ব্লগার বা লেখক মানেই নাস্তিক বা খারাপ মানুষ নয়

আমরা জানি যে, ব্লগ (Blog) বলতে কোন ওয়েব সাইটকে বোঝানো হয়ে থাকে, যেখানে বিভিন্ন লেখকরা তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা থেকে বিভিন্ন বিষয়ে কলাম বা নিবন্ধ লিখে থাকে। কোন ব্লগ সাইট ব্যক্তিগতও হতে পারে; যেখানে সমাজ বা রাষ্ট্রের কোন বিশেষ ব্যক্তি, মন্ত্রী-এমপি, লেখক, সাহিত্যিকেরা তাদের জীবনী এবং অভিজ্ঞতার আলোকে বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করে থাকেন, জনগণের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তার ভক্তবৃন্দ এবং পাঠকদের সঙ্গে ভাগাভাগি বা শেয়ার করে থাকেন। তারা তাদের এ ওয়েব সাইটটি সময়ে সময়ে সমসাময়িকও (আপডেট) করে থাকেন।

ব্লগিং (Blogging) বলতে বিভিন্ন ওয়েব সাইটে লেখালেখি করা, তা সমসাময়িক করা বা প্রকাশ করাকে বোঝায় যাতে সবাই তা দেখতে পারে এবং পড়তে পারে। ব্লগার (Blogger) বলতে লেখককে বোঝায় যারা বিভিন্ন ওয়েব সাইটে লেখালেখি করে থাকে এবং যারা এসব ওয়েব সাইট নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে।

মূল প্রসঙ্গে আসি। আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের মানুষদের অনেকেরই ইন্টারনেট জগত সম্পর্কে ধারনা শূন্যের কৌটায়। বাংলাদেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষই ২১শ শতাব্দীর এই আশীর্বাদ, ইন্টারনেট জগত সম্পর্কে অজ্ঞ। দ্রুত ইন্টারনেট সেবা এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা সারা পৃথিবীকে আজ আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের রক্ষণশীল, উগ্রবাদী, ধর্মাদ্ধ, স্বার্থবাদী এবং অশিক্ষিত একটি শ্রেণী তাদের কায়েমি স্বার্থ হাসিল করার জন্য বিভিন্ন ওয়েব সাইটের এসব প্রগতিশীল লেখকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং কুৎসা রটিয়ে যাচ্ছে। মূলত, এসব জঙ্গিবাদী এবং ধর্মাদ্ধ ব্যক্তিরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষের প্রগতিশীল, আলোকিত লেখকদের বিরুদ্ধে সমাজে বিভিন্ন অপপ্রচার ও গুজব রটিয়ে যাচ্ছে। কারন একটাই, এসব প্রগতিশীল লেখকদের লেখালেখি যে তাদের ধর্ম ব্যবসা ও কায়েমি স্বার্থে আঘাত হানছে।

উল্লেখ্য আলোকিত, প্রজ্ঞাবান, সুশিক্ষিত এবং বিবেকবান মানুষেরা চিরদিনই ধর্মান্ধ ও জঙ্গিবাদীদের চক্ষুশুল ছিল। আলোকিত, প্রগতিশীল মানুষেরাই পারে সমাজকে, একটি দেশকে আলোকিত করতে। তারা পারে একটি জাতির বিবেককে জাগিয়ে তুলতে। আর ঠিক এখানেই জঙ্গিবাদীদের ভয়। আলোকিত মানুষদের কলমের কালি যে তাদের চাপাতি, রাম দা, ছুরির চেয়েও অনেক বেশী শক্তিশালী। জঙ্গিবাদীরা এবং ধর্মান্ধরা কখনও চায় না একটি জাতি বিবেক এবং জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠুক, সচেতন হয়ে উঠুক, নিজেরাই নিজেদের ভালমন্দ বুঝতে শিখুক। জঙ্গিবাদীরা এবং ধর্মান্ধরা সাধারণ মানুষকে কুসংস্কারাছন্ন রেখেই তাদের কায়েমি স্বার্থ হাসিল করতে সদা ব্যস্ত।

অনেক সময়, অনেক লেখক বিভিন্ন ধর্মের কুসংস্কার, জঙ্গিবাদী এবং ধর্মান্ধদের স্বরূপ উন্মোচন করতে গিয়ে বাস্তবভিত্তিক, তথ্যসমৃদ্ধ সমালোচনামূলক কিছু লেখালেখি করে থাকেন। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার যে প্রত্যেকটি মানুষেরই আছে। যা আমাদের মহান সংবিধানে সুরক্ষিত রয়েছে। বাংলাদেশের মহান সংবিধানের আর্টিকেল ৩৯ এর (১) এবং (২) এ এ অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু কেউ যদি সীমালংগন করে বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে থাকে তার শাস্তির ব্যবস্থাও আমাদের মহান সংবিধানে বলা আছে।

বিভিন্ন ওয়েব সাইটের কোন লেখক যদি সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাসী বা নাস্তিক হয়েও থাকে এটা নিতান্তই তার ব্যক্তিগত বিষয়। আমাদের মহান সংবিধানে আর্টিকেল ১২ এবং আর্টিকেল ৪১ এ যার যে ধর্ম ভাল লাগে তাকে সেই ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। ইহকালে কেউ যদি মহান আল্লাহ্‌ তায়ালার ইবাদত-বন্দেগী না করেন পরকালে তার বিচার আল্লাহ্‌ তায়ালা স্বয়ং নিজেই করবেন। এটা তাঁর বিচার্য বিষয়, কোন মানুষের নয়।

কিন্তু নাস্তিকতাবাদের আলোকে কোন লেখক যদি বিভিন্ন ব্লগে লেখালেখি করে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত হেনে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে আমাদের দেশীয় প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ারও বিধান রয়েছে। দণ্ডবিধি-১৮৬০ এর ধারা ২৯৫ থেকে ২৯৮ পর্যন্ত যেকোন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের জন্য সুস্পষ্ট শাস্তির বিধান রয়েছে। যদিও তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় শাস্তির বিধান বিতর্কিতভাবেই বেশী রাখা হয়েছে। আইনটিও সুস্পষ্ট নয়। দেশের সংবাদপত্র সম্পাদকদের পরিষদ এই আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের দাবি জানিয়েছে। অনেক লেখালেখি, প্রতিবাদ হয়েছে। এখনও বিভিন্ন মহল এ ধারাটির বিরুদ্ধে সরব। কারন ৫৭ ধারা যে বিতর্কিত এবং বাক স্বাধীনতার পরিপন্থীও বটে।

যা হোক, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। আমাদের সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, আইনের উর্ধ্বে কেউ নয়। নাস্তিকতার অজুহাতে কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত বা ক্ষতিগ্রস্থ করার বিধান আমাদের দেশীয় আইনে কোথাও নেই। অপরদিকে, এসব অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে। দণ্ডবিধি-১৮৬০ এর ধারা ৩০০ ধারা অনুযায়ী ঠাণ্ডা মাথায়, সইচ্ছায়, পরিকল্পনা করে মানুষ হত্যার শাস্তি যাবৎজীবন বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

যদিও বর্তমান বাংলাদেশকে আমরা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বলে থাকি তবুও ইন্টারনেট বা ওয়েব জগত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন বা সচেতন হয়ে উঠতে সাধারণ মানুষের আরও অনেক সময় লাগবে। কিন্তু এই অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে, সাধারণ মানুষের মধ্যে অপপ্রচার চালিয়ে কোন মহল বা গোষ্ঠী যেন মানুষ হত্যারমত মহা পাপ করে, তাদের কায়েমি স্বার্থ হাসিল না করতে পারে এ বিষয়ে ঘোটা সমাজ এবং দেশের মানুষকে সদা সজাগ থাকতে হবে।

জ্ঞান, বুদ্ধি এবং অভিজ্ঞতার আলোকে লেখালেখিকে আমাদের নিরুৎসাহিত না করে, নতুন প্রজন্মকে আমাদের উৎসাহিত এবং অনুপ্রাণিত করা উচিত। তাদের জ্ঞানগর্ব লেখালেখিতে দেশ আলোকিত হয়ে উঠবে এবং আপামোর সাধারণ জনগণ সকল কুসংস্কার, জঙ্গিবাদ এবং ধর্মাদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবে। আমরা দলমত নির্বিশেষে তৃণমূল পর্যায় থেকে, এখন থেকে সচেতন হলে এবং এসব মুক্তচিন্তা বিরোধী অপপ্রচার ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাংলাদেশ হয়ে উঠবে একটি নিরাপদ আবাসভূমি, সত্যিকারের সোনার বাংলাদেশ।

পরিশেষে, আমাদের মনে রাখা উচিত, শান্তিতে সর্বকনিষ্ঠ নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মালালা ইউসুফজাইও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণমাধ্যম বিবিসি’র ওয়েব সাইটে তাদের সমাজের কুসংস্কার, নারী শিক্ষা এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ব্লগ লিখেই বিশ্ব নন্দিত হয়েছেন; যার চূড়ান্ত সাফল্য হচ্ছে শান্তিতে তাঁর নোবেল পুরস্কার অর্জন।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “ব্লগার বা লেখক মানেই নাস্তিক বা খারাপ মানুষ নয়

  1. কি ব্যাপার খোরশেদ আলম ভাই?
    কি ব্যাপার খোরশেদ আলম ভাই? কমেন্ট করতে ভুলে গেলেন নাকি? না না …এইটাত ঠিক হোল না … আপনার স্টাইল আপনাকে মেইন্টেইন করতে হবে, তা না হলে আবার অন্য কেউ যদি পেটেন্ট তা চুরি করে ফেলে, তাহলে তো সর্বনাশ ! তাড়াতাড়ি কমেন্ট করে ফেলুন। পারলে লাইক দেবার অপশন থাকলে সেটাও দিয়ে ফেলুন। ধন্যবাদ।

    1. ঠিকই ধরেছেন। আমি ভুলেই
      ঠিকই ধরেছেন। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। না সেসবের আদৌ প্রয়োজন আছে কি? মনে হয়, দরকার নেই। @ দয়াল বাবা

  2. ধর্মিয় অনুভুতিতে আঘাত
    ধর্মিয় অনুভুতিতে আঘাত দেওয়াটার কি কোন সুপষ্ট সংগা আছে কি? যেমন ধরেন, কোরান শরীফে অবিশ্বাসিদেরকে সহ মুর্তিপুজারিদের এবং আহেলি কিতাবধারিদেরকে দোজগে পুডানোর তথা কঠোর শাস্তির কথা বলা আছে। তাই কোরান পডলে বা ওয়াজ মাফিলের বক্তব্য শুনলে অমুসলিমদের অনুভুতিতে আঘাত লাগতে পারে। আপনি যদি নাস্তিক হয়ে ধর্মিয় বই পডেন, তাহলে আপনার অনুভুতিতে আঘাত লাগবে, ঠিক তেমনি আপনি যদি ঈমানদ্বার হয়ে নাস্তিকদের বই বা কথা শুনেন তাহলে আপনার অনুভুতিতে আঘাত লাগবে। তাই আমার মতে, যে লোক তার বিশ্বাষের সাথে সাংঘর্ষিক কোন লেখা পডবে, তাকে শাস্তি দেওয়ার বিধান বাংলাদেশের আইনে রাখা উচিত।

    1. আছে। আমাদের প্রচলিত আইনেই আছে
      আছে। আমাদের প্রচলিত আইনেই আছে। আমার লেখা পুরানো একটি ব্লগেই পাবেন। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ সালের ধারা ২৯৫ থেকে ২৯৮ ধারায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের বিভিন্ন ধরন, সংজ্ঞা এবং শাস্তির বিধান সম্পর্কে বলা হয়েছে। দণ্ডবিধি, ১৮৬০ সালের ধারা ২৯৫-ক অনুযায়ী, কোন ব্যক্তি যদি বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মানুসারীদের কোন শ্রেণীর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত ও হিংসাকৃতভাবে লিখিত বা উচ্চারিত কথা কর্তৃক বা দৃশ্যমান কোন বস্তু কর্তৃক সে শ্রেণীর ধর্মকে বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমানিত করে বা অপমানিত করার চেষ্টা করে তবে তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ দাখিল করা যাবে।

      তবে মনে রাখতে হবে, যে ব্যক্তি বিশেষ বা যাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ দায়ের করা হয় তখন মামলার সংবাদদাতা বা অভিযোগকারীকেই আসামী বা আসামীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে।

      লক্ষণীয়, দণ্ডবিধি, ১৮৬০ সালের ধারা ২৯৫, ২৯৬ এবং ২৯৭ অনুযায়ী, কোন শ্রেণী বিশেষের ধর্মের প্রতি অবমাননা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে উপাসনালয়ের স্থান বিনষ্ট বা অপবিত্র করা, যেকোন ধর্মের ধর্মীয় উৎসব পালনরত কোন সমাবেশে গোলযোগ সৃষ্টি করা কোন ব্যক্তির ধর্মের অবমাননা করার উদ্দেশ্যে কোন উপাসনাস্থলে বা সমাধিস্থলে রক্ষিত স্থানে অনধিকার প্রবেশ করা ইত্যাদি প্রচলিত আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। @ নীল নিমো

  3. চমৎকার বলেছেন। আপনার
    চমৎকার বলেছেন। আপনার অনুভূতিতে আঘাত লাগলে সে লেখার পড়ার দরকার কি। সেটাই ধর্মীয় গোঁড়ারা বুঝে না। ধন্যবাদ আপনাকে। @ নীল নিমো

  4. অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমসাময়িক
    অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমসাময়িক একটি লেখা। ব্লগারদের বিরুদ্ধে মোল্লাদের অপপ্রচারের জবাব সবাইকে দিতে হবে।

    1. ব্লগারদের বিরুদ্ধে
      ব্লগারদের বিরুদ্ধে সারাদেশব্যাপী মিথ্যাচার ও অপপ্রচারের জবাব তাদেরকেই দিতে হবে। এ বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। ধন্যবাদ আপনাকে। @ মাইনুল এহসান

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 1