দীর্ঘশ্বাস

তখন কলেজে পড়ি। এক মেয়ের প্রেমে পড়েছিলাম। প্রেমে পড়েছিলাম বললে ভুল হবে। ভালো লেগেছিল। সে বয়সটাই ছিল ভাল লাগার। তাই একটা না অনেকগুলোকে ভালো লেগেছিল। কিন্তু সাড়া (Response) পেয়েছিলাম ওই একজনের কাছ থেকে। প্রপোজ তখনো করিনি। কিন্তু মেয়েরা ছেলেদের চোখ দেখে অনেক কিছু বুঝে নিতে পারে। আমার বেলাতেও তাই ঘটেছিল। মেয়েটা আমার চোখ মুখ এবং আচরণ দেখে অনেক কিছু বুঝে নিয়েছিল। আমিও অনেক কিছু অনেকবার বুঝে নিয়েছি। একবার না বারবার। কোন মেয়ে একটু তাকালে বুঝে নিতাম এ হয়ত আমাকে ভালবাসে কিংবা আমার প্রেমে পড়েছে। আসলে দোষটা আমার না বয়সের। কিন্তু বেলা শেষে যেটা হয়েছে তা হল মেয়েটা আমাকে প্রেমিক বা বয়ফ্রেন্ড হিসেবে নয় অন্য কিছু হিসেবে যেমন হতে পারে বন্ধু হিসেবে, হতে পারে ভাই হিসেবে কিংবা এমনকি হতে পারে আঙ্কেল হিসেবে দেখেছে। আর আমি দেখেছি প্রেমিকা হিসেবে। দৃষ্টিভঙ্গির কতটা পার্থক্য রয়ে গেছে নারী এবং পুরুষের মাঝে!

গল্পের নাম দিয়েছি দীর্ঘশ্বাস। তাই নিয়ে কিছু বলি। দীর্ঘশ্বাস বিষয়টা হল দুঃখ কষ্ট বেদনা আফসোস হতাশা প্রকাশের একটি নির্বাক মাধ্যম। হয়ত বলতে পারেন কিছু অপ্রত্যাশিত অনুভুতির নির্বাক বহিঃপ্রকাশ।

যাইহোক, আবার গল্পে ফিরে আসি। মেয়েটিকে আমার প্রপোজ করা হল না। তার আগেই কলেজ ছেড়ে চলে এলাম। তার মানে এইচএসসি পরীক্ষা দিলাম। মেয়েটা আমার এক বছরের জুনিয়র ছিল তাই সে কলেজে রয়ে গেল। আর সবচেয়ে বড় কথা আমি প্রপোজ করতে চাইনি। কেননা আগে যতগুলোকে প্রপোজ করেছি কেউ সাড়া দেয়নি। তাই ভালবাসাকে ভালোলাগাতেই কারাবন্দী করে রাখলাম। এতে যদি পাই সুখ। সুখ না পেলেও অন্তত দুঃখ তো পাব না।

কিন্তু প্রেমবিধাতা আমার দুঃখ দেখে একটু নড়েচড়ে বসলেন। আমার ফোনে একদিন একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে মিসডকল আসলো। আমি ফোন ব্যাক করলাম ওপাশ থেকে হ্যালোর বদলে একটি দীর্ঘশ্বাস ভেসে আসলো। কিছু বোঝার আগে ঘটে গেল বিপর্যয়। আমার একবন্ধু পাশ থেকে গালাগালি করে বসলো। মেয়েটিও কিছু উত্তপ্ত বাক্য ব্যয় করলে আমি আর থাকতে পারলাম না গালাগালি করে বসলাম। মফস্বলের ছেলে তো। এ বিদ্যা যে মাথার মধ্যে এমন সুপ্ত ভাবে বাসা বেঁধেছিল। এই ঘটনা না ঘটলে তার প্রমান পেতাম না। তখন না বুঝলেও পরে বুঝেছিলাম যে ওই মেয়েটি ফোন করেছিল।

অতএব, আমি পেয়ে ধন হারাইলাম। কিন্তু প্রেম বিধাতা যেহেতু সহায় ছিলেন সেহেতু আবার ফিরেও পাইলাম। মেয়েটির সাথে আমার ফোনে কথোপকথন শুরু হল। কথা যতটা বলত তার চেয়ে বেশি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ত। আমি কোন কথা বললেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ত। কোন কোন কথাতে ডাবল দীর্ঘশ্বাস। আমি মনে করেছিলাম হয়ত তার অনুভুতিকে আমি গভীরভাবে নাড়িয়ে দিতে পেরেছি। একটু গর্বও করতাম তা নিয়ে।

একদিনের ঘটনা। সেদিনই তাকে আমি ফোনে প্রপোজ করি।আমার প্রপোজাল শুনে সে চার/ পাঁচবার ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোন রেখে দিল। আমি ভাবলাম কাজ হয়েছে।

তার কয়েকদিন পর আবার ফোনে কথোপকথন। সে আমাকে বলল- “দেখো আমি তোমাকে অনেক বিশ্বাস করি। তুমি আমার বিশ্বাসের মর্যাদা দিবা তো”? বলে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। প্রতুত্যরে কী বলা যায় আমি ভেবে না পেয়ে একটা বড় করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার প্রস্তুতি নিলাম। বড় করে নিশ্বাসও নিলাম। কিন্তু দীর্ঘশ্বাস আটকে গেল যখন সে বলল- I Love U। সত্যি অনেক প্রত্যাশিত একটি বাক্য। আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম। মনে হতে লাগল বড় বড় করে কয়েকটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি।

আমার বন্ধুরা আমাদের এই সম্পর্কটা গভীর পর্যবেক্ষণে রেখেছিল। আমিও তাদের কাছে সব কিছু শেয়ার করতাম। তারাও আমাকে বিভিন্ন ভাবে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করত। একদিন বন্ধুরা আমার কাছে সম্পর্কের আপডেট জানতে চাইল। আমি সবিস্তারে বললাম। এবং বললাম তার হৃদয়কে আমি গভীরভাবে নাড়া দিতে পেরেছি। তারা জানতে চাইল হৃদয় থাকে ভিতরে তুই কি করে বুঝলি কার হৃদয় কতটুক নড়ল। আমি বললাম- দেখ, আমি কথা বললেই ও ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বন্ধুরদের মধ্যে একজন বলল আরে ওর তো হাঁপানির রোগ আছে।

বন্ধুদের কথা শুনে মন খারাপ হয়ে গেল। তবু মনকে স্বান্তনা দিলাম যে একটা রোগই কারো বড় পরিচয় হতে পারে না। আমি তাকে অনেক ভালবাসবো। অনেক অনেক ভালবাসা দিয়ে তার জীবন ভরিয়ে দিব।

গল্পের এই পর্যায়ে মেয়েটির নাম আমি হাঁপানি রাখলাম। গল্প কন্টিনিউ করতে গেলে তো একটা নাম তো দরকার।

কয়েকদিন হাঁপানির সাথে আমার কথা হয় না। ফোন করলে ফোন ধরে না। একদিন ফোন করলে হাঁপানির বাবা ফোন রিসিভ করল। আমি ফোন রেখে দিতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু শ্বশুরের জেরাতে রাখতে পারলাম না। উল্টা ঝাড়ি, ধমক এবং পা ভেঙ্গে হাতে ধরে দেওয়ার হুমকি খেলাম। কিন্তু মেয়ের হবু জামাই হিসেবে নিজের ভিতরে একটা অধিকার এবং দায়িত্ব জন্ম নিয়েছে। তাই কিছু বললাম না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোন রেখে দিলাম শ্বশুরের অনিচ্ছা সত্ত্বেও। তারপর থেকে শ্বশুরের সাথে শুরু হল আমার চরম শত্রুতা। আমার ব্যাপারে খোঁজ খবরও নিলেন তিনি। তখন আমি অলরেডি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে গেছি।

শ্বশুরের সাথে শত্রুতার সাথে হাঁপানির সাথে প্রেমটাও ভালো করে জমে উঠেছিল। বেশ একটা সুখস্বপ্নের মধ্যেই দিন কাটছিল। কিন্তু হঠাৎ করে একদিন একবন্ধু ফোন করে জানালো হাঁপানি পালিয়ে গেছে অন্য একটা ছেলের সাথে। কিছুই বুঝলাম না। এটা হতেই পারেনা। কিন্তু এটা ঘটেছিল। কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না হাঁপানি এমন একটা কাজ কিভাবে করতে পারে। হাঁপানি আমাকে ঠকিয়েছে।

কয়েকদিন বেশ কষ্টে কাটল। একদিন শ্বশুরকে ফোন করলাম। শ্বশুর আর আমার কষ্ট এখানে এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। ফোনে কোন কথা হল না। তিনি শুধু কয়েকবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। মনে হল তাঁরও হাঁপানি রোগ হয়ে গেছে। আমিও একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম।

এবং আরও একবার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সিদ্ধান্ত নিলাম আর কখনো প্রেম করবো না। কিন্তু তাই হয় নাকি?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

46 − 41 =