তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার সংস্কার করা অতি জরুরী


তথ্য ও প্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর ৫৭ (১) ধারাতে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাটে বা অন্যকোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করে যা মিথ্যা ও অশ্লীল যার দ্বারা কারো মানহানি ঘটে বা ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় আর এ ধরনের তথ্যগুলোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হলে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান আছে।

অধিকিন্তু পর্নোগ্রাফি আইন ২০১২ এ আছে, কোন ব্যক্তি ইন্টারনেট বা ওয়েবসাইট বা মোবাইল ফোন বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি সরবরাহ করলে, তিনি এ ধরণের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ৫ (পাঁচ) বৎসর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২,০০,০০০ (দুই লক্ষ) টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

তথ্য ও প্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর সংশোধনী তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০১৩, জনগণের মৌলিক মানবাধিকার এবং বাক স্বাধীনতা হরণ করবে বলে অনেক আইন বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকারকর্মী আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এর মাধ্যমে অনলাইনে, ওয়েবসাইট, ফেইসবুকে এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে স্বাধীন মত প্রকাশ এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চা বাধাগ্রস্ত হবে মারাত্মকভাবে, কেননা মতামত প্রদানকারীকে সর্বদা তাড়া করে ফিরবে তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের এই ৫৭ ধারা।

পক্ষান্তরে, সরকারের ভাষ্যমতে, সাইবার অপরাধ দমন করাই এ আইনের মূল লক্ষ্য; অযথা কোন নাগরিককে হয়রানি করা নয়। কোন প্রকাশ বা সম্প্রচার ‘মিথ্যা ও অশ্লীল’ ছিল বলে যদি বাদীপক্ষ তা প্রমাণ করতে না পারেন, তাহলে মামলা হারিজ হয়ে যাবে এবং স্বভাবতই বিবাদী খালাস পেয়ে যাবে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (সংশোধন) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে এমন কিছু প্রচার করে, যা মিথ্যা ও অশ্লীল, যা রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে, কোন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে, এমন অপরাধের শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৪ বছর এবং সর্বনিম্ন ৭ বছরের কারাদণ্ড হবে। পূর্বের আইনে সর্বোচ্চ সাজা কারাদণ্ড ছিল ১০ বছর।

যা হোক, মানহানি এমন এক ধরনের ধরনের অপরাধ যে এর বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও দেওয়ানি উভয় প্রকারের হতে পারে যা প্রচলিত আইনেই সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত রয়েছে।

ফৌজদারি আদালতে মানহানি মামলা হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি কারাদণ্ড কিংবা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। পক্ষান্তরে, দেওয়ানি আদালতে মামলা হলে এবং সেই মামলায় বাদি জয়ী হলে বিবাদী থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে অর্থ আদায় করতে পারেন।

বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারা অনুসারে যে ব্যক্তি মানহানির উদ্দেশ্যে বা মানহানিকর জেনে বা পাঠের জন্য উদ্দেশ্যমূলক শব্দাবলি বা চিহ্নাদি বা দৃশ্যমান কল্পস্মৃতির সাহায্যে কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে এমনভাবে কোনো নিন্দাবাদ প্রণয়ন বা প্রকাশ করে যে, সেই নিন্দাবাদ উক্ত ব্যক্তির সুনাম নষ্ট করবে, সেই ব্যক্তি কিছু ব্যতিক্রম অবস্থা ছাড়া উক্ত ব্যক্তির মানহানি করেছে বলে ধরা হবে।

তবে বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে এমন কিছু ব্যতিক্রম অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে, যখন কোনো ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির নামে মানহানিকর কিছু বললে, লিখলে বা প্রচার করলেও দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার অধীনে মানহানির অভিযোগে অভিযুক্ত হতে হবে না। যেমন-
১) জনগণের কল্যাণার্থে কারো প্রতি সত্য দোষারোপ করলে, তাতে মানহানি হবে না।
২) জনগণের প্রতি সরকারি কর্মচারীর আচরণ সম্পর্কে সৎ বিশ্বাসে অভিমত প্রকাশ করলে তা মানহানির শামিল হবে না।
৩) আদালতসমূহের কার্যবিবরণী প্রতিবেদন প্রকাশ করা মানহানির অন্তর্ভুক্ত হবে না।
৪) যে কোনো জনসমস্যা সম্পর্কে কোনো ব্যক্তির আচরণ সম্পর্কে সৎবিশ্বাসে অভিমত প্রকশ করা মানহানির শামিল নয়।
৫) আদালতে সিদ্ধান্তকৃত মামলার দোষ, গুণ বা সাক্ষীদের সম্পর্কে বা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণ সম্পর্কে অভিমত মানহানির পর্যায়ে পড়বে না।
৬) গণঅনুষ্ঠানের অনুষ্ঠানাবলি সম্পর্কে কোনো মতামত প্রদান মানহানি নয়।
৭) কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে সৎবিশ্বাসে কারো সম্পর্কে অভিযোগ করা হলে সেটিও মানহানি হবে না। যেমন- পুলিশের কাছে কারো ব্যাপারে সৎ বিশ্বাসে অভিযোগ।
৮) কোনো ব্যক্তি কর্তৃক তার বা অন্য কারো স্বার্থ রক্ষার্থে দোষারোপ করা মানহানি নয়।
৯) গণকল্যাণার্থে সতর্কতা প্রদানের উদ্দেশ্যে কারো সম্পর্কে কিছু বলা হলে, সেটিও মানহানি হবে না।

বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৫০০ ধারায় মানহানির শাস্তি বর্ণনায় বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে তার দুই বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড উভয়বিধ দণ্ড হতে পারে। ৫০১ ও ৫০২ ধারা অনুসারে, মানহানিকর বলে পরিচিত বিষয় মুদ্রণ বা খোদাইকরণ সম্পর্কে এবং এর শাস্তি বর্ণিত হয়েছে। ৫০১ এবং ৫০২ ধারায় অপরাধী ব্যক্তি দুই বছর পর্যন্ত যেকোন মেয়াদের বিনাশ্রম কারাদণ্ডে, অথবা জরিমানা দণ্ডে, অথবা উভয়বিধ দণ্ডেই দণ্ডিত হতে পারেন।

মানহানির মামলার বিষয়টি এখন দুই আইনে দুই ধরণের বিধান বর্ণিত রয়েছে। তথ্য ও প্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর সংশোধনী ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০১৩’ এবং বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার অপরাধের সাজাও দুই রকম। তবে তথ্য ও প্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর সংশোধনী ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০১৩ এ কঠোর সাজার বিধান রাখা হলেও সুস্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে অপরাধীরা যা প্রকাশ বা সম্প্রচার করে তা ‘মিথ্যা ও অশ্লীল’ তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া যাবে কিন্তু যা ‘সত্য ও শালীন’ তার বিরুদ্ধে নয়।

পক্ষান্তরে, সাম্প্রতিক সময়ে তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের এই ৫৭ ধারা অনেক তর্ক ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এ ধারাটির যেমন কোন বিধিমালা নেই, সুনির্দিষ্টভাবে ধারাটি সংজ্ঞায়িত করা হয়নি; ঠিক তেমনি এর প্রয়োগ নিয়েও রয়েছে অনেক অস্পষ্টতা। ধারাটি বাংলাদেশের নাগরিকদের মহান সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত মৌলিক অধিকারসমূহের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে সাংঘরসিক। যখনই কোন আইন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আইন মহান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘরসিক হবে তখনই এই আইনটি বাতিল বলে গণ্য হবে। এ দৃষ্টিকোন থেকে ৫৭ ধারা বাতিল করার জন্যও সাধারণ জনগণ এবং বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে জোর দাবী উঠেছে।

যদিও তথ্য ও প্রযুক্তি আইনে, মানহানি মামলায় বিবাদি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে, তার প্রকাশ বা সম্প্রচার সত্য তাহলে তিনি স্বভাবতই মামলা থেকে খালাস পেয়ে যাবেন বা তার বিরুদ্ধে মামলাই চলবে না; তা স্বত্বেও বিভিন্ন মহল ও সংগঠন থেকে যোক্তিক কারণেই ৫৭ ধারা বাতিলের জন্য সাধারণ জনগণ সোচ্চার হয়ে উঠেছে।

পরিশেষে, বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে আইনমন্ত্রী ইতিমধ্যে আশ্বস্ত করেছেন যে ধারাটি পুনর্বিবেচনা করবেন। তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের বিকল্প, সহনীয় এবং সকল দিকের সামঞ্জস্যতা বজায় রেখে একটি নতুন আইন প্রবর্তনের চিন্তা-ভাবনা করছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ৫৭ ধারার সংস্কারের বিষয়ে এখনও কোন বিশেষ পদক্ষেপ প্রশাসন নেয়নি। তবে সার্বিক বিবেচনায়, লঘু অপরাধের জন্য সাজার বিধান কম রাখাই শ্রেয় বলে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। লঘু পাপের জন্য কখনও গুরুদণ্ড হতে পারে না, থাকা উচিতও নয়।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক
ই-মেইলঃ [email protected]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার সংস্কার করা অতি জরুরী

  1. মানহানির মামলার বিষয়টি এখন
    মানহানির মামলার বিষয়টি এখন দুই আইনে দুই ধরণের বিধান বর্ণিত রয়েছে। তথ্য ও প্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর সংশোধনী ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০১৩’ এবং বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার অপরাধের সাজাও দুই রকম। তবে তথ্য ও প্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর সংশোধনী ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০১৩ এ কঠোর সাজার বিধান রাখা হলেও সুস্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে অপরাধীরা যা প্রকাশ বা সম্প্রচার করে তা ‘মিথ্যা ও অশ্লীল’ তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া যাবে কিন্তু যা ‘সত্য ও শালীন’ তার বিরুদ্ধে নয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 1 =