শুভ জন্মদিন সত্যজি‌ৎ রায় – এক প্রমিথিউস

আজ ২ মে, প্রথিতযশা চলচ্চিত্র পরিচালক এবং বহুগুণে গুণাণ্বীত ব্যক্তিত্ব সত্যজি‌ৎ রায়ের জন্মদিন। ১৯২১ সালের এই দিনে তিনি কলকাতার বিখ্যাত রায় পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা ছিলেন বিখ্যাত শিশুতোষ সাহিত্যিক, চিত্রকর এবং সমালোচক সুকুমার রায় এবং মাতা ছিলেন সুপ্রভা রায়। সত্যজি‌ৎ-এর পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়-ও ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বিখ্যাত লেখক, চিত্রকর, দার্শনিক এবং ব্রক্ষ্ম সমাজের একজন নেতৃস্থানীয় পদের অধিকারী।

সত্যজি‌ৎ তার জীবদ্দশায় ফিচার, ডকুমেন্টারী এবং শর্ট ফিল্ম মিলিয়ে মোট ৩৬-টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। ১৯৫৫ সালে মুক্তি পাওয়া সত্যজি‌ৎ রায় পরিচালিত প্রথম সিনেমা “পথের পাঁচালী” মুক্তি পায়। যা ১৯৫৬ সালের কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উ‌ৎসবে “বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট এ্যাওয়ার্ড”-সহ মোট ১১ টি আন্তর্জাতিক পুরষ্কার লাভ করে। এটি ছাড়া তাঁর অন্যান্য বিখ্যাত ছবিগুলোর মধ্যে “অপরাজিত (১৯৫৬)” এবং “অপুর সংসার (১৯৫৯)”-এর কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব সিনেমায় পরিচালনার পাশাপাশি তিনি অভিনয়, স্ক্রিপ্ট লেখা এবং সম্পাদনার কাজও করেন। জীবদ্দশায় তিনি ৩২-টি “ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ফিল্ম এ্যাওয়ার্ড” সহ বিভিন্ন অসংখ্য পুরষ্কারে ভূষিত হন। ১৯৯২ সালে তিনি “এ্যাকাডেমি অনরারি এ্যাওয়ার্ড” এবং ভারত সরকার কর্তৃক “ভারতরত্ন” উপাধিতে ভূষিত হন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর কৃতিত্বের সম্মানস্বরূপ তাঁকে সম্মানসূচক ডিগ্রীতে ভূষিত করে।

বহুমুখী প্রতিভাধর সত্যজি‌ৎ রায় চলচ্চিত্র পরিচালনা এবং অভিনয়ের পাশাপাশি একজন সুণিপুণ লেখক, চিত্রকর, প্রচ্ছদকার, গীতিকার এবং চলচ্চিত্র সমালোচক হিসেবে ছিলেন স্ব-মহিমায় ভাস্বর। জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন, রূপসী বাংলা সহ বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় এর চাঁদের পাহাড়ের জন্যও প্রচ্ছদ এঁকেছেন তিনি।

&imgrefurl=http://swarajyamag.com/culture/the-rare-ray-of-talent&h=1018&w=1200&tbnid=4Fn2LPxWpJFPsM:&tbnh=169&tbnw=200&docid=Enopi78KxtNDKM&itg=1&client=firefox-b-ab&usg=__8BoEj3VkkHtYGrji0_B89-DC6rQ=” width=”400″ />

১৯৪৩-সালে সত্যজি‌ৎ রায় “ডি.জে কেমার”-নামক এক ব্রিটিশ এ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সীতে মাসিক ৮০ রুপি মজুরী-তে কাজের মাধ্যমে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু করেন। যদিও সে সময় সেখানে ভারতীয় এবং ব্রিটিশ কর্মচারীদের মধ্যে বেতন বৈষম্য ছিল তবুও সত্যজি‌ৎ রায়ের গুণে মুগ্ধ হয়ে এজেন্সী তাঁর ক্ষেত্রে কোন বৈষম্য করত না। পরে তিনি ডি.কে গুপ্তা-র “সিগনেট প্রেস’-এ ও কাজ করেন। ১৯৪৭ সালে তিনি অন্য কয়েকজন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব্যের সাথে একত্রে “কোলকাতা ফিল্ম সোসাইটি”-র প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৯ সালে ফ্রেঞ্চ চলচ্চিত্র পরিচালক জিন রিনয়ের কলকাতায় “দ্য রিভার” ছবির শ্যুটিং এর জন্য আসেন এবং সত্যজি‌ৎ রায় তাঁকে অপরিসীম শ্রম ও সময় দিয়ে সাহায্য করেন। এই কাজ করতে গিয়েই সত্যজি‌ৎ তাঁর দীর্ঘদিনের ইচ্ছা এবং আইডিয়া “পথের পাঁচালী”-র কথা রেনয়ের এর সাথে আলাপ করেন এবং তিনি তাঁকে উ‌ৎসাহিত করেন। ১৯৫০ সালে ডি.জে কেমার কোম্পানী তাঁকে লন্ডনে তাদের হেডকোয়ার্টারে ট্রেনিং করতে পাঠায়। লন্ডনে তিন মাস অবস্থানকালে সত্যজি‌ৎ ভিত্তরিও ডি সিকা পরিচালিত “বাইসাইকেল থিভস (১৯৪৮)” সহ ৯৯-টি চলচ্চিত্র দেখেন। মূলত: ঐ ছবিটিই তাঁকে পরিচালনায় অণুপ্রাণিত করে এবং লন্ডনে বসেই তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনায় নামার সিদ্ধান্ত নেন।

একজন লেখক হিসেবেও তিনি বাংলা সাহিত্যকে করেছেন সমৃদ্ধ। তাঁর সৃষ্ট ফেলুদা, প্রফেসর শঙ্কু প্রভৃতি চরিত্র এবং এদের নিয়ে লেখা বইগুলো চিরভাস্বর হয়ে জ্বলজ্বল করবে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে। ১৯৮২ সালে সত্যজি‌ৎ রায় তাঁর ছোটবেলার বিভিন্ন ঘটনা-অভিজ্ঞতার অবলম্বনে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ “যখন ছোট ছিলাম” লিখে যান। তাঁর প্রায় সব লেখাই ইংরেজী সহ বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত হয়।

১৯৪৯ সালে সত্যজি‌ৎ রায় দীর্ঘদিনের প্রেমিকা বিজয়া দাস-কে বিয়ে করেন। এই দম্পতির পুত্র সন্দ্বীপ রায়-ও বর্তমান সময়ের একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক। ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল হার্ট এ্যাটাকের কারনে নিভে যায় এই মহান গুণীর জীবনপ্রদীপ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 57 = 65