কোন ঘটনাকে আসলে ইসলামে জিহাদ হিসাবে প্রচার করা হয় ?- ইতিহাসের আলোকে

প্রায়ই শোনা যায়- জিহাদ হলো অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। তো সেই অন্যায় ও অবিচারের ইসলামিক সংজ্ঞাটা কি ? সোজা কথায় , মুহাম্মদের চালু করা ইসলামের প্রতি আনুগত্য না আনাটাই হলো অন্যায় ও অবিচার। সেই কারনে যে কেউ ইসলাম গ্রহন করবে না ,সেটাকে কঠিন অন্যায় হিসাবে বিবেচনা করে তার বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হবে। আর এ জন্যে ডাকাতি , লুটপাট, ধর্ষন সব কিছুই বৈধ। অর্থাৎ ডাকাতিও জিহাদ হিসাবে গন্য হবে যদি সেটা ইসলামের নামে করা হয়। এবার সেটা ইতিহাসের দৃষ্টিতে দেখা যাক।

সবাই জানি , মুহাম্মদ মক্কায় যখন ইসলাম প্রচার করতে ব্যর্থ হলেন , তিনি কিছু সঙ্গীসহ মদিনায় চলে গেলেন। এ নিয়ে অনেক গল্পই শোনা যায় যে মক্কাবাসীরা মুহাম্মদকে হত্যা করতে গেছিল , তাই মুহাম্মদ প্রানের ভয়ে মদিনায় চলে যান। অথচ এর আগে মুহাম্মদ দশ বছরের বেশী ধরে মক্কায় ইসলাম প্রচার করেছেন , কেউ কিন্তু তাকে হত্যা তো দুরের কথা , তার গায়ে আচড়ও কাটে নি। কারন কি ? কারন হলো কুরাইশরা আসলে মুহাম্মদ ও তার ইসলামকে পাত্তা দিত না। তাকে তারা উন্মাদ, পাগল হিসাবে চিহ্নিত করত , পাগলকে মারতে কে যাবে ? কিন্তু সেই পাগল এক কান্ড করে বসলেন।

ইবনে ইসহাকের সিরাত রাসুল আল্লাহ নামক গ্রন্থ যা নাকি মুহাম্মদকে নিয়ে সর্বপ্রথম লেখা হয়, তাতে বলা হয়েছে-

মুহাম্মদ তার সঙ্গিদেরকে মদিনাসহ অন্যত্র পাঠিয়ে দেন। আর তাদেরকে বলে দেন , তারা যেন মদিনার নেতা ও সাধারন মানুষদেরকে ইসলামের পথে দাওয়াত দিয়ে একত্রিত করে, যাতে পরে যদি কোন যুদ্ধ করা লাগে , তাতে তারা সাহায্য করবে। তারা সেই মত কাজ করে ও কিছু মদিনার লোক তাদের সাথে যোগ দেয়। অত:পর তারা হজ্জ করার ছলে মক্কায় গমন করে ও মুহাম্মদের সাথে দেখা করে। মুহাম্মদ তাদেরকে গোপনে বলে , তিন দিন পর মক্কা থেকে মদিনা যাওয়ার পথে যে আল আকাবা নামক স্থান আছে সেখানে অপেক্ষা করতে। মুহাম্মদ তিনদিন পর রাতে গোপনে মদিনার সেই লোকজনদের সাথে দেখা করে ও মুহাম্মদের সাথে যোগ দিয়ে তার পক্ষে মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করে। কিন্তু এই খবর মক্কায় জানা জানি হয়ে যায়। তারা মুহাম্মদের এই ষড়যন্ত্রের কথা শোনার সাথে সাথে আল আকাবা নামক স্থানে ছুটে যায়। তারা দুইজনকে ধরে ফেলে , বন্দী করে নিয়ে এসে কাবা ঘরের দেয়ালের সাথে বেধে রাখে।

এই ঘটনার পরই মক্কাবাসীরা মুহাম্মদের চরম বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের জন্যে তাকে শাস্তি দেয়ার চিন্তাভাবনা করে ও এক রাতে হত্যা করতে চায়। মুহাম্মদ সেটা জানার পর তড়ি ঘড়ি করে মদিনায় পালিয়ে যান।

(সূত্র: Page- 202- 207, Sirat-Rasulallah by Ibne Ishaq, Translation: Alfred Guilleme)
https://archive.org/details/TheLifeOfMohammedGuillaume

এর পরে মুহাম্মদ মদিনায় পালিয়ে গিয়ে একটা দল গঠন করেন। তাদের কাজ ছিল মদিনার পাশ দিয়ে চলে যাওয়া মক্কাবাসীদের বানিজ্য কাফেলার ওপর আক্রমন করে মালামাল লুটপাট করা , বনিকদেরকে হত্যা করা ও তাদেরকে পনবন্দী করে অর্থ আদায় করা। প্রথম দিকে বেশ কিছু আক্রমন বৃথা যায়। অবশেষে মুহাম্মদ কিছু সঙ্গিকে মক্কা ও তায়েফের মাঝখানে নখলা নামক স্থানে পাঠান বানিজ্য কাফেলা আক্রমন করে তাদের মালামাল লুটপাট করে নেয়ার জন্যে, সেই মত তারা সেটা করে।কিন্তু ঘটনাচক্রে সেটা তারা নিষিদ্ধ মাসের মধ্যে করলে , লোকজন মুহাম্মদ সম্পর্কে নানা খারাপ মন্তব্য করতে থাকে। আর তখন মুহাম্মদের এই ডাকাতিকে বৈধতা প্রদানের জন্যে তিনি নিজেই সুরা বাকারার ২১৭ নং আয়াত নাজিল করেন। – এসবের বর্ণনা সিরাত রাসুলুল্লাহ ও ইবনে কাসিরের তাফসিরে বর্নিত আছে।

যে কেউ উক্ত ঘটনা www.qtafsir.com এ গিয়ে চেক করে দেখতে পারেন। এই ঘটনার সবিস্তার বর্ননা ইবনে ইসহাকের সিরাতেও আছে।

যে কুরাইশরা দীর্ঘদিন ধরে মুহাম্মদের গায়ে একটা আচড়ও কাটল না , হঠাৎ করে কেন তারা মুহাম্মদের ওপর খাপ্পা হলো ? তার যথাযথ কারন ইসলামী পন্ডিতরাই বর্ননা করে গেছেন। কোন ইহুদি বা কাফের সেটা করে নি। কিন্তু আমরা কয়জন সেটা জানি ? খুবই কম মানুষই পেছনের ঘটনা জানে। কারন তারা এত জানার চেষ্টা করে না। তারা সবাই এটাই জানে ,দ্বীনের নবী মুহাম্মদকে কুরাইশরা হত্যা করতে গেছিল , আর আল্লাহ তাকে রক্ষা করে মদিনায় নিয়ে গেছিল। আহা , কি ভয়ংকর ষড়যন্ত্রই না করেছিল কুরাইশরা মুহাম্মদকে হত্যা করার জন্যে। শুধু সেখানেই শেষ হলে হতো। এরপর একের পর এক বানিজ্য কাফেলায় আক্রমন যা ডাকাতি ছাড়া কিছুই না , সেগুলো সব হয়ে গেছে জিহাদ , অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিহাদ। কি আজব আমরা , কোন কিছু না জেনে , না বুঝে সেটাই আমরা চোখ বুজে বিশ্বাস করে চলেছি।

ঠিক এরকম একটা ডাকাতি প্রচেষ্টার কারনেই বদর যুদ্ধের ঘটনা ঘটে। সবাই আমরা জানি মক্কার প্রায় ১০০০ লোক মদিনায় গিয়ে আক্রমন করে মুহাম্মদ ও তার দলবলকে শেষ করতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার পিছনের ঘটনা জানি না। প্রকৃত ঘটনা এরকম —

আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে এক বিরাট বানিজ্য কাফেলা যাচ্ছিল সিরিয়াতে। মুহাম্মদ সে খবর পেয়ে তার দলকে বানিজ্য কাফেলা আক্রমন করে মালামাল লুটপাট করতে পাঠায়। কিন্তু যে কোন ভাবে সুফিয়ান সেই আক্রমন থেকে নিজের দলকে রক্ষা করে। কিন্তু সিরিয়া থেকে ফিরতি পথে আবার ঝামেলা হতে পারে , এই ভয়ে সে এই খবর মক্কায় পাঠিয়ে দেয়। তখন ফিরতি বানিজ্য কাফেলা রক্ষার জন্যে মক্কা থেকে ১০০০ জনের মত এক দল মদিনার দিকে ছুটে আসে ও বদর প্রান্তরে অবস্থান নেয়। তখন মুহাম্মদ বদর প্রান্তরে গিয়ে তার দলবল সহ আক্রমন করে। মাত্র ৩১২ জন লোক নিয়ে দীর্ঘ পথ ভ্রমনে ক্লান্ত কুরাইশদেরকে আক্রমন করে ও তাদেরকে পর্যুদস্ত করে।

( সূত্র : Page- 286-287, Sirat Rasul Allah by Ibne Ishaq , Translation: Alfred Guilleme)

এই হলো বদর যুদ্ধের পেছনের ঘটনা। কিন্তু আমরা কেউই সেটা জানি না। আমরা যা জানি তা হলো , মক্কাবাসীরা এক বিরাট দল নিয়ে মদিনায় আক্রমন করে মুহাম্মদ ও ইসলাম দুটোকেই ধ্বংস করতে ছুটে যায়, কিন্তু আল্লাহর অসীম রহমতে মাত্র ৩১২ জন সৈন্য নিয়ে নবী মুহাম্মদ তাদেরকে পর্যুদস্ত করে নিজেকে ও ইসলামকে রক্ষা করেন। আহা , আল্লাহর কি অসীম কুদরত আর জিহাদের কি মাহাত্ম !

বানিজ্য কাফেলায় আক্রমন যা নাকি ডাকাতি ছাড়া আর কিছুই না , সেটাকেই আমরা জানি ইসলামের পবিত্র জিহাদ হিসাবে।

বানিজ্য কাফেলায় আক্রমন সম্পর্কে কিছু তথ্য আছে এখানে : https://en.wikipedia.org/wiki/Caravan_raids

আর মুহাম্মদ ও তার দলের সকল বানিজ্য কাফেলা আক্রমনের ঘটনা বিস্তারিত জানা যাবে , উক্ত ইবনে ইসহাকের সিরাতে। তবে হ্যা , এসব নিয়ে কিন্তু কোন প্রশ্ন করা যাবে না। স্বয়ং নবি নিজেই সেটা বারন করে গেছেন। কারন হলো এসব ঘটনা সবাই জেনে গেলে , তাদের ইমান দুর্বল বা এমন কি বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই শক্ত ইমান বজায় রাখার জন্যে, কোন প্রশ্ন ছাড়াই সবাইকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে হবে , আর তাহলেই পাওয়া যাবে ইপ্সিত বেহেস্ত যেখানে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে জনপ্রতি কমপক্ষে ৭২ টা কুমারি নারী ও মদের নহর। বলুন – সুবহান আল্লাহ !

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

64 + = 65