মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী

আল-কোরআন মানব জাতির শান্তির জন্য প্রেরিত সার্বজনীন বিধান। কোন মুসলিম নিজ ধর্ম ত্যাগ করে নাস্তিক হয়ে গেলে বা ধর্মান্তরিত হয়ে অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ করলে তাকে ‘মুরতাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কোন মানুষ নিজেকে নিজে ধর্মত্যাগী (বা মুরতাদ) ঘোষণা না করা পর্যন্ত অন্যের ঘোষণায় কেউ ‘মুরতাদ’ হয় কীভাবে? ব্যক্তি বিশেষকে স্বীকার করতে হবে সে মুরতাদ। আপনি, আমি ঘোষণা করলে হবে না। আল্লাহকে অস্বীকার করলে একজন নাস্তিক সাব্যস্ত হয় একথা সত্য, কিন্তু এর জন্য কি আল-কোরআনে কোন জাগতিক শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত আছে? না, শুধুমাত্র ধর্ম ত্যাগ করার কারনে কাউকে হত্যা করার কোনরূপ ইঙ্গিত আল-কোরআন এমনকি সহীহ হাদিসেও নেই।

‘হেফাজতের’ পক্ষ থেকে যদিও ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ইসলাম রক্ষার নামে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হাসিলের উদ্দেশ্যে ‘মুরতাদদের’ মৃত্যুদন্ড দাবি করা হয়েছে, তথাপি পবিত্র কোরআনে নাস্তিক-মুরতাদদের জন্য এ ধরণের কোন জাগতিক শাস্তির বিধান খুঁজে পাওয়া যাবে না। পবিত্র কোরআনে যখন যেখানে ধর্মত্যাগ বা ‘ইরতিদাদের’ উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায় সেগুলোতে ঘুণাক্ষরেও জাগতিক কোন শাস্তির বিধান খুঁজে পাওয়া যায় না। যেমন- সূরা বাকারা ১০৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন: …‘এবং যে কেউ ঈমানের পরিবর্তে কুফরী গ্রহণ করে নিশ্চিতভাবে সে সরল পথ হারায়।’ ঈমান আনার পর ধর্মত্যাগ করে কুফুরী মতবাদ গ্রহণ করার নাম ‘ইরতিদাদ’ বা ধর্মত্যাগ। এই আয়াতে ঠিক সেই অপরাধের কথাই বলা হয়েছে, কিন্তু এসত্ত্বেও কোন জাগতিক শাস্তির বিধান এখানে রাখা হয়নি।

একইভাবে সূরা নিসার ১৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, “যারা ঈমান আনে ও পরে কুফরী করে এবং আবার ঈমান আনে, আবার কুফরী করে, অতঃপর তাদের কুফরী-প্রবৃত্তি বৃদ্ধি পায়, আল্লাহ্ তাদেরকে কিছুতেই ক্ষমা করবেন না এবং তাদেরকে কোন পথে পরিচালিত করবেন না”। লক্ষ্য করুন, এ আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা প্রথমে একদল মানুষের ঈমান আনার পর কুফুরী অবলম্বন করার কথা বলেছেন অর্থাৎ তাদের ধর্মত্যাগ করে কাফের হয়ে যাবার কথা বলছেন, এরপর বলছেন, ‘সুম্মা আমানূ সুম্মা কাফারূ’… অর্থাৎ, ‘তারা আবার ঈমান আনে, আবার কুফুরী করে’। মুরতাদের শাস্তি যদি মৃত্যুদন্ডই ধার্য হয়ে থাকে তাহলে প্রথমবার মুরতাদ হবার সঙ্গে সঙ্গে এদের মরে যাবার কথা। কিন্তু না, এরা জীবিত ছিল যার কারণে এরা পুনরায় ঈমান আনার সৌভাগ্য পেয়েছিল। পরবর্তীতে এরা আবার কুফুরী করেছে।

সুতরাং স্পষ্ট বুঝা গেল যে, মুরতাদের জন্য মৃত্যুদন্ডের কোন বিধান কোরআনে নেই। এরপর আল্লাহ্ বলছেন, তিনি এদেরকে কিছুতেই ক্ষমা করবেন না এবং এদেরকে হেদায়াতের কোন পথও দেখাবেন না। অতএব এদেরকে জগতের কারও হাতে তুলে দেয়া হয়নি বরং আল্লাহ্ এদের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নিজের হাতে রেখেছেন।

পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ২১৭ নম্বর আয়াতে, সূরা আলে ইমরানের ৯০ এবং ১৪৪ নম্বর আয়াতে, সূরা নিসার ১৩৭ নম্বর আয়াতে এবং সূরা মায়েদার ৯২ নম্বর আয়াতেও ধর্মত্যাগের বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কোরআন শরীফের কোথাও মুরতাদ বা ধর্মত্যাগীকে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার কথা ঘুণাক্ষরেও উল্লেখ করা হয়নি।

“যারা নিজেদের মতো ধর্ম মেনে চলতে চায়, সমাজে কোনো বিশৃঙ্খলা না করে, ইসলামিক সরকারের বিরুদ্ধে কিছু না করে, তাদের সাথে জোরাজোরি করা যাবে না—ইসলামে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই”। [দেখুন: বাকারাহ ২:২৫৬, আল-মায়িদাহ ৫:৩২, ৫:৯২, আলে-ইমরান ৩:২০, আশ শুরা ৪২:৪৮, ইউনুস ১০:৯৯]

“ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। সত্য পথ মিথ্যা থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে”।… [বাকারাহ ২:২৫৬]

“খুনের প্রতিশোধ বা সমাজে চরম দুর্নীতি-ক্ষয়ক্ষতি-বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর প্রতিফল ছাড়া অন্য কোনো কারণে কেউ যদি একজনকেও হত্যা করে, তাহলে সে যেন মানবজাতির সবাইকে হত্যা করল”। [আল-মায়িদাহ ৫:৩২]

“যদি তোমার প্রভু চাইতেন, তাহলে পৃথিবীতে সবাই অবশ্যই বিশ্বাস করত। তাহলে তুমি কি মানুষকে জোর জবরদস্তি করবে বিশ্বাস না করা পর্যন্ত?” [ইউনুস ১০:৯৯]

অন্যদিকে, সূরা মায়েদার ৫৪ নম্বর আয়াতটিও দেখুন। আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন, “হে মোমেনগণ! তোমাদের মধ্যে কেঊ দীন হতে ফিরে গেলে নিশ্চয়ই আল্লাহ্ এমন এক সম্প্রদায় আনবেন যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন যারা তাকে ভালবাসবে, তারা মুমিনদের প্রতি কোমল ও কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে, তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবে না; এটি আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি দান করেন এবং আল্লাহ্ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ”। এখানে আল্লাহ্ তায়ালা পরিস্কারভাবে বলছেন, মুসলমানদের মাঝ থেকে কেউ মুরতাদ হয়ে গেলে মুসলমানদের কোন ক্ষতি হবে না। বরং একজনের বিনিময়ে আল্লাহ্ নুতন একটি ঈমানদার সমাজ ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসবেন। কিন্তু এখানেও তিনি মুরতাদকে কোন শাস্তি দেয়ার কথা বলেন নি।

সুতরাং যারা মুরতাদ বা ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কূটকৌশল হিসেবে অযোক্তিক জিহাদের অজুহাত দেখাচ্ছেন, এই আয়াতগুলো পড়ার পর তাদের একশ বার ভেবে দেখা উচিত, তারা যেটা করতে চান, সেটা সত্যিই নিশ্চিতভাবে জিহাদ, নাকি সারা মানবজাতিকে তথা ধর্মের মূলমন্ত্র মানবতাকে হত্যা করার একটা স্বার্থান্বেষী উদ্যোগ।

আসুন এবার দেখা যাক, মহানবী (স.) নিজে এ বিষয়ে কী আমল করেছেন? কেননা কোরআন শরীফ তিনিই সবচেয়ে বেশী বুঝতেন। আমাদের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত তিনিই আদর্শ। মহানবী হজরত মোহাম্মদ (স.)-এর জীবদ্দশায় তাঁর সামনে যতজন অভাগা মুরতাদ হয়েছেন তাদের কাউকে নবী করীম (স.) মৃত্যুদন্ড প্রদান করেননি। এক আরব বেদ্ঈুন মদীনায় এসে মুসলমান হবার পর জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। সে এটিকে ইসলাম গ্রহণের কুফল বলে মনে করে এবং প্রকাশ্যে ইসলাম ত্যাগের ঘোষণা দিয়ে মহানবী (স.)-এর চোখের সামনে মদীনা শরীফ থেকে বেরিয়ে যায়। রসূলুল্লাহ্ (স.) তাকে যেতে বাঁধা দেন নি অথবা তাকে হত্যাযোগ্য অপরাধীও সাব্যস্ত করেননি। [বুখারী কিতাবুল হাজ্জ, বাব-আল্ মাদীনাতু তানফীল খুবুস]

হুদায়বিয়ার সন্ধির কথা সমস্ত হুজুর খুব ভাল জানেন। মক্কার কাফেরদের সাথে বিশ্বনবী (স.) নিজে এই চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। মক্কার কুরায়িশরা ছিল কাফের আর মদীনায় হিজরতকারী ও সেখানকার আনসাররা ছিলেন মুসলমান।

হুদায়বিয়ার সন্ধির ৩ নম্বর শর্তে লেখা আছে, ‘যদি কেউ তার অভিভাবকের অনুমতি ব্যতিরেকে হযরত মুহাম্মদ (স.) এর নিকট মদীনায় চলে যায়, তাহলে তাকে তার অভিভাবকের নিকট ফেরত পাঠাতে হবে। তবে কোনও মুসলিম কুরায়শদের নিকট চলে গেলে তাকে ফেরত দেয়া হবে না।’ (ইসলামীক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত ‘ইসলামী বিশ্বকোষ’, ২০শ খন্ড, পৃষ্ঠা ৬৯৯, এপ্রিল ১৯৯৬ সনে মুদ্রিত)। অর্থাৎ, একজন মুসলমান যদি ইসলাম ত্যাগ করে কাফের কুরায়শদের আশ্রয়ে চলে যেতে চায় এতে কোন বাঁধা নেই। সে নির্বিঘে সেখানে যেতে পারে। প্রমাণ হয়ে গেল, মহানবী (স.) মুর্তিমান কোরআন হিসেবে নিছক ধর্মত্যাগের জন্য কোন জাগতিক শাস্তি প্রদান করেননি।

আবদুল্লাহ্ বিন সাদ বিন আবি সারাহ্ নামক এক সাহাবী কোরআনের ওহী সংরক্ষণের কাজে লিপিকারের দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি কেবল মুরতাদই হন নি বরং মদীনা ছেড়ে মক্কায় গিয়ে সশস্ত্র আগ্রাসীদের দলে যোগ দেন। মক্কা বিজয়ের দিন তাকে অন্য সাতজন অপরাধীর মত সাধারণ ক্ষমার আওতা বহিঃর্ভূত রাখা হয়। পরবর্তীতে এই অপরাধী হজরত উসমানের (রা.) কাছে আশ্রয় নেয়। তার অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাওয়ার কারণে এবং হজরত উসমানের সুপারিশে মহানবী (স.) তাকে ক্ষমা করে দেন। কেবল তাই নয়, পরবর্তীতে এই ‘সাবেক মুরতাদ’ খলীফার পক্ষ থেকে মিশর দেশে গভর্ণরের দায়িত্বও পালন করেন। [ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক অনুদিত সীরাতুন নবী-ইবনে হিশাম ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা ৬৪, ৬৫]

মুরতাদের জন্য মৃত্যুদন্ড যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান হত সেক্ষেত্রে আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কখনো এদেরকে ক্ষমা করতে পারতেন না।

এ কথা অনিস্বীকার্য, কোন কোন হাদীসে সাহাবীদের পক্ষ থেকে ‘মুরতাদ’ হত্যা বিষয়টির উল্লেখ পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে নির্দ্বিধায় এ কথা বলা যায়, ধর্মত্যাগের কারণে কাউকে শাস্তি দেয়া হয়নি বরং সশস্ত্র রাষ্ট্রদ্রোহের কারণে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হয়েছিল। ইয়েমেনে হযরত মা’য বিন জাবালকে যখন গভর্ণর নিযুক্ত করা হয় তখন এধরণের এক সশস্ত্র রাষ্ট্রদ্রোহী মুরতাদদের হত্যার উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়।

হযরত মহানবী (স.)-এর মুত্যুর পর, ইয়ামামার মুসায়লামা কায্যাব যে রসূলুল্লাহ্ (স.)-র যুগেই নবী হবার মিথ্যা দাবী করেছিল এবং রসূলুল্লাহ্ (স.)-এর মাধ্যমেই ‘কায্যাব’ (বা চরম মিথ্যুক) নামে আখ্যায়িত হয়েছিল- তার নেতৃত্বে এক বিশাল বাহিনী মদিনার বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এছাড়া আরও অনেক গোত্র ইসলাম পরিত্যাগ করে মদীনা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করে আক্রমন করার প্রস্তুতি নেয়। এই সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনের অংশ হিসেবেই ‘মুরতাদ’ হত্যার বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ হযরত আবু বকরের যুগে দেখতে পাওয়া যায়। ধর্মত্যাগের অপরাধে নয় বরং সশস্ত্র রাষ্ট্রদ্রোহের কারণেই তাদেরকে শাস্তির মুখোমুখি করা হয়েছিল। যে কোন সত্য অনুসন্ধানী হজরত আবু বকর (রা.)-এর যুগের ইতিহাসটি তলিয়ে দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে। তানাহলে কোরআন পরিবেশিত শিক্ষা, মহানবী (স.) প্রতিষ্ঠিত আদর্শ এবং যুগ-খলীফার পক্ষ থেকে গৃহীত ব্যবস্থার মাঝে স্পষ্ট দ্বন্দ্ব ও বিরোধ সাব্যস্ত হবে, যা সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব।

আজও যদি কোন দল বা গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠিত কোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে ইসলামের শিক্ষানুযায়ী তারাও হত্যাযোগ্য অপরাধী।

এখন বিতর্কিত হাদীসটির বিষয়ে সংক্ষিপ্ত কথা বলে শেষ করতে হয়। বাংলাদেশে কিছু পথভ্রষ্ট তথাকথিত আলেমরা মুরতাদের শাস্তি দাবী করে যে হাদীসটি উপস্থাপন করেন সেটি হল, মাম্ বাদ্দালা দীনাহু ফাক্তুলুহু। অর্থাৎ যে-ই নিজ ধর্ম ত্যাগ করবে তাকে তোমরা হত্যা কর। রাজনৈতিক মাওলানারা এটি তাদের মোক্ষম খড়গ হিসাবে ব্যবহার করে থাকেন।

কিন্তু এসব তথাকথিত পথভ্রষ্ট আলেমদের জন্য দুঃসংবাদ যে, বুখারীসহ অন্য চারটি উল্লেখযোগ্য হাদীস গ্রন্থে এটি সংকলিত হওয়া সত্ত্বেও কোরআনের শিক্ষা পরিপন্থি হবার কারণে হাদীসটি আক্ষরিক অর্থে গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা আল্লাহ্ তায়ালা আমাদেরকে স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, “এই রসূল নিজ পক্ষ থেকে কোন মনগড়া কথা বলেন না যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর প্রতি ওহী করা না হয়” (সূরা নাজম-৩,৪)।

সুতরাং পবিত্র কোরআন যে উৎস থেকে অবতীর্ণ হয়েছে সেই একই উৎস থেকে ওহী লাভ করে মহানবী (সা.) আমাদেরকে ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান দান করেছেন। অতএব কোরআনের সাথে রসূলুল্লাহ (স.)-প্রদত্ত শিক্ষার কোন বিরোধ থাকতেই পারে না। যেক্ষেত্রে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ মুরতাদ-নাস্তিকদের জাগতিক কোন শাস্তির বিধান দেননি সেক্ষেত্রে এমন শিক্ষা নবী করীম (সা.)-এর প্রতি কিভাবে আরোপ করা যেতে পারে?

বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ মুহাররার আল ওয়াজীয-এর প্রণেতা ইবনুল আতিয়া আল করুতবী মুরতাদদের বিষয়ে নবীজী (স.)-র সমগ্র জীবনের অবস্থান বর্ণনা করে বলেছেন, মহানবী (স.) মুরতাদ বা কোন জিন্দিককে হত্যা করেছেন বলে কোন প্রমাণ কিতাবে নেই। [ইসলামীক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত ‘সীরাত বিশ্বকোষঃ ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৫৭, জুন ২০০৩ সনে মুদ্রিত]

আলোচ্য হাদীসের বর্ণনাকারীদের অর্থাৎ সনদের মাঝে ‘ইকরামা’ নামক একজন তাবেঈ আছেন। তিনি আবু জাহলের পুত্র ইকরামা নন বরং হজরত ইবনে আব্বাসের মুক্ত কৃতদাস এবং তাঁর এককালের দূর্বল ছাত্র। কিন্তু এই ইকরামা তার উত্তরসূরীর কাছ থেকে শেখা বা শোনা বিষয় বর্ণনা করার ক্ষেত্রেও অবিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছেন। একবার হজরত ইবনে আব্বাসের (রা.) ছেলে আলী তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের প্রতি মিথ্যারোপের কারণে তাকে প্রকাশ্যে শাস্তিও দিয়েছিলেন। তিনি ইসলামের চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রা.)-র কেবল বিরুদ্ধাচরণই করেন নি বরং তিনি খারিজী মতবাদের সক্রিয় সদস্য ও প্রচারক ছিলেন অর্থাৎ হযরত আলী (রা.)-এর প্রকাশ্য শত্রু ছিলেন।

অনেক হাদীস বিশারদ ইকরামার খারিজী বা অধার্মিক মতবাদ পোষণ করার জন্য তার বরাতে বর্ণিত হাদীসকে নির্ভরযোগ্য বা বিশ্বস্ত বলে গন্য করতেন না। [ইসলামী ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত ‘ইসলামী বিশ্বকোষঃ ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা-৬৬৯ জুন ২০০৬ সনে মুদ্রিত]। হযরত মালেক বিন আনাস (রহ.) যিনি প্রাথমিক যুগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হাদীসের সংকলন ‘মুয়াত্তা’র সংকলক- তিনিও এ ব্যক্তি অর্থাৎ ইকরামার সূত্রে কোন হাদীস গ্রহণ করতে বারণ করতেন। [দেখুন-বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার প্রকাশিত ড. মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ রচিত ‘তাবেঈদের জীবন কথাঃ পৃষ্ঠা ৯৮।]

অতএব ইকরামার মত একজন খারেজী, অবিশ্বস্ত ও অনির্ভরযোগ্য রাবী (বা বর্ণনাকরী)-র সূত্রে বর্ণিত কোন হাদীসের উপর ভিত্তি করে মৃত্যুদন্ডের মত গুরুতর শাস্তির বিষয়টি মোটেও বিবেচ্য নয়।

কোরআন বর্ণিত স্পষ্ট শিক্ষা পরিপন্থি হওয়ায় এবং বর্ণনাকরীদের মাঝে একজন রাবী (অর্থাৎ ইকরামা) সত্য খলীফা হযরত আলী (রা.)-এর প্রকাশ্য শত্রু“ হওয়ায় এ হাদীসটি মোটেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অতএব হেফাজতের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হাদীসটি বিতর্কিত, এর বর্ণনাকারীদের সূত্র সন্দেহযুক্ত, মোটের উপর হাদীসটি সর্বদিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ। তাই কোরআনের মত সুপ্রীম কোর্টের মহান আল্লাহ্‌ তায়ালার আয়াতসমূহের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে বাঙালি জাতিকে হাইকোর্ট বা ইকরামার জাল হাদিস দেখিয়ে বিভ্রান্ত করার কোন সুযোগ নেই।

উল্লেখ্য, হেফাজত এবং জামায়েতের কাছ থেকে ইসলাম সম্পর্কে বিভিন্ন অপব্যাখ্যা না শুনাই উত্তম। তারা নিজেদের স্বার্থে ধর্মকে ভিত্তি করে সমাজে বিভিন্ন অপপ্রচার চালিয়ে থাকে। তারা ধর্ম ব্যবসায়ী ও ভণ্ড। তারা নিজেদের জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ বা ধর্মান্ধতা এবং সমাজে তাদের ঘৃণ্য প্রভাব বিস্তার করার জন্য কোরআন-হাদিসের এসব ভুল ব্যাখ্যা করে জনমানসে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করে।

পরিশেষে স্পষ্ট করে বলতে চাই, বাংলাদেশ-বাংলাদেশী আইন আনুযায়ী চলে। আমাদের মহান সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ পরিচালিত হয়; ইসলামী আইন অনুযায়ী নয়। ইসলামী আইনে কি আছে সেটা জানা আমাদের জন্য সেজন্য এতোটা জরুরীও নয়। তবে কেউ কোন ধর্মের ধর্মানুভূতিতে বিভিন্নভাবে আঘাত হানলে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ীই তার শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

ঠিক একইভাবে, বাংলাদেশী প্রচলিত আইনে বেআইনিভাবে মানুষ হত্যার অপরাধে অপরাধী ব্যক্তির শাস্তির বিধান ফাঁসি বা জাবতজীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সুতারাং আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। সুতরাং শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হল, দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী বসবাস করা এবং দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, আইন মেনে চলা।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী

  1. পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার
    পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ২১৭ নম্বর আয়াতে, সূরা আলে ইমরানের ৯০ এবং ১৪৪ নম্বর আয়াতে, সূরা নিসার ১৩৭ নম্বর আয়াতে এবং সূরা মায়েদার ৯২ নম্বর আয়াতেও ধর্মত্যাগের বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কোরআন শরীফের কোথাও মুরতাদ বা ধর্মত্যাগীকে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার কথা ঘুণাক্ষরেও উল্লেখ করা হয়নি।
    “যারা নিজেদের মতো ধর্ম মেনে চলতে চায়, সমাজে কোনো বিশৃঙ্খলা না করে, ইসলামিক সরকারের বিরুদ্ধে কিছু না করে, তাদের সাথে জোরাজোরি করা যাবে না—ইসলামে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই”। [দেখুন: বাকারাহ ২:২৫৬, আল-মায়িদাহ ৫:৩২, ৫:৯২, আলে-ইমরান ৩:২০, আশ শুরা ৪২:৪৮, ইউনুস ১০:৯৯]
    “ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। সত্য পথ মিথ্যা থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে”।… [বাকারাহ ২:২৫৬]
    “খুনের প্রতিশোধ বা সমাজে চরম দুর্নীতি-ক্ষয়ক্ষতি-বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর প্রতিফল ছাড়া অন্য কোনো কারণে কেউ যদি একজনকেও হত্যা করে, তাহলে সে যেন মানবজাতির সবাইকে হত্যা করল”। [আল-মায়িদাহ ৫:৩২]

  2. ইসলামিক দেশগুলোতে ধর্মত্যাগের
    ইসলামিক দেশগুলোতে ধর্মত্যাগের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কেনো, একটু বুঝিয়ে বলবেন ভাই? তারা তো ইসলাম কম জানে না। নিচের হাদিস টি আপনার জন্যেঃ

    সহিহ বুখারী :: খন্ড ৯ :: অধ্যায় ৮৩ :: হাদিস ১৭
    উমর ইবন হাফস (র)… আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, কোন মুসলিম ব্যক্তি যিনি সাক্ষ্য দেন যে আল্লাহ্ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। তিন-তিনটি কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করা বৈধ নয়। (যথা) প্রাণের বদলে প্রাণ। বিবাহিত ব্যভিচারী। আর আপন দ্বীন পরিত্যাগকারী মুসলিম জামাআত থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি।

  3. সুন্দর পোস্ট।
    সুন্দর পোস্ট।
    অনেক হাদীস থেকে যানা যায় সাহাবা (রা) কয়েকজন ইসলাম ত্যাগকারীকে হত্যা করেছিলেন এবং নবী মুহাম্মদ সা এই হত্যার অনুমোদন দিয়েছিলেন। এর কারনটি হচ্ছে মুসলিমরা সেসময় ধর্মযুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন এবং তখন ধর্ম ত্যাগ করার অর্থই হচ্ছে স্বপক্ষ ত্যাগ করা । এই স্বপক্ষ ত্যাগীরা সেসময় মুসলমান আর মুহাম্মদ সা এর নিরাপত্তার জন্য মারাত্নক হুমকী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। তাই সেসময়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় সাহাবারা সঠিক কাজটি করেছেন।
    কিন্তু সেই পরিস্থিতি এখন নেই। অনলাইনে যারা ইসলাম বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন তাদেরকে হত্যার কোন বিধান ইসলামে নেই। বরং ইসলামের নিয়ম হচ্ছে সমান সমান বদলার। অর্থাত অপ্রচারেরকারীদের জবাব অনলাইনেই দিতে ইসলামপন্থীদের। শারিরীক ভাবে আঘাত বা হত্যা করে নয়।
    আমাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।

    1. চমৎকার তথ্যবহুল মন্তব্য করার
      চমৎকার তথ্যবহুল মন্তব্য করার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তাদেরকে স্বধর্ম ত্যাগকারী, রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে শাস্তি দেয়া হয়েছিল। শুধুমাত্র মুরতাদ হিসেবে নয়। ধর্মত্যাগী, রাষ্ট্রদ্রোহীদের বিচার করতে চাইলে দেশের শাসন ব্যবস্থা অবশ্যই পুরোপুরি ইসলামী আইনে পরিচালিত হতে হবে। আবারো আপনাকে ধন্যবাদ। @ হাবশী গোলাম

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 9 = 1