মুজিবনগর সরকারের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় অসাধারন অবদান

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের ঘোষণা অনুযায়ী ১৭ এপ্রিল তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্গত মেহেরপুর মহকুমা (বর্তমানে মেহেরপুর জেলা) সদর থানার বৈদ্যনাথতলার আম্রকানন ‘মুজিবনগরে’ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়। ঘোষণা অনুযায়ী এটি ছিল স্বাধীন গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের বিপ্লবী সরকার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা ছিল গৌরবোজ্জ্বল।

১) পাক বাহিনী যখন দেশের অভ্যন্তরে ছাত্র যুবকদের উপর পাশবিক অত্যাচার চালাচ্ছিল তখন ‘মুজিবনগর সরকার’ গঠিত হওয়ায় তারা আশান্বিত হয়ে উঠে এবং দলে দলে তারা ভারত এবং বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলে চলে যায়।

২) মুজিবনগর সরকার মুক্তাঞ্চলে এবং বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় এলাকায় যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে। এখানে তাদেরকে সামরিক ট্রেনিং দেয়া হয়। পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ভারতীয় বাহিনী এবং বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্বারা উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।

৩) মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশকে ১১ টি সেক্টরে বিভক্ত করে যুদ্ধ পরিচালনায় সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দেয়। মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালিত করা, মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ঠিক রাখা এবং বিভিন্ন সেক্টর ও গেরিলা বাহিনীর সমন্বয় সাধনের দায়িত্ব মুজিবনগর সরকার নিষ্ঠার সাথে পালন করেছিল।

৪) স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনাকে অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য মুজিবনগর সরকার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকার মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালায়। স্বাধীন বাংলা দেশাত্মবোধক গানগুলো এবং চরমপত্র অনুষ্ঠানটি মুক্তিযোদ্ধা ও জনগণকে উদীপ্ত করে তুলেছিল।

৫) মুজিবনগর সরকার নানা প্রতিকুল অবস্থা সত্ত্বেও একটি বেসামরিক প্রশাসন গড়ে তুলেছিল। বেসামরিক প্রশাসন আইন শৃঙ্খলা রক্ষার ভূমিকা পালন করে।

৬) স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা, লক্ষ্য, পাক বাহিনীর হিংস্রতা ও গণহত্যা, মুক্তিবাহিনীর সাফল্য ইত্যাদি বহির্বিশ্বে প্রচার করে জনমত সৃষ্টিতে মুজিবনগর সরকার প্রদক্ষেপ গ্রহন করেছিল।

৭) মুজিবনগর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যভার গ্রহন করার পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সর্বাত্মক রূপ দেওয়ার মানসে ভারত ও রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগের সেতুবন্ধন সৃষ্টি করে।

সর্বশেষে বলা যায় যে, মুক্তিযুদ্ধকে গতিময় ও সুসংহত করা, ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী লক্ষ লক্ষ বাঙালী দেখাশোনা করা এবং বহির্বিশ্বে বাঙালী জাতির ভাবমূর্তিকে তুলে ধরার জন্য মুজিবনগর বিপ্লবী সরকার গঠন করা হয়। এ সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মুক্তিসেনারা তাদের প্রানশক্তি ফিরে পায় এবং বীরবিক্রমে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

লেখকঃ খোরশেদ আলম, বিশিষ্ট কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

32 + = 34