আমি দেশপ্রেমিক নই।

প্রাচীন গোষ্ঠিবদ্ধ সমাজ থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ নিজের অভ্যন্তরীন অবয়বে যেমন বিবর্তিত হয়েছে ঠিক তেমনি সারা দুনিয়ার মাঝে নব নব চিন্তার উদ্ভব ঘটিয়ে পৃথিবীকেও বিবর্তিত করেছে। প্রাচীন গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজ থেকে গ্রীক সিভিস/ সিটি স্টেটের পথ ধরে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এই বিবর্তনের উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত । একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জনসমষ্টীকে শাসকরা যে দুরন্তভাবে বিবর্তিত করেছে তা যেনো ফরাসি বিপ্লবের হাওয়ায় জাতীয়তাবাদী আবেগে মূর্ত হয়েছে। ফরাসি বিপ্লবের ভ্রুন থেকে বিকিশিত হওয়া জাতীয়তাবাদী আবেগ এবং সার্বভৌমত্বের চরমতর অবলম্বন মানবগোষ্ঠীর মাঝে যে আন্তঃআঞ্চলিক ‘মানসিক’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে সেটি অনুদিত হয়েছে গত কয়েক শতাব্দী ধরে সমগ্র পৃথিবী জুড়ে। আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের বিকাশমান ধারায় এই পোক্ত জাতীয়তাবাদভিত্তিক এবং সার্বভৌমত্বভিত্তিক ব্যাবস্থাটি বৃহত্তর অঞ্চলে একদিন উপনিবেশবাদকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মানবগোষ্ঠির আনুকুল্য পেয়েছে কিন্তু মানবগোষ্ঠির সেই সাধের রাষ্ট্র মানুষকে আজকের কিংবা পূর্বের শতাব্দীতেও কি দিয়েছে সেটি হলো আসল প্রশ্ন। রাষ্ট্র উদ্ভবের পর হতে এর অভ্যন্তরস্থ বিষয়াবলী নিয়ে বহুবিধ সঙ্কট মানবের মনে জিজ্ঞাসা তৈরি করেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে দুনিয়াব্যাপী যুদ্ধবিধ্বস্ত মানবসমাজে উত্তরাধুনিকতাবাদের এক নৈরাশ্যবাদী চেতনায় মানব ইতিহাসের অগ্রগামীতা নিয়ে সন্দেহে পেয়ে বসেছিলো এই আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপটকে ঘিরেই। এই প্রেক্ষাপটের নেপথ্যে প্রকট বাস্তবরূপে মানুষ অবলোকন করেছে আগ্নেয়াস্ত্রের কাছে অসহায় মানুষের আর্তচিৎকার , জাতিগত আধিপত্যবাদী চিন্তা কিভাবে ভিন্ন জাতিসত্ত্বার মানুষকে পশুর মতো আছড়ে মেরে ফেলে সেও এই পৃথিবী অবলোকন করেছে , নিরন্ন আফ্রিকান এশিয়ানের বিপরীতে ভোগ-লুণ্ঠন- খবরদারির অন্য বিশ্বও দেখছে এই পৃথিবীর মানুষ।

আজকের শতাব্দীতে মানুষ অবলোকন করছে পৃথিবীতে কিভাবে এক উন্নাসিক, প্রতারিত ,খবরদারিমার্কা, তথাকথিত এবং প্রথাগত ডেমোক্রেসির মাধ্যমে পুজিপতির শাসন। Liberalism, Derugulation, Privatization এর এক মসলাসমেত Globalization প্যাকেজ পরিকল্পনায় দুনিয়া শাসিত হচ্ছে যেখানে অবদমন ,আধিপত্যই যেন হিসাবনিকাশের মূলে।

সমগ্র পৃথিবীর অর্থনীতি কিভাবে আজকের এই পর্যায়ে এসেছে তা কম বেশি সবারই জানা।এই রাষ্ট্রব্যাবস্থার সাথে যখন অর্থনীতির অচ্ছেদ্য সম্পর্ক নির্ণীত হয় তখন ইতিহাস পরিষ্কারভাবে সাক্ষ্য দেয় অর্থ যার ক্ষমতা তাঁর , এর বাইরে বাকি দুনিয়ার মানুষ ক্ষমতাভোগী শোষকশ্রেনীর অধীনস্থ প্রজাবিশেষ। মানুষের মুক্তি আকাঙ্খার স্বপ্ন নিয়ে যে রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে আজকের বিশ্বে সে ব্যবস্থা মানবতার কাছে অসহায় । উপনিবেশবাদ বিলুপ্ত করে সারা দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রগুলো তথকথিত উন্নয়নবিলাসে নিমগ্ন এখন। গ্রীক সভ্যতার আতুর ঘর থেকে যে ডেমোক্রেসি গনমানুষের শাসনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে সেই স্বপ্নে কিংবা ভ্রান্তিতে আজো বিভোর বিশ্ব। ১ম বিশ্বযুদ্ধের ধংসস্তুপ থেকে শান্তিস্বপ্নে জাতিপুঞ্জের সৃষ্টি অতঃপর সে স্বপ্নে গুড়ে বালি ২য় বিশ্বযুদ্ধ। সেই ২য় বিশ্বযুদ্ধের ধংসস্তুপ থেকে সৃষ্ট জাতিসংঘ আধুনিক জাতিরাষ্ট্র গুলোর মধ্যকার শান্তিবাদী সত্ত্বা হয়ে দাড়ানোর প্রচেষ্টায় সেটিও যে সফল তাও নয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর সারা দুনিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মাঝে দেখা দেয় বৃহৎশক্তি কর্তৃক নব্য উপনিবেশবাদী প্রবণতা। অর্থনীতির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রনবাদ প্রতিষ্ঠার ফলভোগী দেশগুলোই সারা পৃথিবীতে তাদের রীতিপদ্ধতি বিস্তার ঘটিয়েছে। নব্যউপনিবেশবাদী পাশ্চাত্য সমাজ এবং মার্কিন ব্যাবস্থার অনুকূলে সমগ্র কর্মযজ্ঞ । মেকি স্বপ্নের ফেরি করে যে জাতিসংঘের উত্থান তা বিশ্বে কি প্রভাব ফেলেছে তা নতুন করে বলার অবকাশ নেই। অস্থির মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির কুলকিনারা করতে না পারা, পরমানু অস্ত্রের প্রশ্নে বৃহৎ শক্তির কাছে মাথা নোয়ানো, ইস্রায়েলি দমন পীড়নে জাতিসংঘের ভূমিকা পাশ্চাত্যতোষণ বৈকি আর কিছু নয়।

সামন্তীয় সমাজের ভূমি অধিকারনির্ভর রাজ্যশাসন আদি দখলদারি সমাজের চিহ্ন বহন করে কালক্রমে এদের বিলুপ্তিও ছিল অনিবার্য কারন দখলদারিত্ব আর প্রজাশাসনের অমানবিকতা প্রগতির কাছে হার মানবে এবং মেনেছে।

কিন্তু সেই শাসকদের হটিয়ে যে প্রগতির জয়গান গাওয়া হলো ,রাষ্ট্র গড়ে তুলে মানুষ যেন সেই লড়াইয়ে ক্ষ্যান্ত দিলো। সেই প্রগতিবাদী ঝরের সুফল ‘রাষ্ট্র’ – এই ভেবে শতাব্দী ব্যাপী দেশে দেশে অর্থনীতি , সেনাবাহিনী ,ক্রীড়াক্ষেত্র , সমরাস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতায় ‘প্রথম’ হতে উঠেপরে লাগলো। এ কর্মযজ্ঞে শাসক থেকে জনগন , সবাই যেন দেশপ্রেমিক। গোষ্ঠিসমাজ, সামন্তীয় সমাজ, আধা সামন্তীয় সমাজ পেরিয়ে আধুনিক উদারবাদী অর্থনীতির বিশ্বায়িত যুগে পর্যায়ক্রমিক ধারায় যা হয়েছে তা হলো সামন্তীয় ভূমির স্থলে ভূমির সার্বভৌমত্ব যেটি কিনা রাষ্ট্র বলে পরিচিত। এখানে আজকের রাষ্ট্রে সামন্তীয় সেনাবাহিনী অবিকল রয়েছে, ভূমির প্রতিযোগিতার স্থলে এসেছে অর্থনীতির প্রতিযোগিতা ,ভুমি দখলের পরিবর্তে এসেছে বাজারদখলের প্রতিযোগিতা,রাজ্যে রাজ্য সন্ধিচুক্তির বদলে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে দাসত্বের চুক্তি এসেছে।

এছাড়া ,অন্যদিকে ফরাসি বিপ্লবের গণতন্ত্রমনস্কতার ঢেউ দুনিয়ার মানুষদের মধ্যে মানবাধিকার, আইনের শাসন, সুশাসন প্রভৃতি প্রপঞ্চের ভ্রুণ রচনা করেছিলো সত্য কিন্তু সেসবের যে আবেদন, যুগোপযোগিতা তা জাতিরাষ্ট্রে কি ফলাফল বয়ে এনেছে তা বড় প্রশ্ন। এসকল প্রেক্ষাপটে আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিযোগী মনোবাঞ্চা সব সময়ই জয়ী হয় সেখানে জনকল্যাণের এসকল আবেদন গ্রাহ্য হচ্ছে না।

ক্রিকেট, ফুটবল সর্বোপরি ক্রীড়াসাফল্যে জাতিগত উল্লাস আধুনিক বাণিজ্যের এক বিশাল ক্ষেত্র। যেকোন ক্রীড়াসাফল্যে মত্ত হয়ে অপরাপর জাতিগোষ্ঠীকে গালিগালাজ এবং রটনা করে স্বীয় উন্মাদনায় ভুলে যাই এদেশেই কারো পেটে ভাত নেই, এদেশেই কেউ চিকিৎসার অভাবে মরে যাচ্ছ অথবা এদেশেই কেউ ন্যুনতম মৌলিক অধিকারও পাচ্ছে না। জাতিগত প্রতিযোগিতার এই উন্মাদনা শাসকদের দুই দিক থেকে সুবিধা দেয় । যেমন – একদিকে অবাধ বাণিজ্যের প্রসারে ক্রীড়াকে ব্যবহার করা অন্যদিকে এরূপ উন্মাদনায় শাসকদের অপশাসন হতে দৃষ্টি সরিয়ে রাখা।
যার অর্থ আধুনিক জাতিরাষ্ট্র মানেই প্রতিযোগনির্ভর জ্যাত্যাভিমানের প্রসার।

রাষ্ট্র যে সেনাবাহিনী গড়ে তুলে তা সুপ্রশিক্ষিত গোষ্ঠি , সন্দেহ নেই । শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতা, চ্যালেঞ্জ, হুমকি, অস্তিত্বের শঙ্কা প্রতিরক্ষা বাজেটের ঊর্ধ্বমুখীতাকে উৎসাহিত করে। কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে পরমানু অস্ত্র, মিগ, জঙ্গি বিমান, টর্পেডো, মরনাস্ত্র , ট্যাঙ্ক, গোলা উৎপাদন করে জাতিগত শৌর্যের পরিচয় দেয়া হচ্ছে। হঠকারি এ প্রতিযোগের লক্ষ্যবস্তু কারা এই জিজ্ঞাসা কেউই করে না। কার বিরুদ্ধে এই অস্ত্র, বাজেট? – নিশ্চয়ই কোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। এই মরনাস্ত্র প্রতিযোগীতায় শাসকরা গর্বে বলে বেড়ায় ‘আমাদের সেনাবাহিনী শক্তিশালী’।

জনগণও আহ্লাদে আটখানা ‘ আমাদের সেনাবাহিনীর শক্তি অনেক’। শাসকদের ঢুকিয়ে দেয়া এই উত্তেজনা জনগন হৃদয়ঙ্গম করে প্রবল উৎসাহে। খোদ রাষ্ট্রবিপ্লব এই উত্তেজনা তৈরি করে যেখানে মৌলিক অধিকারের গ্যারান্টি নেই অথচ কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে সেনাবাহিনী গড়ে তুলার জাতিগত উন্মাদনা ঠিকই আছে।

নীতিশাস্ত্রের একটি ভ্রুকুটি ও জ্বলন্ত শব্দ হলো দেশপ্রেম। জাতিরাষ্ট্রে দেশপ্রেম নিজস্ব জাতিগত অর্জনে গর্ববোধকে নির্দেশ করে, নিজস্ব ভূমির প্রতি একচ্ছত্র অধিকারবোধ নির্দেশ করে, রাষ্ট্রবাসী কর্তৃক ‘একত্ব’ কে ধারন করে যেখানে মানুষ নামের প্রশ্নটি সীমান্তে অনুপ্রবেশের দায়ে হত্যা, আফ্রিকান ভূখণ্ডে অনাহারি চিকিতসাহীনদের সিস্টেমেটিক মৃত্যুর কাছে ফ্যালফ্যালিয়ে চেয়ে থাকে। আর উলটো পিঠে আমেরিকা, ব্রিটেন,ইউরোপে ভোগবাদি চকচকে জীবনপ্রনালীর মানবগোষ্ঠী কুলীন সেজে গর্ব করে ‘আমরা উন্নত জাতি’ ।- এই পরিচয়ই যেন দেশপ্রেম!!

এই ভ্রমাত্নক দেশপ্রেমকেই শানিত করে ধর্ম , জাতীয়তা । সেকারনেই আধুনিক জাতিরাষ্ট্র হুঙ্কার দেয় “ সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোন আপোষ নেই”।
মুল কথা হলো, আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের কাছে সেনাবাহিনী, মরনাস্ত্র, ক্রীড়াসাফল্যকে যেভাবে কৃতিত্বের সাথে প্রচার করা হয় তা রীতিমতো পরিহাস হয়ে দাঁড়ায় যখন মানবিক অধিকার ঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হয়। সমগ্র বিশ্বের বাজারদখল, পুজির পুঞ্জিভবন, উদারবাদের খেসারত হিসাবে যে বিশ্বসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা এই পরিহাসের নামান্তর । গনমানুষকে তাঁর বাচবার অধিকার হতে বঞ্চিত হচ্ছে এই জাতিগত উন্মাদনার কাছেই ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

74 − 71 =