‘জল্লাদ তৈরির রাজনীতির অবসান ঘটাতে হবে’

আবুল কাসেম ফজলুল হক। সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক। গণমানুষের রাজনৈতিক চিন্তা ও তত্ত্বের জন্য সুপরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক এবং বিভাগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একুশটিরও অধিক গ্রন্থের প্রণেতা। পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখে থাকেন। তিনি তাঁর বর্তমান শারীরিক-মানসিক অবস্থা, ছেলে দীপন হত্যা প্রসঙ্গ, রাজনীতি, সমাজ প্রভৃতি নিয়ে কথা বলেছেন।

কেমন আছেন স্যার?

ভালো আছি। শারীরিক অসুস্থতা নেই। তবে বিভিন্ন কারণে মনটা ভালো নেই। ওরা আমার ছেলেটাকে যেভাবে মেরে ফেলল, তার কোনো কারণ খুঁজে পাই না। দীপন কখনো ব্লগে ইসলামবিরোধী প্রচারে যায়নি। একজন ব্লগারের বই প্রকাশ করেছিল মাত্র। সভ্যতার বিকাশে ইসলামের অবদানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল। বই প্রকাশ করার জন্য একজন মানুষকে মেরে ফেলবে? ইসলামের এই কি বিধান? দীপন ও কয়েকজন ব্লগারের মৃত্যুর জন্য এদেশের নষ্ট রাজনীতি কাজ করেছে। সেই কলুষিত রাজনীতির অবসান ঘটাতে হবে। দেশে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম নিয়ে একটি রাজনৈতিক পক্ষ তৈরি হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে আরেকটি পক্ষ ক্রিয়াশীল। দুই পক্ষ থেকেই হিংসা-প্রতিহিংসা ছড়ানো হচ্ছে। এই রাজনীতি যদি থাকে, তাহলে এ ধরনের হত্যাকা- থাকবে। এটাকে র‌্যাব, পুলিশ, কারাগার, ফাঁসি দিয়ে বন্ধ করা যাবে না। আমার ছেলে যখন নিহত হয়েছে তখন বলেছি, ‘আমি এই হত্যার বিচার চাই না।’ এর পেছনে আমার আদর্শগত অবস্থান আছে। আমি হিংসা-প্রতিহিংসায় বিশ্বাস করি না। যারা হত্যাকা- ঘটিয়েছে, তারা জল্লাদ। এই জল্লাদ তৈরির রাজনীতির অবসান ঘটাতে হবে। যদি এই রাজনীতির অবসান না হয়, তাহলে কয়েকজন জল্লাদের ফাঁসি হলেও হত্যাকা- থামবে না। কান্নাকাটি করে এই রাজনীতির অবসান হতে পারে না। আমিও কান্নাকাটি করি না। কিন্তু চোখে পানি চলে আসে। ঘুমাতে পারি না। কিছুক্ষণ পরপর স্বপ্ন দেখি। যখন জেগে থাকি, একলা থাকতে পারি না। ছেলের ৪৩ বছরের অনেক কথা, অনেক স্মৃতি চোখে ভাসে। এই কান্নাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে কোন সুফল হবে বলে আমি মনে করি না।

এখন তদন্ত কতটুকু অগ্রসর হলো? রাষ্ট্র বিচার প্রক্রিয়ায় কতটুকু অগ্রসর হলো?

আমি নিজে এর খোঁজখবর করি না। একসময় পুলিশ বিভাগ থেকে মাঝেমধ্যে জানাত। আমার নিরাপত্তা নিয়ে তৎপর ছিল। কিছু সাংবাদিক আছেন যাঁরা তদন্তের খোঁজখবর করেন, তাঁদের কাছ থেকে জানতে পারি অনুসন্ধানে অগ্রগতি ঘটেনি। সাগর-রুনি হত্যা, অভিজিৎ হত্যা, রাজিব হত্যা, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের হত্যাক- ও আরও অনেক হত্যাকা-ের কোনো কূল-কিনারা হয়নি। দীপনের হত্যাকা-ের পর দেখা গেল একের পর এক শিশুহত্যার জন্য কয়েকটি কোর্ট অনেকগুলো ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন। আদেশের পরে কী হয়েছে? যখন আন্দোলন হয় সরকার ও পুলিশের ওপর চাপ পড়ে, তখন তারা নানা রকম কথা বলে কিন্তু পরবর্তীকালে কাজের কাজ কিছু হয় না। প্রচারমাধ্যমে ক্রমাগত প্রচারিত হয়ে আসছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি জাতিকে পেয়ে বসেছে। বিচার না পেয়ে আমরা বিচার চাইতেও ভুলে গেছি। দেশে আইনের শাসনের জন্য বিচার দরকার। আইনের উন্নয়ন দরকার। আমি বিচার না চাইলেও শাসনের প্রয়োজনে সরকার তো বিচার করার দায় এড়াতে পারে না। সরকারকে প্রতিহিংসাপরায়ণ হতে বলছি না, আইনের শাসনের জন্য দায়িত্ব পালনের কথা বলছি।

বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি কীভাবে সৃষ্টি হলো? এর উৎসটা কোথায়? এর ভিত্তি কী?

অনেক দিন আগে থেকে এই সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়ে আসছে। দিনের পর দিন হত্যার তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে, বিচার হচ্ছে না। র‌্যাব-পুলিশ ক্রসফায়ার দিয়ে সরকার সমস্যার সমাধান করতে চাইছে। এভাবে সম্ভব নয়। রাজনৈতিক নেতা বা বুদ্ধিজীবীদের চিন্তার মধ্যেই মৌলিক ভুল আছে। গণতন্ত্রকে সফল করতে হবে। গণতন্ত্রকে ব্যর্থ করে ধর্মনিরপেক্ষতা হয় না। সমাজে বিচার আর শাস্তির দরকার আছে। তবে সামাজিক আর রাজনৈতিক অবক্ষয় রোধ করা অপরিহার্য। তার জন্য বড় রকমের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন দরকার। সেই পরিবর্তন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি কিংবা বামপন্থীদের চলমান রাজনীতি দিয়ে হবে না। যা প্রয়োজন তা হচ্ছে এসব দলের মধ্যে নতুন রাজনীতি আর গণতন্ত্রের চর্চা। সেই রাজনীতি থেকে এসব দল দূরে রয়েছে।

স্বাধীনতার ৪৫ বছর অতিক্রান্ত হলো। আজও আমরা একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারলাম না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলো না। ব্যর্থতা আসলে কেন?

যে ছয় দফাকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির ভিত্তিমূল ধরা হয়, সেই ছয় দফার মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার পর্যাপ্ত দিকনির্দেশ ছিল না। ছিল শুধুু আবেগ। গণতন্ত্রের কথা যেটুকু ছিল, তা মান্য করা হয়নি। তাকে বিকশিত করা হয়নি। তাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। এখন পর্যন্ত গণতন্ত্র কী আর কী নয়, সেটাই বোঝার চেষ্টা কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতার মধ্যে দেখা গেল না। তাঁরা গণতন্ত্র বলতে বোঝেন কেবল ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া। তাঁদের মতে, গণতন্ত্র হলো একটি অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। কেবল ভোটের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতে পারে না। সিভিল সোসাইটির বুদ্ধিজীবীরা এই ভুল ধারণাকে আরও বদ্ধমূল করে দিয়েছেন। জনজীবনের সমস্যা সমাধানের ও উন্নতির, কর্মসূচি ও কার্যক্রম ছাড়া গণতন্ত্র হতে পারে না। গণতান্ত্রিক মানসিকতা, সম্প্রীতির মনোভাব ও চিন্তা-চেতনা গণতন্ত্রে অপরিহার্য।

জল্লাদ তৈরির রাজনীতির অবসান ঘটাতে হবে

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

22 − 13 =