কোর’আনের নির্দেশ- জোড়ায় জোড়ায় কাট। আহ! কী অমানবিক!

গর্দানে আঘাত কর ও জোড়ায় জোড়ায় কাটো, পাকড়াও কর এবং যেখানে পাও হত্যা কর- কোর’আনের এই আয়াতগুলো পড়ে নাকি এক শ্রেণির মানবতাবাদীর দুঃখে হৃদয় ভেঙ্গে যায়। আহা! মানুষ হত্যার নির্দেশ! তাও কে দিচ্ছে? আল্লাহ। এই কি তবে আল্লাহর দয়া-করুণার নমুনা? আল্লাহ যদি অসীম দয়ালুই হবেন তাহলে মানুষ হত্যার নির্দেশ কেন?
তাদেরকে বলি- ভাই, বঙ্গবন্ধুর ভাষণে ‌’আমরা তোমাদের ভাতে মারব, পানিতে পারব’ লাইনটা শুনে কি আপনার মানবতাবোধে আঘাত লেগেছে কোনোদিন? কিংবা গণজাগরণ মঞ্চ থেকে যখন স্লোগান উঠল- যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে, মানবতা মুছে ফেল টিস্যুতে- সেই সময়? অথবা যখন মিছিল থেকে স্লোগান ভেসে আসে- একটা একটা শিবির ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর, তখন কি দুঃখে আপনার অন্তর ফেটে যেত? পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা কি মানুষ নয়? যুদ্ধাপরাধীরা কি মানুষ নয়? শিবিরের যে পালাপাইনগুলা রগ কাটাকাটি করে বেড়ায় তারা কি মানুষ নয়? অবশ্যই মানুষ। কিন্তু আপনি তাদের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী উত্তেজিত স্লোগান দেওয়াকে অমানবিক মনে করেন না। কারণ, আপনি জানেন তারা অপরাধী। মানুষ তো সবাই। যে হিটলার ষাট লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করল সেও তো মানুষই ছিল, তবু তাকে ঘৃণা করেন কেন? হিটলারের জন্য কখনও আফসোস করেছেন? আহা! একজন মানুষ আত্মহত্যা করে মরে গেল! বলেছেন কখনও?

এই জগতের অনেক সত্য ও সুন্দরের জন্ম দিয়েছে মানুষ, আবার মিথ্যার পক্ষ নিয়ে সত্য ও সুন্দরের বিনাশও করেছে মানুষ। গোড়ায় গেলে দেখা যাবে- মানুষ মূলত দুই ধরনের। এক- সত্যের ধারক, সত্যের পক্ষাবলম্বনকারী; দুই- মিথ্যার পক্ষাবলম্বনকারী। সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব চলে আসছে সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে। এই দ্বন্দ্বে যখন মিথ্যার বিনাশ ঘটিয়ে সত্যের জয় হয়েছে, মানুষ পেয়েছে শান্তি, ন্যায়, নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি। আর যখন সত্যের কণ্ঠরুদ্ধ করে মিথ্যার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তখন মানবজীবন অন্যায়, অবিচার, অশান্তি, অনিরাপত্তায় ছেয়ে গেছে।
সত্য-মিথ্যার এই দ্বন্দ্বে স্রষ্টা কখনই চান না মিথ্যার জয় হোক, মানুষ কষ্ট পাক। কারণ মানুষের ভেতরে তার রূহ আছে। মানুষের কষ্ট তাকে ব্যথিত করে। তাই যখনই মিথ্যার গাঢ় অন্ধকার মানবসমাজকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে তখন তিনি সত্য পাঠিয়ে মানুষকে ন্যায়-অন্যায়ের জ্ঞান দান করেছেন। মানুষের প্রতি করুণা করেছেন। যুগে যুগে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা নবী-রসুলগণ সত্যের ভিত্তিতে বিশুদ্ধপ্রাণ সত্যনিষ্ঠ মানুষগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে মিথ্যার ধারকদের বিনাশ ঘটিয়েছেন। আসলে ওটা বিনাশ নয়, ওটা নবনির্মাণের সূচনা।

নতুন ফসল বুনতে হলে পুরানো ফসল কাটতে হয়, নতুন সভ্যতার সূচনা করতে পুরোনো জরা-জীর্ণ, ব্যর্থ মতবাদের উচ্ধেদ করতে হয়। আর তা করতে গেলেই আঘাত লাগে কোনো না কোনো কায়েমী স্বার্থে। তখন হৈ হৈ রৈ রৈ করে তেড়ে আসে পূর্বের বিকৃত ধর্মমতের ধ্বজাধারী ও সমাজনেতারা। মিথ্যার ধারকরা সর্বশক্তি একত্রিত করে সত্যকে অঙ্কুরেই ধ্বংস করে ফেলতে চায়। করেছেও অনেকবার। কিন্তু যখন আল্রাহ সিদ্ধান্ত নেন তিনি সত্যকে বিজয়ী করবেনই, তখন মিথ্যার ধারকদের মর্মন্তুত শাস্তি দিয়ে হলেও সত্যকে প্রতিষ্ঠা করেন। এই শাস্তি তিনি কখনও নিজ হাতে দেন, যেমন ফেরাউনকে দিয়েছিলেন, কখনও সত্যনিষ্ঠ মু’মিনদের মাধ্যমে দেন, যেমন মোহাম্মদ (সা.) এর অনুসারীদের হাত দিয়ে ক্বাবার ধর্মব্যবসায়ী ফেতনাবাজদের শাস্তি দিয়েছিলেন। মিথ্যার ধারকদের জন্য এটা শাস্তি হলেও সত্যনিষ্ঠদের জন্য এটা করুণা।

আল্লাহ প্রতিহিংসাপরায়ণ নন। যদি প্রতিহিংসাপরায়ণ হতেন তাহলে দুনিয়াতে কোনো নাস্তিক, কোনো পাপাচারি, কোনো আল্লাহদ্রোহী মানুষ নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেত না। তিনি তো কেবল এটুকুই চান যে, মানুষ ন্যায়-অন্যায় বুঝে সঠিক পথে চলে শান্তিতে বসবাস করুক। মানবজাতির এই শান্তির পথে যারা বাধা হয়ে দাড়ায় তারা যেমন মানুষের শত্রু, মানবতার শত্রু, তেমন আল্লাহরও শত্রু। এই শত্রুদের বিনাশ হওয়া উচিত মানুষেরই কল্যাণে। জোড়ায় জোড়ায় যাদেরকে কাটতে বলা হচ্ছে তাদের মধ্যেও কি আল্লাহ রূহ নেই? আছে। তাদেরকে কি আল্লাহ সৃষ্টি করেন নি? করেছেন। তবু আল্লাহ তাদের প্রতি এত নিষ্ঠুর হচ্ছেন, তাদেরকে দণ্ড দিচ্ছেন কারণ এই দণ্ড তাদের প্রাপ্য। ওই লোকগুলো সত্য প্রতিষ্ঠার পথে বাধা হয়ে দাড়িয়ে পড়েছে, তাদেরকে উপেক্ষা করে যদি সত্য প্রতিষ্ঠা করা যেত, শান্তি আনয়ন করা যেত তাহলে তাদের উপেক্ষাই করা হত, কিন্তু তেমন সুযোগ নেই বলেই এই দণ্ড তাদেরকে ভোগ করতে হবে কৃতকর্মের পরিণতিস্বরূপ।

কখনও কখনও এমন সময় আসে যখন দুইটি খারাপের মধ্য থেকে অপেক্ষাকৃত কম খারাপকে বেছে নিতে হয়। ডাক্তারের কাছে যখন গ্যাংরিনের রোগী আসে, ডাক্তার কোনোরূপ চিন্তা-ভাবনা না করে তার অঙ্গ কেটে ফেলেন, নিজের হাতে তাকে পঙ্গু করে ফেলেন তার জীবন বাঁচানোর লক্ষ্যে। সন্তান জন্মদানের সময় যখন এমন সময় আসে যে, বাচ্চার জীবন বাঁচাতে গেলে মা মারা যাবে আর মায়ের জীবন বাঁচালে বাচ্চা মারা যাবে, তখন সিদ্ধান্ত নেয়া হয় মায়ের জীবন বাঁচানোর। বাচ্চার প্রাণহানিকে মেনে নিতে হয় শত অনিচ্ছা সত্ত্বেও। কারণ, এটা কেবল মৃত্যু নয়, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জীবনের সূচনা ঘটানো। যুদ্ধ মানেই রক্ত, যুদ্ধ মানেই ক্রন্দন। কিন্তু প্রেক্ষাপট কখনও কখনও যুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে। তখন নৈতিকতার সংজ্ঞাটাই পরিবর্তিত হয়ে যায়।

উপরোক্ত আয়াতগুলো নাযেলের প্রেক্ষাপট জানতে হবে। জানতে হবে এই নির্দেশ আল্লাহ কাদেরকে দিচ্ছেন? বস্তুত এই নির্দেশ আল্লাহ দিচ্ছেন মদীনায় নবগঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের মুসলিম সেনাদেরকে, যাতে করে তারা অমিততেজে যুদ্ধ করে মক্কার ফেতনা সৃষ্টিকারী কাফের-মুশরিক যোদ্ধাদেরকে পরাজিত করতে পারে এবং তার মাধ্যমে সত্য বিজয়ী হয়। যাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে তাদের অপরাধের ফিরিস্তিটা বিবেচনা করুন এবং মানবতার দোহাই দিয়ে তাদেরকে ছেড়ে দিলে ‘ডু অর ডাই’ অবস্থায় থাকা মদীনায় নবগঠিত ইসলামী রাষ্ট্র কতখানি হুমকির মুখে পড়তে পারত তাও ভেবে দেখুন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “কোর’আনের নির্দেশ- জোড়ায় জোড়ায় কাট। আহ! কী অমানবিক!

  1. খুব সুন্দর পোস্ট। মুহাম্মদ সা
    খুব সুন্দর পোস্ট। মুহাম্মদ সা আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করবার জন্য পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন। মক্কায় তিনি ১৩ বছর শান্তিপুর্ন ভাবে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। বিনিময়ে প্যাগান, মুশরিক, আর কুরায়শরা মুহাম্মদ সা এর উপর অমানবিক অত্যাচার আর অবিচার শুরু করে। তিনি বাধ্য হন মদীনায় হিজরত করতে। তিনি মুশরিক আর প্যাগানদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত না হলে আল্লাহর একত্ববাদ ভিত্তিক ইসলাম ধর্ম আমরা পেতাম না। আজকে কাবা ঘরে আল্লাহর জন্য হজ্জ হতে পারত না। তাছাড়া ইসলাম আর মুসলিম জাতির বৃহত্তর স্বার্থে কিছু কিছু ধর্মত্যাগীদেরকে হত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মানুষকে ক্ষমা করেছেন বহুগুনে বেশী।

  2. এইগুলার প্রেক্ষাপট সহই
    এইগুলার প্রেক্ষাপট সহই ব্যাখ্যা করা হয়েছে।আপনি কি পড়তে চান। লিঙ্ক দিব? Bored হবেন না তো?

    মূলধারার ইসলাম কে যারা সমর্থন করে, ইমাম, আলেম, বড় বড় ইসলামিক স্কলার তারা যেটা বলবে, সেটা ঠিক না আপনার মত সহনশীল একজন মানুষ যেটা বলবে, সেটা ঠিক? ইসলাম কে আপনি বা হাবশী ভাই represent করেন নাকি সেই সমস্ত fundamentalist স্কলাররা represent করেন?

    দেখেন ভাই, আইসিস, বোকো হারাম, তালেবান এরা কিন্ত কুরআন মেনেই চলে, আরবী এদের মাতৃভাষা। আপনার/আমার/হাবশী ভাই/আমাদের সকলের থেকে কুরআন এরা অনেক অনেক বেশী ভালো বুঝে। কারন কি? কারন, তারা আরবী ভাষায় কোরআন পড়ে। যে আরবী ভাষা তাদের মায়ের ভাষা।

    কুরআন এই সমস্ত ভয়ংকর নির্দেশনামা খুব নির্দিষ্ট ভাবেই বলা আছে এবং সেগুলার বিস্তৃত আছে হাদিস শরীফ এ। তাফসির/প্রেক্ষাপট জানবার জন্য তারা হাদিস কেই অনুসরন করে। আপনি যতই defending logic দিন না কেন, এই কথা ওদের সামনে বললে ওরাই আপনাকে মুরতাদ বলবে। কারন আরবী ওদের ভাষা, কোরআন ওদের অন্তস্থ। ওরা বলবে আপনি কোরআন বুঝেন নাই।

  3. মহান আল্যাপাকের সাথে
    মহান আল্যাপাকের সাথে বঙ্গবন্ধুর তুলনা। হায়রে পাগল, ঘিলু থাকলে ইমান থাকার তো কথা না।

    যাউকগা, যিনি সর্বশক্তিমান, সমস্ত মহাবিশ্ব এক কথায় সৃষ্টি করে ফেলেন, যিনি সকল মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তিনি আবার কিছু মানুষকে নির্দেশ দিচ্ছেন কিছু মানুষকে জোড়ায় জোড়ায় খুন করতে, গর্দানে আঘাত করতে। এটা কি সম্ভব? আপনার বিবেক কী বলে? অবশ্য ইমান যুক্তিবোধ ধ্বংস করে ফেলে।

    এ রকম আয়াত পাওয়ার পরও যদি কোরানকে আল্যার বানী বলে বিশ্বাস করতে থাকেন তবে ঠিক কোন জিনিসটা পেলে একে অবিশ্বাস করবেন? এর চেয়ে জঘন্য আর কী আছে?

  4. খুব যৌক্তিক ও বাস্তববাদী লেখা
    খুব যৌক্তিক ও বাস্তববাদী লেখা ।

    উপরোক্ত আয়াতগুলো নাযেলের প্রেক্ষাপট জানতে হবে। জানতে হবে এই নির্দেশ আল্লাহ কাদেরকে দিচ্ছেন?

    এটা যেমন জানতে হবে ইসলামবিদ্বেষীদের, তেমনি জানতে হবে ধর্মের নামে যারা সন্ত্রাসবাদ করছে ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

41 − = 35