বাংলাদেশ ব্যাংকে জোচ্চুরি এবং অতঃপর

ক’দিন ধরে বেশ শোরগোল শুনছি সারা বাংলাদেশ জুড়ে। সবখানে হৈচৈ আর নানা কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে, যদিও আমরা কানাডায় বসে বসে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছি। কোন আওয়াজ তুলিনি। হ্যাঁ, কানাডা বা আমেরিকাসহ পৃথিবীর অন্যান্য বহুদেশে এটিএম বুথে জালিয়াতির ঘটনা কিন্তু নতুন না হলেও বাংলাদেশের এটিএম বুথে যে জালিয়াতির ঘটনায় বেশ ক’জন বিদেশিসহ দেশিয় চক্রের ঘটনা আমাদের নজরে এসেছে! বর্তমান এই সাইবার যুগে কানাডার মতো দেশেও আমি কিংবা আমার বড়ো ছেলেরও ব্যাঙ্ক থেকে ডলার লুটপাট হয়ে গেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু আমি নই, আমার কিছু বন্ধুবান্ধবদেরও এটিএম বুথ বো একাউন্ট থেকে বেশ ডলার লুটপাট হয়ে গেছে। তবে আমাদের একটা সৌভাগ্য যে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ গোপনভাবে তদন্ত করে আমাদের খোয়া টাকাপয়সা ২/৩ মাসের মধ্যেই আবার ফেরৎ দিয়েছে। এসব দেশে কিন্তু একটা জবাবদিহিতার ব্যবস্থা আছে বলেই আমরা বেঁচে যাই আর কি। শুনেছি, বাংলাদেশ ব্যাঙ্কগুলোও নাকি গ্রাহকদের খোয়া যাওয়া টাকা-পয়সা পরিপূর্ণভাবে আবার গ্রাহকদের ফেরৎ দিতে সম্মত হয়েছে ইহাতেই প্রাণরক্ষ!

কিন্তু বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে কিংবা তার আগেও অনেক বড়ো বড়ো ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনা কিন্তু সারা বিশ্বে একটা আলোড়ন তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, হলমার্ক কেলেঙ্কারী, ব্যাসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারী, সোনালী ব্যাঙ্কে আর্থিক কেলেঙ্কারী এমন কি ডেস্টিনি গ্রুপেও ও ব্যাপক টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। সব যেন একই সূত্র আর লাল সূতোয় যেন সবকিছু মোড়া! বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এই দেশে একটা প্রতিষ্ঠিত সরকার থাকতে কিভাবে এসব দুর্নীতিবাজরা হরিলুটের মতো বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওলিয়া বানিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণের কাছে ইহাই এখন চরম প্রশ্ন? আমি মাননীয় প্রধামন্ত্রীর সততা নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের কোন কথা এই আলোচনায় আনছি না। কিন্তু তাঁর মতো এত দেশদরদী ও দেশপ্রেমিক প্রধানমন্ত্রীর আমলে কিভাবে যে দুষ্কৃতিকারীরা এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে তা মোটেও মেনে নিতে পারছি না। যদিও তিনি কোন দুর্নীতিবাজকেই তাঁর শাসনামলে রেহাই দিচ্ছেন না। আমরাতো এর আগে জিয়ার আমলকে দেখেছি, এরশাদের আমলকে দেখেছি আর ও দেখেছি বেগম খালেদা জিয়ার আমলকেও! দেখেছি, খালেদার আমলে বিদ্যুৎবিহীন খাম্বা, হাওয়া ভবন করে চাঁদাবাজি ও জোরপূর্বক চাঁদা আদায় এবং সেইসাথে তারেকের অন্যায্য সামন্তরিক সরকার পরিচালনার খবর আর বিএনপি সরকারের মন্ত্রী কিংবা নেতানেত্রীদের সারা দেশটাকে লুটপাটের চারণভূমি বানিয়ে হাজার হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে খাওয়া এসবতো বাংলাদেশের সবারই জানা ঘটনা।

তাই দেখি, বিএনপি নামক এই রাজনৈতিক দলে এমন কোন ব্যক্তিত্ব নেই যাঁরা নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারে বিপরীতে এটা অন্য ইন্টেরিম সরকারে ব্যবস্থার প্রস্তাব করতে পারে না তাদের কাছ থেকে জনগণ আর কি আশা করতে পারে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে পাগল আর শিশুদের সরকার বলে আখ্যায়িত করেছিলেন তিনি তার বিএনপি দলই সেই বিলুপ্ত সরকারের পুনর্বহাল চাচ্ছেন এসবতো দেশের জন্য গণতন্ত্র নয় বরং কিভাবে ক্ষমতায় আরোহন করা যায়, তারই প্রকৃত পদক্ষেপ মাত্র। সেই যাই হোক, পাটাপুতোয় ঘষাঘষিতে ৯২ দিন যাবৎ দেশের জনসাধারণ যে আগুন সন্ত্রাস, পেট্রোলবোমা ও জ্বালাও পোড়াও অভিযানে যে চরম বর্বরতার শিকার হয়েছিলো, তা অনেকদিন যাবৎ ১৬ কোটি মানুষের মনে থাকবে। সাবাস বিএনপি-জামায়াত আর তাদের উর্বর মস্তিষ্কের অনুর্বর চিন্তাধারার দেশপ্রেমের ফসল। কিন্তু এখন দেখছি শর্ষফুলের মধ্যেও ভুত লুকানো আছে। আওয়ামী লীগ, নব্য আওয়ামী লীগ কিংবা সুবিধাভোগী কিছু আওয়ামী লীগ নামধারী লোক, সংগঠন ও নেতানেত্রীর মধ্যেও যে লোভলালসা নেই তা কিছুতেই বলা যাবে না। কারণ কেবল একটাই, তা হলো বিভিন্ন দল ও উপদেলে বিভক্ত থাকলেও আমরা বাঙালি এবং সব রসুনের কোঁয়া একটি মুড়িতে আবদ্ধ তা যাবে কোথায়? তাইতো দেখি আগে, ছাত্রলীগ, যুবলীগ অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোর মাঝে যে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেণ্ডারবাজির মহোৎসব চলতো, সারাদেশে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করায় অন্তত কিছুটা হলেও তার রেশ কমেছে! তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা জনাব সজীব ওয়াজেদ জয়কে অনেক অনেক অভিনন্দন!

সেসব কথা এখন থাক, আমি যে কারণে আজ কলম ধরেছি তার প্রসঙ্গেই আসি। তাহলো বাংলাদেশের অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু ও দেশের সকল সরকারী বেসরকারী ব্যাঙ্কগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী ব্যাংক বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রসঙ্গে। উল্লেখ্য যে, গত ৫ই ফেব্রুয়ারী যুক্তরাষ্ট্রের রিজার্ভ ব্যাংকে গচ্ছিত বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা হতে আধুনিক পদ্ধতির সূক্ষ্ম কারচুপির মাধ্যমে একশত ১ মিলিয়ন ডলার লোপাট হওয়ার দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা।

আমার মতে, ইহা কেবল দুঃসাহসিক হ্যাকাদের হ্যাকিং নয়, এই জুচ্চুরির সাথে আমাদের দেশি-বিদেশি আইটি প্রফেশনালরা যে জড়িত নয়, ইহা কোনক্রমেই বলা যাবে না। কথায় আছে, ঘরের শত্রু বিভীষণ। ইহা মহাভারতের একটা কাব্যিক উপমা হলেও কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এই প্রবাদ ১০০% অনেকক্ষেত্রে সত্য হয়! আমি নির্বধায় ও অবলীলাক্রমে বলতে পারি যে দেশিয় চক্রের “ধরি মাছ না ছুঁই পানি” এইভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংক ও অন্যান্য সহযোগিদের কালোহাত ছাড়া ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার কোন হ্যাকারের বাপের সাধ্য নেই যে এহেন দুষ্কর্ম তারা সাধন করতে পারে।

ইহা কিন্তু এক অঘটনঘটন সাহসিকতার পরিচয় বটে। ইহা কেবল বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকে হানা নয়, স্বয়ং বাংলাদেশ অর্থনীতির বিরুদ্ধে একটা অসমযুদ্ধ ঘোষণা করা বৈ আর কিছুই নয়! ভাগ্যিস ৩৫টা সুইফট কোড পাঠালেও তারা মাত্র ৫টি সুইফট কোড ভাউচার ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে মাত্র। ইহা শুধু বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য নয়, শ্রীলঙ্কা এবং বিশেষ করে ফিলিপাইন জাতি ও দেশের জন্য বেশ কলঙ্কও বটে! আমরা যারা বিদেশে আছি অথবা যারা এই ঘটনাপ্রবাহ সম্পরকে সম্যক জানে, শ্রীলঙ্কা কিংবা ফিলিপাইন জাতিকে কিন্তু মন থেকে অনেকেই ঘৃণার চক্ষে দেখছে।

আমাদের প্রবাসীদের মতে সারা বাংলাদেশ ব্যাংকে এখন সবকিছু হিসাব নিকাশের একটা “Thoroughly Investigation” অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর যারা যারা এই কারচুপি ও কারসাজির সাথে জড়িত তাদের সবারই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, তিনি যেই পদবী বা পদমর্যাদার লোকই হোক না কেন!

আর বিশেষ করে শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনে যারা এই জোচ্চুরির সাথে জড়িত আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল গঠন করে এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করতে হবে। তাহলে ইহার একটা সুরাহা হতে পারে। আমাদেরতো সন্দেহ হয় এই চুরি অঘটন ঘটানোর পেছনে কোন কোন শক্তিধর রাষ্ট্র জড়িত কিনা তা জনসাধারণকে অকুতোভয়ে সরকারকে জানাতে হবে যাতে ভবি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “বাংলাদেশ ব্যাংকে জোচ্চুরি এবং অতঃপর

  1. ধন্যবাদ লেখাটির জন্য। সহমত।
    ধন্যবাদ লেখাটির জন্য। সহমত। আমাদের প্রবাসীদের মতে সারা বাংলাদেশ ব্যাংকে এখন সবকিছু হিসাব নিকাশের একটা “Thoroughly Investigation” অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর যারা যারা এই কারচুপি ও কারসাজির সাথে জড়িত তাদের সবারই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, তিনি যেই পদবী বা পদমর্যাদার লোকই হোক না কেন!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 7 =