ইসলামের গায়ে কলংক টেনে আনবেন না

একটি আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন মোহাম্মদ (সা.), সেই আন্দোলনের কর্মীরা একটি পর্যায়ে জাতিতে পরিণত হয়। তারও পরে সেটা পরিণত হয় একটি সভ্যতায়। আল্লাহর রসুল যখন আন্দোলনটির সূচনা করেন তখন থেকেই আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে আল্লাহ দিক নির্দেশনা দিতে থাকেন। এই নির্দেশনা, আদেশ, বিধান, উপদেশ, সান্ত্বনা ইত্যাদির সংকলনই হচ্ছে কোর’আন। একইভাবে রসুল (সা.) আন্দোলন পরিচালনা করতে গিয়ে তাঁর সঙ্গীদেরকে যে কথাগুলো বলেছেন, যে কাজগুলো করেছেন সেগুলোর ইতিহাসের সংগ্রহই হচ্ছে সিরাতগ্রন্থ, হাদীস ইত্যাদি।

আজকে যদি আবারও রসুলের উম্মত হয়ে কেউ তদ্রূপ আন্দোলন করতে চায় তাহলে তাকেও পর্যায়ক্রমিকভাবে মূল লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হতে হবে। এরই মধ্যে ১৪শ বছর পার হয়ে গেছে। বহু প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হয়েছে। অলৌকিক গ্রন্থ কোর’আনকে আল্লাহ সংরক্ষণ করেছেন। সেখানে আছে কিছু মূলনীতি। মূল নীতি এমন একটি বিষয় যা চিরন্তন সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। যেমন ঐক্যবদ্ধ হওয়া, শৃঙ্খলাবদ্ধ হওয়া, নেতার আনুগত্য করা, অন্যের হক নষ্ট না করা, বিশ্বাসের বিষয়ে কারো উপর জবরদস্তি না করা ইত্যাদি। প্রেক্ষাপট যতই পাল্টে যাক, এই নীতিগুলোতে পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই।

একটি শিশু ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে আবার বার্ধক্যে উপনীত হয়। সে শিশুকালে যা খায় যৌবনে তা খায় না, শিশুকালের অভ্যাস তারুণ্যে থাকে না, জীবনের পূর্ণতা যখন আসে তখন তার যৌবনের অাচরণ অদৃশ্য হয়ে যায়। আপনি যদি ঐ ব্যক্তির অনুসরণ করতে চান তাহলে আপনাকে তার জীবনের পর্যায়গুলোকে অনুভব করেই অনুসরণ করতে হবে। সে বেবিফুড খেয়েছে, এটা সত্য কিন্তু আপনার যখন ৩০ বছর বয়স তখন যদি আপনি তার অনুসরণ করে বেবিফুড খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন এবং এটাকেই তার সুন্নত বলে গোঁ ধরে বসে থাকেন তাহলে সেটা আপনার মস্তিষ্কের প্রতি অবিচার করা হবে। সর্বাগ্রে আপনাকে এই সিদ্ধান্তে আসতে হবে যে, আপনি এখন তাঁর জীবনের কোন পর্যায়টিতে অবস্থান করছেন এবং সেই পর্যায়ে তিনি কী করেছেন সেটাই আপনাকে করতে হবে।

আল্লাহর রসুল যখন মানুষকে তওহীদের দিকে আহ্বান করতে শুরু করলেন তখন সেই সমাজে জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা চলছিল যাকে আইয়্যেমে জাহেলিয়াত বলা হয়। তিনি বললেন, শান্তি আসবে আল্লাহর হুকুমে। তাঁর ডাকে যারা সাড়া দিল, তারাও একই আহ্বান করতে লাগলেন। তারা নির্যাতিত হলেন, তিরষ্কৃত হলেন। কিন্তু কোনো প্রতিশোধ নিলেন না, ধৈর্য ধরে সত্যের পক্ষে- জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে লাগলেন। প্রচারের পথ ধরেই মদীনায় তাদের জন্য একটি নিরাপদ অবস্থান তৈরি হলো। তখন রসুল সেখানে রাষ্ট্রপ্রধান হলেন। একটি শিশু তার বাল্যকাল, কৈশোর, তারুণ্য পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণ করল।

রাষ্ট্র কখনো আন্দোলনের নীতিতে চলতে পারে না, রাষ্ট্রনীতি-পররাষ্ট্রনীতি লাগে। তাকে অপরাপর রাষ্ট্রের সঙ্গে সন্ধি, চুক্তি যেমন করতে হয় তেমনি তার নিরাপত্তার জন্য সামরিক বাহিনী তৈরি করতে হয়, প্রয়োজনে যুদ্ধ করতে হয়। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য বিচারব্যবস্থা ইত্যাদিরও বিকাশ সাধন করতে হয়। রসুলও (সা.) সেগুলো করলেন।

আজকে আমরা যদি সেই রসুলের (সা.) অনুসরণ করতে চাই তাঁর মূল কাজটির অনুসরণ করতে হবে অর্থাৎ তিনি ইসলাম (শান্তি) প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করেছেন সেই কাজগুলোকে অনুসরণ করতে হবে। শুধু তাঁর খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, চুল-দাড়ির ধরন অনুকরণ করলে হবে না। দ্বিতীয়ত আমরা এখন কোন পর্যায়ের কাজগুলোকে অনুসরণ করব সেটা আমাদের নিজেদের অবস্থার আলোকে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাহলেই আমরা বুঝবো কোর’আনের কোন হুকুমগুলো আমার জন্য প্রযোজ্য, রসুলের ও উম্মতে মোহাম্মদীর কোন কাজগুলো আমারও এই মুহূর্তে কর্তব্য।

বর্তমানে জবরদস্তিমূলক একটি শাসনব্যবস্থা সমগ্র পৃথিবীতে চলছে। মুসলিমসহ পুরো মানবজাতিই স্রষ্টার ‍হুকুমকে এ যুগে অচল মনে করে গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র ইত্যাদি গ্রহণ করে নিয়েছে, তবে সেগুলোও ব্যর্থ হয়েছে। এগুলোকে শেরক-কুফর হিসাবে ঘোষণা দিয়ে মুসলিমদের মধ্যেই একটি অংশ সংগ্রাম করছে কোর’আনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য। যারা এই চেষ্টাটি করছে তাদের উচিত হবে রসুলাল্লাহ (সা.) যেভাবে প্রথমে মানুষকে তওহীদের দিকে আহ্বান করেছেন, যেভাবে অন্যায়-অশান্তিময় সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন সেটা করা। বর্তমানে মুসলিমদের মনও আল্লাহর হুকুম জাতীয় জীবনের মানার জন্য প্রস্তুত নয়। নানাবিধ কারণে তারা এর বিরুদ্ধে। আগে তাদের কাছে ইসলামের যুগোপযোগিতা প্রমাণ করতে হবে। মুসলিমরা দীনের বিভিন্ন ফতোয়া নিয়ে হাজারো ফেরকা মাজহাবে বিভক্ত, আত্মকলহে লিপ্ত এই জনগোষ্ঠীকে আগে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

কাজটি বড় মনে হলেও এটাই সঠিক পথ। ভুল পথে আজীবন চলেও গন্তব্যে পৌছা যায় না। আজকে যারা রাষ্ট্রশক্তি ব্যতিরেকেই সশস্ত্র পন্থা নিয়ে মানুষ কুপিয়ে হত্যা করছেন তাদের দ্বারা ইসলামের কোনো বিন্দুমাত্রও উপকার হচ্ছে না। ইসলামের যুদ্ধনীতি আছে, কিন্তু সেটা কখন আপনার উপর ফরদ হবে সেটা না বুঝে আমল করলে ব্যর্থতা নিশ্চিত। যখন রাষ্ট্রক্ষমতা আপনি পাবেন তখন অবশ্যই রাষ্ট্রদ্রোহীকে, যুদ্ধাপরাধীকে, বিশ্বাসঘাতককে দণ্ড দিবেন। তখন আর কেউ সেটাকে অন্যায় বলতে পারবে না। কিন্তু আগে দণ্ড দেওয়ার অধিকার অর্জন করুন। শিশুকালে বেবিফুডই স্বাস্থ্যকর, সীমালঙ্ঘন করে নিজেদের সংগ্রামকে অর্থহীন ও ব্যর্থ করে দিবেন না, নিজেদের আখেরাতকে ধ্বংস করবেন না, ইসলমের গায়ে কলঙ্ক টেনে আনবেন না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “ইসলামের গায়ে কলংক টেনে আনবেন না

  1. নিরপেক্ষ ও বেশ যুক্তিসঙ্গত
    নিরপেক্ষ ও বেশ যুক্তিসঙ্গত লিখা ।
    তবে –
    রাসূল সাঃ যে অান্দোলন গড়ে তুলেছিলেন সেটার সাথে বর্তমান যারা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায় – এ দুটির মধ্যে মিল কোথায় সেটাই ইতিহাসসাপেক্ষ । উপরন্তু বর্তমান ইসলাম প্রতিষ্ঠাকারীরা তো তাদের স্বমতে-স্বপথে সুপ্রতিষ্ঠিত এবং তারা প্রত্যেকে ভাবছে তাদেরটাই ঠিক । কোরঅান-হাদিস থেকে তার ব্যাখ্যাও দিচ্ছে । তাদেরকে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে অাগে যে প্রশ্নটি করে তা হলো –

    অাপনি কি অালেম-মুফতি-মুহাদ্দিস? অাপনার গায়ে সুন্নতি লেবাস কৈ?

    এ বিষয়টির সমাধান অাপনি কিভাবে দিবেন?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

89 − 79 =