জাতিসংঘের সংস্কার একান্ত প্রয়োজন

জাতিসংঘের নতুন সদস্য গ্রহণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশক্রমে সাধারণ পরিষদ নতুন সদস্য গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সাধারণ পরিষদের অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি রাষ্ট্রই জাতিসংঘের সদস্য।

জাতিসংঘ সনদের ২৩নং অনুচ্ছেদে নিরাপত্তা পরিষদের গঠনপ্রণালী অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিষদ জাতিসংঘের ১৫টি সদস্য সমন্বয়ে গঠিত হবে। এ ১৫টি সদস্যের মধ্যে ৫টি স্থায়ী সদস্য, ১০টি অস্থায়ী সদস্য।

১৯৬৫ সালের পূর্বে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মোট সদস্য ছিল ১১টি। এর মধ্যে স্থায়ী সদস্য সংখ্যা ছিল ৫টি এবং অস্থায়ী সদস্য সংখ্যা ছিল ৬টি। ১৯৬৫ সালে জাতিসংঘের সংশোধিত সনদ কার্যকরী হলে অস্থায়ী সদস্য সংখ্যা ১০ এ উন্নীত হয়। জাতিসংঘের সনদের সুত্রে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের একটি করে ভোট থাকবে এবং কোন প্রস্তাব পাস করতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী সদস্যসহ অন্যান্য অস্থায়ী ৪টি সদস্যসহ মোট ৯টি ভোটের প্রয়োজন হবে।

সনদে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ৫টি সদস্যের আবার ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। প্রতিটি স্থায়ী সদস্য নিরাপত্তা পরিষদের যেকোন প্রস্তাবে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী কোন স্থায়ী সদস্য যদি সনদের বিপরীতে ভেটো প্রয়োগ করে তাহলে উক্ত প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে পাস হতে পারবে না।

মূলত, জাতিসংঘের এ ভেটো ক্ষমতার অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারনে বর্তমানে জাতিসংঘ অনেক বিরোধপূর্ণ বিষয়ের শান্তিপূর্ণ সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ভোটসহ অন্যান্য বিষয়ের সংস্কার অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

প্রথমত, সাধারণ পরিষদের ক্ষমতার সিমাবদ্ধতা। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা পরিষদের অত্যাধিক ক্ষমতা। তৃতীয়ত, জাতসংঘের মহাসচিবের সীমিত ক্ষমতা। চতুর্থত, বিশ্বশান্তি রক্ষায় ব্যর্থতা। পঞ্চমত, নিরাপত্তা পরিষদ, সাধারণ পরিষদ এবং মহাসচিব কারো কাছে দায়বদ্ধ নয়। ফলে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের স্বেচ্ছাচারিতার কাছে বিশ্বশান্তি পরাভূত।

অন্যদিকে, জাতিসংঘের বিশেষ কার্যক্রমে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বৃহৎ অর্থনীতি এবং পরাশক্তিগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। অনুন্নত এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোকে এ সকল ক্ষেত্রে তেমন সুযোগ দেওয়া হয় না। এছাড়া ভৌগলিক ও জনসংখ্যানুপাতে ক্ষমতা বণ্টনেও জাতিসংঘ বৈষম্য করে।

স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা জাতিসংঘের কোন সার্বজনীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় বাধা। ভেটো ক্ষমতাধর শাক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে না। তারা শুধু নিজেদের স্বার্থে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধার সৃষ্টি করে আসছে দিনের পর দিন।

জাতিসংঘের বর্তমান সনদে সাধারণ পরিষদের হাতে তেমন কোন ক্ষমতা নেই। সাধারণ পরিষদের সদস্যরা নিরাপত্তা পরিষদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সাধারণ পরিষদেই জাতিসংঘের সকল সদস্য অন্তর্ভুক্ত। তাই সকল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু সাধারণ পরিষদকে করা একান্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি জবাবদিহিতামূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা একান্ত জরুরি।

বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের সম্প্রসারণ করা অপরিহার্য এবং নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যের সাধারণ পরিষদের কাছে জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে। এশিয়াতে মোট জনসংখ্যা আনুমানিক ৩৮৫ কোটি হওয়া স্বত্বেও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য সংখ্যা মাত্র একটি দেশ, আর তা হচ্ছে চীন। অথচ ইউরোপে মোট জনসংখ্যা মাত্র ৭৬ কোটি হওয়া স্বত্বেও ইউরোপের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য সংখ্যা ৩টি, যথা- ফ্রান্স, ব্রিটেন, রাশিয়া। উল্লেখ্য উত্তর আমেরিকার মোট জনসংখ্যা আনুমানিক মাত্র ৫০ কোটি হওয়া স্বত্বেও নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্য সংখ্যা ১টি আছে; আর তা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অথচ আফ্রিকায় প্রায় ৮৫ কোটি জনসংখ্যা থাকা স্বত্বেও নিরাপত্তা পরিষদে তাদের কোন স্থায়ী সদস্য নেই।

সুতরাং এটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য সংখ্যা ৫টি দেশের মধ্যে ৪টি দেশই আধুনিক সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপ এবং আমেরিকার। এক্ষেত্রে এশিয়া থেকে বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারত এবং অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপানকে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য করা যেতে পারে। আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা বা নাইজেরিয়ার মত দেশকে স্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করে জাতিসংঘে ভারসাম্য সৃষ্টি করা যেতে পারে।

প্রচলিত পদ্ধতিতে জাতিসংঘের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে মহাসচিব শুধুমাত্র কাগজে কলমে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত রয়েছেন। সনদের দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী তিনি নিরাপত্তা পরিষদের কাছে দায়বদ্ধ। বর্তমান সনদ সংশোধন করে মহাসচিবের নিকট সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদসহ জাতিসংঘের অন্যান্য অঙ্গসংগঠনকে দায়বদ্ধ রাখার বিধান করতে হবে।

সর্বোপরি, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো প্রদানের ক্ষমতা রোহিত করতে হবে। কারন এটি একটি অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি, এর পরিবর্তে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রবর্তন করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও গ্রহনযোগ্য করতে হবে। বিশেষ করে কোন প্রস্তাব গ্রহণের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ বা দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের গ্রহনযোগ্যতা রাখতে হবে।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “জাতিসংঘের সংস্কার একান্ত প্রয়োজন

  1. প্রচলিত পদ্ধতিতে জাতিসংঘের
    প্রচলিত পদ্ধতিতে জাতিসংঘের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে মহাসচিব শুধুমাত্র কাগজে কলমে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত রয়েছেন। সনদের দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী তিনি নিরাপত্তা পরিষদের কাছে দায়বদ্ধ। বর্তমান সনদ সংশোধন করে মহাসচিবের নিকট সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদসহ জাতিসংঘের অন্যান্য অঙ্গসংগঠনকে দায়বদ্ধ রাখার বিধান করতে হবে।

    1. ধন্যবাদ। কোন প্রস্তাব গ্রহণের
      ধন্যবাদ। কোন প্রস্তাব গ্রহণের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ বা দুই-তৃতীয়াংশের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। @ মুনতাসির আহমেদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

52 + = 54