ধর্ম এবং জঙ্গিবাদ এক বিষয় নয়

সন্ত্রাস, ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত একটি পৃথিবীর স্বপ্ন মানুষের সেই আদিকাল থেকে। সেইসব স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে মানুষের অব্যাহত প্রচেষ্টাও থেমে নেই। এখানে এই পৃথিবীতে দুশ্রেণির মানুষ লক্ষ্যণীয়। একশ্রেণির মানুষ রয়েছেন যাদের কর্মপ্রচেষ্টায় পৃথিবী ক্রমশ এগিয়ে যাবার পথে। আর এক শ্রেণির মানুষ রয়েছে যাদের আগমন ঘটেছে দুষ্টুগ্রহ থেকে, তাদের নিয়ত কর্ম হচ্ছে শান্তির পৃথিবীতে অনাহুত অশান্তি তৈরি করা। এরা মানুষের পক্ষে দাঁড়াবার কথা ভুলে মানুষের জীবন বিপন্নের খেলায় নিত্য মগ্ন। খুব বেশি মানুষ যে এই সমস্ত অপকর্ম, অপ-তৎপরতায় লিপ্ত তা অবশ্য নয়।

কিন্তু কতিপয় নষ্ট মানুষের সম্প্রদায়ের-গোষ্ঠির হিংস্র থাবায় পৃথিবীর বুকে নেমেছে আজ অন্ধকার। এখনো এ বিশ্বে ভালোর দিকে যাত্রীই বেশি। নাহলে এ পৃথিবী চলমান থাকত না। জঙ্গিবাদ-মৌলবাদ-সন্ত্রাসবাদ বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত এবং ঘৃণিত এক বিষয় এখন। মানুষ মানুষের হন্তারক হয়ে যায় নিমিষেই। অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ধূলায় লুটায় মুহূর্তেই। কি এক বৈরি বিশ্বে বেঁচে আছি আমরা। এর পিছনে রাজনীতির যে কুটচাল নেই, রাজনীতির মৃত্যু খেলা নেই তা নয়। কিন্তু এই রাজনীতি সভ্য পৃথিবীতে মানুষের কাম্য নয়।

জীবন খুব বড় নয়। যারা এখানে আছেন তারাও বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের হিংস্র থাবায় দুর্বিষহ অবস্থায় মৃত্যুর দিন গোনে। তার ওপর ভূমিকম্প-ঝড়-জলোচ্ছাস-মহামারিতে নিয়ত পৃথিবী কম্পমান। সেখানে গোদের ওপর বিষ ফোড়ার মতো ধেয়ে আসছে জঙ্গিবাদ। সমগ্র বিশ্ব এখন জঙ্গিবাদী থাবায় আক্রান্ত। কেউ মুক্ত নয়। যারা এদের ইন্ধন জোগায় তারাও একদিন এদের হাত থেকে রেহাই পাবে না। সাপুড়ের মৃত্যু একদিন সর্পের দংশনে নিশ্চিত হয়।

সমগ্র বিশ্বে নানা নামধারী জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী রয়েছে। এরা আসলে কি চায়? এই ধরাধামে নানা শ্রেণি-পেশা-গোত্র-বংশের মানুষ রয়েছে। জন্মগতভাবেই মানুষ কোনো না কোনো ধর্মের অনুসারী। আর ধর্ম তো চাপিয়ে দেবার কোনো বিষয় নয়। যার যার ধর্ম সেই সেই পালন করবে। আবার কোনো ধর্মকে ছোটো করাও চলবে না। সমাজে ধর্মের প্রয়োজন আছে একথা কেউ অস্বীকার করেনা। কোনো ধর্মকে কটাক্ষ করাও ঠিক নয়।

ধর্ম মানুষকে শান্তি দেয়, স্বস্তি দেয়, ভালোর পথ দেখায়। পৃথিবীতে এমন কোনো ধর্ম নেই যে ধর্ম শান্তির বাণী আনেনি অথবা শান্তির কথা বলেনি। এই ধর্ম সংক্রান্ত বিষয়ে বাড়াবাড়িও ঠিক নয়। মনে রাখা দরকার ধর্ম যার যার উৎসব-আনন্দ-শান্তি-শৃঙ্খলা সবার। যারা এই বিষয়টি মানেন না বা ধর্মকে স্বীকার করেন না সেটা একান্তই তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। এই না মেনে নেয়ার বিষয়টিও এক শ্রেণির মানুষ তাদের না মানার ধর্ম বলে মেনে নিয়েছে।

স্বাধীনচেতা এই গোষ্ঠীটি এখন মৌলবাদী-জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর প্রধান অন্তরায় বাংলাদেশে। এর উপায় কি? সরকার বাহাদুরেরা নানামুখী চেষ্টা করে যাচ্ছেন এর থেকে কিভাবে পরিত্রান পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষক হুমায়ুন আজাদ-এর হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে অদ্যাবধি ধর্মের নামে যে অকারণ নৃশংস হত্যাকাণ্ড হয়েছে তারই বা যৌক্তিকতা কতটুকু? আমরাতো হাজার বছর আগে ধর্মীয় যুদ্ধেও দিন পেরিয়ে এসেছি। এখনতো পৃথিবীতে মানুষের শান্তিতে-শৃঙ্খলায় বসবাস করবার কথা। তার ব্যত্যয় হচ্ছে কেন? অকারণ যে হত্যাগুলো পৃথিবীতে তথা বাংলাদেশে হয়েছে, হচ্ছে সে বিষয়ে সরকারেরও সুস্পষ্ট কোনো পদক্ষেপ আমরা লক্ষ করিনি। এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধ-প্রগতিশীলতা, শান্তিপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থার কথা যারা অকপটে বলতে চেয়েছেন তাদেরকেও তো হত্যা করা হয়েছে।

প্রকারান্তরে, যারা অকারণ হত্যার শিকার হয়েছে তারা বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির পক্ষেই কলম চালিয়ে ছিল। সরকার তাদের রক্ষা করতে পারেননি। বরং অবস্থা এমন যাদেও জন্যে করি চুরি তারাই বলে চোর। যে সমস্ত নির্মম হত্যাকা- হয়েছে তার তদন্ত ও বিচার চলে যায় দিনদিন অতল অন্ধকারে।

ভালোর পক্ষে, মানুষের কল্যাণের-মুক্তির পক্ষে, সরকারের পক্ষে লিখতে গিয়ে তাদেরকে যদি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়, তাহলে তারা আপনাদের পক্ষে সত্য ইতিহাস লিখতে যাবে কেন? এর উত্তরে আপনারা বলবেন যারা ধর্মের বিরুদ্ধে লিখবে তারাতো হত্যাকাণ্ডের শিকার হবেই। তাহলে এক কাজ করুন না কেন, বাংলাদেশকে ইসলামিক স্টেট ঘোষণা করে দেন। সমস্ত ঝামেলা চুকে যাবে। পাকিস্তানি পেতাত্মারা শান্তি পাবে। যারা পৃথিবীতে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে শান্তির বাণীকে পিছনে দিকে ঠেলে দিতে চায় তাদের জয় হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের মাঝে বিরাজিত আছে, তার মূলচেতনা ভুলুণ্ঠিত হবে। এ বিষয়গুলো সচেতন ব্যক্তিরা যে জানেন না তা নয়। কিন্তু কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। পদক্ষেপ শুধু তাদের বেলায় যারা এই পৃথিবীর মানুষের মুক্তির জন্যে লিখছেন।

মানুষের সৎ-সত্য-শান্তির লোলিত বাণী বন্দ করে পৃথিবীতে আর যাই হোক সভ্যতা তৈরি করা যায় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একথা আরো দৃঢ়ভাবে প্রযোজ্য। কেননা স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনবার পর থেকে সেই পরাজিত শক্তিরা সর্বদাই সচেষ্ট থাকে এদেশের অনিষ্ট করবার। তাহলে একদিকে দেশের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা সেই পরাজিত শক্তি, অপরদিকে পঙ্গপালের মতো ধেয়ে আসছে ভারতবর্ষের বুকে আইএসআইএস জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী। এই সমস্ত অপশক্তির বিরুদ্ধে যারা কলম ধরেছিলেন তাদের নৃশংসভাবে মৃত্যুর যাত্রী চলে যেতে হয়েছে অকালে। সরকার ছিলেন তবুও নিশ্চুপ। ক্রমাগত এভাবেই যদি কেটে যায় দিন, তাহলে লিখবার, সত্য কথা বলবার মানুষের দিনও যাবে ফুরিয়ে। এমনো হতে পারে বাংলাদেশের প্রগতির পক্ষের সমস্ত পত্রিকাগুলোও ক্রমশ হয়ে যাবে পরাধীন। তাহলে আমরা কি এভাবেই ক্রমাগত গুটিকয়েক কুচক্রির জঘন্য মৃত্যুর খেলায় চুপসে যাবো? এটা আমাদের ভেবে দেখবার সময় এসেছে।

কেউ বুঝতে পারে না ধর্ম এবং জঙ্গিবাদ এক বিষয় নয়। সরকারের উচিৎ এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো। বাংলাদেশের মানুষ এমনিতেই ধর্মপ্রাণ। এটা অপরাধ নয়। কিন্তু তাদের মগজে অতীতের ধর্মীয় যুদ্ধের যে বীজ বপন করে চলেছে একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী, সে বিষয়ে সরকারকে আরো দৃঢ়ভাবে আন্তরিক হয়ে কাজ করতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে প্রগতি-আধুনিকতা ধর্মের বিরুদ্ধের কোনো বিষয় নয়, এগুলো হলো এগিয়ে যাওয়া, এগিয়ে নেওয়া আর প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা। মানুষ বোঝে না, ‘এমন মানব জনম আর কি হবে/মন যা করো ত্বরায় করো এই ভবে’।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “ধর্ম এবং জঙ্গিবাদ এক বিষয় নয়

  1. মানুষের সৎ-সত্য-শান্তির লোলিত
    মানুষের সৎ-সত্য-শান্তির লোলিত বাণী বন্দ করে পৃথিবীতে আর যাই হোক সভ্যতা তৈরি করা যায় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একথা আরো দৃঢ়ভাবে প্রযোজ্য। কেননা স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনবার পর থেকে সেই পরাজিত শক্তিরা সর্বদাই সচেষ্ট থাকে এদেশের অনিষ্ট করবার। তাহলে একদিকে দেশের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা সেই পরাজিত শক্তি, অপরদিকে পঙ্গপালের মতো ধেয়ে আসছে ভারতবর্ষের বুকে আইএসআইএস জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী। এই সমস্ত অপশক্তির বিরুদ্ধে যারা কলম ধরেছিলেন তাদের নৃশংসভাবে মৃত্যুর যাত্রী চলে যেতে হয়েছে অকালে। সরকার ছিলেন তবুও নিশ্চুপ। ক্রমাগত এভাবেই যদি কেটে যায় দিন, তাহলে লিখবার, সত্য কথা বলবার মানুষের দিনও যাবে ফুরিয়ে। এমনো হতে পারে বাংলাদেশের প্রগতির পক্ষের সমস্ত পত্রিকাগুলোও ক্রমশ হয়ে যাবে পরাধীন। তাহলে আমরা কি এভাবেই ক্রমাগত গুটিকয়েক কুচক্রির জঘন্য মৃত্যুর খেলায় চুপসে যাবো? এটা আমাদের ভেবে দেখবার সময় এসেছে।

  2. এইনা হইলে খোরশেদ ভাই। নিজেই
    এইনা হইলে খোরশেদ ভাই। নিজেই লিখে নিজেই কমেন্ট করেন সবার প্রথমে। সাবাশ !! এটা খুবই উতসাহব্যাঞ্জক।

    “যদি তোর লেখা পড়ে কেউ কমেন্ট না করে, তবে নিজেই কররে … ”
    – দাড়ি বুড়ো রবি

    1. আমি কিছু অংশ মন্তব্যে লিখে
      আমি কিছু অংশ মন্তব্যে লিখে থাকি। এতে দোষের কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। ধন্যবাদ আপনাকে। @ দয়াল বাবা

  3. প্রগতি-আধুনিকতা ধর্মের
    প্রগতি-আধুনিকতা ধর্মের বিরুদ্ধে নয়,কিন্তু ধর্ম এগুলোর বিরুদ্ধে।ধর্মের আধুনিকায়ন কি সম্ভব?

    1. সম্ভব। গোঁড়ামি ছাড়তে হবে।
      সম্ভব। গোঁড়ামি ছাড়তে হবে। পৃথিবীর অনেক ধর্মই তারা করে থাকে। যুগের সাথে তাদের নীতি-আদর্শেও পরিবর্তন করে থাকে। ইসলাম ধর্মেও ফতোয়া জাতি করে আধুনিকায়নের ব্যবস্থা আছে, মুসলিমরা যার সঠিক ব্যবহার করতে পারছে না। @ সুজন আরাফাত

      1. ইস্লামের গঠনমূলক আলোচনাই
        ইস্লামের গঠনমূলক আলোচনাই যেখানে গ্রহন করা হয় না,সংস্কার করতে চাওয়া আর কল্লা হারাতে চাওয়া সেখানে একই কথা।

        1. মূল সমস্যা তো এখানেই। কিন্তু
          মূল সমস্যা তো এখানেই। কিন্তু ফতোয়া কমিটির মাধ্যমে আধুনিকায়নের একটি স্বীকৃত ব্যবস্থা রয়েছে। যা ইসলাম ধর্ম আজও সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছে না। এটাই বাস্তব। সাহাবীদের শাসনামলের অনেক সমস্যার সমাধানই তারা সবাই আলোচনা করে সমাধান করতো। অনেকটা ফতোয়ার মতোই। @ সুজন আরাফাত

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 18 = 24