প্রাচীন কালে উড়উড়ি

প্রাচীনকালের উড়উড়ি

——————–

রাশিয়ার রকেট বিশেষজ্ঞ সিওলোকভস্কী বলেছিলেন, প্রথমে একটি স্বপ্নের সৃষ্টি হয়েছে, তারপর মানুষ সেই স্বপ্নের গায়ে জড়িয়েছে পরিকল্পনা, আঁকা হয়েছে নকশা এবং এভাবেই সেই স্বপ্ন বাস্তবে এসে দাঁড়িয়েছে । আমরা আজ যে উড়োজাহাজে ঘুরে বেড়াচ্ছি, এর পিছনেও সেই একই কারণ –মানুষ তার স্বপ্ন থেকে সত্যিকার জিনিষগুলো তৈরি করেছে ।

পৃথিবীর প্রথম দিককার আকাশভ্রমণ সংক্রান্ত পরিকল্পনাবিদ যারা ছিলেন তাদের মধ্যে ডেডালাস অন্যতম। ডেডালাস নিজের ও ছেলের জন্যে পাখা তৈরি করেছিলেন, তবে তার ছেলে ইকারুস সেই গ্লাইডার বা পাখা চালাতে চালাতে অনেক উঁচুতে উঠে গিয়েছিলেন, ফলে বেসামাল অবস্থায় তাকে সমুদ্রে পড়তে হয়–যে সমুদ্র’কে এখন বলা হয় ইকারিয়ান সী । এই ঘটনার ৪৫০০ বছর পর রাইট ভ্রাতৃদ্বয় ছিলেন অনেক সৌভাগ্যশালী । কারণ ইতিমধ্যে বিমান চালনা বিজ্ঞান-কৌশল ইত্যাদি সম্পর্কিত মৌলিক জ্ঞান অনেকটা তাদের চোখের সামনেই সমৃদ্ধ হয়েছিল । উল্লেখ্য, ডেডালাস’কে পৌরাণিক কাহিনীর নায়ক বলে গণ্য করা ভুল হবে, কারণ তার উপস্থিতির প্রমাণ রয়েছে ।

হার্মেস বা মার্কারী সম্বন্ধে বলা হয় যে সে এমন পাখাযুক্ত স্যান্ডেল এবং হ্যাট পরতো, যার সাহায্যে সে প্রচণ্ড গতিতে জল কিংবা স্থল ভাগের উপর দিয়ে উড়ে যেত । চীনের ঐতিহাসিক নথিপত্রে মনে গ্রাহী কিছু ব্যাপার রয়েছে। সম্রাট শাহ (খৃষ্টপূর্ব ২২৫৮ -২২০৮) শুধু আকাশে ওড়ার পোশাক নয়, প্যারাসুটও বানিয়েছিলেন । ডেডালাস যে সময়ে তার গ্লাইডার বানিয়েছিলেন, সম্রাট শানের ব্যাপারটিও সেই একই সময়ের । সম্রাট চেঙ তাঙ্গ (১৭৬৬ খৃষ্টপূর্ব) কাই কুণ্ড শিকে উড়ন্ত রথ বানানোর হুকুম দিয়েছিলেন । সম্রাট সেই রথে চড়ে হোনান প্রদেশে গিয়েছিলেন । অবশ্য শক্রর হাতে পড়তে পারে এই আশঙ্কায় সেই রথ এবং তার তৈরির কৌশল সম্রাটের আদেশেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল ।

খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর চৈনিক কবি চুউয়ান-এর এক লেখায়, রথে করে গোবী মরুভূমির ওপর দিয়ে পশ্চিমে কুন-লুন পর্বতের দিকে উড়ে যাওয়ার বর্ণনা রয়েছে । কিভাবে তার উড়োযান গোবী মরুভূমির প্রবল বাতাস আর ধূলো থেকে বেঁচেছিল তিনি তার নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন। কিভাবে তিনি এরিয়াল সার্ভে পরিচালনা করেছিলেন তার সঠিক বর্ণনাও লেখায় রয়েছে। কো-হাঙ চতুর্থ শতাব্দীর প্রথমদিকে চীনে হেলিকপ্টার সম্বন্ধে লিখে ছেন—কেউ কেউ জুজুবী গাছের ভেতরের অংশ দিয়ে উড়ন্ত গাড়ি বানিয়েছিল, ওক গাছের ছালের সরু সরু ফালি দিয়ে গাড়ির ব্লেডগুলো বেঁধে রাখা হতো যেন মেশিনটা চালু থাকে। চীনের সাংটুং প্রদেশের সমাধিক্ষেত্রের এক সমাধিতে পাথরে খোদাই করে করে মেঝের অনেক ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া ড্রাগন চালিত এক রথের ছবি আঁকা আছে । চীনের লোক কাহিনীতে এধরনের রথের ছড়াছড়ি ।

পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন পুস্তক মহাভারতেও আমরা রথের উল্লেখ দেখতে পাই । প্রাচীন ভারতের নানা গল্পে উড়ন্ত রথের বহু ব্যবহার রয়েছে । রামায়নেও উড়োজাহাজের উল্লেখ আছে । সংস্কৃতে বিমানবিদ্যা নামে দুটো শব্দোও আছে। রামায়ণে বলা হয়েছে বিমান বায়ুর গতিতে চলে এবং সুমিষ্ট শব্দের সৃষ্টি করে। মহাভারত ও রামায়নে বিমান সম্বন্ধে আর যেসব বর্ণনা আছে সেসবের ওপর নির্ভর করে প্রাচীনকালের বিমানকে বর্তমানের হেলিকপ্টারের সঙ্গে তুলন। করতে পারি । কারণ প্রাচীনকালের রথ বা বিমানের কর্মক্ষমতার যে বর্ণনা রয়েছে সে সবের কিছু অংশ কেবল মাত্র হেলিকপ্টারই এখন করতে পারে, যেমন শূন্যে গতি বন্ধ করে এক-জায়গায় চুপচাপ দাড়িয়ে কার ক্ষমতা । গ্রন্থে আরো বলা হয়েছে বিমানে করে যাওয়ার সময় উঁচু থেকে সমুদ্রকে মনে হত ক্ষুদ্র জলাশয় । আরোহী সমুদ্র তার এবং নদীর বদ্বীপ দেখতে পেত। বিমানগুলো রাখা হত বিমান-গৃহ অর্থাৎ হ্যাঙ্গারে । আর এগুলো চালানো হত হলুদ সাদা রঙের তরল পদার্থ দিয়ে ।
প্রাচীন ভারতে ছ’জন তরুণ মিলে একটা উড়োজাহাজ বানিয়েছিল । উড়োজাহাজটা খুব সহজ পরিচালনযোগ্য ছিল এবং সহজেই উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারতো। পঞ্চতন্ত্রে এর পুরো বর্ণন দেওয়া হয়েছে। ‘সমর-সূত্রধর’ গ্রন্থেও উড়ন্ত মেশিন বানানোর বিবরণ সম্বন্ধীয় ২৩০টা শ্লোক রয়েছে। শ্লোকসমূহে শুধু মাত্র যে উড়োজাহাজ তৈরি, উড্ডয়ন, আমোদ-প্রমোদের জন্যে বা শত্রু, জাহাজের পেছনে হামলা, স্বাভাবিক বা ফোর্সড অবতরণ সম্পর্কিত বর্ণনা রয়েছে তা নয়, এমনকি আকাশে বিচরণরত পাখির সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘর্ষ সম্পর্কেও শ্লোকে বলা হয়েছে । এসব বর্ণনা আমরা যদি প্রাচীন যুগের বৈজ্ঞানিক কল্প কাহিনী হিসেবেও বিবেচনা করি তবে আমাদের অন্তত এটুকু স্বীকার করতেই হবে যে এতো ভালো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী অদ্যাবধি লেখা হয়নি। উল্লেখ্য, একই গ্রন্থে আমরা

রাসায়নিক এবং জৈবিক অস্ত্রের উল্লেখও দেখি মিসাইল জাতীয় এধরনের অস্ত্রের কথা

উল্লেখিত হয়েছে যা মানুষকে পঙ্গু করে দেয়, আরেক ধরনের অস্ত্রে মানুষ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয় ।

বহু শতাব্দী ধরে ক্রমান্বয়ে মানুষ শুধু উড়োজাহাজের স্বপ্নই দেখেনি, উড়োজাহাজ বানানোর চেষ্টাও করেছে। ডেডালাস আর লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির মধ্যে বহু শতাব্দীর ব্যবধান থাকলেও তাদের চিন্তাধারা ছিল অভিন্ন । দুজনেই এমন কোনে যন্ত্র তৈরি করতে চেয়েছিলেন যার সাহায্যে মানুষ আকাশে উড়তে পারবে । এখন দ্রুতগামী জেট অল্প সময়েই মহাদেশ, মহাসমুদ্র পেরিয়ে যাচ্ছে । এর জন্যে আমরা সেই প্রাচীন জ্ঞানী ব্যক্তিদের প্রশংসা করতে পারি, যারা তাদের সমসাময়িক অন্যান্যের সীমাবদ্ধ চিন্তাধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজে । দের উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগাতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লোক কাহিনীতে উড়োজাহাজ সম্বন্ধে মজার মজার তথ্য রয়েছে ।

১৯৫৮ সালে স্মিথসেনিয়ান ইন্সটিটিউশন আমেরিকা, রাশিয়া ও ইণ্ডিয়ানদের প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক এক রিসার্চের ফল প্রকাশ করে । উক্ত রিসার্চে বলা হয়েছে দশ হাজার বছর আগে এস্কিমোরা মধ্য এশিয়ায় বাস করতো। রিসার্চ পেপারের মতে দশ হাজার বছর আগে পুরনো বাসস্থান ছেড়ে পায়ে হেঁটে কিংবা শ্লেজে চেপে তারা গ্রীনল্যাণ্ডে পৌঁছেছিলো । কিন্তু এস্কিমো উপকথায় বলা হয়েছে তারা “দৈত্যাকার লোহার পাখিতে চড়ে উত্তর মেরুতে পৌঁছেছিলো । দৈত্যাকার লোহার পাখি’ বলতে একমাত্র উড়োজাহাজ বা এই জাতীয়ই কিছু বুঝায়। ম্যাডিসনের কাছে উইসকিনসন-এ নুড়ি ।পাথরের ওপর বিরাটকায় পাখির মূর্তি খোদাই করা আছে। পাখির ডানার একটি থেকে আরেকটির দূরত্ব ৬২ মিটার। সব মিলিয়ে পাখির এই খোদিত মূর্তি উড়োজাহাজের মতোই।

পেরুর নাসকার শুষ্ক উপত্যকায় পেরুভিয়ান এয়ার ফোর্সের এক ফটোগ্রাফিক সার্ভেতে দেখা গেছে মাটির বুকে বহুদূর বিস্ত.ত লাইন আর জিওম্যাট্রিক্যাল ফিগারের নেট ওয়ার্ক । মানুষের হাতে তৈরি এই নেটওয়ার্ক তৈরির পেছনে বহু বছর ব্যয় করা হয়েছে । ত্রিভুজ আর ট্র্যাপিজয়েড (যে চতুর্ভুজের একটি বাহুও সমান্তরাল নয়) ছাড়া পশু-পাখির ছবি দিয়েও লাইনের সীমারেখা চিহ্নিত করা হয়েছে। পেশীর ভাগ লাইনের সঙ্গেই সে যুগের সড়কসমূহের কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায়না । মাসকার এই প্যাটার্ন পা নকশার বয়স প্রায় দেড় হাজার ।

ইণ্ডিয়ানরা বলে দৈত্যাকার এইসব আক -জোক ইনকাদেরও আগেকার এক জাতির । তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হল এই লাইন আর ডিজাইনগুলো আকাশ থেকে দেখতে হলে কমপক্ষে ৩৩০ মিটার বা এর উঞ্চেবর্ণ অবস্থান করতে হবে । কার উদ্দেশ্যে এই লাইনগুলো তৈরি করা হয়েছিল—পাখি, দেবতা ন। উড়ন্ত মেশিনে ভ্রমণকারী মানুষের জন্যে ? বহু বর্গ মাইল বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে আকা বীকন আর সংকেতগুলো সুবিন্যস্ত, একটি আরেকটির সঙ্গে সমানুপাতে আঁকা । স্যালভেডরে প্রাপ্ত প্রাচীনকালের এক ফুলদানীতে দেখা গেছে উড়োজাহাজ এবং পাইলটের ছবি আঁকা। হয়তো সত্যি সত্যিই মাসকার সেই লাইন আর সংকেতগুলোর সঙ্গে স্যালভেডরে এই ফুলদানীর মিল রয়েছে । উড়োজাহাজের নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্যেই হয়তো সেই লাইমগুলো আঁকা হয়েছিল দেড়হাজার বছর আগে । অতি প্রাচীনকালে উড়োজাহাজ হয়তে সত্যিই ছিল ৷

আকৃতি হয়তো ঠিক ঠিক এখনকার মতো ছিলনা কিন্তু আকাশে ওড়ার ক্ষেত্রেও প্রাচীনকালের লোকরা আমাদের চেয়ে পিছিয়ে ছিলনা । উড়ন্ত কার্পেট আর ‘ভাসমান রথ সেই কথাই প্রমাণ করে। আর এই উড়ন্ত কার্পেট আর রথকে অবলম্বন করেই আমরা আকাশে ওড়ার ক্ষেত্রে এতোদূর পৌঁছেছি। উড়ন্ত রথ আর কাপেটিই লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির আকাশ ভ্রমণে উদ্বুদ্ধ করেছিল । এই শতাব্দীকে বিজ্ঞানের মধ্যাহ্ন বলা যায়। কিন্তু অনেক আগে হয়তো বিজ্ঞান ও কুৎকৌশলের সোনালী দিন ছিল । প্রাচীনকালে লোকরাই বিজ্ঞানের আলো প্রথম দেখেছিল । অবশ্য অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো এই ক্ষেত্রেও হঠাৎ কালে যুগের আগমন ঘটেছিল । তারপর মাঝখানে বহু বছরের নিরবত। তারপর আবার নতুন করে আকাশে ওড়ার চেষ্টা চলে, সে চেষ্টার উপাদান যুগিয়েছিল প্রাচীন কাল ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + = 9