বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় ক্ষুদ্র আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী : বানাই

বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার ভারতের মেঘালয় প্রদেশের সীমান্ত পাহাড় ঘেষা সমতলে বসবাসকারী একটি বিলুপ্তপ্রায় আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নাম ‘বানাই’। বর্তমানে ভারতের আসাম, অরুনাচল ও মেঘালয় রাজ্যে এবং বাংলাদেশে কিছু সংখ্যাক বানাই জাতিগোষ্ঠীর বসবাস বয়েছে। দেশ বিভাগের সময়ে প্রায় ১৬ হাজার বানাই থাকলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ভুমি বেদখল, শাসক শ্রেনীর বৈরীতা, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ইত্যাদি নানা কারনে দেশান্তরের ফলে বর্তমানে তাদের সংখ্যা এদেশে নগন্য। সর্বশেষ একটি বেসরকারী সংস্থার জরীপের তথ্য অনুযায়ী ময়মনসিংহ জেলার ধোবাউড়া উপজেলায় গানই ও ভালুকাপাড়া গ্রামে ৫টি পরিবারে ২৩ জন, নেত্রকোনা জেলার সুসং-দুর্গাপুর উপজেলায় ফারংপাড়া গ্রামে ৩টি পরিবারে ১৬ জন, কলমাকান্দা উপজেলায় বালুচরা ও নলছাপ্রা গ্রামে ৯টি পরিবারে ৪৬জন, সুনামগঞ্জ জেলার ধরমপাশা উপজেলায় বহেড়াতলী ও মোহনপুর গ্রামে ৬০টি পরিবারে ১৯৮জন বানাই রয়েছে।
?oh=8c33af28678ed9b2278464e7087c0fb8&oe=57C061A5″ width=”400″ />
সমতলের আদিবাসী এই জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সংগীত-সংকির্তন, কৃষিভিত্তিক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, রয়েছে নিজস্ব দেব-দেবী। উপমহাদেশে আর্যদের আগমনের পর যে সকল জাতিগোষ্ঠীর উপর আর্য ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছিলো বানাই জাতিগোষ্ঠী তার মধ্যে একটি। ফলে বানাইদের উপর আর্য সংস্কৃতির প্রভাবে বাংলা এবং অসমীয়া ভাষার মতই তাদের ভাষা বিবর্তিত হয়ে বর্তমানে আর্যমূলীয় বানাই ভাষার রূপ লাভ করেছে । বাংলা অথবা অসমীয়া স্বরবর্ণের সাথে একটি মাত্র স্বরবর্ণ যোগ করলে খুব সহজে বানাই ভাষা লেখা ও পড়া যায়। যারা বাংলা বা অসমীয় ভাষা জানেন নৈকট্যের কারনে তারা বানাই ভাষাও সহজে বুঝতে পারেন। ভাষাগত বিশ্লেষণে বানাই জাতিগোষ্ঠী স্মরনাতীত কাল থেকে এই ভূ-খন্ডে বসবাসকারী কাঠিকাটা ভূমিজ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী। সুতরাং একটি জাতিগোষ্ঠী হিসেবে বানাইরা তাদের ভাষাগত এবং সংস্কৃতিগত মৌলিকত্ব বজায় রেখে চলেছে।

মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভুত সর্বপ্রাণবাদী বানাইরা সনাতন ধর্মাবলম্বী। কালের বিবর্তনে তাদের উপাসনায় নিজস্ব দেব-দেবীর সাথে সংমিশ্রণ ঘটেছে আর্য দেব-দেবীর। কামাক্ষা ও বাস্তু দেও(ভূমির মঙ্গলকারী দেবতা) তাদের নিজস্ব আদি দেব-দেবীর মধ্যে অন্যতম । অন্যান্য দেবদেবীর মধ্যে রয়েছে, পথে দেও(পথের দেবতা), নিকনী দেও (মাতৃধারায় সৃষ্ট গোত্র),রাখাও দেও (সৃষ্টির দেবতা) কানি দেও (সর্প দেবী), মুইলা দেও (শিশুর অমঙ্গলকারী বৃক্ষ দেবতা), হুইলা দেও (শিশুর রোগশোকের বৃক্ষ দেবতা), গংস দেও (শিশু কান্নার দেবতা), চুকধাপা দেও (বিশেষ রোগের দেবতা), বন দেও (বিশেষ রোগের দেবী)ইত্যাদি। বানাইরা তাদের গোষ্ঠীর মধ্যে শুদ্ধপ্রাপ্ত দেবর্ষীর দ্বারা পূজার্চনা করে থাকে।

নিকট অতীতে বানাইদের সমাজ পরিচালিত হতো তাদের নিজস্ব সমাজ কাঠামো ব্যবস্থায় ।বানাই সমাজ পিতৃতান্ত্রিক ও পুরুষ শাসিত যৌথপরিবার। পিতা বা বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ ব্যক্তি যৌথপরিবারের প্রধান। তারা তাদের গ্রাম বা দলের প্রধান “গাঁওবুড়া”-র নেতৃত্বে যুথবদ্ধ ভাবে বসবাস করে। প্রতিটি গাঁও যেন তাদের গাঁওবুড়াদের শায়ত্ব শাসিত এলাকা। সেজন্য তারা প্রতিটি বসত গ্রামের ভূমির কল্যাণে “বাস্তুদেবতা” স্থাপন করে থাকে। বানাইরা বাঙালী মুসলিমদের মতন পর্দানশীল নয়, তবে অবাধ মেলামেশা বানাই সমাজে কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। তারা নারী-পুরুষ একত্রে মাঠে কাজ করে, তাদের সমাজ ব্যবস্থায় তারা নিকনি (মাতৃধারায় সৃষ্ট গোত্রে বিবাহ নিষিদ্ধ) প্রথা তারা মেনে চলে।

তারা নিজের হাতে তৈরী করতো তাদের ঐতিহ্যবাহী নিজস্ব পোশাক। বানাই পুরুষেরা পরিধান করতো ফতুয়া আর হাটু পর্যন্ত ফটা (ধুতি)। মহিলারা পরিধান করতো পায়ের গোড়ালী থেকে বুকের উপর পর্যন্ত লাল-কালো ডোঢ়াকাটা পাতিন (প্রশস্ত বস্ত্র)ও অর্গান, কানে ধিরি, গলায় বয়লা বা পয়সার মালা, বাহুতে বাজুবন্ধ, কপালে আকতো বিচিত্র উল্কি, মাথায় ঢিকনা খোপা (বিশেষ ধরনের খোপা)…….. ইত্যাদি।

এদেশের দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে তাদের রয়েচ্ছে উল্লেখযোগ্য অবদান। কৃষক বিদ্রেহ, হাতিবেগার আন্দোলন, রিজার্ভ হাওর প্রথা বিরোধী আন্দোলন, টংক ও জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ আন্দোলন থেকে ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের রয়েছে গৌরবময় ভূমিকা। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও সকল রকম ন্যায্যতা থেকে বঞ্চিত এই জাতিগোষ্ঠী তাদের নিজেস্ব জাতিসত্তার অস্তিস্তের কথা আমাদের জানান দিয়ে যাচ্ছে । সংখ্যাগত স্বল্পতার কারনে বানাইদের নিজস্ব কোন সামাজিক সংগঠন নেই, তাদের গড় স্বাক্ষরতার হার শতকরা ২১জন এবং শতকরা ৮৯ জন ভূমিহীণ-দিনমজুর। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ৪ জন। তাদের মধ্যে কোন সরকারী চাকরীজীবি নেই এবং তাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি রক্ষণাবেক্ষণে এই পর্যন্ত কোন সরকারী বা বে-সরকারী কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় নি।

স্বাধীনতার সুফল এখনোও তাদের কাছে এসে পৌছায় নি। ত্যাগ ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জয়ী হয়ে তারা গৌরব অর্জন করেছিলো, কিন্তু স্বাধীনতার সুফল পাবার বদলে তাদের বঞ্চিত হতে হয়েছে বারবার। ধারাবাহিক বঞ্চনায় নিজ ভূমিতে আজ তারা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতরে পরিনত হয়েছে। রক্তে ভেজা জমি হারিয়ে পরিনত হয়েছে দাস শ্রেণীতে। সব কিছুতে তারা পিয়েছে আজ তাদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত প্রায়। জীবন সংগ্রামে দিনদিন তারা হেরে চলেছে। তাদের জাতীয় অস্তিত্ব আজ চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে। এছাড়াও ক্ষুদ্র বিপুপ্তপ্রায় জাতিগোষ্ঠী হিসেবে প্রতিনিয়ত অনাকাঙ্খিত সংহতিবিহীন অপ্রকাশ্য কিছু ঘটনাবলী তাদের মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করে চলেছে। তাদের জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব এবং তাদের বেঁচে থাকার জীবন সংগ্রাম মূলত একটি নিয়ন্ত্রনহীন কঠিন সময়ের মধ্যে পড়েছে। তাই তাদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে সাংবিধানিক নাগরিক অধিকারগুলো তাদের জন্য নিশ্চিত করা একান্ত জরুরী।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় ক্ষুদ্র আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী : বানাই

  1. এদের জন্য আমাদের কিছু করা
    স্বাধীনতার সুফল এখনোও তাদের কাছে এসে পৌছায় নি। ত্যাগ ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জয়ী হয়ে তারা গৌরব অর্জন করেছিলো, কিন্তু স্বাধীনতার সুফল পাবার বদলে তাদের বঞ্চিত হতে হয়েছে বারবার। ধারাবাহিক বঞ্চনায় নিজ ভূমিতে আজ তারা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতরে পরিনত হয়েছে। রক্তে ভেজা জমি হারিয়ে পরিনত হয়েছে দাস শ্রেণীতে। সব কিছুতে তারা পিয়েছে আজ তাদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত প্রায়। জীবন সংগ্রামে দিনদিন তারা হেরে চলেছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 69 = 77