প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য মিডিয়ায় সেন্সরড হলো যেভাবে (Creativity of yellow journalism)

ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর ও বিদ্বেষপূর্ণ ভাষায় ব্লগে লেখালেখির ব্যাপারে অবশেষে মুখ খুলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিন বছর ধরে এ নিয়ে আমাদের সমাজ বিভক্তির চরমে পৌঁছেছে। এ বছর পয়লা বৈশাখে গণভবনে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে কিছু ব্লগারের ধর্ম সম্পর্কে বিদ্বেষপূর্ণ লেখালেখি নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন তিনি। আমরা প্রধানমন্ত্রী সেদিন কী বক্তব্য দিয়েছেন, এটা দেখার চেয়ে বরং দেখব গণমাধ্যম তাঁর বক্তব্যকে কীভাবে প্রকাশ করেছে। এ জন্য জাতীয় উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলের সংবাদ প্রতিবেদনগুলো পাঠ করেছি।

দেখা গেছে, হাতেগোনা কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল ‘স্পিরিট’ প্রকাশ পেয়েছে। ধর্মবিদ্বেষী ব্লগারদের নিয়ে তাঁর ক্ষুব্ধ মনোভাব ফুটে উঠেছে। কিন্তু বেশির ভাগ টিভি ও পত্রিকার সংবাদে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের ‘কড়া’ কথাগুলোকে সেন্সর করা হয়েছে। এতে তাঁর বক্তব্যের মূলভাব শ্রোতা-পাঠকদের পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের একাধিক ভিডিও ক্লিপ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তিনি ধর্মবিদ্বেষী লেখা ও সেগুলোর লেখকদের জন্য কয়েকটি বিশেষণ ব্যবহার করেছেন। যেমন, ‘পর্নো’, ‘নোংরা’, ‘অগ্রহণযোগ্য’, ‘বিকৃত মানসিকতা’ ‘চরিত্রের দোষ’ ‘অসভ্যতা’ ইত্যাদি। কিন্তু বেশির ভাগ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই বিশেষণগুলো হুবহু উল্লেখ করা হয়নি। বিশেষ করে ‘পর্নো’, ‘চরিত্রের দোষ’, ‘বিকৃত মানসিকতা’ শব্দগুলোকে বেশি সেন্সর করা হয়েছে। অথচ এসব শব্দের ব্যবহার করা ছাড়া কতিপয় ব্লগারের ধর্মবিদ্বেষের মাত্রা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর মনোভাব যথাযথভাবে ফুটে ওঠে না।

‘পর্নো’ শব্দটিকে প্রতিবেদনের মধ্যে প্রচার করেছে চ্যানেল২৪। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের এই অংশটি ছিল, ‘কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে লেখা এটা কখনো গ্রহণযোগ্য না। এখন একটা ফ্যাশন দাঁড়িয়ে গেছে যে ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু লিখলেই তা হয়ে গেল মুক্তচিন্তা। আমি তো এখানে মুক্তচিন্তা দেখি না। আমি এখানে দেখি নোংরামি। আমি এখানে দেখি পর্নো। পর্নো লেখা লেখে। এত নোংরা নোংরা কথা কেন লিখবে?’

১৪ এপ্রিল অনলাইনে বাংলাট্রিবিউন ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকে বিকৃত রুচির পরিচয় মনে করি : প্রধানমন্ত্রী’ শিরোনামে এবং প্রথম আলো ‘মুক্তচিন্তার নামে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বিকৃত রুচি : প্রধানমন্ত্রী’ শিরোনামের প্রতিবেদনে হুবহু শেখ হাসিনার বক্তব্য ছাপিয়েছে। সেখানে ‘পর্নো’ শব্দটিও ছিল। কিন্তু ১৬ এপ্রিল (১৫ তারিখ সব পত্রিকা প্রকাশনা বন্ধ ছিল) প্রথম আলোর প্রিন্ট সংস্করণে ব্লগারদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের ‘কড়া’ সব কথা বাদ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় পাতায় ‘মুক্তচিন্তার নামে ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু লেখাটা যেন ফ্যাশন’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি এদিন প্রথম আলো সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘বাসস’-এর বরাতে প্রকাশ করে। ১৬ এপ্রিলের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য জাতীয় পত্রিকাগুলোও একই রকমভাবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে ‘পর্নো’ ‘বিকৃত মানসিকতা’ ‘চরিত্রের দোষ’ শব্দগুলোকে সেন্সর করে প্রকাশ করে। দৈনিক ইত্তেফাক-এর ‘মুক্তচিন্তার নামে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত সহ্য করা হবে না’, সমকাল-এর ‘কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বিকৃত রুচি’, কালের কণ্ঠ-এর ‘ধর্মকে আঘাত এবং ধর্মের নামে খুন গ্রহণযোগ্য নয়’ ইত্যাদি শিরোনামে প্রতিবেদনগুলোতে এসব শব্দ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। টেলিভিশন চ্যানেলের মধ্যে এনটিভি, একাত্তর টিভি এবং বৈশাখী টিভির এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ‘পর্নো’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে এমন নয় যে আপত্তিকর বিবেচনায় কখনোই ‘পর্নো’ শব্দটি ব্যবহার করা হয় না। বরং অহরহই শব্দটি এবং এই গোত্রীয় আরও শব্দ ব্যবহৃত হচ্ছে। ‘ছাত্রীর পর্নো ভিডিও ধারণ’, ‘গোপনে ছবি তোলা মোবাইল পর্নো অ্যাপ নিয়ে আতঙ্ক’, ‘পর্নো ইন্ডাস্ট্রির কিছু অবাক করা তথ্য!’, ‘বাস্তবে কেমন দেখতে নীল ছবির পর্নো তারকারা?’ ইত্যাদি বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকার বিভিন্ন সময়ের সংবাদ শিরোনাম। এ ছাড়া নামকরা পর্নো তারকাদের দৈনন্দিন জীবনের খবরাখবরও ছাপা হচ্ছে নিয়মিত। ফলে এমন একটি ‘স্বাভাবিক’ ব্যবহৃত শব্দ, যেটি প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে নির্দ্বিধায় উল্লেখ করেছেন, তা প্রকাশে সংবাদমাধ্যমগুলোর সংকোচ কেন, তা বোঝা মুশকিল! –কদরুদ্দীন শিশির

যদিও যাদের জন্য এই তথ্য তারা ঠিকিই সঠিক তথ্য গুলো জেনে গেছেন। আমাদের মিডিয়াতো চলেই একটা বিশেষ শ্রেনী দ্বারা যারা শেখ হাসিনার বক্তব্যে মর্মাহত। তাই ঐ বিশেষ শ্রেনী কিছু কড়া বক্তব্য গুলো এড়িয়ে গেছেন। এই মিডিয়াগুলোই জনগনকে সবসময় ভুল ম্যাসেজ দেয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 68 = 72