সভ্যতার আদি পীঠস্থান পালমিরা

একটি প্রাচীন শহর এবং সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অন্যতম একটি অধ্যায় । গোটা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশাল অঞ্চলের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পালমিরার ইতিহাস । ‘পালমিরা’ শব্দটি মূলত গ্রিক শব্দ, যাকে আরামিক ভাষায় বলা হতো ‘তেদমুরতা’, আরবি ও হিব্রুতে তাদমোর । আরামিক ভাষায় তাদমোর বলা হয় ‘তাল গাছ’কে । বর্তমানে পালমিরা শহর থেকে কিছু দূরেই তাদমোর নামের একটি ছোটো শহরও আছে, যা অতীতের অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়ে আজও দাড়িয়ে আছে । পুরো শহরটি পর্যটকদের উপর নির্ভর করলেও প্রায় ৩৬ হাজার মানুষের বসবাস ওই তাদমোরে । ১৯ শতকের যে ট্যাবলেট পাওয়া যায় তাতেও উল্লেখ ছিল পালমিরা শহরের নাম । সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, পালমিরা ছিল মেসোপটেমিয়া এবং উত্তর সিরিয়ার মধ্যবর্তী বাণিজ্যিক রুটের অন্যতম শহর

♦ পালমিরা
একটি প্রাচীন শহর এবং সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অন্যতম একটি অধ্যায় । গোটা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশাল অঞ্চলের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পালমিরার ইতিহাস । ‘পালমিরা’ শব্দটি মূলত গ্রিক শব্দ, যাকে আরামিক ভাষায় বলা হতো ‘তেদমুরতা’, আরবি ও হিব্রুতে তাদমোর । আরামিক ভাষায় তাদমোর বলা হয় ‘তাল গাছ’কে । বর্তমানে পালমিরা শহর থেকে কিছু দূরেই তাদমোর নামের একটি ছোটো শহরও আছে, যা অতীতের অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়ে আজও দাড়িয়ে আছে । পুরো শহরটি পর্যটকদের উপর নির্ভর করলেও প্রায় ৩৬ হাজার মানুষের বসবাস ওই তাদমোরে । ১৯ শতকের যে ট্যাবলেট পাওয়া যায় তাতেও উল্লেখ ছিল পালমিরা শহরের নাম । সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, পালমিরা ছিল মেসোপটেমিয়া এবং উত্তর সিরিয়ার মধ্যবর্তী বাণিজ্যিক রুটের অন্যতম শহর । এমনকি বাইবেলে পর্যন্ত পালমিরার বর্ননা পাওয়া যায় । বাইবেলে বলা হয় পালমিরা শহরটি বাদশাহ সোলায়মানের তৈরি(তামার নামের শহরটিও বাদশাহ সোলায়মানের তৈরি বলে জানা যায়) । এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে অনেক ঐতিহাসিক বলেন যে তাদমোর শহরটিও সোলায়মানেরই তৈরি, কিন্তু এই দাবির পক্ষে কোনো নিরেট তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি । বিখ্যাত রোমান ইহুদি জোসেফাসের লেখাতেও পালমিরা শহরের নাম পাওয়া যায় ।

খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তদোমর। কারণ সেসময় প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের বাণিজ্যিক রুট হিসেবে তাদোমরের উপর দিয়ে একটি রাস্তা তৈরি করা হয়েছিল । ভূমধ্যসাগর থেকে পশ্চিমে এবং ইউফ্রেতাস নদীর ঠিক পূর্বদিকে ওই রাস্তাটি তৈরি করা হয়েছিল, যাতে প্রাচ্য হয়ে খুব সহজেই পণ্যবাহী ক্যারাভান পশ্চিমে প্রবেশ করতে পারে । মূলত প্রাচ্য এবং পাশ্চত্যের মিলনস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো এই শহর । তবে খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৩ সালে যখন সেলুসিডস সাম্রাজ্য সিরিয়া দখল করে নেয় তখন পালমিরা(তদোমর) শহরটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে । খ্রিষ্টপূর্ব ৪১’এর দিকে মার্ক অ্যান্টনি পালমিরা দখল করতে চেয়েও ব্যর্থ হয় । কারণ পালমিরার কর্তৃপক্ষ আক্রমনের খবর আগেই পেয়েছিলেন এবং ইউফ্রেতাসের বিপরীত তীরে শহরের অধিবাসীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় । সিরিয়ায় রোমান সাম্রাজ্যের সময় রোমনরা পালমিরা শহরের বেশ উন্নয়ন করেছিল । কারণ সেই সময়েই পালমিরা শহরের কথা পারস্য, ভারত, চীন এবং গোটা রোমান সাম্রাজ্যে ছড়িয়ে গিয়েছিল । ১২৯ সালের দিকে হাদ্রিয়ান এই শহরে আসেন এবং শহরটিকে মুক্ত ঘোষণা করে নতুন নামকরণ করেন ‘পালমিরা হাদ্রিয়ানা’ নামে । এরপর ২১৭ সালে সম্রাট কারাকাল্লা পালমিরাকে কলোনি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন, এবং সেই সময়েই প্রথমবারের মতো পালমিরার অধিবাসীদের কর দিতে হয়েছিল । পালমিরার অধিবাসীদের মুখের ভাষা ছিল ‘আরামিক’ । তবে তাদের লেখ্যরীতি ছিল দুই ধরণের । এক রীতিতে বিভিন্ন স্থাপনাকে প্রমাণ মেনে লেখা হতো, এবং দ্বিতীয়ত তারা মোসোপটেমিয়ার রীতিতে লিখতো । এরফলে খুব সহজেই এই শহরে প্রাচ্য এবং পাশ্চত্যের প্রভাব সম্পর্কে বোঝা যায় । শহরের বিভিন্ন স্থানে তৎকালীন অনেক নেতাদের স্থাপত্যকর্ম আছে । সেই স্থাপত্যগুলোয় প্রদর্শিত পোশাকের ফ্যাশন ইত্যাদি দেখলেও প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের প্রভাব সম্পর্কে সহজেই বোঝা যায় ।

পারস্য সাগর হয়ে পালমিরার ব্যবসায়িরা ভারতের সঙ্গে ব্যবসা করতো । তবে তৃতীয় শতকের শুরুর দিকে টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেতাসের সম্মুখভাগ দখল করে নেয় পার্সিয়ান সাসারিয় সাম্রাজ্য । ২৫৫ সালের দিকে সাসারিয়দের পক্ষে সেপটিমাসকে সিরিয়ার গর্ভনর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়, এর পাঁচ বছর বাদে তাকে গোটা পূর্বাঞ্চলের গর্ভনর বানানো হয়েছিল । ২৬৬ সালের দিকে পালমিরার দায়িত্ব রানী জেনোবিয়ার হাতে আসে । তিনি ছিলেন অর্ধেক গ্রিক এবং অর্ধেক আরব(কোনো কোনো ঐতিহাসিক দাবি করেন যে, জেনোবিয়া ছিলেন মূলত অর্ধেক ইহুদি) এবং ক্লিওপেট্রার দূরসম্পর্কের আত্মীয় । তার বুদ্ধিমত্তার কাছে তৎকালীন অনেক রাজার রাজত্ব লোপাট হয়ে যায় । শিক্ষা-সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রেও তার অনেক অবদান ছিল বলে জানা যায় । তার আমলেই মূলত পালমিরার দক্ষ সেনাবাহিনী আনাতোলিয়ার বিশাল অংশ দখল করে নেয় এবং পালমিরা রোম থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে । তবে জেনোবিয়াকে রোমান বাহিনী একটা সময় গ্রেপ্তার করে রোমে নিয়ে গেলে তার ভাগ্যে কি ঘটেছিল তা সঠিক জানা যায়নি । জেনোবিয়ার শেষ জীবন নিয়ে দুইটি ঘটনা চালু আছে । একটিতে বলা হয় জেনোবিয়া রোমে সুখে শান্তিতেই ছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত । আর অন্যটিতে দাবি করা হয় যে, তাকে বিষপানে হত্যা করা হয়েছিল এবং তাকে হত্যার এক বছর পরেই পালমিরায় ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয় এবং অনেক অধিবাসীকে হত্যা করা হয় । ষষ্ঠ শতকের দিকে সম্রাট জাস্টিনিয়ানের নেতৃত্বে আবারও মাথা তুলে দাড়ায় পালমিরা ।

তৎকালীন সময়ে পালমিরায় বেশ কয়েকটি বাইজানটিন চার্চ তৈরি করা হয়ে । যদিও তখন শহরের অধিকাংশই পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে । ৬৩৪ সালের দিকে পালমিরার দায়িত্ব চলে যায় মুসলিম বিশ্বের প্রথম খলিফা আবু বকরের নিয়ন্ত্রনে । সেসময় পালমিরার পাহাড়ের উপর একটি প্রাসাদ তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে থেকে উন্মুক্ত সাগর দেখা যেতো । ১০৮৯ সালের শুরুতে এক ভয়ংকর ভূমিকম্পে পালমিরার একাংশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায় । কিন্তু ১৬৭৮ সালের দিকে দুই ইংরেজ ব্যবসায়ির চেষ্টায় পালমিরাকে পুনরায় আবিষ্কার করা সম্ভব হয় । ১৯২৪ সালে এই শহরটির খননকার্য শুরু হয় এবং ১৯৮০ সালে ইউনেস্কে এই শহরটিতে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা দেয় ।

♦ বাল শামিন
পালমিরা শহরের ইতিহাস, ঐতিহ্যের সাথে যে কয়টি নাম জড়িয়ে আছে তার মধ্যে ২০০০ বছরের পুরাতন এই মন্দিরটি অন্যতম । এটি প্রাচীন বিশ্বের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসাবে বিবেচিত হয় । এটাকে বলা হয় “Pearl of the desert”. বাংলা করলে হয় “মরুভূমির মুক্তা” ।
১ম এবং ২য় শতাব্দী তে এটা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্র ছিল । গ্রেকো – রোমান স্থাপত্যশিল্পের অন্যতম নিদর্শন এই বাল শামিন । এর ভিতরের স্মারক প্রকল্পের সংখ্যা ১০০০ । এছাড়া আরো ৫০০ টি কবর রয়েছে এর ভিতরে ।

প্রতি বছর প্রায় দেড়লাখ পর্যটক বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে পালমিরায় আসত ।

♦ বিশ্ব ঐতিহ্যের এই তীর্থভূমি পালমিরা গত ২১ মে দখল করে নেয় আই.এস নামক একটি জঙ্গি গোষ্ঠী । দখলের পর থেকে তারা ছোট বড় অনেক স্থাপনা ধ্বংস করে । ২৪ আগস্ট তারা বাল শামিন নামক বিশ্বের অন্যতম এই প্রাচীন, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির ধারক এই মন্দিরটিকে ধ্বংস করে ।

© তথ্যসূত্র
উইকিপিডিয়া ও বিবিসি নিউজ থেকে অনুবাদকৃত
এবং গুগল

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 7