ব্লগার খুন: প্রগতির এক চরম অন্তরায়

ব্লগার মানেই যে ইসলাম বিরোধী অথবা নাস্তিক এই ধারণা থেকে অনেককেই সরিয়ে আনা গেল না। অনেককেই বোঝানো গেল না যে, শুধু প্রগতিবাদীরাই ব্লগার নন, অনেক ইসলামী চিন্তাবিদরাও ব্লগার আছেন। তারপরেও কেন শুধু প্রগতিপন্থী ব্লগাররা খুন হচ্ছেন? বিষয়টি এতদিন হালকাভাবে নিলেও এখন আর এইসব অনাকাঙ্খিত খুনগুলোকে স্বাভাবিকভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। একটি স্বাধীন দেশের জন্যে, একটি জাতির জন্যে বিষয়টি নিদারুণ পরিতাপের ও লজ্জার। সরকারের এবং সরকারের প্রশাসনিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এটি ভয়ানক সমালোচনার। লিখলে মানুষকে মরে যেতে হয় সহজেই, এই প্রক্রিয়াটি এখন পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে সক্রিয় পন্থা।

মানুষের বাকস্বাধীনতা ও লেখনি সত্ত্বার স্বাধীনতা হরণের চরম দৃষ্টান্তে বাংলাদেশ আজ উপণীত হয়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে মুক্তপ্রাণ-মুক্তমনা মানুষদের হত্যা করা হচ্ছে। কি এক বিভৎস দর্শনের খেলায় ক্রমাগত নিমজ্জিত হচ্ছে প্রিয় এই মাতভূমি। সেই দর্শন হচ্ছে প্রগতিপন্থী ব্লগার হচ্ছেন নাস্তিক, তাদেরকে খুন করলে বেহেস্ত নসীব হয়। কতিপয় কুলাঙ্গার পরকালে বেহেস্ত পাবার আশায় নির্বিঘে খুন করছে তারই ভাইকে।

ইসলাম ধর্মের কোথাও বেহেস্ত লাভের আশায় মানুষ খুন করা যায়, এই বক্তব্য ও বাণী সমর্থন করে না। এমনকি পৃথিবীর কোনো ধর্মই এই নীতি গ্রহণ করে না। টনক নড়ছে না কারো। বাংলাদেশ সহসাই সবকিছু ভুলে যায়। প্রখ্যাত শিক্ষক-সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদের হত্যাকা- আমরা ভুলে গেছি। আর যারপরনায় পরবর্তীতে একের পর এক ব্লগার রাজিব হায়দার, অভিজিৎ রায় ও অতি সম্প্রতি ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে খুন হতে দেখলাম। আমরা কি প্রকৃতপক্ষে এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম? একটি দেশের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র-গঠনতন্ত্র-ভাবনা কি এই ছিল? বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চেতনায়-ভাবনায়-দর্শনে-মননে কি এই বাংলাদেশ ছিল।

কতিপয় দেশবিরোধী উচ্ছিষ্ট-ম্লেচ্ছ-ধর্মান্ধ-জঙ্গি দেশটাকে প্রতিনিয়ত বিষদাতে আর বিষাক্ত নখরাঘাতে ছিড়েখুড়ে খাচ্ছে, একাকার করে দিচ্ছে আর আমরা প্রতিনিয়ত তা নির্বোধ কাপুরুষের মতো অবলোকন করছি। কোনো কথা নেই, কোনো প্রতিবাদ নেই, কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই। তাহলে কি সমাজে ঘুণ ধরেছে, একটি স্বাধীন সমাজ ব্যবস্থায় পরাজিত পাকিরা স্থায়ী শিকড় গেড়ে বসেছে। মানুষ আজ কাঁদতে ভুলে গেছে, ভুলে গেছে ভালোবাসা, ভুলেছে প্রতিবাদের দিন। বিবেকের জায়গা থেকে সরে এসেছি আমরা, হয়ে গেছি বিবেকবর্জিত। নইলে সামান্য কিছু ধর্মান্ধের হাতে কি করে একটি প্রগতিবাদী দেশ ধরা পড়ে।

আমরা কেন, আমাদের সরকার বাহাদুররাও ভুলে যান যে, মৌলবাদীরা তাদের কর্মকা- এখনো চূড়ান্তভাবে অব্যাহত রেখেছে। তারা তাদের প্রক্রিয়ায় শুধু পরিবর্তন এনেছে। এটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার কিছু নেই। পেট্টোল বোমা পর্ব আপাতত মৌলবাদীরা থামিয়ে রেখে মুক্তচিন্তার মানুষগুলোকে হত্যার খেলায় লিপ্ত হয়েছে।

এই কথাটি আমাদের বারবার সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে কেন যে, একটি জাতিকে ধ্বংস করতে হলে প্রথমে তার বুদ্ধি-মেধাকে শেষ করে দিতে হবে। এটাতো এদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রাক্কালে ঘটেছিল বিবেকী শিল্পী বুদ্ধিজীবীদের করুণ-নির্মম হত্যার মধ্য দিয়ে। বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের পক্ষে, সত্য-ন্যায়ের পক্ষে এক শ্রেণির তরুণ বুদ্ধিজীবীরা-তাত্ত্বিকরা কাজ করে যাচ্ছেন, সেটিও জঙ্গিবাদীদের এক চরম গাত্রদাহ। একথা শাসনব্যবস্থায় থাকা মানুষগুলোকে বোঝাই কি করে! আর তাছাড়া আমরা যদি ধরে নেই যে ব্লগাররা নাস্তিক, তাহলেই বা তাকে কোন আইনে প্রকাশ্যে হত্যা করা যায়। জঙ্গিবাদী-মৌলবাদী তৎপরতা বাংলাদেশে নতুন নয়। এটি আওয়ামীলীগ সরকারের জন্য চরম এক হতাশার এবং বিব্রতকর।

মানূষ এই সরকারকে অন্যভাবে জানে, প্রত্যাশাটাও তাদের কাছে একটু বেশি, বিশেষত যারা মুক্তচিন্তার মানুষ তাদের। কিন্তু আমরা খুব হতাশ হই, নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রই কি করে মাঝে মাঝেই বিবেকবান মানুষগুলো খুন হয়ে যায়। এইসব খুন-হত্যার পিছনের ইতিহাস আসলে আমাদের কারো অজানা নয়। তারপরেও তার কোনো প্রতিকার নেই কেন? আমরা জানি যে একটি অন্ধগোষ্ঠী এদেশে অন্ধকার ক্ষমতার স্বপ্ন দেখে। আর সেই স্বপ্নে যারা ব্যাঘাত ঘটায় তারা হয়ে যায় তাদের চক্ষশূল। এসবতো নতুন কথা নয়। কিন্তু ঘুম আমাদের ভাঙছেনা কোনোক্রমেই। সামাজিক নিরাপত্তাটুকু মানুষের বড় বেশি প্রয়োজন এখন।

মানুষ প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন জীবনযাপনে বিশ্বাসী, সেতো জানোয়ার নয় যে সবকিছু মুখ বুজে সয়ে যাবে, রয়ে যাবে। স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করা, প্রকাশ করা এখানে এখন ভীষণ দুষ্কর হয়ে পড়েছে। স্বাধীন সত্ত্বার বুকে ছুরিকাঘাত করে একটি জাতির মেধাশক্তিকে স্তব্ধ করে দিতে চায় সেই পুরনো শকুন। আমাদের তাহলে কাজ কি, সরকারের তাহলে কাজ কি? সামান্য কিছু জন্তু খেয়ে যায় আমাদের সোনার ফসল, আমরা অপলক তা চেয়ে চেয়ে দেখি। এই হতভাগ্য আমাদের দেখা এ এক নিদারুণ ক্ষতি বয়ে নিয়ে আসবে আমাদের বাংলাদেশে।

সত্য কথা লিখলে, সত্যের পক্ষে দাঁড়ালে যদি মৃত্যু হয় তাহলে মানুষ বা সেইসব বিবেকী জাতিগোষ্ঠী কেন আপনাদের পক্ষে দাঁড়াবে। আপনি শুধু গ্রহণ করবেন তাদের বুদ্ধি কিন্তু দেবেন না নিরাপত্তা, জোগাবেন না সাহস তা কি করে হয়। স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষেত্রে বিস্ময়করভাবে ব্লগার হত্যা দিনদিন বাড়ছে, প্রগতির পথে, সরকারের শাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এ এক চরম বিপর্যয় ও অন্তরায়। আশার কথা যা তাহলো ব্লগার ওয়াশিকুরের খুনীদের সাথে সাথে ধরা সম্ভব হয়েছে। এটি বেশ ভালো বিষয়।

এখন যে কাজ তাহলো এসব জঙ্গিবাদী, মানুষ হত্যাকারীদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং অবশ্যই ফাঁসি কার্যকর করতে হবে। তানাহলে এরা, এই অন্ধরা থামবে না। থামবে না তাদের নর্তন-কুর্তন। এদেরকে এই অশুভ শক্তিদের এখনই থামাতে হবে। নইলে দেশের ভয়াবহ বিপর্যয়ের পথে এইসব কুপমণ্ডূকেরা জয়ী হবে। একজন ব্লগারকে-মানুষকে হত্যা করা যায় কিন্তু তার চেতনাকে কিভাবে জঙ্গিরা শেষ করবে। তা করা যায় না। বুদ্ধির মুক্তির আন্দোলনের যে সমস্ত নব্য সৈনিক তারা এখন মৌলবাদীদের প্রধান টার্গেট। এরা ভবিষ্যৎ আওয়ামীলীগের বিবেকী চরিত্র হয়ে কাজ করবে, সেটাও ধর্মান্ধদের কাছে এক বড় বিবেচ্য বিষয়। অসংখ্য মানুষকে খুন করে, মুক্তমনা মানুষদের খুন করে ক্ষমতায় যেতে চায় সেই হায়েনার দল। আমাদের যেমন বিষয়টিকে দৃঢ়চিত্তে ভাবতে হবে, তেমনি এইসব পরাজিত শক্তিদের রুখে দিতে বর্তমান সরকারকে আরো কঠোর ভূমিকায় যেতে হবে।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “ব্লগার খুন: প্রগতির এক চরম অন্তরায়

  1. একমত। সত্য কথা লিখলে, সত্যের
    একমত। সত্য কথা লিখলে, সত্যের পক্ষে দাঁড়ালে যদি মৃত্যু হয় তাহলে মানুষ বা সেইসব বিবেকী জাতিগোষ্ঠী কেন আপনাদের পক্ষে দাঁড়াবে। আপনি শুধু গ্রহণ করবেন তাদের বুদ্ধি কিন্তু দেবেন না নিরাপত্তা, জোগাবেন না সাহস তা কি করে হয়। স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষেত্রে বিস্ময়করভাবে ব্লগার হত্যা দিনদিন বাড়ছে, প্রগতির পথে, সরকারের শাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এ এক চরম বিপর্যয় ও অন্তরায়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 1