ইসলামী বিধান- কখন কোথায় কীভাবে কেন?

?oh=43c79a54d96cc97d3d7559e96f619900&oe=57B3D428″ width=”400″ />
নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, কেতালসহ ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলো নাজেল হবার সাথে জড়িয়ে আছে বিশেষ বিশেষ প্রেক্ষাপট। মুসলমানরা যখন যে বিধান পালন করার উপযোগী পরিবেশ পেয়েছে তখনই কেবল সেই বিধান কার্যকর করার নির্দেশ এসেছে।
.
মক্কায় অবতীর্ণ কোর’আনের আয়াতগুলোতে প্রাধান্য পেয়েছে কলেমা, সবরের তাৎপর্য, জান্নাত-জাহান্নামের বিবরণ, মুশরিকদের বিবিধ প্রশ্নের উত্তর ইত্যাদি। আর মদীনায় অবতীর্ণ আয়াতে অগ্রাধিকার পেয়েছে ইসলামের সমষ্টিগত বিধি-বিধান, রাষ্ট্রীয় নীতিমালা, কেতালের নির্দেশনা ও নিয়ম-নীতি ইত্যাদি। মক্কায় অবতীর্ণ আয়াত ও মদীনায় অবতীর্ণ আয়াতের এই ভিন্নতার কারণ হচ্ছে- প্রেক্ষাপট চেঞ্জ হয়ে যাওয়া।
.
মক্কায় নামাজ বাধ্যতামূলক ছিল না। কারণ সেখানকার পরিবেশ-পরিস্থিতি মুসলমানদের অনুকূলে ছিল না। মুসলমানরা প্রকাশ্যে এক জায়গায় মিলিত হয়ে দৈনিক পাচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে- এমনটা হওয়া অসম্ভব ছিল। একইভাবে যাকাতের বিধান ছিল না, হজ্বও ফরদ ছিল না। এমনকি মুসলমানদেরকে ধরে নিয়ে গিয়ে প্রকাশ্যে হত্যা করা হলেও মুসলমানরা কেতাল করার অনুমতি পেত না। কারণ একটাই- এসব বিধান বাস্তবায়ন করার জন্য যে প্রেক্ষাপট দরকার তা তখনও সৃষ্টি হয় নি, যে পূর্বশর্ত বাস্তবায়িত হওয়া দরকার তা বাস্তবায়িত হয় নি। ব্যক্তি কখনও যুদ্ধের বৈধতা পায় না, যুদ্ধ করতে রাষ্ট্রশক্তি লাগবে, যেটা মক্কার মুসলমানদের ছিল না।
.
তারপর যখন মুসলমানরা মদীনায় হিজরত করল, একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠল, জীবনযাত্রা নিরাপদ হলো, তখন নতুন প্রেক্ষাপটে নতুন বিধি-বিধান আসতে লাগল। নামাজ-রোজা-যাকাত ফরদ হলো, ঈদের নামাজ পড়ার বিধান এলো, কিতালের নির্দেশ এলো।
.
মদীনার জীবনে আল্লাহ মুসলমানদেরকে কিতাল করার জন্য বহু আয়াতে উৎসাহ দিয়েছেন, এমনকি কিতাল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে ভয়াবহ শাস্তির সতর্কবাণীও উচ্চারণ করেছেন। অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যেন, একজন মুসলমান কিতালে যাবে না এটা যেন অবিশ্বাস্য ব্যাপার। হাদীসে আছে- যে ব্যক্তি কোনোদিন জিহাদ করল না, জিহাদ করার সংকল্পও করল না, সে মুনাফিকের একটি শাখায় মৃত্যুবরণ করল। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে মদীনা জীবনে জিহাদ-কিতালকে কতখানি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
.
অথচ এই মহাগুরুত্বপূর্ণ কিতালের বিধানটি মক্কার জীবনে ছিল সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ও অনৈসলামিক। সেখানে কেউ কেতাল করলে তা নিঃসন্দেহে আল্লাহ-রসুলের আনুগত্যের লঙ্ঘন হতো। সেটা হতো আল্লাহর দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অর্থাৎ মক্কায় যা ছিল কার্যত হারাম, মদীনায় তা কেবল হালালই হলো না, প্রত্যেক মুসলমানের জন্য হয়ে গেল বাধ্যতামূলক, আল্লাহর পথে জিহাদ করে শহীদ হওয়া ব্যক্তির সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদা ঘোষিত হলো।
.
এইযে প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সাথে সাথে একটি বিধানের এতখানি পরিবর্তন ঘটে যাওয়া, নিষেধের আদেশে পরিণত হওয়া কিংবা আদেশের নিষেধে পরিণত হওয়া, এটার গুরুত্ব অনুধাবন করতে আমরা ব্যর্থ হই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। যুগের প্রেক্ষাপট, যেটা আল্লাহর রসুলের সময় প্রধান বিবেচ্য বিষয় ছিল, আমরা দেখি সেটা বর্তমানে কার্যত অস্বীকার করে বসা হয়।
.
কোর’আন একদিনে হঠাৎ করে নাজেল হয়ে যায় নি, কোর’আনের প্রতিটি আয়াতের সাথে জড়িয়ে আছে কোনো না কোনো ঘটনা, পরিবেশ, পরিস্থিতি বা প্রেক্ষাপট। দীর্ঘ ২৩ বছরের বিভিন্ন ঘটনা পরম্পরা ও নতুন নতুন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অবতীর্ণ হওয়া আয়াতসমূহের সমষ্টি হচ্ছে সমগ্র কোর’আন। সুতরাং বর্তমানে কোর’আনের শাসন কায়েম করতে চান যারা, তাদেরকেও বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে এগোতে হবে। উদাহরণ দিচ্ছি।
.
কোর’আনে যুদ্ধের নির্দেশ আছে, এটা অস্বীকার করছি না। অন্তত ছয়শ আয়াত আছে সরাসরি যুদ্ধ সংক্রান্ত। কাজেই ওটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু বিবেচনা করতে হবে যে, কোর’আনের ওই যুদ্ধের নির্দেশনা কোন প্রেক্ষাপটে নাযেল হয়েছিল, কাদের জন্য নাযেল হয়েছিল, কার বিরুদ্ধে যুদ্ধের নির্দেশনা এসেছিল, কেন যুদ্ধ ফরজ করা হয়েছিল? অতঃপর বর্তমানে সেই বিধানকে বাস্তবায়ন করতে চাইলে আপনাকে দেখতে হবে ওই প্রেক্ষাপটের সাথে বর্তমানের প্রেক্ষাপট কতখানি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
.
কোর’আনের যুদ্ধের নির্দেশনা আসার পর রসুল রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন, আর মুসলমানরা রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল ফেতনা নির্মূল করা। কোর’আনের বিধান শাশ্বত, কেয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে, সুতরাং যুদ্ধের ওই নির্দেশনা আজও আছে কোর’আনে। কোর’আন খুললেই স্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়- যুদ্ধ কর যতক্ষণ না ফেতনা পুরোপুরি নির্মূল হয় (সুরা বাকারা ১৯৩)। ফেতনা কি নির্মূল হয়ে গেছে? না, হয় নি। সুতরাং যুদ্ধ এখনও ফরজ।
.
কিন্তু আপনি যেহেতু রাষ্ট্রপ্রধান নন, সুতরাং কেতালের ঘোষণা দেওয়ার অধিকার আপনার নেই। এই আয়াত আপনার জন্য নয়, যিনি রাষ্ট্র চালাচ্ছেন কোর’আনের এই বিধান তার জন্য। তিনি যদি এই বিধান বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেন, আপনাকে রাষ্ট্র থেকে যুদ্ধের অনুমতি প্রদান করা হয় আপনি তখন কেতাল করবেন, তখন আপনি হবেন বাচলে গাজী মরলে শহীদ। আর যদি আপনি প্রেক্ষাপটকে বিবেচনা না করে, রাষ্ট্রকে উপেক্ষা করে ব্যক্তিগতভাবে বা দলগতভাবে আল্লাহর এই বিধান (কিতাল) বাস্তবায়নে নিযুক্ত হন তাহলে আপনি নিজেই ফেতনা ছড়ানোর অপরাধে অপরাধী হবেন। তখন বাকারার ১৯৩ আয়াত মোতাবেক- আপনাকে নির্মূল করাই হবে রাষ্ট্রের কেতাল।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “ইসলামী বিধান- কখন কোথায় কীভাবে কেন?

  1. আপনি সত্যের অনেকটাই কাছাকাছি
    আপনি সত্যের অনেকটাই কাছাকাছি চলে গেছেন। তবে সেটার ফিনিশিংটা ঠিকমত হয় নি।

    আল্লাহ যদি চিরশ্বাশ্বত ও চিরন্তন হয়, তাহলে তার বানীও হবে চিরন্তন। তাই সেগুলো কার্যকরী হবে চিরকাল। যদি কোন প্রেক্ষাপটেও আল্লা কাউকে কোন আদেশ দিয়ে থাকে , সেটা অত:পর শুধুমাত্র প্রেক্ষাপট নির্ভর হবে না , সেটা হয়ে যাবে চিরন্তন একটা আদেশ।

    এখন আপনার মতে আল্লাহর বানীর কার্যকারিতা যদি প্রেক্ষাপট নির্ভর হয় , তাহলে আপনি প্রকারান্তরে এটাই প্রমান করছেন যে , কোরান ও মুহাম্মদের আদর্শ শুধুমাত্র ১৪০০ বছর আগের আরব সমাজের জন্যে প্রযোজ্য ছিল। কারন সেই ১৪০০ বছর আগেকার আরব দেশের প্রেক্ষাপট দুনিয়াতে আর কোথাও কোনদিন ছিল না , বা নেই , ভবিষ্যতেও থাকবে না। কিন্তু যখনই এই বক্তব্যটা দেয়া হচ্ছে , সাথে সাথেই আপনি এর বিরোধীতা শুরু করবেন। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন , বিষয়টা সেরকমই।

    যেমন ধরুন , কুরাইশরা মুহাম্মদকে আক্রমন করতে যাচ্ছিল , আর তখন আল্লাহ আদেশ দিল – কুরাইশদেরকে যেখানে পাও সেখানে হত্যা কর। শুধু প্রেক্ষাপট ভিত্তিক বিষয়টা হলে , দুনিয়াতে মুহাম্মদের পর আর কাউকে কুরাইশরা আক্রমন করতে যায় নি , তাই আর হত্যার উক্ত আদেশেরও কার্যকারিতা আর থাকে না। কিন্তু এটা যখন বলা হবে , তখনই বলবেন , না , অত:পর যখনই মুসলমানরা কোন আক্রমনের শিকার হবে , তখনই উক্ত বিধান অনুযায়ী তারা আত্মরক্ষার জন্যে যুদ্ধ করবে। তাহলে কিন্তু দেখুন , আল্লাহর উক্ত বানী আর প্রেক্ষাপট নির্ভর থাকল না। উক্ত বানীর অর্থ হয়ে গেল চিরন্তন , কারন আত্মরক্ষার অধিকার সবার আছে , ছিল ও থাকবে।

    সমস্যাটা হচ্ছে , আপনি যখনই কোরান হাদিসের কিছু বানীকে উক্ত ভাবে ব্যখ্যা করার সুবিধা পাবেন , তখনই কিন্তু আর প্রেক্ষাপটের কথা বলবেন না। ঠিক একই ভাবে আপনি কিন্তু কিছু একই রকম বানীর কার্যকারীতা দেখে বিপদ বুঝে সাথে সাথেই সেটাকে প্রেক্ষাপট নামক অজুহাত দিয়ে বাদ দিতে চাইবেন। যেমন নিচের আয়াত :

    সুরা তাওবা – ৯: ৫: অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও, তাদের বন্দী কর এবং অবরোধ কর। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাক। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

    আপনি দেখুন , এই আয়াতের কোথাও বলে নি , যে মুশরিকরা মুহাম্মদকে আক্রমন করতে যাচ্ছিল তাই তার প্রেক্ষিতে , আল্লাহ মুশরিকদেরকে হত্যা করতে বলছে। এমন কি আপনি যদি এই সুরার ১ নং থেকে শুরু করে ক্রমাগত পড়ে যান , কোথাও পাবেন না , যে মুশরিকরা মুহাম্মদকে আক্রমন করতে যাচ্ছিল আর তাই কোরান বলতে মুশরিকদেরকে হত্যা করতে হবে। বরং এটাই দেখা যাচ্ছে , যেহেতু মুশরিকরা ইসলাম গ্রহন করছে না , তাই তাদেরকে হত্যা করতে হবে। এটা সম্পূর্ন একটা বিশ্বাস না করার কারনে। এই আয়াত কোনভাবেই আত্মরক্ষা মূলক না। অথবা নিচের আয়াত

    সুরা তাওবা – ৯: ২৯: তোমরা যুদ্ধ কর আহলে-কিতাবের ঐ লোকদের সাথে, যারা আল্লাহ ও রোজ হাশরে ঈমান রাখে না, আল্লাহ ও তাঁর রসূল যা হারাম করে দিয়েছেন তা হারাম করে না এবং গ্রহণ করে না সত্য ধর্ম, যতক্ষণ না করজোড়ে তারা জিযিয়া প্রদান করে।

    এই সুরার ২৯ নং আয়াতের আগে পরের আয়াত পড়ুন, কোথাও দেখবেন না যে ইহুদি বা খৃষ্টানরা মুহাম্মদকে আক্রমন করতে যাচ্ছিল আর তাই কোরানে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হচ্ছে। বরং সোজা ভাবে এটাই বলা হচ্ছে , তারা যদি ইসলাম গ্রহন না করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যেতে হবে , আর যদি গ্রহন না করে তাহলে তাদেরকে জিজিয়া কর দিতে বাধ্য করতে হবে ও তারা সব সময় আত্মসমর্পন করা অবস্থায় থাকবে।

    আপনি হাদিস , তাফসির , সিরাত কোথাও থেকে এই আয়াত দ্বয়ের প্রেক্ষাপটে দেখাতে পারবেন না , যে মুশরিক বা ইহুদি খৃষ্টানরা মুহাম্মদকে আক্রমন করতে যাচ্ছিল আর তাই তাদেরকে হত্যা করতে বলছে বা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বলছে। অর্থাৎ এটা সম্পূর্নই আক্রমনাত্মক আদেশ আর সেটা কিসের জন্যে ? সেটা তাদেরকে ইসলাম গ্রহনে বাধ্য করার জন্যে। আর বলা বাহুল্য, আল্লাহর এ আদেশ হবে চিরন্তন।

    সমস্যাটা হচ্ছে তখনই। যখন কোন বানী চিরন্তন হিসাবে গ্রহন করলে তা আপনার নিজস্ব ধারনার বিপরীতে যাবে , বা কেউ যদি উক্ত বানীকে চিরন্তন জ্ঞান করে তা বাস্তবায়ন করতে যাবে , যেমন আই এস , তালেবান এরা করছে , তখন আপনার কাছে সেটা ভাল না লাগলে, এইসব চিরন্তন আদেশকে প্রেক্ষাপট নামক অজুহাত দিয়ে পাশ কাটাতে চাইবেন। এটাই হলো আপনাদের সমস্যা । আর এটা অবশ্যই একটা মানসিক সমস্যা। আমরা সেটা টের পাই , এটা নিয়ে লেখা লেখি করি , আর তখনই আপনরা আমাদেরকে ইসলাম বিদ্বেষী উপাধি দেন। অথচ আমরা সত্য কথাই লিখি।

    আপনি যদি সত্যি একজন ইমানদার মুমিন হন , সত্য স্বীকার করার সৎ সাহস নেই কেন ? কেন আল্লাহর চিরন্তন আদেশকে প্রেক্ষাপট নামক অজুহাত দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করেন ?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 14 = 19