মে দিবসে দেশব্যাপী জাতীয় ন্যূনতম মজুরির দাবি

মে দিবস, ২০১৬-তে দেশব্যাপী জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা ও তা বাস্তবায়নের দাবি উঠেছে। বিভিন্ন শ্রমিক ও রাজনৈতিক সংগঠন দেশের অর্থনীতির প্রসার ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সব ধরণের মজুরদের বেতন নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। অর্থনীতিবিদ, শ্রমপরিস্থিতি গবেষক ও শ্রমিক আন্দোলনের পোড় খাওয়া নেতারাও একই দাবিতে বক্তব্য রেখেছেন, লিখেছেন ও প্রকাশ করেছেন নানা নিবন্ধ।

?oh=70ef618cc81a602820be23872a694e36&oe=57B364F2″ width=”500″ />

জাতীয় ন্যূনতম মজুরি হচ্ছে সারা দেশের যে কোনো অঞ্চলে যে কোনো কাজের জন্য সর্বনিম্ন মজুরি। যে কেউ যদি একজনকে কোনো কাজের জন্য নিয়োগ দিতে চান, তাকে এই মজুরি দিতে হবে। আইনি বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে তাই জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কার্যকর করতে হয়। এর চেয়ে কম মজুরি দিলে তা বেআইনি কাজ হিসেবে গণ্য হয় এবং শাস্তির আওতায় পড়ে। জাতীয় ন্যূনতম মজুরির সুবিধা পেলে তাই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর কিছু না হোক বেঁচে থাকার একটা ব্যবস্থা হয়। বিশ্বজুড়ে এজন্যই জাতীয় ন্যূনতম মজুরিকে ‘বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় মজুরি’ বলা হয়।

যে কোনো খাতের একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি কত হবে, রাষ্ট্র কর্তৃক এই সীমা ঠিক করে দেয়ার দাবিটা অনেক দিনের। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত কেবল বিশেষ কিছু খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির ব্যবস্থা করতে পেরেছে। যদিও জাতীয় ন্যূনতম মজুরির আলাপটা বাংলাদেশে নতুন নয়। ১৫ বছর আগে ২০০১ সালে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করেছিল সরকার। মালিকদের বিরোধিতায় ও মামলায় সেটি আদালতে আটকে গেছে। এর পরের সরকারগুলো আর কোনো তৎপরতা দেখায়নি। ফলে এখনও ঝুলছে জাতীয় ন্যূনতম মজুরির দাবি।

জাতীয় বাজেট প্রতি বছরই বড় হচ্ছে। বাড়ছে জিডিপির মোট পরিমাণ। বাড়ছে কোটিপতির সংখ্যা ও গড় আয়। সরকারি বিলবোর্ডগুলো ব্যাপক উন্নয়নের বার্তা দিচ্ছে। সরকার জোর দিয়ে বলছে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের রাষ্ট্র হবে বাংলাদেশ। অথচ দেশে মাত্র ৪২টি পেশা ব্যতীত অন্যদের মজুরির কোনো ঠিকঠিকানা নেই। যদিও ন্যূনতম মজুরির বিধানটা প্রধানত দরিদ্রদের দরকার। এরকম একটি বিধান থাকলে হতদরিদ্র মানুষের জীবনমানের কিছুটা উন্নতি ঘটে, অর্থনীতি গতিশীল ও তার ভিত্তি শক্ত হয়, শ্রম খাতের অব্যবস্থাপনা দূর হয়, মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতা হ্রাস পায়, শ্রমিকের অধিকার চর্চার সুযোগ বাড়ে।

এত কার্যকারিতা সত্ত্বেও কিন্তু সরকারের দিক থেকে এখনও জাতীয় ন্যূনতম মজুরি প্রণয়নের কোনো উদ্যোগ নেই। নিউজিল্যান্ডে সেই ১৮৯৪ সালে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি চালু হলেও ডিজিটাল বাংলাদেশে এখনও তা অধরা। যদিও তুলনামূলক দুর্বল অর্থনীতির দেশ নেপালে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি চালু আছে, এমনকি আছে মিয়ানমারেও। শ্রমবিশ্লেষকরা মনে করেন, জাতীয় ন্যূনতম মজুরি প্রদানের বাস্তবতা বিরাজ করলেও মালিকদের অসহযোগিতা ও চাপ এবং সরকারের অনাগ্রহের কারণেই এটি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে বর্তমানে কেনাবেচার অর্থনীতি বেশ চাঙা। ফলে সব ধরনের শহর এলাকায় দেখা যায় বিপুল পরিমাণ দোকানপাট। এসব দোকানের কোটিরও বেশি কর্মচারীর জন্য কোনো ন্যূনতম বেতন কাঠামো নেই।

সরকারি হিসাবে দেশের ৪৫ ভাগ মানুষ এখনও কৃষিশ্রমের সঙ্গে যুক্ত। কৃষিনির্ভর দেশ বলা হলেও মাত্র ৫ বছর আগে ২০১০ সালে শ্রম আইনে শ্রমিকের সংজ্ঞায় কৃষিশ্রমকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে এখনও এই বিপুল পরিমাণ কৃষকের ন্যূনতম মজুরির কোনো ব্যবস্থা হয়নি।

দেশে বর্তমানে গৃহকর্মীর সংখ্যা ২০ লাখেরও বেশি। মজুরি প্রশ্নে তারা চরম অন্যায়ের শিকার হচ্ছেন। এখনও তারা শ্রমিক হিসেবে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাননি। এমনকি সাপ্তাহিক ছুটি বা মে দিবসের ছুটিও তারা পান না। ন্যায্য মজুরি বুঝে নেয়া দূরে থাক, মারধর-নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়াই দায়।

এমনকি দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত চা শিল্পের প্রায় দেড় লাখ শ্রমিকেরও ন্যূনতম মজুরি বলে কিছু নেই। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর অবধি তাদের দৈনিক মজুরি ছিল ৬৯ টাকা। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে চা-শ্রমিকরা ৪০০ টাকা দৈনিক ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আন্দোলন করেন। সরকার এই খাতে ন্যূনতম মজুরি প্রণয়ন না করায় মালিকরা দৈনিক মজুরি ৮৫ টাকার মধ্যে শ্রমিকদের বেঁধে ফেলতে সক্ষম হয়। যা কিনা প্রায় বেগার খাটার শামিল।

দেশে প্রায় ২৫ লাখের মতো যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করছে। এর সঙ্গে প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিক যুক্ত, যার বড় একটা অংশ শিশুশ্রমিক। এদের মজুরি খুব কম হয়, ড্রাইভিং শেখানোর প্রতিশ্রুতিতে নামকাওয়াস্তে দৈনিক কিছু টাকা দেয়া হয়। এত বড় খাতটিতেও নেই ন্যূনতম মজুরি।

?oh=39e5ec6d528d38a76d467c6def9cde68&oe=57AFA3DE” width=”500″ />
অপ্রচলিত খাতের শ্রমিকদের জন্য রাষ্ট্র নির্ধারিত কোনো বেতন কাঠামো না থাকায় হতদরিদ্ররা দিন-রাত শ্রম দিয়েও ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

অবস্থাদৃষ্টে প্রমাণ হয় বড় খাত কিংবা ছোট খাত, প্রতিষ্ঠিত শিল্প খাত কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাত, সর্বত্রই মজুরি নিয়ে অব্যবস্থাপনা জারি রয়েছে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী জনগণ শ্রম দেয়ার পরেও বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের বাঁচার মতো প্রয়োজনীয় মজুরি নিশ্চিত হচ্ছে না। মালিকদের জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে কাজ শেখানোর নামে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শ্রমিককে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এটা নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার মানবিক মূল্যবোধ ও সাংবিধানিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য নির্মূলের ক্ষেত্রে বড় বাধা।

২০১৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ‘শ্রমশক্তি জরিপ-২০১৩’ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট কর্মরত শ্রমশক্তি ৫ কোটি ৮১ লাখ। এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজারে কাজ করেন মোট শ্রমশক্তির মাত্র ১৩ ভাগ। বাকি ৮৭ ভাগ কাজ করেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। এদের কাজ আছে, কিন্তু আয়ের নিশ্চয়তা নেই, শ্রমের স্বীকৃতি নেই, নিরাপত্তা নেই, মর্যাদা নেই।

প্রতিষ্ঠানিক শ্রমবাজারের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি উভয়ই পড়ে। এরা রাষ্ট্রীয় আইনের আলোকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে বাধ্য। শ্রম আইন মেনে চলা, শ্রমিকের কাজের সময় পূর্বনির্ধারণ এবং শ্রমিকের স্বার্থরক্ষায় তার সংগঠন করার নিশ্চয়তা দিতে হয় এই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বিপরীতে অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজারে এসব নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করা হয় না। ফলে প্রায় ৫ কোটি ৫৫ লাখ শ্রমজীবীই থেকে যাচ্ছেন সুরক্ষাহীন। এত মানুষকে ন্যূনতম মজুরি না দিতে পারলে দেশ মধ্যম আয়ের দিকে এগুনোর কোনো সম্ভাবনা নেই। যদিও সরকার মধ্যম আয় সম্পর্কে ব্যাপক আগ্রহী!

জানা যায়, এখন পর্যন্ত খাতভিত্তিক ন্যূনতম মজুরির দাবিতে শ্রমিকরা কথা বলছেন। এর ফলে ৪২টি খাতে ন্যূনতম মজুরির বিধান চালু হলেও শ্রম আইনে তা মানার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ২০০৬ সালের শ্রম আইনের অধীনে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন হলেও তা হয়েছে নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে। ফলে এটি দুর্বল থেকে গেছে। এমনকি বিধি অনুযায়ী সরকার যদি কোনো খাতকে ন্যূনতম মজুরি খাতে অন্তর্ভুক্ত না করে, তাহলে সেই খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষমতা বোর্ডের নেই।

আইনি এসব জটিলতা ছাড়াও রয়েছে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কত হবে, তা নির্ধারণে সমস্যা। কর্মঘণ্টা ধরে মজুরি ঠিক করার নিয়ম চালু না হওয়ায় এক ধরনের সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। গৃহশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, দোকানশ্রমিক, সাংবাদিক, শিক্ষকের মতো পেশাগুলোতে নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই। ফলে মাসভিত্তিক জাতীয় ন্যূনতম মজুরির হার ঠিক হলে এদের ক্ষেত্রে সেটা কিভাবে প্রযোজ্য হবে তা অনির্দিষ্ট থেকে যায়। কৃষিশ্রমিকের কাজ থাকে মৌসুমভিত্তিক। সুতরাং তার মজুরি নির্ধারণের প্রশ্নটি গভীর সংবেদনশীলতা নিয়ে বিচার করা দরকার।

শ্রমিকের বেঁচে থাকার প্রয়োজন মেটানোটাই ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভিত্তি হওয়া উচিত। একজন শ্রমিক দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করে চারজনের পরিবারের ব্যয় বহন করতে পারলে সেটা হয় আদর্শ ন্যূনতম মজুরি। আন্তর্জাতিক চলকগুলো হিসাব করে এটা প্রণয়ন করা হলে কোনোক্রমেই শহরে তা ১৫ হাজার টাকার কমে হয় না।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এক্ষেত্রে দারিদ্র্যসীমার আয়কে ভিত্তি ধরে দেখিয়েছেন এটি হতে হবে ১৬ হাজার টাকা।

বিশেষজ্ঞরা মতপ্রকাশ করেছেন যে, জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কিছুতেই জাতীয় গড় আয়ের কম হতে পারে না। সরকারি হিসাবে এখন বাংলাদেশের একজন নাগরিকের বার্ষিক গড় আয় ১৩১৬ মার্কিন ডলার বা ১ লাখ ২ হাজার ৬৪৮ টাকা (ডলার = ৭৮ টাকা)। প্রতি মাসে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ হাজার ৫৫৪ টাকা।
বিদ্যমান এসব হিসাব-নিকাশ থেকেই একটিকে বেছে নিতে হবে। তবে সেক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছেন মালিকরা। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে এরূপ কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকায় এই মালিকরা ন্যূনতম মজুরি ঠেকাতে মরিয়া।

উন্নত দেশগুলোর কথা বাদ দিয়ে শুধু পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর হিসাব ধরলেই বেরিয়ে আসে যে, বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে অনেক আগে থেকে আছে এবং নিয়মিত তা নবায়িত হচ্ছে। ভারতে প্রাদেশিকভাবে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিধান রয়েছে। বিহারে এটা সর্বনিম্ন, দৈনিক ১৫০ রুপি। দিল্লিতে সর্বোচ্চ, দৈনিক ৩৬১ রুপি। সে দেশে কৃষিশ্রমিকদের জন্য ভিন্ন মজুরি কাঠামো রয়েছে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী পাকিস্তান, মিয়ানমার, নেপালেও জাতীয় ন্যূনতম মজুরি চালু আছে।

১৯৬৯ সালে ব্যাপক শ্রমিক আন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের সামরিক সরকারের শ্রমমন্ত্রী নূর খানের কমিশন জাতীয়ভিত্তিতে ১৫৫ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে। এর মধ্যে ১২৫ টাকা ছিল মূল মজুরি, ৩০ টাকা প্রান্তিক ভাতা। এটাই ছিল এ অঞ্চলের শ্রমিকদের প্রথম জাতীয় ন্যূনতম মজুরি। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর এই মজুরি বাতিল হয়ে যায়।

এরপর ২০০১ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন সরকার একটি জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কাঠামো ঘোষণা করেছিল। তাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের শ্রমিকদের জন্য ১২০০ টাকা ও বড় শিল্পের শ্রমিকদের জন্য ১৩৫০ টাকা মাসিক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এর বিরোধিতা করে আদালতে যায় মালিকদের সর্বোচ্চ সংগঠন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ)। মজুরি নির্ধারণের পদ্ধতিগত ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখিয়ে উচ্চ আদালত এই মজুরির আদেশকে স্থগিত করে। এখনও তা বহাল আছে।

মালিকপক্ষ বরাবরই একই বক্তব্য দিচ্ছে। জাতীয় ন্যূনতম মজুরির বিপক্ষে তাদের যুক্তি হচ্ছে, একটি জাতীয়ভিত্তিক নিম্নতম মজুরি একদিকে দেশের বিরাট অনানুষ্ঠানিক খাতের জন্য মজুরি প্রদানের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে। অথচ অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন উপখাতের সেই সক্ষমতা নেই। অন্যদিকে অধিক হারে মজুরি দিতে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিল্প খাত জাতীয় ন্যূনতম মজুরির অজুহাত তুলে শ্রমিকদের কম মজুরি দিতে চাইবে, যা আবার শ্রম অসন্তোষ তৈরি করতে পারে।

যদিও শ্রমিকপক্ষ মনে করে, মালিকদের এসব দাবির ভিত্তি নেই। কারণ ন্যূনতম মজুরি হচ্ছে পারিশ্রমিকের সর্বনিম্ন সীমা, সর্বোচ্চ নয়। শ্রমঘন শিল্পের শ্রমিকরা দর কষাকষির ভিত্তিতে নিজেদের মজুরি বাড়িয়ে নিতে পারবে। তাছাড়া দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। কোনো খাত দুর্বল হলে সে সরকারের কাছে প্রণোদনা চাইবে। শ্রমিকের মজুরি কমিয়েই কেবল মুনাফা করার কথা মালিকদের ভাবা উচিৎ নয়।

শ্রমপরিস্থিতি গবেষকদের দাবি, মুনাফা সর্বোচ্চ করার তাড়নায় পুঁজিপতিরা কিছু পথ অবলম্বন করে। শ্রমিকের মজুরি কমায়, শ্রমঘণ্টা বাড়ায় এবং প্রযুক্তির বিকাশে বিনিয়োগ করে। এর ফলে শ্রমিক দিন-রাত শ্রম দিয়েও বেঁচে থাকার মতো অর্থ পায় না। কিন্তু বর্তমান ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্র কারো সম্পদ কেড়ে নিতে পারে না। ফলে শ্রমিকের চাহিদা মেটানোর জন্য মালিকের কাছ থেকে ন্যায্য মজুরি আদায়ই এক্ষেত্রে সুব্যবস্থাপনা কায়েমের একমাত্র উপায়। যদিও শ্রমিকপক্ষের বক্তব্য হচ্ছে, তারা আন্দোলন না করা অবধি আজ পর্যন্ত কোনো সরকারই নিজের উদ্যোগে মজুরি পুনর্নির্ধারণের কথা বলেনি।

এই অবস্থার অবসান ঘটাতে হলে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি ও তৎপরতায় পরিবর্তন দরকার। ১৫ বছর ধরে ঝুলতে থাকা জাতীয় মজুরির দাবি নিষ্পত্তি করে শ্রমিকের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের প্রমাণ সরকারকে দিতে হবে। এবারের মে দিবসে এই দাবি আরও সংহত হয়েছে। শ্রমিকরা অচিরেই এ দাবি না মানা হলে পুরো রাষ্ট্র অচল করারও হুমকি দিয়েছেন। সরকারের উচিৎ হবে শ্রমিকদের ন্যায্য এই দাবি দ্রুত মেনে নেয়া ও সব ধরণের মালিকদের ন্যুনতম মজুরি দিতে বাধ্য করা। তা না করলে এই ন্যায্য দাবি বলপ্রয়োগেই আদায় করবেন বলে মে দিবসের বিভিন্ন সমাবেশে বারংবার ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমিকরা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

50 + = 52