পাখিদেশে শকুনানুভূতি।

বনের যে অঞ্চলটায় পাখিরা থাকে তাকে পাখিদেশ নামে অবহিত করা হয়। কাক, কোকিল, চিল, মোরগ, দোয়েল, শ্যামা, ময়না, পেঁচা, শকুন, ময়ুর সবই থাকে।
একসময় শকুনরা শাসন করতে এ পাখির দেশটাকে নামও ছিল শকুস্তান। শকুনদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে পাখিরা প্রতিবাদ করা শুরু করে এবং প্রতিবাদীদের প্রধান ছিল চিল। পাখিদের ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি হবার পরেও তারা চিনিয়ে নেয় স্বাধীনতা এবং তা তুলে দেয় আরেক শিকারীর হাতে। চিলটা ক্ষমতা পাওয়ার পর পরই তার নখ-ঠোঁট বের করতে শুরু করে, হয়ে উঠে এক নায়ক। প্রত্যেক পাখিকে বাধ্য করে চিলের পালক লেজে গুঁজে চিল হয়ে উঠতে। আজকের সময়েও চিলরা শাসন করছে, তাদের আদি পুরুষ স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিল বলে তারাও তার সদ্বব্যাবহার করছে নিজের বাপের দেশ বলেই ভোগ করে চলছে, গনতন্ত্র, সাম্যবাদ, পক্ষী স্বাধীনতা।

এখানে উল্লেখ্য এ শিকারী পাখিরা একসময় ছিলনা এ দেশে। হাজার বছর আগে আরব থেকে তারা উড়ে এসে জুড়ে বসলো। মূলত দেশটা ছিল ময়না, টিয়া, শালিকদের। আজ তারাই নির্বাসিত। শিকারী পাখিদের অত্যাচারে তাদের টিকে থাকা কোন ভাবেই সম্ভব হচ্ছেনা এদেশে।

দেশের শিকারী পাখি মোট পাখিদের ৯০ শতাংশ, অচিরেই ১০০ শতাংশ হয়ে যাবে। চিল ছাড়াও আছে বাজ, কাক, পেঁচা। প্রধান চিলকে হত্যা করার কয়েকমাস পর কাকরা যখন প্রথম ক্ষমতার স্বাদ পেলো, প্রধান কাক পাখবিধানে পরিবর্তন আনলো; অন্যান্য পাখিদের উপেক্ষা করে পাখবিধানে সংযোগ করলো “শিকারীদের জয় হোক”। সে কাকটাও একসময় ভোগে গেল।
পেঁচাটা ক্ষমতায় থাকা কালীন পাখবিধানে পাখিদের প্রধান ধর্ম হিসেবে যুক্ত করলো “শিকারী ধর্ম।” আজ পেঁচাটার কোন পাওয়ার নাই তবুও মাঝে মাঝে নিম্ নিম্ করে উঠে। কাক-পেঁচা দুজনেই চতুর ছিল, অন্যান্যদের সাথে শিকারী পাখিদেরও শিকার করতো তবুও তারা এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে তারা ত্রাতা। তারা না দেখেছে শিকারী পাখির স্বার্থ না ভেবেছে নন্- শিকারীদের কথা, নিজেদের আখেরই গুছিয়েছে সব সময়। অন্যায়ভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকা বড় ফন্দী ছিল সেটা। আজও সে সংস্কৃতিই বহাল আছে পাখিদেশে।

শকুনদের কাছ থেকে মুক্ত হবার পরপরই শিকারী পাখি আঘাত পায় শকুনানুভুতিতে, তাদের কিন্তু কিছু হয়নি, মাঝখান দিয়ে দেশ থেকে নির্বাসনে যেতে হলো এক কোকিলকে। কাকরা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় যাবার পর শিকারীরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে দোয়েলদের উপর। এক কোকিল কূহু করে উঠতেই শিকারীরা একজোট হয়ে তাড়িয়ে দিলো তাকে, চলে গেল নির্বাসনে। কি মর্মান্তিক এ শকুনানুভূতি।

পাখিদেশ শকুন মুক্ত হলেও পুরো পুরি মুক্ত হয়নি, কিছু শকুন লুকিয়ে পড়ে অন্যান্য শিকারীদের ভিড়ে। কাক প্রথম ক্ষমতায় এসেই তাদের অবমুক্ত করে। এখনতো কাকের দলে কাকরা নেই শকুনের সাথে মিলে মিশে প্রত্যেকটা কাক এক একটা শকুন হয়ে উঠেছে।

দোয়েল-টিয়া-ময়না-শালিক এরা বরাবরই উপেক্ষিত এ দেশে। কোকিলরা এদের অধিকার নিয়ে কুহূ কুহূ বেশী করে সেটা অবশ্য শিকারী পাখিদের পচন্দ না। কোকিলরা হচ্ছে সে প্রজাতির যারা উপেক্ষা করেছে ভয়-লোভ, পাখিদের পাখি হিসেবেই চিন্তা করে, স্বর্গ থেকে বিতাড়িত প্রজাতি হিসেবে চিন্তা করেনা। পাখিধিকার নিয়েই বেশী কাজ করে। তারা মনে করে কোন পাখি উত্তম নয়, কোন পাখি নিকৃষ্টও নয়। কোকিলদের কিছু অংশ এসেছে শিকারীদের থেকে কেউ আসে নন্-শিকারী পাখি থেকে। তবে তাদের মুল কথা এক, সব পাখির সমধিকার। তারা মনে করে, সবার উপরে পাখি সত্য তাহার উপরে নাই। বারবার শিকারী পাখিদের বিষধর নখের প্রতিবাদ করেছে, ঐ নখের কুফল সম্পর্কে লিখেছে, লিখছে কিংবা তীক্ষ ঠোঁট যেটাকে সব শিকারী পাখি তাদের মুল অস্ত্র হিসেবে স্বীকার করে; ঐ ঠোঁট কাজে লাগিয়ে তাদের পুর্বে কি পরিমান অন্যায় করা হয়েছে কোকিলরা সে কথা লেখে, প্রতিবাদ করে। তাতেই শিকারী পাখিদের শকুনানুভূতিতে আঘাত লাগে, মনে মনে ঠিক করতে থাকে কোকিলদের শেষ করে দেবে, কুহূ কুহূ স্তব্ধ করে দেবে চিরতরে। বিরোধী তাদের পচন্দের ছিলনা কোন কালেই।

ইদানিং শিকারী পাখিদের দলে কিছু বাজের প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। যেসকল শিকারী পাখিরা নখ-ঠোঁট লুকিয়ে তৃণভোজি সেজে ছিল তারাই শিকারী ধর্মের প্রকোপে আর লুকিয়ে রাখতে পারলোনা। তাদের আদিম পুরূষদের মতো শিকার শুরু করলেও। একটা নিদিষ্ট সময় পর্যন্ত চিল কিংবা শকুন তা স্বীকার করতে চাইনি, বলেছে বিচ্ছিন্ন ঘটনা। যখন তারা একযোগে বোমা হামলা করলো পাখিদেশে তখন স্বীকার না করার কোন উপায় রইলোনা। কিন্তু শকুন-চিল তারা কখনো বাজদের শিকারী পাখি গোত্রের কিংবা তারা যে শিকারীদের ধর্মের প্রভাবেই এ খুন করছে তা মানেনি। বলছে ওরা বিচ্ছিন্ন, শিকারী ধর্মই সেরা ধর্ম এবং তা হত্যা সমর্থন করেনা।
কিন্তু কোকিলরাও চুপ করে নেই তারা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে বাজরা যা করছে তা শিকারী ধর্ম মতেই করছে, তীক্ষ নখ-ঠোঁট শিকারী ধর্মের প্রধান উপকরণ।
এইতো সেরেছে, চিল-শকুন কষ্ট পেলো, আঘাত পেলো তাদের শকুনানুভূতিতে। তারাও ইনিয়ে বিনিয়ে সমর্থন করতে থাকলো বাজ পাখিদের। চিলরা হয়ে পড়লো কোনঠাসা কেউ মারা পড়লো কেউ দেশান্তরী হলো। শিকারী পাখিদের দলে যুক্ত হতে থাকলো কিছু দোয়েল-টিয়া-ময়না। তারা হত্যার প্রতিবাদ করাতো দুরের কথা শকুনানুভূতিতে আঘাতের পরিনামযে মৃত্যু এ কথাই প্রচার করে বেড়াচ্ছে।

যত শিকারী পাখি আছে সবারই চরিত্র এক মুখে যতোই পাখিদের কথা বলুক মনে মনে কোকিল হত্যাকেই সমর্থন করে। এবং সময় সুযোগ পেলে তাদেরও নখ-ঠোঁট সামনে চলে আসে। কারণ প্রত্যেক শিকারী পাখিরই আছে শকুনানুভূতি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 21 = 23