প্রগতির ঐক্যের এখনই শ্রেষ্ঠ সময়

বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি ভাষার গান রয়েছে যা আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনে অপরিসীম প্রেরণা ও সাহস জুগিয়েছিল। সেই বিখ্যাত গানটি হলো- ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়/ ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমাদেরই পায়’। এর অর্থ আর কাউকে ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই, সকলেরই তা জানা। সেই ভাষা ও কলম কেড়ে নেবার আবার এক অশুভ পায়তারা শুরু হয়েছে বাংলাদেশে।

মৌলবাদ-জঙ্গিবাদী অপশক্তি বাংলাদেশের প্রগতির পথে এখন এক চরম অন্তরায়। ব্যাপক উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে যাওয়া একটি দেশের সফলতার চাকা পিছনের দিকে ঘুরতে শুরু করেছে। দীর্ঘকাল অবরোধ-হরতালে বিপর্যস্ত মানুষের জীবন। তবে এদেশের মানুষও সব পারে। অবরোধ-হরতালে সাধারণ মানুষের কোন সাড়া ছিল না। প্রতিটি দিনের মতো স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে অবরোধ-হরতালের দিনগুলো। মানুষের আর কত সয়!

পেট্রোল বোমার আগুনে পুড়ে মানুষ মরার প্রক্রিয়া থামতে না থামতে শুরু হয়েছে আবার মুক্তমনা মানুষের হত্যার পর্ব। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাজনীতিক হত্যাকাণ্ড প্রায় প্রতিটি দেশে কমবেশি ঘটেছে। এর পাশাপাশি যদি আর একটি বিষয় খতিয়ে দেখা যায় তাহলে দেখতে পাওয়া যাবে, যারা মুক্তবুদ্ধির চর্চা করেন, প্রগতিবাদী-মানবতাবাদী সাহিত্য রচনা করেন, তাদেরও কিন্তু হত্যার শিকার হতে হয়। প্রশ্ন উঠতে পারে রাজনীতিকের সাথে মুত্তচিন্তার অগ্রদূতদের সামঞ্জস্য কোথায়। তার উত্তরে বলতে হবে একজন প্রগতিবাদী-মানবতাবাদী রাজনীতিকের মস্তিষ্কেও তেল হচ্ছেন প্রগতিশীল-মুক্তচিন্তার মানুষগুলো। একজন রাজনীতিক মাঠে-ময়দানে হাজারো মিছিলে বেড়ে উঠে দেশমাতৃকার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেন। আর এই বিলিয়ে দেবার পথে কখনো কখনো হয়তোবা নিজের জীবনটাকেই বিলিয়ে দিতে হয়।

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের রয়েছে একটি বড় ভূমিকা। এই সম্মানিত শ্রেণি সম্প্রদায় হয়তো একজন নেতার মতো মাঠে সবসময় বিচরণ করেন না। কিন্তু তাদের শক্তিশালী-সাহসী কলম কাজ করে দেশমাতৃকার সেবায়-চিন্তায় সর্বক্ষণই। রাজনীতিবিদদের প্রধান সহায়ক শক্তি হচ্ছে এদেশের সাহিত্যিক-সাংবাদিক সর্বোপরি বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণী। এদের লেখনির সারাংশ অনেক সময়ই একজন রাজনীতিকের ভাবনার সাথে ঐক্য স্থাপনে নতুন সিদ্ধান্তে ব্রতি হয়। বিশেষত বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে বুদ্ধিজীবী শ্রেণির রয়েছে ব্যাপক যোগাযোগ। এর পিছনে যে কারণ তাহলো বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময় থেকেই দেখা যায় বুদ্ধি-তত্ত্ব-চিন্তা-তথ্য এর সমন্বয়ে তাঁর পার্টি পরিচালিত হয়েছে। আর এ সবের পিছনে এদেশের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, প্রগতিবাদী চিন্তাশীলেরা একাত্ম হয়ে কাজ করেছেন। এখনো এ ধারা বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের রাজনীতির ক্ষেত্রে অক্ষত আছে।

বর্তমান সরকারের পাশে সুচিন্তিত মতামত-পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেন বহু সূর্যসন্তানেরা। এরাও কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই সম্প্রদায়টি পড়েছেন ঝুকির মধ্যে। এদের বিপদও কম নয়। বিদগ্ধ এই সমাজের অপরাধ হলো সরকারকে সৎ পরামর্শ, সুশাসন, মৌলবাদ-জঙ্গিবাদমুক্ত দেশগড়ার পরামর্শ প্রদান করা। কয়েকদিন আগে মুক্তচিন্তার মানুষ অভিজিৎ রায়কে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর পিতা অধ্যাপক অজয় রায় একজন খ্যাতিমান লেখক-শিক্ষাবিদ। হত্যার এই প্রক্রিয়াকে আমি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া বলবো। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের শেষপর্যায়ে আমরা কি দেখতে পেয়েছি। ঘাতকের বুলেট ছিনিয়ে নিয়েছে এদেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ ও সন্তান বুদ্ধিজীবীদের। এটা আসলে নতুন নয়। বহু সাংবাদিককে তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমরা অকালে চলে যেতে দেখেছি, দেখছি।

অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুর ঘটনা এদেশের রাজনীতিরই এক ধারাবাহিক প্রকাশ। এর আগেও আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. হুমায়ুন আজাদকে নির্মমভাবে নিহত হতে দেখেছি, ব্লগার রাজীবদের অসহনীয় মৃত্যু দেখেছি। একটি দেশের প্রগতির চাকাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার ক্ষেত্রে রাজনীতিকদের অবদানের পাশাপাশি বুদ্ধিভিত্তিক সম্প্রদায়ের অবদানের কথা ভুলে গেলে চলবে না। তাছাড়া মুক্তমনা মানুষগুলো বর্তমান জঙ্গিদের টার্গেটে পরিণত হবার পিছনেও রয়েছে এক বড় কারণ। প্রায়ই মুর্খ এই বর্বর জঙ্গিগোষ্ঠীদের ধারণা এদেশের যে সমস্ত প্রগতিশীল বুদ্ধিবাদীরা আছেন তারা আওয়ামীলীগের পক্ষে কাজ করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো এ চিন্তার সত্যতা থাকতেও পারে, কিন্তু তাদের মনে রাখা দরকার কোনো অভিপ্রায় আর স্বপ্ন নিয়ে জ্ঞানীরা কাজ করেন না। তারা চিন্তা করেন ভালোর এবং সফলতার। আর তা যদি বর্তমান সরকারের চিন্তার-কর্মের সাথে মিলে যায় তার দায় তাদের জীবন দিয়ে নিতে হবে কেন? পৃথিবীর সব মানুষই জঙ্গিবাদী চিন্তায় একিভূত হবে, এটাই বা জঙ্গিদের মাথায় আসে কি করে?

পৃথিবী অনেক এগিয়েছে, দারুণ গতিপ্রবাহের যুগে মানুষের জীবনে এসেছে ছন্দ। তারা জীবনকে নতুন করে উপলব্ধি করতে শিখেছে। জোর করে তৈরি করা বর্বর ধর্মীয় ধারণা চাপিয়ে দেবার প্রসঙ্গ ইসলামের কোথাও নেই। একথা বহবার বহু ইসলামী চিন্তাবিদেরা বলেছেন। কিন্তু ফলাফল যা তা শুন্যই রয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে যে ঘটনা অব্যাহত রয়েছে তার পিছনে সহজ কোনো সমীকরণ নেই। ভাবতে হবে কঠিনভাবে, সিদ্ধান্ত নিতে হবে দৃঢ়চিত্তে।

একটি স্বাধীন দেশের কয়েকটি উদ্ভট দলের ওপর ভর দিয়ে কতিপয় গর্দভ যে নর্দন-কুর্তন করছে তা এদেশের জন্যে তো নয়ই আগামী পৃথিবীর জন্যের এক ভয়ঙ্কর পন্থা। এই অপশক্তিদের বিরুদ্ধে সমগ্র পৃথিবীর সোচ্চার, বিশেষত কলম সৈনিকেরা এক্ষেত্রে অগ্রগামী। আর যে কারণে জঙ্গিবাদীদের তালিকায় দিনদিন মুক্তবুদ্ধির চর্চায় নিয়োজিত মেধাবী মানুষগুলোর নাম বাড়ছে। দেশের কতিপয় ভণ্ড-বকধার্মিক-অর্ধশিক্ষিতদের কোপানলে-রোষাণলে পড়ে সোনার মতো একটি দেশ তামার দেশে পরিণত হবার উপক্রম ঘটেছে। এর থেকে যেকোনো মূল্যে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।

প্রগতিশীল সমস্ত মানুষকে এক জায়গায় দাঁড়াতে হবে। মনে রাখা দরকার তাহলো এরা সংখ্যায় খুব বেশি নয়। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সমাজে স্বীকৃত নয়। অতএব এদের কোনো ঘর নেই, বসবাস নেই, এরা উচ্ছিষ্ট। সে কারণে গুটিকয়েক অসভ্য জন্তুর ভয়ে, ঘরে লেজগুটিয়ে লুকিয়ে না থেকে এদেরকে সামনাসামনি মোকাবিলা করা উচিৎ। সরকারকে এদের বিষয়ে আরো তৎপর হওয়া প্রয়োজন। প্রকাশ্য দিবালোকে কতিপয় দুর্বৃত্ত কেড়ে নিচ্ছে বহু মূল্যবান প্রাণ। এটা অনাকাঙ্খিত।

সরকারের সহায়তায় যারা বুদ্ধি দিয়ে, দেশের মঙ্গলের জন্যে ঝুকি নিয়ে তাদের সাহসী কলমে অনবরত লিখে চলেছেন, এদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টিও দেখা দরকার। যে কথা আরো বলা দরকার তাহলো সরকারের বিভিন্ন সৎ পরামর্শ দেয়া থেকে এই সম্প্রদায়টিকে মৌলবাদীরা দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। কেননা বুদ্ধিজীবী মহলটিকে দূরে সরিয়ে দিতে পারলে ঘাতকদের সুবিধা হবে সরকারকে আরো বিপদে, বেকায়দায় ফেলার। যুগে যুগে দেখা গেছে কোনো সৎ রাজনীতিক এবং তাঁর শাসন ক্ষমতাকে বিপর্যস্ত করার জন্যে পাশের প্রিয়তম বুদ্ধিদাতাদের সরিয়ে দেবার প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। সে প্রক্রিয়া এখন এদেশে শুরু হয়েছে। দিনদিন মূল টার্গেটে রাজনীতিক এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চায় নিয়োজিত মানুষগুলো চলে আসছে। সময়েই সবকিছু হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। অতর্কিতে জঙ্গিবাদের বর্বরোচিত হামলা ও নগ্ন-কলঙ্কিত চিন্তার ও অধ্যায়ের অবসান হবে। কিন্তু কখনো কখনো যে মূল্যবান প্রাণ হারিয়ে যায় অকালে আমাদের মাঝ থেকে, তা আর ফিরে আসে না। আর কেইবা তার ক্ষতিপূরণ দেবে।

দেশের এই বিপন্ন সময়ে সমস্ত প্রগতিবাদী-মুক্তবুদ্ধির চর্চায় নিয়োজিত মানুষের ঐক্যের এখন কোনো বিকল্প নেই। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত সেই কবিতার লাইন দিয়ে আজকের লেখাটির সমাপ্তি ঘটানো যায়। কবিতার লাইনটি ছিল এরকম- ‘সহজ কথা বলতে আমায় কহ যে/ সহজ কথা যায় না বলা সহজে’। রবীন্দ্রনাথের মতো মানুষটিও সহজ কথাটি সহজে বলতে পারেননি। আমি বুদ্ধিজীবী মহলকে মুমূর্ষু স্বদেশের ভীষণ দুঃসময়ে এক হবার কথা বলেছি। যদিও সেখানে রয়েছে নানামত, নানা পথ। একই জায়গায় দাঁড়ানো আসলে কারো তাবেদারি করার জন্যে নয়, এটি তাদের নিজেদেরই প্রয়োজনে। মনে রাখা দরকার সমন্বিত ও অখ- প্রচেষ্টাকে কেউ কখনো ভেঙে দিতে পারে না। আর সেই কারণেই মুক্তমনা মানুষের মধ্যে সমন্বয় ও মহান ঐক্য আজ বড় প্রয়োজন।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “প্রগতির ঐক্যের এখনই শ্রেষ্ঠ সময়

  1. যুগে যুগে দেখা গেছে কোনো সৎ
    যুগে যুগে দেখা গেছে কোনো সৎ রাজনীতিক এবং তাঁর শাসন ক্ষমতাকে বিপর্যস্ত করার জন্যে পাশের প্রিয়তম বুদ্ধিদাতাদের সরিয়ে দেবার প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। সে প্রক্রিয়া এখন এদেশে শুরু হয়েছে। দিনদিন মূল টার্গেটে রাজনীতিক এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চায় নিয়োজিত মানুষগুলো চলে আসছে। সময়েই সবকিছু হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। অতর্কিতে জঙ্গিবাদের বর্বরোচিত হামলা ও নগ্ন-কলঙ্কিত চিন্তার ও অধ্যায়ের অবসান হবে। কিন্তু কখনো কখনো যে মূল্যবান প্রাণ হারিয়ে যায় অকালে আমাদের মাঝ থেকে, তা আর ফিরে আসে না। আর কেইবা তার ক্ষতিপূরণ দেবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

66 − = 63