ব্যর্থ শিক্ষকতা !!

শিক্ষক কথাটি শুনলেই যে বিষয়টি প্রথমে মাথায় আসার কথা তা হলো সম্মান | আদিকাল থেকেই শিক্ষকতা এক মহান পেশা | এ পেশার পূর্বশর্ত সম্মান লাভ | কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে শিক্ষকরা তাদের এই মূল্য যথেষ্টই হারিয়েছে | বাংলাদেশের বেশীরভাগ শিক্ষার্থীদের মাঝে একটি বিষয় ইদানিং লক্ষ্য করা যায় যে তারা শিক্ষকদের আর তেমন একটা সম্মান করে না | যদিও বলতে খারাপ লাগছে তবু এটাই সত্যি যে এখন শিক্ষার্থীদের মুখে তাদের শিক্ষকদের নামের পরে স্যার শব্দটির বদলে অন্যান্য বিভিন্ন বিশেষণ ব্যবহার করতেই বেশী দেখা যায় | এর কারণ যদি কাউকে জিজ্ঞাসা করা হয় তো সবারই এক উত্তর , আসলে ছাত্ররা মূলত শিক্ষিত হচ্ছে না কিংবা এরা বেয়াদব ইত্যাদি ইত্যাদি | এখন কথা হলো কেন বেয়াদব তৈরি হচ্ছে কিংবা কেনই বা শিক্ষিত হচ্ছে না ? এর জন্য কারা দায়ী ? শুধুই কী শিক্ষার্থীরা নাকি আমাদের শিক্ষক সমাজও দায়ী ??? চলুন আজ এ বিষয়ে কিছু জিনিস ভেবে দেখা যাক |

শিক্ষক শব্দের মানে কী ? যে শিক্ষা দান করেন | অর্থাৎ যে অন্যের মাঝে নিজের জ্ঞান বিলিয়ে দিয়ে তাকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন | এখন জ্ঞান বা শিক্ষা বলতে কী বোঝায় ? শুধুমাত্র পাঠ্য বিষয় মুখস্থ করিয়ে পরীক্ষার জন্য একজন শিক্ষার্থীকে প্রস্তুত করাই কী শিক্ষকের দায়িত্ব নাকি একজন শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনে শিক্ষকের কোন ভূমিকা আছে ? জ্ঞান বলতে কি শুধু গ্রন্থগত বিদ্যাকেই বোঝায় না এর বাইরেও কিছু আছে ? কিংবা শুধুমাত্র পাঠ্য পুস্তকের বিষয়ই কী একজন শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনের জন্য যথেষ্ট ?

বাংলাদেশে বর্তমানে শিক্ষকরা ব্যস্ত থাকেন শুধু শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করিয়ে পরীক্ষায় ভাল করে বিদ্যার বালিশ বানাতে | তাদের পাঠদানের বিষয়ের মাঝে থাকে না নৈতিক বিষয় , থাকে না কোন সৎ আদর্শ কিংবা চরিত্র | শিক্ষার্থীদের রেজাল্টের ক্ষেত্রে দেখা যায় এ প্লাসের পর এ প্লাস , সিজিপিএ বাড়তে বাড়তে পারলে ফোর আউট অফ ফোর কিন্তু ফলাফল ঘোড়ার ডিম !! শিক্ষিত হচ্ছে না | কারণটা হলো একজন মানুষের জীবনে বাবা-মার পর যে শিক্ষকের গুরুত্ব সব থেকে বেশী , সেই শিক্ষকরাই নিজেদের দায়িত্ব যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে পালন করতে পারছে না | ছোট বেলা থেকেই একটি ছাত্রের মাঝে তার চরিত্র গঠনের যেসব উপাদান শিক্ষকদের দেয়া উচিত তা দেয়া হচ্ছে না | একটি একটি ক্লাস পার করে শিক্ষার্থীরা পাস করে করে | তাই তাদের কাছে শিক্ষার উদ্দেশ্যে পাস করা , বড়জোড় ভাল রেজাল্ট করা | অথচ এই শিক্ষার উদ্দেশ্য যে হওয়া উচিত ছিল মানুষ হওয়া তা তারা কখনোই জানতে পারে না |

চরিত্র গঠনমূলক শিক্ষা না পাওয়ায় দেশজুড়ে প্রতিবছর লক্ষ্য লক্ষ্য পাস করা সততাহীন ছাত্র বের হয় | তারপর কর্মক্ষেত্রে গিয়ে তারা শুরু করে ঘুষের মত অসৎ কাজ | কারণ যাদের শিক্ষার উদ্দেশ্য পাস করে ভাল চাকুরি নেয়া , তাদের এই ভাল চাকুরির মানেই হল অর্থ এবং ভোগ বিলাস | এজন্য পথ সৎ হোক কিংবা অসৎ তাতে কী যায় আসে | আমার নিজের ডিপার্টমেন্টের কথাই বলি , টেক্সটাইল এ যখন এত সব মেধাবী ছাত্রদের পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হতে দেখেছিলাম , তখন মনে হয়েছিল ভবিষ্যতে মনে হয় বাংলাদেশ টেক্সটাইল খাতে অনেক উন্নতি করবে | কিন্তু যখন সবাইকে জিজ্ঞাসা করা হলো কেন টেক্সটাইল এ পড়তে এসেছে , তখন শতকরা ৯৫% এর উত্তর ছিল অধিক টাকা উপার্জন | আর ২০১৬ সালের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার অবস্থা দেখার পর তো আর মেডিকেল নিয়ে কোন কথা বলার অপেক্ষা রাখে না | এবার বলুন তো এদের মুখস্ত বিদ্যার অসৎ শিক্ষিত করে দেশের কী লাভ হলো ? এতগুলো স্বার্থান্ধ অপদার্থ তৈরির দায় কী নিবে শিক্ষক সমাজ ?

কিছুদিন আগে একজন নবম শ্রেণীর ছাত্রের সাথে কথা বললাম | তার সমাজ বইটা হাতে নিয়ে একটু দেখছিলাম | সেখানে একটা পুরো অধ্যায়ই আছে গণতন্ত্র | তাই ছাত্রটাকে জিজ্ঞাসা করলাম গণতন্ত্র কাকে বলে ? সে সহজ বাংলায় সংগাটা চট করে বলে দিলো | তারপর আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম এই যে গণতন্ত্র , এর মানে কী বা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্রের অবস্থা কিংবা এর কোন উদাহরণ বলো ? তখন সে নিশ্চুপ , কোন উত্তর তার জানা নেই | আমি তাকে বললাম যে এই বিষয়ে পুরো একটা অধ্যায় পড়া শেষ অথচ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর অবস্থা বলতে পারছো না ! সে অমনি উত্তরে বললো আমাদের স্যার তো কখনো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এগুলো সম্পর্কে কিছু বলেন নি | তিনি শুধু পয়েন্ট ধরে দাগিয়ে দিয়েছেন , রিডিং মুখে পড়িয়েছেন এবং কি কি পড়তে হবে বলেছেন , তাহলে আমি আপনার এই প্রশ্নের উত্তর দিবো কী করে ? শুনে এবার আমিও একটু স্তব্ধ হয়ে গেলাম | এই বালকের সামনে আমি কী উত্তর দিব কিছুই বুঝছিলাম না | আপনারাই বলুন কী উত্তর দেয়া উচিত ছিলো ? একটা পুরো অধ্যায় গণতন্ত্র নিয়ে পড়িয়েও যদি শিক্ষক তাকে এর মানে বোঝাতে কিংবা এর বাস্তবিক ক্ষেত্র বোঝাতে ব্যর্থ হন তো এ ব্যর্থতা কার ? এই ছাত্রটি মুখস্ত করে ঠিকই কিন্তু পাস করে যাবে এবং একসময় ডাক্তারি কিংবা ইন্জিনিয়ারিং পড়ার সময় তার আর গনতন্ত্র বিষয়ক কিছু লাগবেও না | কিন্তু সারা জীবনের মত তার এই জানার অভাবটা রয়েই যাবে | কিংবা বয়সের সাথে সাথে আশেপাশের বিচিত্র ধ্যান ধারণা মানুষের কাছ থেকে গণতন্ত্র সম্পর্কে শিখে তার প্রকৃত শিক্ষা কতটাই বা পূর্ণতা পাবে ? তো এখন ভাবুন তো কাল যখন এই শিক্ষার্থী বাংলাদেশের বড় কোন আসনের দায়িত্ব পাবে , তো তখন তার কর্মকাণ্ডের মাঝে গণতন্ত্র রক্ষার ছাপ কতটা থাকবে ?

আমরা বরাবরই বলে আসছি যে বাংলাদেশে ভাল রাজনীতিবিদ , ভাল নেতা নেই | কিন্তু কেন নেই কখনো কী তা ভেবে দেখেছি ? কারণ সুষ্ঠ রাজনীতি করতে যে সব বিষয় তার জানা দরকার তা একজন নেতা তার শিক্ষা জীবনে শিক্ষকদের থেকে জানতে পারে না | তারা শিক্ষকদের কাছ থেকে জানতে পারে না কার্ল মার্কসের মত রাজনৈতিক আদর্শদের জীবনী | তারা জানতে পারে না সমাজতন্ত্র , শ্রমিকের ব্যাখ্যা , বস্তুবাদ কিংবা বামপন্থী রাজনৈতিক ইতিহাস | যেটুকু সম্বল করে তারা রাজনীতির মাঠে নামে তা বাংলাদেশ আওয়ামী লিগ কিংবা বিএনপির গোটা কয়েক বিকৃত ইতিহাস , ভোগবাদী সমাজের লাভ কিংবা উপরস্থ নেতার কাছ থেকে শেখা দমন-পীড়ন নীতি | তো এই শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি করলে তাদের কাছ থেকে আর কতোটাই বা আশা করা যায় ? অথচ শিক্ষকরাই কিন্তু পারতো তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের গঠন করতে | এখন শিক্ষকরাই যদি ছাত্রদের এই শিখায় যে রাজনীতি মানে পচা নর্দমা , তাহলে কে এই নর্দমা পরিষ্কারের দায়িত্ব নিবে ? একমাত্র একজন শিক্ষকই পারেন একটি আদর্শ জাতি তৈরির গুরু দায়িত্ব পালন করতে | দেশকে একজন ভাল মানুষ , একজন ভাল রাজনীতিবিদ উপহার দিতে পারেন একজন শিক্ষক | এই শিক্ষক সমাজ পারেন উপযুক্ত শিক্ষা দান করে রাজনীতি নামক নর্দমা পরিষ্কার করতে |

অথচ আজ এই শিক্ষকরাই হয়ে পড়েছে উট পাখির মত | বিপদ দেখলেই মাথা লুকিয়ে ভাবে নিজে বাচলে বাপের নাম ! এই তো সেদিনের কথা , রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যপক রেজাউল করিমের ছিন্ন বিচ্ছিন্ন লাশ রাস্তায় পাওয়া গেল | উনি তো ব্লগারও ছিলেন না | ব্লগার হলে না হয় বলা যেত যে সরকার থেকে লাইসেন্স আছে ব্লগারদের হত্যা করা জায়েয | তো কেন হত্যা করা হলো তাকে আর কেনই বা সরকার এর বিচার নিয়ে তেমন কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না ? অথচ এ ব্যাপারে শিক্ষকরা সবাই চুপ করে আছে |কেন আন্দোলন কী শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত ? ভেবেছিলাম অন্তত হত্যার পরের দিনটা সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রেখে শিক্ষকরা বিচারের দাবিতে কোন কর্মসূচি রাখবে | কিন্তু নাহ ! কে মরেছে তাতে তাদের কী বাপু নিজে তো বেচেই আছে !! তো এমন শিক্ষকদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কিছু আশা করা কী নেহাত আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখার মত নয় !!!

একটা বিষয় এখন পরিষ্কার যে উটপাখির মত বৈশিষ্ট্য যুক্ত শিক্ষকদের ছাত্ররাও যে ভবিষ্যৎ উট পাখি তাতে কোন সন্দেহ নেই | শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্য পুস্তকের মধ্যে ডুবিয়ে না মেরে একটু সাহস করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা , ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্য শেখানোটা এখন সময়ের দাবী | নাহলে সামনে এমন দিন আসবে যখন একজন শিক্ষককেও পুলিশের মতই সম্মান করা হবে | সামনে এলে স্যার স্যার , দূরে গেলেই শালার বাল !

বাংলাদেশের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় ভাষা আন্দোলন , ৭১ এর যুদ্ধে শিক্ষকদের কতটা অবদান ছিল | ছাত্রদের মনে তারা যে দেশপ্রেমের মূলমন্ত্র গেথেছিল , তারই ফল আজকের এই প্রাণের ভাষা , এই স্বাধীন ভূখণ্ড | অথচ বর্তমান সময়ে এসে এই ডিজিটাল বাংলাদেশের ডিজিটাল শিক্ষকদের দেখলে বোঝা যায় যে শিক্ষক সমাজ কতটা মূর্খ হলে একজন শিক্ষকের লাশ রাস্তায় পড়ে থাকা সত্বেও দেশে কোন আন্দোলন হয় না | ধিক এ শিক্ষক সমজকে , ব্যার্থ এ শিক্ষকতা !!!

পরিশেষে একটা কথা না বললেই নয়-
“বাংলাদেশে যেমন মেডিকেল কিংবা ইন্জিনিয়ারিং পড়ুয়া স্টুডেন্টের অভাব নেই কিন্তু ভাল ডাক্তার কিংবা ইন্জিনিয়ারের অনেক অভাব তেমনি শিক্ষকতা করার মত মানুষের অভাব নেই , কিন্তু ভাল শিক্ষকের বড়ই অভাব ……”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + 4 =