রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক খুন: ইসলামের সাথে ইহার কোনই সম্পর্ক নেই

শিরোনাম দেখেই অনেকে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে। সেটাই স্বাভাবিক। শান্তিপ্রিয় ধর্মপ্রান মুসলমানরা কোন অপকর্মের সাথে ইসলামের সম্পর্ক দেখতে পায় না। আর কেউ যদি সেটা কোরান হাদিস ঘেটে দেখায় , তাকে তারা ইসলাম বিদ্বেষী বলে। এ ধরনের কাউকে যদি কোন উগ্রবাদী ইসলামী গোষ্ঠি হত্যা করে, তাহলে মিন মিন করে এর প্রতিবাদ করে সাথে সাথে বলে ইসলাম নিয়ে লেখা উচিত না। তাদের আপ্ত বাক্য- ইসলামে ভুল নেই , কিন্তু মুসলমানরা সঠিক না।

ইতোপূর্বে বেশ কয়েকজন ব্লগার খুন হয়েছে। তাদের অপরাধ একটাই। তারা কোরান হাদিস ঘেটে, বহু পড়াশুনা করে , প্রশ্ন তুলেছিল – দুই পাখা বিশিষ্ট গাধায় চড়ে মুহাম্মদ কিভাবে মহাকাশ ভ্রমন করল ? নুহ নবীর সময় গোটা পৃথিবী কিভাবে কয়েক কিলোমিটার পানির তলায় ডুবে গেল , সেই পানি এখন কোথায় ? আকাশে যে উল্কা পিন্ড ছুটে যেতে দেখি রাতের বেলা , সেসব কিভাবে ছুটন্ত নক্ষত্র হয় ? সেসব আবার কিভাবে শয়তান তাড়ায় ? যে মুহাম্মদ ৬ বছরের শিশু বিয়ে করে , ৯ বছরের শিশুর সাথে যৌনসঙ্গম করে, ১৩ টা বিয়ে করে , পুত্রবধু বিয়ে করে, দাসীর সাথে নিয়মিত যৌনসঙ্গম করে, বানিজ্য কাফেলা আক্রমন করে মালামাল লুট করে – সেই লোক কিভাবে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট আদর্শ মানুষ হয় ? এইসব প্রশ্ন তোলাটাই ছিল ইসলামের দৃষ্টিতে অমার্জনীয় অপরাধ। সবাই এটা জানে। আর তাই যখন তাদেরকে খুন করা হলো, সাধারন মুমিন মুসলমানরা মিন মিন করে বলল- এটা তো ঠিক না , ইসলাম তো কোন ব্লগারকে হত্যা করতে বলে নি , বা ইসলাম কাউকে খুন করতে বলে না ইত্যাদি। কিন্তু একই সাথে বলেছিল – নবীকে নিয়ে সমালোচনা করাটা ঠিক না। কিন্তু কেউ তলিয়ে দেখে নি , বা দেখার চেষ্টাও করে নি , এসব আসলে সমালোচনা না। এসব আসলে আদর্শের প্রশ্ন, নৈতিক প্রশ্ন , নৈতিক মানদন্ডের প্রশ্ন। যার উত্তর সবার জানা দরকার। এসবের উত্তর না জানলে ইসলাম সঠিকভাবে পালন করা যায় না। কিন্তু মুমিন বান্দাদের কাছে , এসব যৌক্তিক প্রশ্নই মুহাম্মদ বা ইসলামকে সমালোচনার সামিল।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক রেজাউল করিম কি ব্লগার ? না ব্লগার না। তাহলে তিনি কেন খুন হলেন ?

ইসলামে নাচ, গান , ইসলাম বহির্ভুত কবিতা চর্চা , ইসলাম বহির্ভূত সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, সঙ্গীত চর্চা, শিল্পচর্চা এসবই কঠিনভাবেই হারাম। এ বিধান মোতাবেকই , পয়েলা বৈশাখ, পৌষ পার্বন, বসন্ত উৎসব, স্বাধীনতা দিবস , একুশে দিবস, মেলার আয়োজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মুক্তবুদ্ধির চর্চা করা ইত্যাদি সবই হারাম কাজ। ইসলামের সংস্কৃতি হলো – ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন , বাদ্য যন্ত্র ছাড়া হাম ও নাত নামক ইসলামী সংগীত, আল্লাহর নামে জিকির , একসাথে বসে মুহাম্মদের প্রশংসা করা ইত্যাদি। ইসলামে এসবই হালাল। এটা সবাই জানে। কিন্তু অনেকে সেটা মানে না। তারা গান গায়, গান শোনে , নাচে , নাচ দেখে , মেলায় যায়, শিল্প চর্চা করে , সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তারা আবার ওয়াজেও যায়, নামাজ পড়ে , রোজা রাখে , কোরবানী দেয়। তারা একইসাথে ইসলামী কাজ ও ইসলাম বিরোধী কাজ উভয়ই করে বলে , তাদের ইসলাম বিরোধী কাজগুলো ইসলামীক হয়ে যায় না। তবে এরা যখন ইসলামী জলসায় যায়, ওয়াজে যায় , তখন আলেমরা যখন বলে এসব নাচ গান , সংগীত চর্চা , পহেলা বৈশাখের মত অনুষ্ঠান ইত্যাদি ইসলাম বিরোধী, তখন তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে , মনে মনে অনুতপ্ত হয়, আর আল্লাহর কাছে এ জন্যে মাফও চায়। অর্থাৎ যদিও তারা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড করে , কিন্তু তারা উপলব্ধি করে ভিতরে ভিতরে যে তাদের সেই কর্মকান্ড ইসলাম বিরোধী। উপরে উপরে তারা নিজেদেরকে যতই উদার বলে প্রচার করুক না কেন।

কিন্তু যারা সঙ্গীত , নাচ গান , কবিতা চর্চা , পয়লা বৈশাখ ইত্যাদিকে মন প্রান দিয়ে ভাল বাসে , এসবের প্রচার ও প্রসার ঘটানোর জন্যে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে , তাদের কথা ভিন্ন। কারন তারা হয় মনে মনে ইসলাম ত্যাগ করেছে , কিন্তু প্রকাশ করছে না , অথবা , ইচ্ছা করেই তারা মুসলিম নাম ধারন করে ইসলাম বিরোধী এসব কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে , মুসলমানদেরকে বিপথে চালিত করার জন্যে। যারা মনে মনে ইসলাম ত্যাগ করেছে – তাদেরকে বলা হয় মুর্তাদ , আর যারা নিজেদেরকে মুসলমান পরিচয় দিয়ে ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ড করে যাচ্ছে , তারা হলো মুনাফিক।

মুর্তাদ ও মুনাফিকদের শাস্তি কি ? এখন সবাই জানে , কোরান হাদিস থেকে আর উদ্ধৃতি দরকার নেই , যে এদের একমাত্র শাস্তি হলো মৃত্যুদন্ড।

এবার দেখা যাক , রেজাউল করিম কোন দলের লোক ছিলেন। তার সম্পর্কে যা জানা গেছে , তা নিম্নরূপ :

গ্রামবাসী জানান, শিক্ষক রেজাউল ছিলেন মুক্তমনা ও সংস্কৃতিমনা। এলাকার শিশু-কিশোরদের জন্য গানের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। ওই সংগীত বিদ্যালয়ের সভাপতি রাজু আহমেদ জানান, একজন সংগীতশিক্ষক শিশু-কিশোরদের গান শেখান। সব খরচ রেজাউল স্যারই বহন করতেন।

প্রতিবেশী মুনসুর রহমান জানান, গ্রামে এসে ঘুড়ি উৎসব, ঘোড়দৌড়সহ বিভিন্ন খেলার আয়োজন করতেন। বিজয়ীদের পুরস্কারও দিতেন নিজের টাকায়। পয়লা বৈশাখ তিনি গ্রামে এসেছিলেন। নিয়মিত মুঠোফোনে এলাকার লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো ২৪/০৪/২০১৬ তাং

এখন কি বুঝতে বাকি আছে , কেন কিছু সহিহ মুসলমান রেজাউল করিমকে চাপাতি দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে ?

সরকার , বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাধারন ধর্মপ্রান উদার মানুষ ইত্যাদিরা যদি মনে করে থাকে যে শুধুমাত্র ব্লগাররাই প্রকৃত সহিহ মুমিন গ্রুপদের টার্গেট , তাহলে তারা মূর্খের স্বর্গে বাস করছে। তারা যদি মনে করে , ব্লগিংই হলো ইসলামের সবচাইতে বড় শত্রু , তাহলে বুঝতে হবে , তারা এখনও শিশু। যারাই সংস্কৃতিমনা , উদারমনা, ধর্ম নিরপেক্ষ , সাংস্কৃতিক মনা – তারা সবাই ইসলামের শত্রু , আর তাদের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড।

সাধারন মানুষ আর কবে এটা বুঝতে পারবে ? আর কতদিন লাগবে তাদের এটা বুঝতে ?

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.