নিষ্ক্রিয় বিরোধীদল, পর্দার আড়ালে নেত্রী

:: রনি রেজা ::

/দশম জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিতর্কিত অবস্থানে রয়েছে জাতীয় পার্টি এবং সংসদীয় ব্যবস্থা। দশম সংসদের প্রথম অধিবেশনের পরে কেউ কেউ বলেছিল বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব সংসদীয় ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছে। যাঁরা সরকার পক্ষ তারাই বিরোধী দল। তাহলে জনগণের কথা বলবে কে? অনেককেই তখন এ মতে তাল মেলাতে দেখেছি। আবার বিরোধিতাও করেছেন কেউ কেউ। সে সময়ে অনেক আসরই জমেছে এই রসালো আলোচনায়। সাধারণ জনগণও তখন আগ্রহের সাথে গিলেছে এই বাক্যগুলো। কখনো সমর্থকদের কথায় তৃপ্ত হয়েছে আবার যারা এই জাতীয় পার্টির বিরোধী দলের বিরোধিতা করেছে তাদের কথায়ও হতাশ হয়েছে কখনো সখনো।

অনেককেই বলতে শুনেছি, বিরোধী দল মানে তো আর সরকারের বিরোধিতা করা না। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় প্রধান বিরোধী দলকে বিকল্প সরকার বলা হয় এবং তারা হচ্ছেন সরকারের সহযোগী বা সহযোদ্ধা। বিরোধী দল দেশের উন্নয়নে সরকারকে সহযোগিতা করবে। আমাদের দেশের বিরোধী দল বরাবর ব্যর্থ হয়েছে। নিজেদের স্বার্থে জনগণের কথা ভুলে গিয়ে সরকারকে বিব্রত করেছে। তাই তো আমাদের মাঝে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ‘বিরোধী দল মানেই সরকারের বিরোধিতা করা।’ এবার যোগ্য বিরোধী দল পেল সংসদ। এবার দেশের উন্নতি হবে। একথায় অনেকে আস্বস্ত হয়েছিলো। কিন্তু তাদের নাকে খৎ দিয়ে পূর্বের চেয়েও বেশি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এবারের বিরোধী দলীয় নেত্রী। যদিও ১৯৯৬ সাল থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি যে সংসদে বিরোধী দলের আকার ছোট হয়ে আসছে। উল্লেখ করার মতো-১৯৯১ সালে সংসদে বিরোধী দলের আসন ছিল ১৩৯টি, ১৯৯৬ সালে তা হয় ১২০টি, ২০০১ সালে ৭৮টি এবং ২০০৮ সালে ৩৪টি। আর সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির কথা তো সবারই জানা (৩০০ আসনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, আওয়ামীলীগের আসন সংখ্যা ২৩১, জাতীয় পার্টির (এরশাদ) ৩৪, জাসদের (ইনু) ৫, ওয়ার্কার্স পার্টির (মেনন) ৬, তরিকত ফেডারেশনের ২, জাতীয় পার্টির (মঞ্জু) ২, বিএনএফের ১, স্বতন্ত্র ১৬)। যদিও এসব আসন সংখ্যা সরকারি ও বিরোধী দলের প্রাপ্ত ভোটের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না কিন্তু বিরাজমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের জনগণ সেটাকে অনিবার্য বলেই ধরে নিয়েছে। একই সাথে সংসদে বিরোধী দলের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ১৯৯১-৯৬ সালে বিরোধী দল অনুপস্থিত থেকেছে ৩৪ শতাংশ অধিবেশন, ১৯৯৬-২০০১ সালে এই অনুপস্থিতির হারছিল ৪৩ শতাংশ এবং ২০০১-০৬ সালে ছিল ৬০ শতাংশ। বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা ১৯৯১-৯৬ সালে ৪০০ বৈঠকের ১৩৫টিতে যোগ দেন, ১৯৯৬-২০০১ সালে খালেদা জিয়া যোগ দেন ৩৮২ বৈঠকের ২৮টিতে, ২০০১-২০০৬ সালে শেখ হাসিনা যোগ দেন ৩৭৩ বৈঠকের ৪৫টিতে। এই তথ্যগুলো আমাদের কাছে স্পষ্ট করে দেয় বাংলাদেশের দুই প্রধান দল, যারা পালাক্রমে সরকার ও বিরোধী দলের আসনে বসেছে, তারা সরকার চালাতে যতটা উৎসাহী, বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালনে ততটাই অনুৎসাহী হয়েছে।

এতকিছুর পরেও সংসদের বাইরে বিরোধী দল সরব ছিলো সব সময়। বিভিন্ন দিবস, জনস্বার্থ সম্পর্কিত বিষয়সহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছিলো চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এখন সেটিও নেই। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিকে কিছু ক্ষেত্রে বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদের অংশগ্রহণ দেখা গেলেও এখন তিনি পুরোটাই পর্দার আড়ালে। চলতি বছরে রওশন এরশাদের কোনো কার্যক্রমই দেখিনি আমরা। নাম মাত্র বিরোধী দল থাকলেও এখন পুরোটাই একদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা চলছে। এ পর্যায়ে অনেকেই বলতে পারেন, রওশন এরশাদের উপস্থিতি-অনুপস্থিতি দিয়ে আমরা কি করবো? দেশ তো ভালোই চলছে। সরকার তার মতো করে দেশ খুব ভালোভাবেই চালাচ্ছেন। একের পর এক প্রতিটি ক্ষেত্রেই সফলতার দেখা মিলছে। দেশে কোনো প্রকারের হৈ হট্টগোল নেই। তাহলে বিরোধী দল কেন? তাহলে কি আমরা ধরে নিব সংসদে বিরোধী দলের কোনো প্রয়োজন নেই? এ প্রশ্নের জবাব পেতে হলে আগে জানতে হবে বিরোধী দলের ভূমিকা কী?

সংসদীয় ব্যবস্থার উদ্ভবের ইতিহাস ঘাটলে দেখতে পাই, ‘ব্রিটেনের পার্লামেন্টে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে সাংসদেরা যদি তাঁদের ব্যক্তিগত, স্থানীয় কিংবা বিশেষ ধরনের ক্ষোভের বাইরে কিছু বক্তব্য দিতেন, তবে তাঁর পরিণতি হতো ভয়াবহ। রাজার বিরোধিতা, উত্তরাধিকারের অধিকার, পররাষ্ট্রনীতি বা ধর্মের মতো জাতীয় বিষয় নিয়ে বিতর্ক করলে কারাবাস ছিল নিশ্চিত, প্রাণ হানির আশঙ্কা কোনো কল্পিত বিষয় ছিল না। ’আবার তৎকালীন সময়ে ইংল্যান্ডে ও বিরোধী দলের ধারণার উত্থান হয়নি। বিরোধী দলের ধারণার উদ্ভবের আগে‘ বিরোধী’দের প্রধান ভূমিকা কী, সেটা স্পষ্ট রূপ লাভ করতে শুরু করে। এরপর বিরোধীরা কেবল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিরোধিতা করবেতা-ই নয়, তারা বিকল্পও উপস্থাপন ও করবে, সামগ্রিকভাবে রাজ্য শাসনের বিকল্প। এই বিকল্পের প্রশ্নেই ইংল্যান্ডে রাজনৈতিক দলের উদ্ভব ঘটে; অন্যথায় সপ্তদশ শতকের গোড়ায়ও ‘দলাদলি’ এবং ‘পার্টি’কে কলঙ্কজনক বলেই মনে করা হতো। এ শতকেই আমরা দেখতে পাই, এই ধারণা সুস্পষ্টরূপ নিতে শুরু করেছে যে ক্ষমতাসীন শক্তির বিরোধিতা করার বিষয়টি কেবল ব্যক্তি কেন্দ্রিক নয়, তার জন্য সংগঠিতভাবে দল গঠন এবং আদর্শিক ও ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মকা- পরিচালনার মধ্য দিয়েই সরকারের বিকল্প উপস্থাপন করা যেতে পারে। যে দেশে ক্ষমতাসীনের বিরুদ্ধে বলাকে বিবেচনা করা হতো রাষ্ট্রদ্রোহ বলে, সেখানে ক্ষমতাসীনেরাও বিরোধীদের দল গঠন এবং জাতীয় বিভিন্ন প্রশ্নে তাদের অবস্থানকে বৈধ এবং সংগত বলে মনে করতে থাকে। ইংল্যান্ডে সপ্তদশ শতকের শেষ ভাগে রাজার উত্তরাধিকারের প্রশ্নকে, বিশেষত রাজা দ্বিতীয় জেমসের ক্ষমতায় আরোহণকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্কেই দল হিসেবে টোরি এবং হুইগ পার্টির আবির্ভাব ঘটে। রাজসিংহাসনে উত্তরাধিকারের প্রশ্ন সামনে নিয়েই সাংগঠনিকভাবে সংসদীয় বিরোধী দলের আবির্ভাব ঘটেছে। তাহলে আমরা দেখতে পাই যে, রাজনৈতিক দল এবং সংসদীয় বিরোধী দলের প্রধান কাজ হচ্ছে জবাবদিহির দাবি তোলা এবং সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া। সংসদীয় ব্যবস্থায় সংসদের প্রধান কাজই হচ্ছে সেই নির্বাহী বিভাগের ওপরে নজরদারি করা। কিন্তু ১৯৯১ সালের পরে আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি যে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সেই ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাতে করে আমরা নির্বাচনের মাধ্যমে যে ধরনের সংসদ তৈরি হতে দেখেছি, তাতে যে দলই ক্ষমতায় গেছে, তারা সংসদকে তাদের প্রতিশ্রুত রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে পারেনি কিংবা চায়নি।

রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য যদি হয় জনসেবা তাহলে দেশের মঙ্গল ও উন্নয়ন হলেও একটি রাজনৈতিক দলের নীতি এবং আদর্শ অপর রাজনৈতিক দলের অনুরূপ নয়। তাই বলে সংসদের প্রধান বিরোধী দলের নিষ্ক্রিয়তা আমাদের কাম্য নয়।

লেখক: কথা সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

// লেখাটি সাপ্তাহিক সময়ের বিবর্তন ১৯ এপ্রিল,২০১৬ সংখ্যায় প্রকাশিত //

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 51 = 56