অভাব

মানুষের অভাবের শেষ নেই। পরিচিত অপরিচিত সবার চোখেই শুধু অভাব দেখে বেড়াই। যদিও তাদের জন্য এতেকরে আমার সহানুভূতি জন্মে না একবিন্দু। বরং হাসি পায়, খুব জোড়ে হাসতে ইচ্ছে হয় তখন। পাশের বাসার মেয়েটা গত ঈদে সাতটা জামা কিনেছিল। ওর বাবার মস্ত বড় চাকরি। বেতন, শিক্ষাভাতা, চিকিৎসাভাতা, বাড়িভাড়া, আরও কত কত কি ( সম্মানি, ঘুষ) সব মিলিয়ে মাসে ইনকাম আশি হাজার। মেয়েটির বাবা সরকারি অফিসের কর্মচারী। বেতন পান হাজার পঁচিশ কি ত্রিশ। তাই গত ঈদে দুটো জামার বেশি কিনে দেয়নি মেয়েটিকে তার বাবা। এযে বড্ড গ্লানিময় অভাব মেয়েটির বাবা কি অনুধাবন করতে পারে! ছেলেটির বন্ধুর নতুন ল্যাপটপ টা নাকি পঁয়ষট্টি পড়েছে। ছেলেটির বাবা মধ্যবিত্ত। কাজেই বাবার কিনে দেয়া ডেস্কটপ কম্পিউটার নিয়েই ছেলেটাকে সুখী থাকার অভিনয় করে যেতে হয়। এ অভাব ছেলেটা ছাড়া আর কেউ যে বোঝেনা, বোঝার চেষ্টা করেনা কখনো। টিফিনের ঘন্টায় ছেলেটার বেষ্ট ফ্রেন্ড প্রতিদিন বার্গার খায়। অথচ ছেলেটাকে খেতে হয় শিঙাড়া কিংবা ভেজিটেবল রোল। টিফিনের টাকা হাতে দেয়ার সময় ছেলেটার বাবা একবারও এ লজ্জাময় অভাবের কথা চিন্তা করে দেখেছে কি!

উপরতলার ভাবীকে তার হাজবেন্ড জন্মদিনে একটা দেড়ভরির নেকলেস দিয়েছে। আর নিচতলায় অন্য একজন মহিলার জন্মদিনে তার হাজবেন্ড আট আনার কানের দুল উপহার দিয়েছে। এ অভাবটা কি তার স্বামী ভুল করেও ভেবে দেখেছে কোন একসময়।

আমার কিচ্ছু যায়ে আসে না এমন ধারার অভাবে আর অভাবীদের আর্তনাদে। কারণ, আমি ঘন্টার পর ঘন্টা ষ্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসে দেখেছি অভাব। দেখেছি সত্যিকারের অভাবীদের যারা অভাব অভাব বলে চিল্লায় না। দেখেছি নারকেলের শক্ত খোসাকে ( আড়চি) দু খন্ড করে প্লেট বানিয়ে তাতে স্বামী- স্ত্রী মিলে একমুঠো সাদা ভাত ভাগাভাগি করে খাচ্ছে। স্ত্রীর বয়স আঠেরো কি উনিশ। সে গায়ে কাপড়হীন স্বামীকে তার ভাগের আরোও কিছু ভাত তুলে দিচ্ছে। কারণ, তার স্বামীর নিজের ভাগের ভাত তাদের ছোট্ট মেয়েটার মুখে দিতে দিতে ফুরিয়ে গেছে। তবুও তাদের দুপুরের সে খাওয়াটা তৃপ্তিময় ছিল। খাওয়া শেষ করে মিনিট পাঁচেক বিশ্রাম নিয়ে পাশে থাকা বোতল ভর্তি বস্তা কাঁধে তুলে রাতের খাবারের বন্দবস্ত করতে চলে গিয়েছিল তারা।

আমি দেখেছি আমারই রক্তের কোন এক আত্মীয়কে কলমের কালি ফুরিয়ে যাওয়ার পর টিউবওয়েল চেপে সেই কলমের ভেতর পানি ঢোকাতে। জিজ্ঞেস করায় সে হাসিমুখে বলেছিল কালি না বের হলেও কিছুটা কালি কলমে থেকে যায়। তখন পানি দিলে সেই কালিটুকুও ব্যবহার করা যায়।

খুব কাছ থেকে দেখেছি জীর্ণ এক মহিলা রাস্তায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে। তারই একহাত ব্যবধানে শুয়ে ছিল কালো রঙের কুকুরটা। আমি এও দেখেছি সারাদিন রোজা রেখে ইফতার করার পয়সা নেই এমন লোককে। যাকে রাস্তার পাশে থাকা এক শিঙাড়া- পিঁয়াজুর দোকানী ইফতার করতে গোটা তিনেক পিঁয়াজু আর একটা নিমকি হাতে দিয়েছিল। সে দুটো পিঁয়াজু খেয়ে নিমকি আর একটা পিঁয়াজু বাড়িতে থাকা ছোট্ট ছেলেটার জন্য নিয়ে গিয়েছিল। ছেলেটা নাকি ততার নিমকি খেতে বড্ড ভালোবাসে।

দেখেছি বই কিনতে না পেরে পড়া আটকে যাওয়া হাই স্কুলের মেয়েটাকে। যাকে বই কিনে দিতে হবে বলে তার বাবা পড়াবেন না ঠিক করেছেন। পরেরদিন আমার বাবার সৌজন্য সংখ্যায় পাওয়া গাদাগাদা বইগুলো থেকে ঐ মেয়ের প্রয়োজনের বইগুলো নিয়ে গিয়ে দিতে। কিন্তু ঐযে এখনো স্কুলের বেতনটা যে দিতেই হচ্ছে মেয়ের বাবাকে। স্কুল করে আর কাজ নেই স্যার এসে বলে গিয়েছিল আমার বাবাকে মেয়েটির বাবা। এরপর বাধ্য হয়ে মেয়েটির বেতন মওকুফ করে তাকে উপবৃত্তি পাইয়ে দিয়ে স্কুল করাটা চালিয়ে যেতে সাহায্য করতেও দেখেছি আমার বাবাকে। দেখেছি স্কুলের শিক্ষকরা চাঁদা তুলে ক্লাসের ভালো ছাত্রটি যেবার এসএসসি পরীক্ষা দিতে যাবে কেন্দ্রে তার অভাবী বাবার একটা নতুন শার্ট কিনে দেয়ার অক্ষমতাকে পুষিয়ে দিয়ে শার্ট কিনে দেয়ার বাস্তব চিত্র।

এরপর আর নিজেকে অভাবী বলতে সাহস হয় না নিজেকে। বেশতো আছি তিনবেলা পেটভরে ভাত খাচ্ছি। তরকারী পছন্দ না হলে ডিম ভেজে মুখে ভাত তুলে দেয়ার দেয়ার সামর্থ্য আছে পরিবারের জানা আছে। পরীক্ষা উপলক্ষ্যে টেবিলের ড্রয়ার ভর্তি তিন ডজন কলম রাখা আছে। আছে একদিনও না খুলে দেখা বাবার চাপাচাপিতে কেনা টেষ্ট পেপার। আছে টেবিলের লকারে রাখা সেই কলেজের ভর্তির প্রথম দিন বাবার কিনে দেয়া অনেকগুলো খাতা যা আমার হাতের স্পর্শ থেকে আজও বঞ্চিত। আলমারিতে গোটা সাতেক কি কিছু বেশি শার্ট আর চার কি পাঁচটা জিন্স। আছে বছরখানেক আগে শখ করে কেনা কিছু গায়ে না দেয়া টি-শার্ট। টেবিলে সাজানো চার হাজার সাতশো + ভ্যাট দিয়ে কেনা হাত ঘড়িটা। বাবাকে বন্ধুর আইফোন দেখে আমার একটা আইফোনের অভাবের কথাটা বলা হয়নি কখনো। চলুক না নিজের টাকায় কেনা xperia z টা দিয়েই। আমার ব্যাংক একাউন্টে লাখ দেড়েক টাকা নাই বা থাকলো। নিজের নামে একটা একাউন্ট তো আছে, আছে তো সেখানে কয়েকটা হাজার টাকার নোটের সংখ্যা। এতেই চলুক না। নেই লাল মারুতি কিংবা মোটর বাইক। আছে শখ করে কেনা সপ্তাখানেক এলাকার গলিতে চালানো লাল সাইকেলটা। আছে কালো ডেস্কটপ টা। এরপর আর নিজেকে অভাবী বলতে ঘেন্না লাগে। ঘেন্না লাগে জেগে ওঠা অভাব নামক কোন জিনিসকে।

কারণ, আমি যে দেখেছি সত্যিকারের সেই অভাব আর অভাবীটাকে যে কলমের শেষ কালিটুকু বের করতে কলমে পানি ঢুকিয়ে আবার লিখতে শুরু করেছিল কোন এক প্রশ্নের উত্তর। নারকেলের আড়চিকে প্লেট বানিয়ে প্ল্যাটফর্মে একমুঠো তরকারী বিহীন ভাত স্বামী- স্ত্রী আর সন্তান মিলে খেয়ে সুখের হাসি দিয়েছিল সেদিন। দেখেছি রাস্তায় কুকুরের সাথে ঘুমোতে কোন এক অপরিচিতা বৃদ্ধা আশ্রয়হীনাকে। এরপর জোড় করে মুখে হাসি ফুটিয়ে হলেও বলতে হবে আমাকে আমি অভাবের সংস্পর্শহীন একজন। বলতে হবে ভালো আছি। সত্যিই বেশ ভালো আছি।- মুনতাসির সিয়াম

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 82 = 84