ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সংজ্ঞায় সংস্কার আনা একান্ত জরুরী

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সংজ্ঞায় পরিবর্তন অর্থাৎ নতুন কিছু বিষয় যোগ করা একান্ত প্রয়োজন। কোন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের শাস্তির ক্ষেত্রে আমাদের দেশে প্রচলিত আইন-ই যথেষ্ট। কিন্তু বিষয়টির আইনি সংজ্ঞায় নতুন কিছু বিষয় যোগ করা এখন সময়ের দাবী।

আমাদের দেশের একটি সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী বরাবরের মতই ধর্মকে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে। এখনও করছে যা আমাদের রাষ্ট্রীয় সংবিধানে জোরালোভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তা স্বত্বেও স্বঘোষিত ধর্মীয় ব্যবসায়ীরা ইসলাম ধর্ম রক্ষার নামে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেই যাচ্ছে। সমাজের সহজ-সরল সাধারণ মানুষকে কোরআন-হাদিসের ভুল বা ইচ্ছাকৃত অপ-ব্যাখ্যা দিয়ে সমাজে নানামুখী বিভান্তি সৃষ্টি করছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে গুটিকয়েক অর্বাচীনেরা যতোটা না সামাজিক শৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িকতা বিনষ্ট করছে, তারচেয়েও বেশী ক্ষতি করছে কোরআন-হাদিসের এসব অপ-ব্যাখ্যাকারীরা।

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন লেখা যেন না লেখা হয়। কেউ ধর্ম না মানলে সে তার মত থাকবে কিন্তু কোন ধর্মকে আঘাত করা উচিৎ নয়। আমি নামাজ পড়ি কোরআন তেলাওয়াত করি এবং অন্য সব ধর্মকে সম্মান ও করি”।

আমিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত পোষণ করছি। ধর্মীয় অনুভুতি বা নিজ নিজ ধর্ম পালন হচ্ছে নাগরিকদের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। কেউ যদি কোন ধর্মে বিশ্বাসী না হয় সেটাই তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। রাষ্ট্র বা ধর্ম এক্ষেত্রে জোরাজোরি করতে পারে না। ইসলামে ধর্মের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তির বিধান নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বলেন, ধর্ম অবমাননা আইনের আদলে নতুন আইন তৈরি সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ প্রচলিত আইনেই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। যথার্থই বলেছেন শেখ হাসিনা। প্রচলিত আইনেই ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে, বিভিন্ন কট্টরপন্থী ইসলামী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে নতুন কোন আইন তৈরির প্রস্তাবনা নিতান্তই অযোক্তিক এবং অর্থহীন।

মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ সালের ধারা ২৯৫ থেকে ২৯৮ ধারায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের বিভিন্ন ধরন, সংজ্ঞা এবং শাস্তির বিধান সম্পর্কে বলা হয়েছে। অপরদিকে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের (আইসিটি আইন) ৫৭ ধারায়ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের শাস্তি সম্পর্কে বিধান রাখা হয়েছে। যদিও ধারাটি বহুল সমালোচিত এবং আইনজ্ঞদের মতে আমাদের সংবিধানের মৌলিক কিছু অধিকারের সঙ্গে কনফ্লিক্ট করে। এ আইনে লঘু অপরাধের গুরুদণ্ডের বা শাস্তির বিধান করা হয়েছে যা মোটেও সভ্য সমাজে গ্রহনযোগ্য হতে পারে না। এ ধারাটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সচেতন মহল থেকে প্রতিবাদ, সমাবেশ, মানব বন্ধন এবং উচ্চ আদালতে রিটও হয়েছে। যদিও ধারাটি অস্পষ্ট এবং সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত নয় তবুও একটি বিশেষ সময়ের বিবেচনায় উচ্চ আদালত তার অবস্থানে অনড় রয়েছেন।

যা হোক, তাও আসুন আইসিটি আইনের ৫৭ ধারাটি সম্পর্কে আমরা জেনে রাখিঃ
“কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েব সাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানী প্রদান করা হয়, তাহা ইহলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ”।

অপরদিকে, দণ্ডবিধি, ১৮৬০ সালের ধারা ২৯৫-ক অনুযায়ী, কোন ব্যক্তি যদি বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মানুসারীদের কোন শ্রেণীর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত ও হিংসাকৃতভাবে লিখিত বা উচ্চারিত কথা কর্তৃক বা দৃশ্যমান কোন বস্তু কর্তৃক সে শ্রেণীর ধর্মকে বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমানিত করে বা অপমানিত করার চেষ্টা করে তবে তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ দাখিল করা যাবে।

তবে মনে রাখতে হবে, যে ব্যক্তি বিশেষ বা যাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ দায়ের করা হয় তখন মামলার সংবাদদাতা বা অভিযোগকারীকেই আসামী বা আসামীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে।

লক্ষণীয়, দণ্ডবিধি, ১৮৬০ সালের ধারা ২৯৫, ২৯৬ এবং ২৯৭ অনুযায়ী, কোন শ্রেণী বিশেষের ধর্মের প্রতি অবমাননা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে উপাসনালয়ের স্থান বিনষ্ট বা অপবিত্র করা, যেকোন ধর্মের ধর্মীয় উৎসব পালনরত কোন সমাবেশে গোলযোগ সৃষ্টি করা কোন ব্যক্তির ধর্মের অবমাননা করার উদ্দেশ্যে কোন উপাসনাস্থলে বা সমাধিস্থলে রক্ষিত স্থানে অনধিকার প্রবেশ করা ইত্যাদি প্রচলিত আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত।

অথচ ইসলাম ধর্মে, ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাতের ক্ষেত্রে যারা পবিত্র কোরআন ও হাদিস শরীফের অপ-ব্যাখ্যা করে ধর্মভীরু মুসলমানদের বিপথগামী করছেন এবং বিভ্রান্ত করছেন সেসব তথাকথিত ধর্মীয় আলেম-মওলানাদেরকেও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অপরাধে অভিযুক্ত করা উচিত। তারা ইসলামের লেবাস পড়ে ধর্মভীরু মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন অপ-ব্যাখ্যা ও ভুল মতবাদ ছড়িয়ে সাধারণ ধর্মভীরু মুসলমানদের উসকানি দিচ্ছে এবং সমাজের সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি বিনষ্ট করছে। তারা কোন অংশেই যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয় তাদের চেয়ে কম নয়!

অতএব, বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সংজ্ঞায় এসব অপ-ব্যাখ্যা ও ভুল মতবাদকেও অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবী। একগোষ্ঠী সর্বদা বাক স্বাধীনতা হরনের শঙ্কায় শঙ্কিত থাকবে; আরেক সম্প্রদায় আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে ধর্মের মূল স্বত্বাকে বিনষ্ট করে অধর্মে পরিনত করবে, সমাজের সর্বক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে তা কখনও হতে দেওয়া যায় না। প্রত্যেক ধর্মের মূল স্বত্বা ধরে রাখার মহৎ স্বার্থেই কালবিলম্ব না করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সংজ্ঞা পরিবর্তন করে এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবী।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সংজ্ঞায় সংস্কার আনা একান্ত জরুরী

  1. বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে,
    বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সংজ্ঞায় এসব অপ-ব্যাখ্যা ও ভুল মতবাদকেও অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবী। একগোষ্ঠী সর্বদা বাক স্বাধীনতা হরনের শঙ্কায় শঙ্কিত থাকবে; আরেক সম্প্রদায় আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে ধর্মের মূল স্বত্বাকে বিনষ্ট করে অধর্মে পরিনত করবে, সমাজের সর্বক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে তা কখনও হতে দেওয়া যায় না। প্রত্যেক ধর্মের মূল স্বত্বা ধরে রাখার মহৎ স্বার্থেই কালবিলম্ব না করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সংজ্ঞা পরিবর্তন করে এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবী।

  2. ভাল লিখেছেন। যে ব্যক্তি বিশেষ
    ভাল লিখেছেন। যে ব্যক্তি বিশেষ বা যাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ দায়ের করা হয় তখন মামলার সংবাদদাতা বা অভিযোগকারীকেই আসামী বা আসামীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 1 =