অনলাইন এক্টিভিস্ট এবং ব্লগারদের বিরুদ্ধে সরকারের জিহাদ, আসছে জামিন অযোগ্য ধারাসম্বলিত আইন, সন্দেহ হলেই গ্রেপ্তার

আপনি অনলাইনে লিখালিখি করছেন, যখন তখন পুলিশ কিংবা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হতে প্রস্তুত তো!

হ্যা, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে যখন তখন যেকোন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার ক্ষমতা দিয়ে সংশোধন করা হচ্ছে আইসিটি এক্ট। সন্দেহ হলেই গ্রেফতারের বিধান রেখে সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হচ্ছে। খবরটি আজকের মোটামোটি সকলের চোখ এড়িয়েই গেছে বলা যায়। কারণ, ইনফরমেশন টেকনজলি নিয়ে আইন হলেও অনলাইনে এ নিয়ে কোথাও কারও কোন লিখা এখনও চোখে পড়েনি। অথচ, এ আইনটি নিয়ে অনলাইনেই মাতামাতি হবার কথা ছিলো বেশি খড়গটা যে অনলাইন একটিভিস্টদের উপর তাক করা!

যাই হোক, আসুন দেখা যাক কী আছে এ আইনটিতে। সবচেয়ে ভয়ংকর কথাটি শিরোনামেই বলেছি যে পুলিশ কিংবা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তি যদি কাউকে সন্দেহ করেন যে তিনি আইন লংঘন করছেন, তাহলেই কেল্লাফতে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিটির জায়গা হবে ১৪ শিকের লালঘর। এ আইনটিতে জামিন অযোগ্য হিসেবে রাখা হয়েছে আটটি ধারা। অর্থাৎ, আপনাকে এ আটটি ধারার একটি ধারায় ফেলে দিলে আপনি নিজেকে নির্দোষ প্রমান আগ পর্যন্ত লালঘরেই কাটাতে হবে আপনাকে।

সন্দেহ থেকে গ্রেফতার কিংবা জামিন অযোগ্যতা যেমন তেমন, আপনি যদি নির্দোষ হয়ে থাকেন এবং তা প্রমান করতে সক্ষম হয়েও যান, আর তা করতে গিয়ে যদি বছরের পর বছর লেগে যায় তবে আপনার এই হাজত বাসের কোন দায় কেউ নেবে না। কারন, এ আইনে রাখা হয়েছে দায়মুক্তির সুন্দর একখান ভয়ংকর বিধান। আপনি যদি ফেসবুক ব্যবহার করেন আর কোন কারণে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা রাজনৈতিক কোন নেতার বিরাগভাজন হয়ে যান কোন সময়, তাহলে আপনাকে এ আইনের ফাকে একবার ফেলে দিলেই কেল্লাফতে আপনার। আপনাকে আর পায় কে! আপনি বহাল তবিয়তে ঠাই নেবেন থানার হাজত ঘরে, সেখান থেকে হাজতবাসের জন্য কারাগারে। জামিন অযোগ্য ধারায় জেলে বসবাস করবেন দিনের পর দিন। আপনি আচ্ছামত হাজত বাস করে নির্দোশ প্রমানিত হয়ে বের হলেও মামলার বাদী অর্থাৎ আপনার বিরুদ্ধে যে কর্মকর্তা অভিযোগ দায়ের করবে তার কিছুই হবে না, তার জন্য রয়েছে দায়মুক্তি। না না ক্রসফায়ারের সাথে এর সামঞ্জস্য খুঁজবেন না। ক্রসফায়ারে তো মেরে ফেলে, এখানে বড়জোর আপনার জীবন থেকে মূল্যবান ৭ থেকে ১৪টা বছর হারিয়ে যাবে। এর বেশি কিছু না।

জানা গেছে,সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়ায় বেশ কিছু বিষয়কে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ সাইট ফেসবুক, টুইটার, ইন্সট্রাগ্রাম, ট্যাঙ্গো, ভাইবার, ইমোসহ যে কোনো অ্যাপস বা ওয়েবসাইটে গোপনীয়তা লংঘন করে ছবি প্রকাশ, প্রেরণ, পর্নোগ্রাফি, কোম্পানি অপরাধ, ভাইরাস ছড়িয়ে কারও ক্ষতিসাধন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্ন, রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি, ক্ষতির চেষ্টা করা বা প্ররোচনা দেয়া। এসবের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের শনাক্ত করে নতুন আইনে বিচারের আওতায় আনা যাবে। এ আইনের অধীনে কেউ অপরাধ করেছেন বা করছেন বলে সন্দেহ হলে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরোয়ানা ছাড়াই তাকে গ্রেফতার করতে পারবেন। তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত যে কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশিও করতে পারবেন। এ আইনে অপরাধের তদন্তভার পাবে ডিজি নির্ধারিত প্রতিনিধি ও পুলিশ।

ঘাবড়াবেন না, সবসময় সরকারকে তেলের ডিব্বা উপুর করে দিয়ে অনলাইনে লিখবেন, তাহলে আপনার কিছুই হবে না। আর যদি তেড়িবেড়ি করেন, তাহলে আপনি রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলায় ফেসে গেলে সরকারের কীই বা করার আছে! ও ভূলে যাবেন না, রাজনৈতিক নেতা কিংবা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জন্যও তেলের ডিব্বা রেডি রাখবেন। না হলে, ফেসবুক, টুইটার, ইন্সট্রাগ্রাম, ট্যাঙ্গো, ভাইবার, ইমোসহ যে কোনো অ্যাপস কিন্তু কোন ধরনের অপরাধ না করেও সন্দেহের তালিকায় ঢুকে গেলে এই অধম ব্লগার দায়ী থাকবে না। দায়ী থাকবে না রাষ্ট্রের কেউ।

আশার কথা হচ্ছে, এ আইনের অধীনে দায়েরকৃত মামলার অভিযোগ গঠনের (চার্জ গঠন) দিন থেকে ৬ মাসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে হবে। তবে, আপনাকে গ্রেফতারের পর থেকে চার্জ গঠন করতে কয়দিন লাগবে তা কিন্তু আমি কোনভাবেই আন্দাজ করতে পারব না, এ জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।

আইনের ৯ থেকে ১৬ ধারা পর্যন্ত ৮টি ধারার অপরাধ হবে আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য করা হয়েছে। ধারা-১০ ও ১১-এ কম্পিউটারসংক্রান্ত জালিয়াতি ও প্রতারণা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি অনুমতি ছাড়া কারও কম্পিউটার, কম্পিউটার প্রোগ্রাম, কম্পিউটার সিস্টেম বা নেটওয়ার্কে অপর কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে কোনো তথ্য পরিবর্তন, মুছে ফেলা বা নতুন তথ্য সংযুক্ত বা বিকৃতি ঘটানোর মাধ্যমে নিজে বা অন্য কারও আর্থিক সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করেন তা হলে এ কাজ অপরাধ হবে। এছাড়া কোনো ব্যক্তি প্রতারণার অভিপ্রায়ে প্রেরকের বরাবরে এমন কোনো ইলেকট্রনিক মেসেজ প্রেরণ করেন যা বস্তুগতভাবে ভুল তথ্য দেয়ায় অপর কোনো ব্যক্তির লোকসান বা ক্ষতি সংঘটিত করে তাহা হইলে তাহার এই কাজ হইবে একটি অপরাধ।’ এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে অনধিক ৫ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। কী বুঝলেন! সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে কম্পিউটার ব্যবহার করেন? অন্য কারও কম্পিউটার ব্যবহার করার অভ্যাস আছে? আপনার কম্পিউটার ল্যান কানেকশনে যুক্ত? সময় থাকতে সাধু সাবধান। নাইলে কে যে কখন আপনার পেছনে আঙুল দিয়ে দেয়, থুক্কু ক্ষতি সাধনের অভিযোগ দায়ের করে ফেলে কে জানে!! অবশ্য আপনি যদি মনে করেন যে পাঁচ বছর জেলে থেকে ফ্রিতে খাবেন দাবেন, লাখ তিনেক টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দেবেন, তাহলে অন্য কথা।

ধারা-১২ এ পরিচয় প্রতারণা এবং ছদ্মবেশে প্রতারণা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- ‘কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম বা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অপর কোনো ব্যক্তির পরিচয় ধারণ করে বা অন্য কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য নিজের বলে দেখায় বা উদ্দেশ্যমূলক জালিয়াতির মাধ্যমে কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তির ব্যক্তিসত্তা নিজের বলে এ উদ্দেশ্যে ধারণ করে যে, তার নিজের বা অপর কোনো ব্যক্তির সুবিধা লাভ করা বা করানো, কোনো সম্পত্তি বা কোনো সম্পত্তির স্বার্থ প্রাপ্তি, অপর কারও ক্ষতি করা হলে অনধিক ৫ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে।’ আপনার ফেইক আইডি আছে? আপনার ফেসবুকের আইডির কাব্যিক নাম খুব পছন্দ? মেঘ, ফুল-পাখীর নামে আইডি খুলতে খুব ভাল লাগে? আপনি আরজ আলী মাতুব্বর কিংবা হুমায়ুন আজাদের নামে আইডি খুলেছেন? এখনই এসব মুছে ফেলুন। নাহলে পাঁচ বছর বসে খাবেন কিংবা তিন লাখ টাকা জরিমানা দেবেন, কার তাতে কী!

১৩ নম্বর ধারার ৪টি উপধারা এবং বেশ কিছু উপ-উপধারার মাধ্যমে সাইবার সন্ত্রাসী কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। এতে সাজার বিষয়ে স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে।
গোপনীয়তা লংঘনের বিষয়ে ১৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কারও অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা, প্রকাশ ও প্রেরণ গোপনীয়তা লংঘনের ক্ষেত্রে অপরাধ হবে। হ্যাকিং অপরাধ করলে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। অন্যের ছবি তোলার অভ্যাস থাকলে বাদ দেন। আর হ্যাকিং কিভাবে করতে হয় শেখার যদি ন্যুনতম খায়েশ মনের ভেতরে থাকে, তাহলে ১০ বছরের জন্য রেডি হয়েই শিখুন। ও হ্যা, ১০ লাখ টাকাও মজুদ রাইখেন কিন্তু!

পর্নগ্রাফি দেখতে ভাল লাগে? মোবাইলের মেমরিতে, পেনড্রাইভে পর্ন সংগ্রহ করে রাখছেন একা একা দেখবেন বলে? এই নিন আপনার পুরষ্কারঃ পর্নোগ্রাফি, শিশু পর্নোগ্রাফি এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের জন্য (ধারা-১৫) অনধিক ১০ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। এক্ষেত্রে কম্পিউটারে, পেন ড্রাইভ, মেমোরি কার্ডে পর্নোগ্রাফি সংরক্ষণ, এমন কোনো বিজ্ঞাপন প্রকাশ করলে যাতে বিজ্ঞাপনদাতা কর্তৃক পর্নোগ্রাফি বা অশ্লীল উপাদানগুলো বিতরণ বা প্রদর্শনের সম্ভাবনা থাকে, কম্পিউটার বা কম্পিউটার সিস্টেমের মধ্যে শিশু পর্নোগ্রাফি বা শিশু সম্মন্ধীয় অশ্লীল উপাদান প্রকাশ করলে কম্পিউটার সিস্টেমের মধ্যে প্রকাশের উদ্দেশ্যে শিশু পর্নোগ্রাফি উপাদান উৎপাদন করলে, এমন কোনো বিজ্ঞাপন প্রকাশ করলে যা শিশু পর্নোগ্রাফি বা শিশু সম্মন্ধীয় অশ্লীল উপাদান বিতরণ বা প্রদর্শনের সম্ভাবনা থাকে তবে তিনি এই অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবে। এ আইনের ২৯ ধারায় বলা হয়েছে, দণ্ডযোগ্য কোনো অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিনে মুক্তি দেয়া যাবে না। কী মনে হয়! এরপরও পর্নগ্রাফি নিয়ে ঘুরবেন? না কি কম্পিউটারে হাইড করে রাখবেন!

সর্বোপরি, আমাদের মত ব্লগারদের কথা না হয় নাই বললাম। ওরা তো লেখেই এ কারণে যে তারা সরকারের ভাল কোন কিছু চোখে দেখে না। এদের চোখের মধ্যে আল্লাহ পর্দা ফালায়া দিছে। এদের দীলের মধ্যে শীল মোহর পইড়া গেছে, এরা সরকারের উন্নয়নকে হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করতে পারে না। এই দেখেন না, এত সুন্দর একটা আইনকে নিয়েও ব্লগ লিখা শুরু কইরা দিছে আমার মত ফালতু একজন আদার বেপারী, আবার শিরোনাম দিছে “ অনলাইন এক্টিভিস্ট এবং ব্লগারদের বিরুদ্ধে সরকারের জিহাদ, আসছে জামিন অযোগ্য ধারাসম্বলিত আইন, গঠন হচ্ছে উচ্চক্ষমতার সাইবার নিরাপত্তা কাউন্সিল, সন্দেহ হলেই গ্রেপ্তার করবে পুলিশ”। এখন আমাকে যদি পুলিশ রাষ্ট্রবিরুধীতার দায়ে গ্রেফতার করে, তাহলে সরকারের কি করার আছে? তাদের তো আছে দায়মুক্তি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “অনলাইন এক্টিভিস্ট এবং ব্লগারদের বিরুদ্ধে সরকারের জিহাদ, আসছে জামিন অযোগ্য ধারাসম্বলিত আইন, সন্দেহ হলেই গ্রেপ্তার

  1. আহারে পর্ণগ্রাফী বন্ধ করায়
    আহারে পর্ণগ্রাফী বন্ধ করায় নাস্তিক মহলে কান্নার রোল পড়েছে দেখছি।

    প্রতিবছর বিপুল পরিমান নাস্তিক বিদেশে আশ্রয় নিয়ে দেশের রেমিট্যান্স বাড়াতে কিন্তু বিরাট ভূমিকা রাখছে। সরকার সেটা ভুলে যায় কিভাবে?

  2. এদিকে একের পর এক মুক্তচিন্তার
    এদিকে একের পর এক মুক্তচিন্তার মানুষদের হত্যা করা হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার মুক্তিচিন্তা চর্চার দ্বার রুদ্ধ করার আয়োজন করছে। জামায়াত-বিএনপি-হেফাজত-আওয়ামীলীগ এরা কেইউ ভিন্ন কিছু নয়। নামের পরিবর্তন শুধু। এদের সবার দর্শন এক। দেশ অন্ধকারের দিকে ধাবিত, এটাই এই মুহুর্তের সত্য।

  3. লেখাটি পড়লাম । চমৎকার একটি
    লেখাটি পড়লাম । চমৎকার একটি বিষয় নিয়ে লিখেছেন । ভাল লেগেছে । যদিও উল্লেখিত বিষয়গুলো সদা মেনে চলার চেষ্টা করি তবুও বিষয়টি নিয়ে বেশ চিন্তায় পরে গেলাম । খায়দায় জলিল মোটা হয় জব্বার । এই অবস্থা হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায় ?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

33 − = 23