আমেরিকা এবং রাশিয়ার মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ

স্নায়ুযুদ্ধ বা ঠাণ্ডা লড়াই আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক বহুল আলোচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের অবসানের অল্পকাল পরেই ১৯৪৬ সালের গোঁড়ার দিকে জৈনক মাকিন সাংবাদিক মন্তব্য করেছিলেন যে, “We are in the midst of a cold war.” অর্থাৎ আমরা অবস্থান করছি একটি ঠাণ্ডা বা স্নায়ু যুদ্ধের মাঝখানে। এ মন্তব্যের মধ্যে আশু স্নায়ু যুদ্ধের সম্ভবনা ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে স্নায়ুযুদ্ধ বাস্তব রূপ ধারন করে। সময় পূর্ব ও পশ্চিম ব্লকের মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধের সুচনা হয়েছিল তা আজ পর্যন্ত চলে আসছে। অধ্যাপক ফ্রাঙ্কেল বলেন, “ঠাণ্ডা যুদ্ধ বলতে সাম্যবাদ ও গণতান্ত্রিক মতাদর্শ এবং তাদের প্রবক্তা রাশিয়া ও আমেরিকার বিরোধের সাথে জড়িত সকল ঘটনাকে বুঝায়।”

১) ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পূর্বে এবং পরে পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এদের মধ্যে ছিল পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া, হাঙ্গেরি ইত্যাদি রাষ্ট্রসমূহ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনুধাবন করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন বা রাশিয়া তার সমস্ত শক্তি ইউরোপের দিকে কেন্দ্রীভূত করতে পারে। এ আশংকা থেকে মার্কিনীরা রাশিয়ার প্রতি আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করতে থাকে যা স্নায়ুযুদ্ধের সৃষ্টি করে।

২) ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কম্যুনিস্ট পার্টির প্রভাব বৃদ্ধিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আশংকিত হয়। অর্থনৈতিক সমস্যা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে ইউরোপের একমাত্র পথ ছিল পুনর্গঠনের কর্মসূচি গ্রহন করা।

৩) ইরান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার সম্পর্কে পশ্চিমা জোটের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতবিরোধ শুরু হয়। ২য় বিশ্ব যুদ্ধের সময় মিত্র বাহিনী ইরান দখল করে।

৪) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি গ্রিস দখল করলে ইংরেজ বাহিনী তা মুক্ত করে, কিন্তু ইংরেজ বাহিনী গ্রীসের ফ্যাসিবাদী বিরোধী জনগণের প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করে যা স্নায়ুযুদ্ধের কারন।

৫) ১৯৪৫-৪৭ সালে তুরস্কের ঘটনাবলিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের তিক্ততা শুরু হয়।

৬) সোভিয়েত ইউনিয়ন একদিকে এটম বোমা প্রস্তুত করার জন্য গবেষণা চালায়, অন্যদিকে পূর্ব ইউরোপের সাথে নিবিড় সম্পর্ক করে যার ফলশ্রুতিতে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়।

৭) ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ স্বাধীনতা লাভ করে। তাই অন্যান্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশসুমুহ থেকে ব্রিটেন ও ফ্রান্স সরে যাওয়ায় তারা রাজনৈতিকভাবে শূন্য হয়ে পড়ে।

৮) ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর ৩য় বিশ্বের দেশগুলোকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া নিজেদের স্বার্থের অনুকুলে আনার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয় যা স্নায়ুযুদ্ধের কারন।

৯) একটি দেশের প্রযুক্তি পরিবর্তনের সাথে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়। ফলে তারা যুদ্ধ না করলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে যা স্নায়ুযুদ্ধের কারন হয়ে দাঁড়ায়।

১০) আমেরিকা ১৯৪৫ সালে এবং রাশিয়া ১৯৪৯ সালে আনবিক শক্তির অধিকারী হয়। যেহেতু টেকনোলোজি মানুষের চিন্তা ধারাকে উচ্চাকাঙ্খে প্রবাহিত করে- ফলে ঘোষিত যুদ্ধ না করলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে যা স্নায়ুযুদ্ধের কারন হয়ে দাঁড়ায়।

অবশেষে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া ইউরোপের পরাশক্তির ভুমিকা পালন করতে অগ্রসর হয়। কিন্তু পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের যে ক্ষমতা ও শক্তি ছিল আজ রাশিয়ার তা নেই। সবচেয়ে বড় কথা হল রাশিয়ার বর্তমান রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন সাম্যবাদের পরিসমাপ্তি ঘোছা্নোর কাজে ব্যস্ত। আমেরিকার সাথে তিনি পুরো সহযোগিতা করে চলতে চান। মার্কিনী ধাঁচের বাকার অর্থনীতি তিনি চালু করে দিয়েছেন। রাশিয়াকে ন্যাটোর সদস্য করা হয়েছে। আমেরিকাও রাশিয়াকে সব রকম সাহায্য প্রধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

সুতরাং অতীতে দুই পরাশক্তির মধ্যে যে তিক্ততা ছিল বর্তমানে তা আর নেই। অন্যদিকে ভ্লাদিমির পুতিন ব্রিটেনের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করে ফেলেছেন। অতি সম্প্রতি ব্রিটিশ রানী ২য় এলিজাবেথ রাশিয়া সফরে গিয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও সময়ে সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দুই পরাশক্তি ঠাণ্ডা যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে যান। এ স্নায়ুযুদ্ধের পুরোপুরি শেষ কোথায় তা আজও অজানা।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “আমেরিকা এবং রাশিয়ার মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ

  1. ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার
    ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পূর্বে এবং পরে পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এদের মধ্যে ছিল পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া, হাঙ্গেরি ইত্যাদি রাষ্ট্রসমূহ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনুধাবন করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন বা রাশিয়া তার সমস্ত শক্তি ইউরোপের দিকে কেন্দ্রীভূত করতে পারে। এ আশংকা থেকে মার্কিনীরা রাশিয়ার প্রতি আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করতে থাকে যা স্নায়ুযুদ্ধের সৃষ্টি করে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কম্যুনিস্ট পার্টির প্রভাব বৃদ্ধিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আশংকিত হয়। অর্থনৈতিক সমস্যা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে ইউরোপকে একমাত্র পথ ছিল পুনর্গঠনের কর্মসূচি গ্রহন করা।

  2. ভাল বলেছেন। অতীতে দুই
    ভাল বলেছেন। অতীতে দুই পরাশক্তির মধ্যে যে তিক্ততা ছিল বর্তমানে তা আর নেই। অন্যদিকে ভ্লাদিমির পুতিন ব্রিটেনের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করে ফেলেছেন। অতি সম্প্রতি ব্রিটিশ রানী ২য় এলিজাবেথ রাশিয়া সফরে গিয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও সময়ে সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দুই পরাশক্তি ঠাণ্ডা যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে যান। এ স্নায়ুযুদ্ধের পুরোপুরি শেষ কোথায় তা আজও অজানা।

    1. তারা এখন একে অপরের সাথে সমজতা
      তারা এখন একে অপরের সাথে সমজতা করেই চলছে। ধন্যবাদ। @ মোঃ সাইফুর রহমান

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 69 = 75