয় প্রয়োজন নেই ।

ভূত আর ভগবান নিয়ে যে লেখা, তার গোড়াতেই উলফগ্যাং পাউলির কথা টেনে আনাতে পাঠক যদি আপত্তি না করে থাকেন, তাহলে সে লেখার শেষে পটলডাঙার টেনিদার প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেও সম্ভবত তিনি খুব বেশি আহত হবেন না । নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যা্যের সৃষ্টি এই অনবদ্য চরিত্রটি ও তার তিন সঙ্গীর অসাধারণ কাণ্ডকারখানার কথা অল্প বয়েসে আমরা কে না পড়েছি, আর কে-ই বা মনে মনে তাদের সঙ্গী না হয়েছি ! তো, সেই রকমই এক গল্পে টেনিদা আর তার সাথীদের মোলাকাত হয়েছিল এক মস্ত বিজ্ঞানীর সাথে, যিনি নাকি থিয়োরি অফ রিলেটিভিটির সঙ্গে জোয়ানের আরক যোগ করে ভয়ঙ্কর কী একটা আবিষ্কার করতে চান । নানা রোমহর্ষক ঘটনার পরে গল্পের শেষে সেই ‘বৈজ্ঞানিক’ মহাশয় স্বীকার করেন যে, তিনি আসলে আদৌ কোনও বৈজ্ঞানিক নন, কিন্তু, উত্তেজক একটা গল্প বানিয়ে তোলবার প্রবল তাড়নায় বিকট এক মিথ্যের জাল ফেঁদে বসেছেন । দুঃখের বিষয়, থিয়োরি অফ রিলেটিভিটির সঙ্গে জোয়ানের আরক যোগ করে ভয়ঙ্কর-কী-এক-জিনিস বানাতে চাওয়া সেই ভুয়ো বিজ্ঞানী ভদ্রলোক শেষে গিয়ে যা স্বেচ্ছায় স্বীকার করে নিতে পারেন গল্পের মধ্যে, ভূত-ভগবানের সাথে কোয়ান্টাম তত্ত্ব ও তথ্যপ্রযুক্তি যোগ করে ভয়ঙ্কর-কী-এক-জিনিস বানাতে চাওয়া বাস্তবের ভদ্রলোকেরা সারা জীবনেও তা আর স্বীকার করে উঠতে পারেন না । উফ্‌ফ্‌ফ্‌, ‘নট ইভেন রঙ’ আর কাকে বলে মশায় !!!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “উলফগ্যাং পাউলি থেকে পটলডাঙার টেনিদা আত্মা, ঈশ্বর এবং অর্থহীনতা প্রসঙ্গে

  1. “উলফগ্যাং পাউলি থেকে …. “
    “উলফগ্যাং পাউলি থেকে …. ” লেখাটির বিষয়ে একটি মন্তব্য সম্প্রতি পোস্ট করার আগে খুঁটিয়ে দেখে নিই নি। অনেক অযাচিত টাইপোগ্রাফিক ভুল রয়েছে। মার্জনা করবেন। লেখাটির সংশোধিত আকারে আবার পাঠাচ্ছি। আমার জিজ্ঞাসা তৃপ্ত হলেই খুশি হব. প্রয়োজন মনে না করলে এই রিপিট প্রকাশ করবেন না

    অত্যন্ত স্বাদু, উপভোগ্য ,বিশ্লেষণধর্মী,সহজপাচ্য, অতি সরস লেখা। লেখককে সাধুবাদ জানাই। এমন একটি বিষয় তাঁকে ভাবিয়েছে এবং তিনি কলম ধরেছেন সেটি আমা হেন “হাবলু- গাবলু প্রেমে পাগলু গঙ্গাফড়িঙকে” সহজ করে বোঝাতে – এই গোটা প্র্ক্রিয়াটুকু অসামান্য। তাঁকে শতেক অভিনন্দন। অধম বিজ্ঞান বিষয়ে বড়ই অজ্ঞ,অপঠিত। একটি ফেসবুক পোস্টে সম্প্রতি মহাজগত বা আমরা পার্থিবরা কম্পিউটার “সিমুলেসন ” এবম্বিধ জটিল আধা-দার্শনিক আলোচনা পড়তে গিয়ে মাথার চুল থেকে গায়ের লোম একসঙ্গে খাড়া হয়ে উঠছে দেখে দীর্ঘ আলোচনা সূত্রটিকে ফলো করা শ্রেয় মনে না করে মাঝপথে পরিত্যাগ করি। গোড়াতেই বলছি আমি বিজ্ঞানের অপরিমেয় (বা পরিমেয়) গভীরতা বিষয়ে পুরোপুরি মূর্খ কালিদাস অথবা চিফ মিনিস্টার গোত্রের । আমার খটমটে লাগল একদা পাঠ্য প্লেটো-র “রিপাবলিক’ মনে পড়ে। লেখক কবি নটনটীদের ঝেঁটিয়ে বিদেয় করেছিলেন তাঁর আদর্শ “রিপাবলিক” থেকে। তাঁদের দোষ তেনারা নাকী অনুকরণের অনুকরণ করেন। “হনুকরণ ” বলি মুজতবা আলি সায়েবকে ধার করে। সক্রেটিস শিষ্যের প্রতিপাদ্য ছিল এ জগত এক ভিন্ন সত্তা ( বলুন জগত বা ওইপ্রকার কোনো অস্তিত্ত্বের ) ছায়া মাত্র। আর শিল্পী কবিরা নাকী সেই ছায়ার সঙ্গে কুস্তিকরেই সক্কলের গতর ব্যথা করে দেন। অতএব তাড়াও এইসব মশামাছি ,সাজোয়ান ,বুদ্ধিমান,শিক্ষিত নাগরিক তৈরির পথে যেনারা ভাইরাস হয়ে উঠবেন। মহাকম্পিউটার “সিমুলেসন” তত্ত্বটি যেটুকু পড়লাম সেটুকু কি ভুল পড়লাম মহা-অজ্ঞতায় ? আমার কি সর্পে রজ্জুভ্র্ম, নাকী রজ্জুতে সর্পভ্রম ? কোন দ্বিপদ দোষদুষ্ট হলাম যদি আমার বিজ্ঞান সচেতন বন্ধুদের কেউ সহজ করে খুপরিতে ড্রিল করে দেন তবে বিশেষ উপকৃত হই। এদেশের বেদ-উপনিষদ ভকতকূল এইসব পরম বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্লাস্টিক ঠোঙার মতো গিলে অম্ল-অজীর্ণ বাড়িয়ে যেসব নিঃসরণ করবেন পরবর্তীতে তা এ দ্যাশে বাস করা আরও কঠিন করে তুলবে এই শঙ্কা।
    নমস্কার জানবেন
    অমিতাভ সেনগুপ্ত

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

71 − 70 =