কওমি মাদ্রাসাগুলোকে সুনির্দিষ্ট বিধিমালায় নিয়ে আসা একান্ত প্রয়োজন

বর্তমান বিশ্বে, জঙ্গি রাষ্ট্রসমূহ ছাড়া অন্য কোন দেশ আছে কিনা আমার জানা নেই, যেখানে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। এক কথায়, কোন স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রে কোন প্রকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারের বা সুনির্দিষ্ট কোন বিধিমালার বাইরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের দেশে বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে ঠিক তাই হচ্ছে। মাদ্রাসা শিক্ষা আধুনিকীকরণ করা এবং বিধিমালায় নিয়ে আসা এখন সময়ের সময়ের দাবি।

ব্যক্তিগতভাবে, আমি মোটেও মাদ্রাসা শিক্ষার বিরোধী নই। আমার অনেক আত্মীয়স্বজনই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে। আমার আপন ছোট ভাইও মাদ্রাসার ছাত্র ছিল। যা হোক, ইউরোপে বিশেষ করে লন্ডনে দেখেছি, সেখানকার মাদ্রাসাগুলো কত আধুনিক। লন্ডনের মাদ্রাসাগুলোতে ইংরেজি মাধ্যমে আরবি শিক্ষার পাশাপাশি সকল শিক্ষায় তাদের শিক্ষিত করে তোলা হয়ে থাকে। জ্ঞানের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই তাদের বিচরন থাকে। সেখানকার মাদ্রাসা ছাত্রদের বিধর্মীদের কাছে প্রকৃত ইসলাম ধর্মকে তুলে ধরা এবং ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ করার ধরণ সত্যিই মনোমুগ্ধকর।

বর্তমান সময়ে, আমাদের দেশে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় পরিচালিত প্রায় ৬০০০ কওমী মাদ্রাসায় ২০ লক্ষের বেশি ছাত্র পড়াশুনা করে। কওমী মাদ্রাসাসমূহ প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ছাত্রকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী মানসিকতায় গড়ে তুলতে এবং বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী হিসাবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছে। ফলে কওমী মাদ্রসাসমূহ দেশে জঙ্গিবাদী গোষ্ঠি তৈরীর উর্বর ক্ষেত্র হিসাবেও সদর্পে বিরাজ করছে।

সেদিনও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে দেখেছি এ নিয়ে বিতর্কের ঝড় বইছে। কওমি মাদ্রাসাগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের ভুল ইতিহাস বা বিকৃত ইতিহাস পড়ানো হচ্ছে যেখানে বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোন স্থান নেই। উল্লেখ্য, কওমি মাদ্রাসাগুলোতে তথাকথিত ধর্মীয় শিক্ষকেরা তারা তাদের ইচ্ছানুযায়ী পাঠ্যক্রম সাজিয়ে থাকে। বাংলাদেশে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার কোন বিধিবিধান তারা অনুসরণ করে না। সরকার এখনও এ ৬০০০ (প্রায়) কওমি মাদ্রাসাকে সুনির্দিষ্ট বিধিমালায় নিয়ে আসতে পারেনি। ফলে দিনদিন এসব ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের দেশের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে উঠছে।

এসব মাদ্রাসাগুলোতে প্রতিবছর দেশিবিদেশি প্রচুর অর্থ বরাদ্ধ আসে। এসব অর্থ তারা কোথায়, কিভাবে, কোন খাতে ব্যবহার করছে তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা উচিত। বর্তমান আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি না রেখে এসব কওমি মাদ্রাসায় যে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে তা সরকার অনুমোধিত নয় বলে, যেসব ছেলেমেয়ারা এসব মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে তাদের ভবিষ্যৎ রীতিমত অন্ধকার। দেশীয় চাকরিবাকরিতে বরাবরের মতোই তাদের শিক্ষা উপেক্ষিত থেকে যাবে, যত স্বঘোষিত শিক্ষা সনদই তাদের থাকুক না কেন। কিন্তু যদি এসব মাদ্রাসাগুলো সরকার অনুমোধিত নির্দিষ্ট বিধিমালায় পাঠ্যক্রম পরিচালনা না করে তাহলে দেশীয় সবধরনের সুযোগসুবিধাই তারা পাবে।

বর্তমান সময়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এসব বিধি বহির্ভূত ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোমলমতি ছাত্ররা প্রায়ই বিভিন্ন রাষ্ট্র বিরোধী অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। মিথ্যা জিহাদের নামে দেশিবিদেশি-বিশ্বের বিভিন্ন কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠনগুলো এসব মাদ্রাসার কোমলমতি ছাত্রদের দিয়ে বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সম্প্রতি অতি তৎপর হয়ে উঠেছে। এ যেন হয়ে উঠেছে কওমি মাদ্রাসাগুলোর মিশন এবং ভিশন। গতকয়েক বছর যাবত আমরা প্রায়ই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেখছি, এসব মাদ্রাসাগুলোতে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের অনেক সদস্য বিস্ফোরক দ্রব্যাদিসহ হাতেনাতে ধরা পড়েছে।

সর্বোপরি, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার নিয়ে আসা অত্যন্ত প্রয়োজন। জরুরী ভিত্তিতে সরকারের উচিত এসব রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বহির্ভূত কওমি মাদ্রাসাগুলোকে সুনির্দিষ্ট বিধিমালার আওতায় নিয়ে আসা এবং তাদের সার্বিক কার্যক্রমে নজরদারি করা। তানাহলে নিকট ভবিষ্যতে বাঙালি জাতিকে এজন্য অনেক খেসারত দিতে হবে। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের চেয়ে শক্তিশালি কেউ নেই। অনেক দেরী হয়ে যাওয়ার আগেই সরকারের উচিত হবে এসব ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশের প্রচলিত মাদ্রসা শিক্ষা ব্যবস্থার বিধি-বিধানের আওতায় নিয়ে আসা।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “কওমি মাদ্রাসাগুলোকে সুনির্দিষ্ট বিধিমালায় নিয়ে আসা একান্ত প্রয়োজন

  1. কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা
    কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার নিয়ে আসা অত্যন্ত প্রয়োজন। জরুরী ভিত্তিতে সরকারের উচিত এসব রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বহির্ভূত কওমি মাদ্রাসাগুলোকে সুনির্দিষ্ট বিধিমালার আওতায় নিয়ে আসা এবং তাদের সার্বিক কার্যক্রমে নজরদারি করা। তানাহলে নিকট ভবিষ্যতে বাঙালি জাতিকে এজন্য অনেক খেসারত দিতে হবে। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের চেয়ে শক্তিশালি কেউ নেই। অনেক দেরী হয়ে যাওয়ার আগেই সরকারের উচিত হবে এসব ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশের প্রচলিত মাদ্রসা শিক্ষা ব্যবস্থার বিধি-বিধানের আওতায় নিয়ে আসা।

  2. যুগোপযোগী একটি লেখা। মিথ্যা
    যুগোপযোগী একটি লেখা। মিথ্যা জিহাদের নামে দেশিবিদেশি-বিশ্বের বিভিন্ন কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠনগুলো এসব মাদ্রাসার কোমলমতি ছাত্রদের দিয়ে বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সম্প্রতি অতি তৎপর হয়ে উঠেছে। এ যেন হয়ে উঠেছে কওমি মাদ্রাসাগুলোর মিশন এবং ভিশন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

25 − 16 =