দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রনে পুলিশের ভুমিকা অপরিসীম

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের এই মেয়াদেই পুলিশ বাহিনীতে ৫০ হাজার নতুন সদস্য নিয়োগ দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। একই সঙ্গে RAB-কে আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ৪০ হাজার অপরাধীর তথ্য ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্রিমিনাল ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে।-(তথ্যসুত্রঃ বাসস)

বর্তমান সময়ের সাইবার ক্রাইম সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, দেশে সাইবার ক্রাইমের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। এ ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ড রোধে নিরলসভাবে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। RAB-এর ক্রিমিনাল ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। সেখানে সকল অপরাধীর নাম, ঠিকানা, পেশা, ছবি, ফিঙ্গার প্রিন্ট, আঙ্গুলের ছাপ, চোখের চিত্র, অপরাধের ধরন, অপরাধের সংখ্যা, অতীতের রেকর্ড ও ডিএন সংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন তথ্য থাকবে।

একটু পিছনে বাংলাদেশ পুলিশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশমাতৃকার তরে প্রথম যে বাহিনী সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তা হচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী। ২৫ শে মার্চের কালো রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে এই বাহিনীর সদস্যরা ৩০৩ রাইফেল দিয়ে পাকিস্থানী হানাদারদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ান এবং নিঃশঙ্ক চিত্তে লড়াই করে প্রান দান করেন। এই বাহিনী সম্পর্কে অনেকেই অনেক কথা বলে থাকেন বা ভাবেন, পজিটিভ নেগেটিভ সবই বলা হলেও এই বাহিনীর নেতিবাচক ধারনাটা বোধ করি বেশি শোনা যায়, কিন্তু এই বাহিনীর এমন গৌরবজ্জ্বল অতীতের কথা নিশ্চয় অনেকেই জানেন না, হানাদারদের ভারী অস্ত্রের গোলায় ঝাঝরা হয়ে গিয়েছিল সবকটি পুলিশ ব্যারাক, অসংখ্য পুলিশ সদস্য মৃত্যুবরণ করেন, তবুও কেউ মাথা নত করেনি, এই রাজারবাগ থেকেই শুরু হয় প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ। অনেক গুণ বেশি ও উন্নত অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে রাতভর যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিলেন রাজারবাগের বীর পুলিশ সদস্যরা। শেষ পর্যন্ত শহীদ হলেন অন্তত একশ পুলিশ সদস্য। বন্দী হলেন আরও দেড়শ।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পুলিশের মহাপরিদর্শক আবদুল খালেক বেতারে একটি ভাষণ দিয়ে পুলিশ বাহিনীকে উজ্জীবিত করেন। সেই ভাষণের কপিটিও আছে জাদুঘরে। ওই ভাষণে দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

যা হোক, মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বক্তব্যকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা বড়ই অপ্রতুল। বিশাল জনসংখ্যার এই দেশে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য পুলিশের জনবল বাড়ানো একান্ত প্রয়োজন। তা নাহলে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দিনদিন দুর্বল হয়ে পড়ছে।

অপ্রিয় হলেও সত্য যে, পুলিশদের প্রতি আমাদের দেশের সাধারন মানুষদের দীর্ঘদিনের একটি নেতিবাচক ধারনা রয়েছে। অনেকেই কটাক্য করে বলেন যে, পুলিশ হচ্ছে সরকারী লাইসেন্সধারী মাস্তান। তারা চরম ঘুষখোর, দুর্নীতিগ্রস্থ। অথচ প্রথম বিশ্বের দেশগুলোতে দেখছি পুলিশকে জনগন পরম বন্ধু মনে করে থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশে পুলিশের বিরুদ্ধে জনগনের এই বিরূপ প্রতিক্রিয়া কেন? নিশ্চয়ই এর পিছনে অনেক কারন রয়েছে।

সরকার পুলিশ বাহিনীতে ৫০ হাজার নতুন সদস্য নিয়োগ দিবে জেনে আমরা সাধারন জনগণ অনেক খুশি হয়েছি। কিন্তু কিছু বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। রাজনৈতিকভাবে যেন এসব পুলিশদের নিয়োগ দেওয়া না হয়। রাজনৈতিকভাবে সরকারী চাকরীতে নিয়োগকৃত মেধাহীন লোকবল একটি প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতিগ্রস্থ এবং দুর্বল করে দেয়। কারন তাদের মধ্যে ‘প্রফেসনালিজম’ বিষয়টি থাকে না।

আরেকটি বিষয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে সংক্ষিপ্ত ট্রেনিংপ্রাপ্ত এসব লোকজন অনেক ক্ষেত্রেই অযোগ্য এবং অদক্ষ হয়ে থাকে। সরকারের উচিত হবে, রাজনৈতিক কোন সুপারিশ ছাড়া মেধার ভিত্তিতে, যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের নিয়োগ দেওয়া।

প্রায়শই একটি অভিযোগ শোনা যায় যে, বাংলাদেশে পুলিশ ডিপার্টমেন্ট হচ্ছে সবচেয়ে বেশী দুর্নীতিগ্রস্থ, তারা ঘোষখোর। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এসব দুর্নীতিগ্রস্থ, ঘুষখোর পুলিশদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। জনগনের নিরাপত্তা যারা দিবে তারাই যদি দুর্নীতি গ্রস্থ হয়ে থাকে তাহলে সাধারন জনগনের নিরাপত্তার বিষয়টি সরকার কিভাবে নিশ্চিত করবে?

পুলিশের পবিত্র দায়িত্ব হচ্ছে যেকোন মুল্যে সাধারন জনগনের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা, তাদের হেফাজত করা। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, গত ২৬শে নভেম্বর, ২০১৪ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানায় মানবপাচারের মামলা দায়ের করতে গিয়ে রইশ উদ্দিন নামে এক আইনজীবী থানার ওসি মো. জসীম উদ্দিনের হাতে প্রহৃত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে, জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মো. রইশ উদ্দিন জানান, তিনি জেলা ও দায়রা জজ ও পিপি’র পরামর্শে একটি মানবপাচার মামলা দায়ের করার জন্য সকালে সদর মডেল থানায় যান। ওসির সঙ্গে দেখা করার পর তিনি মামলা দায়েরের জন্য মুন্সির কাছে যেতে বলেন। এর কিছুক্ষণ পর ওসি জসীম উদ্দিন মুন্সীর রুমে গিয়ে অ্যাডভোকেট মো. রইশ উদ্দিনকে গালিগালাজ করে চড়থাপ্পর মারেন এবং মারতে মারতে হাজতে নিয়ে আটকে রাখেন। পরে তাকে মুচলেকা নিয়ে থানা থেকে ছাড়া হয়। এসবই হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগকৃত দুর্নীতিগ্রস্থ পুলিশদের পেশাগত অদক্ষতার ফলে।

সরকারের উচিত এসব দুর্নীতিগ্রস্থ, অদক্ষ পুলিশদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করা। পুলিশ বাহিনীর সগৌরব ইতিহাসের আলোকে তাদের উচিত মনপ্রান দিয়ে জনগনের সেবক হিসেবে কাজ করে যাওয়া যাতে সাধারন মানুষজন পুলিশকে আবার আপন ও বন্ধু ভাবতে শুরু করে। তাদের হারানো গৌরব তাদেরকেই আবার ফিরে পেতে সচেষ্ট হতে হবে।

বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী আবার দেশের অহংকার হয়ে উঠবে, দেশ ও সর্বোপরি দেশের সাধারন জনগনের সেবায় মনপ্রান দিয়ে আত্মনিয়োগ করবে এই কামনা করছি। যেসব দুর্নীতিগ্রস্থ পুলিশদের কারনে পুলিশ বাহিনী জনমানসে কলংকিত হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই সৎ পুলিশদের কর্মকাণ্ড জনগনের হৃদয় স্পর্শ করবে। কর্মরত অবস্থায় কোন পুলিশ মারা গেলে জনগনের মন ব্যথিত হবে।

সর্বোপরি, পুলিশ বাহিনীকে মনে রাখতে হবে তাদের পেশা হচ্ছে একটি মহৎ এবং পবিত্র পেশা যা দিয়ে দেশের সেবা করা যায়, দেশের মানুষের সেবা করা যায়। কোন প্রকার পার্থিব লোভের বশবর্তী হয়ে তাদের এই মহৎ পেশার পবিত্রতাকে বিলিয়ে দেওয়া কোনক্রমেই সমোচীন হবে না। আশা করি, দেশ ও দেশের জনগণের সেবায় পুলিশ সর্বদা নিজেদের নিয়োজিত রাখবে।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রনে পুলিশের ভুমিকা অপরিসীম

    1. আপনাকেও ধন্যবাদ। কিন্তু
      আপনাকেও ধন্যবাদ। কিন্তু বর্তমান সময়ে তারা তাদের গুরু দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এটাই বাস্তব। তাদের হারিয়ে যাওয়া সুনাম ফিরে পেতে তাদেরকেই চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। @ তামান্না রহমান

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 60 = 65