জনগণের মৌলিক অধিকারগুলো সুপ্রতিষ্ঠিত করাই যে গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র

অপরাধ এবং সন্ত্রাসবাদকে দমন করতে হবে, জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে হবে। এটা যেকোন সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। কিছু জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের হাতে সাধারণ জনগণের জান-মাল, রুটি-রোজগার জিম্মি থাকতে পারে না।

বাংলাদেশে হরতাল-অবরোধের মত ধ্বংসাত্মক কর্মসূচীগুলো যদি রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক অধিকার হয়ে থাকে তাহলে হরতাল-অবরোধের কারনে যে, সাধারণ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন হচ্ছে সেটা ভেবে দেখার বিষয়। প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচী চিরতরে নিষিদ্ধ করে, জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা উচিত। তাহলেই গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।

এটি নিঃসন্দেহে সুসংবাদ যে, দেশ ও দেশের সাধারণ জনগণের সার্বিক মঙ্গলের কথা বিবেচনা করে, অতি সম্প্রতি অবৈধ হরতাল-অবরোধ বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একটি রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) এ নির্দেশ দেন বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

একটু পিছনে ফিরে তাকাই, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি গণযুদ্ধ। তখন বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে ও নেতৃত্বে সকল মুক্তিকামী শ্রেণী-পেশার মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। তাদের মধ্যে একটি শ্রেণী বাঙালি হয়েও আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। তারা এখনও এই স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে বুক ফুলিয়ে বসবাস করছে। সেই স্বাধীনতা বিরোধী, বাংলাদেশ বিরোধী চক্রই ২০১৫ সালে এসে পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে আবার জেগে উঠেছে। তারাই পেট্রোল বোমা মেরে দেশের সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে, দেশজুড়ে নাশকতা করছে, রাষ্ট্র বিরোধী সকল ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আবার ৭১’ এর ন্যায় দল-মত নির্বিশেষে সকল শ্রেনী-পেশা-বর্ণের সাধারণ মানুষদের সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাদেরকে সর্বাত্মক শক্তি দিয়ে প্রতিহত করতে হবে, দেশ ও দেশের মানুষকে রক্ষা করতে হবে। আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে কিন্তু সেই স্বাধীনতা রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের নতুন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের।

অন্যদিকে, বিএনপি’র সমর্থকেরা মাঝেমধ্যে এমন আচরন করে মনে হয়, বাংলাদেশে তারাই গণতন্ত্রের ধারক-বাহক ও রক্ষক! সত্যিই হাস্যকর! বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের কাছ থেকে গণতন্ত্রসহ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল। এনে দিয়েছিল পৃথিবীর বুকে একখণ্ড স্বাধীন ভূখণ্ড। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বীজ তিনিই প্রথম বপন করেছিলেন। অন্যদিকে, জিয়াউর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম স্বৈরতন্ত্রের সুচনা করেছিলেন এবং গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিলেন। আর এখন এই জিয়ার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি’র মুখে ‘গণতন্ত্র, গণতন্ত্র’ বুলি আওড়ানো যে ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। তাদের ভাষায় সংজ্ঞায়িত গণতন্ত্রের আন্দোলনের নামে দেশের সাধারণ জনগণকে পুড়িয়ে হত্যা করে, মানুষের মৌলিক অধিকার তারা হরন করছে। আর জনগণের এই মৌলিক অধিকারগুলো সুপ্রতিষ্ঠিত করাই যে গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র।

আমরা বাঙালি জাতি স্বাধীনতার পর কখনও পর পর দুই টার্ম কোন গণতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতায় দেখে অভ্যস্ত নই। সেজন্যই আওয়ামী লীগ পর পর দুই টার্ম ক্ষমতায় থাকায় স্বার্থবাদী, ক্ষমতালোভী গোষ্ঠীগুলোর গলায় কাঁটার মত বিঁধছে। উন্নত দেশগুলোর দিকে চোখ তুলে তাকান। সেসব দেশে সাধারণ জনগণের সমর্থন থাকলে শুধুমাত্র দুই টার্ম নয়, তার চেয়েও বেশী সময় সরকার ক্ষমতায় থাকে।

কিছুদিন আগেও দেখতাম যে, বিএনপি-জামায়াতি ইসলামী জোট সমর্থকেরা কথায় কথায় মালয়েশিয়ার ড. মহাতির বিন মোহাম্মদের কথা উদাহারন হিসেবে উল্লেখ করত। এখন আর বলে না। কারন সেই মাহাতির বিন মোহাম্মদ নিজেই ক্ষমতায় ছিল প্রায় সুদীর্ঘ ৪০ বছরের মত। তিনি কিছুদিন আগে বাংলাদেশে এক বেসরকারি সফরে এসে বলে গেছেন যে, বিরোধী দলগুলোকে ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করতে হবে বর্তমান সরকারের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত। বিরোধী দলগুলোর উচিত দেশ পরিচালনায় সরকারকে সহযোগিতা করা।

যাই হোক, আমাদের দেশে হেফাজতে ইসলামীদের নিয়ে কিছু লিখতে, বলতে এবং বিভিন্ন পত্রিকায় গঠনমূলক সংবাদ প্রকাশ করতেও আমাদের সম্পাদক ও প্রকাশক মহোদয়রা ভয় পান। কারন তাদেরকে সবাই মৌলবাদি বা ধর্মান্ধ, জংগিবাদি এবং আতঙ্কবাদী মনে করেন। হেফাজতে ইসলামীদেরই বা দোষ দিয়ে কি লাভ? তাদের যে গোঁড়ায় গলদ। তারা যে কুশিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত এবং আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত নয়। আমরা সচেতন সমাজ তাদের বিবেককে জাগিয়ে তুলতে পারছি না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সুবিধাবাদী সম্প্রদায় তাদেরকে নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ব্যবহার করছে।

সময়ে অপ্রয়োজনে তারা ইসলাম রক্ষার নামে রাজপথে নেমে যান। কিন্তু দেশে এখন বোমা মেরে পুড়িয়ে, চাপাতি চালিয়ে সন্ত্রাসীরা মুসলমানদেরকেই হত্যা করছে। স্বঘোষিত ইসলাম রক্ষাকারীরা এখন নিশ্চুপ কেন? এখন কি তাদের কোন ঈমানী দায়িত্ব নেই? আজ সারা দেশে হরতাল-অবরোধের নামে যে নাশকতা এবং মানুষ হত্যা চলছে এসবের বিরুদ্ধে আপনারা রুখে দাঁড়াচ্ছেন না কেন! তাদেরতো অন্ততপক্ষে জানার কথা যে, ইসলামে হরতাল-অবরোধ হারাম। ইসলাম ধর্মে নিরীহ মানুষ হত্যা করা মহা পাপ। তা সত্ত্বেও তারা জোটবদ্ধভাবে এসবের বিরুদ্ধে এখন আন্দোলন করছে না কেন? সহিংসতা প্রতিরোধে এবং নাশকতাকারীদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান না নেওয়ার বিষয়টি এখন পুরো জাতির কাছে প্রশ্নবিদ্ধ!

নীতিহীন এবং আদর্শহীনদের মুখে নীতির কথা যে, ভণ্ডামি আর কিছুই নয়। সচেতন হও বাংলাদেশ। রুখে দাও ধর্ম ব্যবসায়ী ভণ্ডদের সকল ভণ্ডামি। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিরা নিপাত যাক! বাংলাদেশ মুক্তি পাক!

পরিশেষে, দেশ ও জাতির স্বার্থে এসব সন্ত্রাসবাদ, নাশকতা এবং সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা বিরুদ্ধে আমাদের গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাদেরকে সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করতে হবে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন রাজাকারেরা মুক্তিযোদ্ধাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ঠিক একইভাবে এখন রাজাকারদের বংশধররা আমাদের নতুন প্রজন্মের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তাদের যেকোন মুল্যে বাংলার মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে। এই হোক, আমাদের আগামী দিনের দৃঢ় প্রত্যয়।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “জনগণের মৌলিক অধিকারগুলো সুপ্রতিষ্ঠিত করাই যে গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র

  1. ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল
    ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি গণযুদ্ধ। তখন বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে ও নেতৃত্বে সকল মুক্তিকামী শ্রেণী-পেশার মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। তাদের মধ্যে একটি শ্রেণী বাঙালি হয়েও আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। তারা এখনও এই স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে বুক ফুলিয়ে বসবাস করছে। সেই স্বাধীনতা বিরোধী, বাংলাদেশ বিরোধী চক্রই ২০১৫ সালে এসে পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে আবার জেগে উঠেছে। তারাই পেট্রোল বোমা মেরে দেশের সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে, দেশজুড়ে নাশকতা করছে, রাষ্ট্র বিরোধী সকল ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আবার ৭১’ এর ন্যায় দল-মত নির্বিশেষে সকল শ্রেনী-পেশা-বর্ণের সাধারণ মানুষদের সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাদেরকে সর্বাত্মক শক্তি দিয়ে প্রতিহত করতে হবে, দেশ ও দেশের মানুষকে রক্ষা করতে হবে। আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে কিন্তু সেই স্বাধীনতা রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের নতুন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 43 = 48