শুভ জন্মদিন জননী

জুড়ুর বয়স যখন বারো তেরো, ফ্রক পরে গ্রাম দাঁপিয়ে বেড়াতো সাইকেল নিয়ে। হুল্লোড়ে মেতে থাকতো সারক্ষণ। বাবা ডেপুটি মেজিস্ট্রেট হওয়ার সুবাদে বছর কয়েক বাদেই যেতে হত নতুন জায়গায়। কখন সেতাবগঞ্জ, কখনো ঠাকুরগাঁও আবার কখনো খেপু পাড়া। বয়স বারো পার হতেই বন্ধ হয়ে গগেল সাইকেল চালানো, নিষিদ্ধ হয়ে গেল বাড়ির বাইরে যাওয়া। তখনকার মেয়েদের মেনে চলতে হত ভয়ানক পর্দাপ্রথা।

জুড়ুর পুরো নাম ছিল জাহানারা বেগম। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে ত্রিশ চল্লিশের দশকের রক্ষণশীল বাঙালি মুসলমান পরিবার বলতে যা বোঝায় তেমনই এক পরিবারে সৈয়দা হামিদা বেগম আর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ আবদুল আলীর ঘরে ১৯২৯ সালের ৩ মে জন্ম গ্রহণ করেন জাহানারা বেগম। তাকে আদর করে ডাকা হত জুড়ু। পরে জুড়ু কে জাহান নামেও ডাকা হতো। সাত ভাই-বোনদের মাঝে জাহান ছিলো সবার বড়। বিশাল পরিবার ছিল তাদের। একান্নবর্তী না হলেও শব-ই-বরাত থেকে বকরী ঈদ পর্যন্ত বছরে টানা তিন চার মাস দাদার বাড়িতে গিয়ে থাকতে হত।

বাবা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ আবদুল আলী মনেপ্রাণে ছিলেন অত্যন্ত আধুনিক। কিন্তু জুড়ু–র দাদা ছিলেন সেকালের আমলের বিশ্বাসে বিশ্বাসী। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মেয়েদের বাংলা পড়াটা ছিল গুনাহ্ -র কাজ। তাই তাদের বাড়িতে কেবল কোরান শরীফ পাঠ করানো হতো। স্ত্রীকে লেখাপড়া শেখাতে পারেননি বলে ডেপুটি সাহেব তার চার মেয়েকে ঠিক ঠিক শিক্ষিত করে তোলেন সমস্ত পারিবারিক আর সামাজিক সংস্কারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে।

বয়ঃসন্ধিকালে জাহানারার প্রধান আশ্রয় ছিলো বই। নভেল। ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট বাবার কল্যাণে বাড়িতে নিয়মিত আসতো পত্রপত্রিকা। জাহানারার পাঠতৃষ্ণাকে উসকে দিয়েছিল দৈনিক আনন্দবাজার, অমৃতবাজার, আজাদ, ষ্টেটসম্যান, সাপ্তাহিক শনিবারের চিঠি, ইলাষ্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়া, মাসিক ভারতবর্ষ, প্রবাসী, বসুমতি আর মোহাম্মদী। বাড়িতে কলের গান ছিলো। আর ছিলো হারমোনিয়াম। সপ্তাহে দু’দিন গানের মাস্টার এসে গান শিখিয়ে যেতেন।

এ সময় জাহানারার সকাল দুপুর সন্ধ্যা ছিলো মাস্টার দিয়ে ঠাঁসা। একজন মাসলা-মাসায়েল শরা শরীয়তে হেদায়েত করেন তো আরেকজন আসেন উর্দু পড়াতে। পাঠ্য বইয়ের মাস্টার তো আছেনই। এ সময় জাহানারার জীবনে বিনোদন বলতে শুধু কলের গান। তাঁর বাবা হিজ মাস্টারস ভয়েস-এর একটা গ্রামোফোন ও রেকর্ড কিনে আনবার পর আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, হরিমতী, কৃষ্ণচন্দ্র দে, কমলা ঝরিয়া, আব্বাসউদ্দিন আহমদ, কনক দাস, শাহানা দেবী, যুথিকা রায়ের গান হয়ে উঠলো বিনোদনের সঙ্গী।

গ্রামের দুরন্ত কিশোরী জাহানারাকে মটকা চাচা (বাবার বন্ধু) বেছে বেছে এমন সব বই উপহার দিতেন যেগুলো তাঁর মেধা ও মননের জগৎকে আলোকিত করেছে। দৃষ্টিকে করেছে দিগন্তবিস্তৃত। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, নারী শিক্ষা আন্দোলন, মুসলিম সমাজের জাগরণের প্রচেষ্টা, বেগম রোকেয়ার সাধনা- এসব বিষয়ের ওপর রচিত বইগুলো মটকা চাচাই নিয়ে আসতেন জাহানারার জন্যে। আর বাংলা সাহিত্য এবং বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে জাহানারার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন একজন গৃহশিক্ষক। জাহানারা তখন ক্লাস সেভেনের ছাত্রী। গৃহশিক্ষকের দায়িত্ব ছিলো ইংরেজী, বাংলা, অঙ্ক, ভূগোল আর ইতিহাস পড়ানোর। এই মাস্টারমশাই ছিলেন সাহিত্যপাগল। এই মাস্টারমশাই-এর কল্যাণেই, ওই বয়সেই টলস্টয়, ডস্টয়েভস্কি, ভিকটর হুগো, সেলমা লেগারলফ, শেক্সপীয়র, বার্নাড শ, ন্যুট হামসুন-এর অনেক বইয়ের বাংলা অনুবাদ জাহানারার পড়া হয়ে গিয়েছিলো। রবীন্দ্রনাথ এবং শান্তিনিকেতন বিষয়েও জাহানারাকে প্রবলভাবে আগ্রহী করে তুলেছিলেন মাস্টারমশাই। জাহানারার স্বপ্ন ছিলো- বড় হয়ে শান্তিনিকেতনে পড়তে যাবে। কিন্তু সে স্বপ্ন তাঁর সফল হয়নি। মটকা চাচা বাবাকে বলে কয়ে রাজিও করিয়ে ফেলেছিলেন। ডাকযোগে শান্তিনিকেতনে ভর্তির প্রসপেকটাসও এসে পড়েছিলো। কিন্তু ১৯৪১ সালের ৯ আগস্ট পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর খবর পড়ে জাহানারার শান্তিনিকেতন যাবার স্বপ্নেরও মৃত্যু ঘটলো।

বাড়িতে বাবার কাছেই তাঁর শিক্ষা জীবনের শুরু। শিক্ষা জীবনে তাঁর বাবা সব ধরনের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। পড়াশুনা করতে জাহানারার ভালো লাগতো না। ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়তেই তিনি অস্থির- আর পড়বেন না এরকম একটা সিদ্ধান্ত যখন প্রায় পাকা, তখনই মটকা চাচার (বাবার বন্ধু) কাছে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর উচ্চশিক্ষিতা, সভা- সমিতিতে বক্তৃতা দিতে পটু এবং সাহেব-সুবোদের সঙ্গে কথাবার্তায় চৌকস বোন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতের ছবি দেখে মুগ্ধ জাহানারা সিদ্ধান্ত পাল্টালেন- ‘আমিও বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতের মতো লেখাপড়া শিখব।’
সেই যেন শুরু। তারপর আমৃত্যু যিনি নিজের সাথে নিজেও আপোষ করেননি। জীবনের নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যিনি থেকেছেন পাহাড়ের মতো অটল। ভবিতব্যের মুখোমুখি হবার অপার সাহস নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তিনি।

জাহানারা ষষ্ঠ শ্রেণীর দরজা উতরে গেলেন। তারপর স্কুলে যাওয়া বন্ধ। কারণ, তখন কুড়িগ্রামে মেয়েদের স্কুল ছিল না তাই ছেলেদের স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে জাহানের নাম থাকবে। সময়মতো তিনি পরীক্ষাও দেবেন; কিন্তু ক্লাস করতে হবে না। বাড়িতে অবশ্য শিক্ষক নিয়োগ করা হলো। দু’জন শিক্ষক। তাঁরা দু’বেলা এসে জাহানারাকে পড়িয়ে যান। ১৯৪১ সালে কুড়িগ্রাম থেকে বদলি হয়ে তাঁরা চলে এলেন লালমনিরহাটে। লালমনিরহাটে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবার সেন্টার ছিলো না। জাহানারা ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলেন রংপুর থেকে। দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করলেন জাহানারা ১৯৪২ সালে। ম্যাট্রিক পাস করে জাহানারা ভর্তি হলেন রংপুর কারমাইকেল কলেজে।

রংপুরের মুন্সিপাড়ার মোহাম্মদ আলী উকিলের কনিষ্ঠ ছেলে শরীফ। এই শরীফের সঙ্গে জাহান-এর একসময় হৃদয় বিনিময় হয়ে যায়। সেকালে দুজন তরুণ-তরুণীর প্রেম ভালোবাসা ব্যাপারটি এখনকার মতো এতোটা সহজ স্বাভাবিকভাবে দেখা হতো না। বিষয়টি উভয় পরিবারে আলাপ আলোচনার পর শরীফ-জাহানারার প্রেম অবশেষে পারিবারিক স্বীকৃতি পেলো। শরীফুল আলম ইমাম আহমদের সঙ্গে জাহানারা বেগমের বিয়ে সম্পন্ন হলো ১৯৪৮ সালের ৯ আগস্ট। শরীফ ইমাম ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার।

স্বাভাবিক নিয়মেই চলছিলো জীবন। রাজনৈতিক মতবাদ থাকলেও তার বাবা চাননি মেয়ে রাজনীতি করুক, চাননি আরও একজন-শরীফ ইমাম। ফলশ্রুতিতে শরীফ-জাহানারা জুটিও পারিবারিক বিধিনিষেধের গ্যাড়াকলে আটকে গেলো। এরকম টানাপোড়েনে পরে জাহানারা ইমাম অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন-

“আমি অনেক বিভ্রান্ত চিন্তাভাবনা ও নিঃসঙ্গ অশ্রুজলের ভেতর দিয়ে এ সিদ্ধান্তে উপনিত হলাম যে আব্বাকে অসন্তুষ্ট করে ,শরীফকে অসুখী করে অনিশ্চিত রাজনীতির পথে পা বাড়ানোর আদর্শ আমার নেই। আমি আমার প্রেমকে ত্যাগ করতে পারলাম না, আমি আমার অস্ফুট, অপরিনিত রাজনৈতিক মতাদর্শকেই ফিরিয়ে দিলাম।”

কলেজ জীবনে নেয়া এই সিদ্ধান্তে আজীবন অটল থাকতে পারেননি জাহানারা ইমাম। তাঁর মাঝে আগুন ছিলো, সে আগুন বরাবরই ছিলো নাকি একাত্তরে প্রতিদিন একটু একটু করে সংগৃহীত হয়েছে সমাধি- তারপর তা ধিকিধিকি জ্বলেছে আগুনে, আর দাবানলের মতো দেখা দিয়েছে বিশ বছর পর। “একাত্তরের দিনগুলো” যিনি পড়েছেন তিনি জেনেছেন জাহানারা ইমাম থেকে শহীদ জননীতে তাঁর রূপান্তরের ইতিহাস।

জাহানারা ইমামের রাজনৈতিক জীবনের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় অঞ্জলি নামের একটি মেয়ের কথা। কলেজে জাহানারা ইমামের সহপাঠী অঞ্জলি। এই অঞ্জলির মাধ্যমেই কমিউনিজমের পাঠ নেন জাহানারা ইমাম। অঞ্জলি তাঁকে এ সংক্রান্ত বইপত্র পড়তে দিতো।

স্বামী, দুই পুত্রসন্তান,আত্মীয়-পরিজন নিয়ে সুখে আর স্বাচ্ছন্দ্যের সংসার ছিলো তাঁর। একাত্তর এসে উপড়ে নিল তার শান্তি আর স্বস্তির ভিত। ছেলে যুদ্ধে যাবে। ছোট ছেলে জামীকে পাশে বসিয়ে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেলেন তিনি নিজে। পেছনে শরীফ আর রুমী। কতটা ইস্পাত কঠিন মনোবলের আধিকারী হতে হয় এই স্বদেশের জন্য যাত্রায়। সেক্রেটারিয়েটের সেকেন্ড গেটের কাছে এয়ারব্যাগ কাঁধে নিয়ে নেমে গেলো সূর্যের মতো পুত্র রুমী। পেছনে তাকাতে নিষেধ ছিলো । রিয়ারভিউ মিররে তাকে দেখার চেষ্টা সফল হলো না। জনস্রোতে ততক্ষণে সে মিশে গেছে।

লোহার সাঁড়াশি যেন পাঁজরের দু’পাশে চেপে ধরে মায়ের, নিশ্বাস আটকে আসে, চোখ ঝাপসা হয়ে যায়, ডুকরে কেঁদে উঠতে ইচ্ছা করে। কিন্তু তার উপায় নেই। রুমী ফিরে আসে অল্পক্ষণের জন্য, আবার চলে যায়। মার্কিণ নভোচারীদের চন্দ্রাভিযান দেখে মায়ের মনে হয় আহা! তিনি যদি একটা টুটো-ফুটো আকাশযান পেতেন তাহলে কয়েক মাইল দূরে মেলাঘরে গিয়ে এক পলক দেখে আসতেন ছেলেকে। কিন্তু তা হয়না। মা নিজেই নেমে পড়েন কাজে। খবরা-খবর আনা নেয়া, কাপড় চোপড় ওষুধপত্র সংগ্রহ আরো কতো কি! তারপর আসে সেই ভয়াল দিন – ২৯শে আগষ্ট। বাড়ি ঘেরাও করে পাকিস্তান বাহিনী, ধরে নিয়ে যায় রুমী,জামী, শরীফ কে। দুদিন পরে ফিরে আসে জামী আর শরীফ অত্যাচার সয়ে। আসেনা কেবল রুমী। বাবা ফিরে এলেও প্রায় নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন। এমপি হোস্টেলে তার বুক থেকেই তো কেড়ে নিল রুমীকে জল্লাদের দল! তারপর রুমীকে কিভাবে হত্যাকরা হয় তা কল্পনা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই পিতার। সেই দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াতে বেড়াতে হার মানলেন শরীফ ইমাম।

১৩ই ডিসেম্বর ১৯৭১, আর এক ঝড় এলো জাহানারার জীবনে। হার্ট এ্যাটাক করলেন শরীফ। অনেক কষ্টে তাঁকে হাসপাতালেও নেয়া হলো। তার কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল পিজির কর্তব্যরত দুজন ডাক্তার শরীফ ইমামের দু’পাশে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে কার্ডিয়াক ম্যাসাজ দিচ্ছেন। জাহানারা জানতে চাইলে- আপনারা মেশিন লাগাচ্ছেন না কেন? একজন ডাক্তার হাত দিয়ে শরীফ ইমামের বুকে চাপ দিতে দিতে বললেন- “লাগাবো কি ভাবে। হাসপাতালের মেইন সুইচ তো বন্ধ। আজ তো ব্ল্যাক আউট!” সেই ব্ল্যাক আউট সত্য করে জাহানারার জীবন থেকে চলে গেলেন শরীফ ইমাম। তাঁর কুলখানির দিন রেসকোর্স এ আত্মসমর্পন করলো পাক বাহিনী। কেবল সে বিজয় দেখা হলো না পিতা-পুত্রের।

১৭ই ডিসেম্বর ফিরে এলো রুমীর সহযোদ্ধারা। কেবল ফিরল না রুমী। যে সত্য কে মেনে না নিতে রোজ নিজেকে সাহস যুগিয়েছেন জাহানারা, তা তাকে মানতেই হলো অবশেষে। শহীদ হয়েছেন রুমী আর জাহানারা হলেন শহীদ জননী। বিশ বছর পর সঞ্চিত দুঃখ, ক্ষোভ, বেদনায় তিনি জানতে চেয়েছিলেন-

”যাহারা তোমার বিষাইছে বাযু, নিভাইছে তব আলো
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ,তুমি কি বেসেছ ভালো?”

দেশ স্বাধীন হলো। কেটে গেলো অনেকটা বছর সময়ের যান্ত্রিক নিয়মে। কিন্তু আবার কুচক্রীমহল সক্রিয় হয়ে উঠলো। ১৯৯২ সালের ২৯শে ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার বিরোধীতার অপরাধে যার নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয়েছিল সেই নাগরিকত্বহীন গোলাম আযম কে করা হলো যুদ্ধাপরাধী ঘাতক দলের আমীর। যা একটি স্বাধীন দেশের জনসাধারণের স্বপ্ন, বিশ্বাস, অস্তিত্ব এবং আবেগের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের সামিল। এই ধৃষ্টতাকে চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯২ সালের ১৯শে জানুয়ারী ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নিমূল (ঘাদানি)কমিটি হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। একটি বিশেষ প্রয়োজনে যেমন মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল তেমনি একটি বিশেষ প্রয়োজনে, বিশেষ ক্ষণে নেত্রী হিসেবে তাঁর আবির্ভাব ।

ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস- যে গোলাম আযমের বিচার দাবি করায় জাহানারা ইমাম কে করা হলো রাষ্ট্রদ্রোহী!

তবু থেমে থাকেননি জাহানারা ইমাম। মামলা মাথায় নিয়ে চালিয়ে গেলেন আন্দোলন। কিন্তু আবার ভাগ্য যেন উপহাস করলো তাঁকে। আশির দশকের প্রথম দিকে, ১৯৮২ সালে আরো এক শত্রু বাসা বাঁধল শরীরে। তিনি আক্রান্ত হলেন ওরাল ক্যান্সারে। কিন্তু ভেঙ্গে পরবার মানুষ নন তিনি। মনের জোর দিয়ে লড়লেন ব্যাধির সঙ্গে। কতো নির্মোহ, স্থিরচেতা, ধৈর্যশীল হলে পরেই তা সম্ভব! ’ক্যান্সারের সাথে বসবাস’-তার অবিশ্বাস্য বয়ান।

১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারী ১০১ সদস্যবিশিষ্ট ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি’ গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়। সর্বসম্মতিক্রমে এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম। দেশের লাখ লাখ মানুষ শামিল হয় নতুন এই প্লাটফর্মে।

এই কমিটি ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ ‘গণআদালত’-এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করে। গণআদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন। সমবেত লক্ষ লক্ষ মানুষের পক্ষ থেকে জাহানারা ইমাম গণআদালতের রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান। এই গণআদালতের সদস্য ছিলেন : সর্বজনাব এডভোকেট গাজিউল হক, ড. আহমদ শরীফ, স্থপতি মাজহারুল ইসলাম, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, বেগম সুফিয়া কামাল, কবীর চৌধুরী, কলিম শরাফী, শওকত ওসমান, লে’ কর্নেল (অব.) কাজী নূরুউজ্জামান, লে. কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী এবং ব্যারিষ্টার শওকত আলী খান। সেদিন পুলিশ ও বিডিআরের কঠিন ব্যারিকেড ভেঙ্গে বিশাল জনস্রোত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢুকে পড়েছিলো। সেই বিশৃঙ্খল পরিবেশে বর্ষীয়ান কবি বেগম সুফিয়া কামাল ও কথাশিল্পী শওকত ওসমানকে গণআদালত মঞ্চে (ট্রাকে) উপস্থিত করা সম্ভব হয়নি বলে মাওলানা আবদুল আউয়ালকে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে গণআদালত সদস্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

গণআদালত অনুষ্ঠিত হবার পর সরকার ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে অজামিনযোগ্য মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে হাইকোর্ট ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির জামিন মঞ্জুর করেন। এরপর লাখো জনতার পদযাত্রার মাধ্যমে জাহানারা ইমাম ১২ এপ্রিল ১৯৯২ গণআদালতের রায় কার্যকর করার দাবী সংবলিত স্মারকলিপি নিয়ে জাতীয় সংসদের স্পীকার, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে পেশ করেন। চিন্তায় চেতনায় মননে ও মেধায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালনকারী ১০০ জন সাংসদ গণআদালতের রায়ের পক্ষে সমর্থন ঘোষণা করলে আন্দোলনে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা। এরপর শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপী গণস্বাক্ষর, গণসমাবেশ, মানববন্ধন, সংসদ যাত্রা, অবস্থান ধর্মঘট, মহাসমাবেশ ইত্যাদি কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে সরকার ৩০ জুন ১৯৯২ সংসদে ৪ দফা চুক্তি করতে বাধ্য হয়। তবে এ চুক্তি কার্যকর হয়নি আজও।

২৮ মার্চ ১৯৯৩ নির্মূল কমিটির সমাবেশে পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জে আহত হন জাহানারা ইমাম। তিনি প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান রাজপথে। সহযোদ্ধারা তাঁকে ধরাধরি করে নিয়ে যান পিজি হাসপাতালে। ক্যান্সার আক্রান্ত বর্ষীয়ান শ্রদ্ধেয়া জননেত্রী চিকিৎসকদের আন্তরিক সেবায় সেরে ওঠেন। এ সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও গঠিত হয় নির্মূল কমিটি এবং শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন। পত্রপত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠলে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন জাহানারা ইমাম। গোলাম আযমসহ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলনকে সমর্থন দেয় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে।

২৬ মার্চ ১৯৯৩ স্বাধীনতা দিসবে গণআদালত বার্ষিকীতে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণতদন্ত কমিটি ঘোষিত হয় এবং আরো ৮ জন যুদ্ধাপরাধীর নাম ঘোষণা করা হয়। এরপর ২৬ মার্চ ১৯৯৪ স্বাধীনতা দিবসে গণআদালতের ২য় বার্ষিকীতে গণতদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান কবি বেগম সুফিয়া কামাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে রাজপথের বিশাল জনসমাবেশে জাহানারা ইমামের হাতে জাতীয় গণতদন্ত কমিশিনের রিপোর্ট হস্তান্তর করেন। গণতদন্ত কমিশনের সদস্যরা হচ্ছেন : সর্বজনাব শওকত ওসমান, কে এম সোবহান, সালাহউদ্দিন ইউসুফ, অনুপম সেন, দেবেশচন্দ্র ভট্টাচার্য, খান সারওয়ার মুরশিদ, শামসুর রাহমান, শফিক আহমেদ, আবদুল খালেক এবং সদরুদ্দিন। এই সমাবেশে আরো ৮ জন যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে তদন্ত অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়া হয়।

কিন্তু শরীর মনের সাথে একাত্বতা করলনা। এ সময় দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলে ২রা এপ্রিল ১৯৯৪, চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে মিশিগান ডেট্রয়েট হাসপাতালের উদ্দেশ্যে দেশত্যাগ করলেন। ডাক্তার এবার জানালেন আর সম্ভব নয়। এবার শুধু অপেক্ষা মৃত্যুর হিমশীতল কোলে ঢলে পড়ার।মৃত্যুশয্যায় শায়িত থেকেও মনোবল হারাননি জাহানারা ইমাম। হাসপাতালের শুভ্র বিছানায় শায়িত থেকেও কাঁপা কাঁপা অস্পষ্ট হাতে ডায়রি লিখতেন। বাকশক্তি হারিয়ে কথা বলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো তাঁর। এ সময় ছোট ছোট চিরকুট লিখে প্রিয়জনদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা চালিয়ে যেতেন। রসিকতাও করতেন ঐ চিরকুটের মাধ্যমেই। মৃত্যু শয্যায় থেকেই কাঁপা কাঁপা হাতে লিখতেন আন্দোলনের পরামর্শ। শেষের দিকে ডাক্তাররা বন্ধ করলেন ওষুধ এমন কি সকল প্রকার খাবারও। শেষ মূহুর্তের যন্ত্রনায় একবার শুধু লিখলেন- “আর কতদিন কষ্ট পেতে হবে!”

২২ এপ্রিল ওখানকার চিকিৎসকরা জানান, চিকিৎসার আওতার সম্পূর্ণ বাইরে চলে গেছেন তিনি। ২২ জুনের পর থেকে শহীদ জননীর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে। অবশেষে দেশবাসীকে অশ্রুসাগরে ভাসিয়ে ২৬ জুন ১৯৯৪ বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টায় মিশিগানের ডেট্রয়েট নগরীর সাইনাই হাসপাতালে ৬৫ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতীক শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।

৪ঠা জুলাই, ১৯৯৪।
বেদনার মতো নীল আকাশে স্বপ্নের মতো ভাসছিল ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘ। অসংখ্য মানুষের বিষন্ন চোখ তার মধ্যে খুঁজে বেড়াচ্ছিল একটি বিমান। দীর্ঘক্ষণ থেকে রোদ মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁরা। তারপর সূর্য যখন হেলে পড়েছে, ম্লান হয়েছে রোদ, আকাশের গায়ে ভাসতে দেখা গেল বিমানটিকে। আপেক্ষমান মানুষের মধ্যে তখন স্তব্ধ-গম্ভীর উত্তেজনা। ক্রমশই বড় হয়ে উঠছিল বিমানের অবয়ব। একসময় স্পষ্ট দেখা গেল বিমানের রং টি আকাশের মতোই সাদা আর নীল।

বিকেল চারটা পঞ্চাশ মিনিটে ব্রিটিশ এয়ার ওয়েজ বিএ-১৪৮ নম্বর ফ্লাইটের ৭৪৭ বিমানটির চাকা স্পর্শ করল জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে। তারপর দৌড়ে এসে থামলো রানওয়ের ঠিক উত্তর মাথায়। কান ফাটানো গর্জন থামতেই দরজা খুলে গেল বিমানটির। জুড়ে দেয়া হলো সিঁড়ি। যাত্রীরা নামতে শুরু করলেন একে একে। হয়তো তাদের অনেকেই জানেন না তাদের সঙ্গে আরো একজন ফিরে এসেছেন চিরতরে তাঁর আপনার মাতৃক্রোড়ে। কিন্তু তাঁকে আর দেখা গেল না সিঁড়ির মাথায় হাত উঁচিয়ে দাঁড়াতে। যাবে না আর। তার এখন অন্য পথে আগমন, অন্য গৃহে শয্যা।

উল্টোদিকে, বিমানের ডানপাশে খুলে গেল সেই দরজা। নীল রঙের কনটেনার বেরিয়ে এলো বিমানের পেট থেকে। অপেক্ষমান মানুষের দৃষ্টি এই দ্বিতীয় দরজায়। প্রথমে ছোট আকারের তিন-চারটা কনটেনারের পর বেশ লম্বা বড় একটা কনটেনার বেড়িয়ে এলো বিমান থেকে। নড়েচড়ে উঠলো অপেক্ষমনাদের দল, তবে কি এই সেই প্রতিক্ষার ধন। এই দীর্ঘকায় কনটেনারে চড়েই কি প্রথম আর শেষ বারের মতো নিজ ভূমে ফিরলেন সকলের পরম শ্রদ্ধেয়া, বাংলার শহীদ জননী জাহানারা ইমাম!

বিকেলে শহীদ জননীর মরদেহ বাংলাদেশে আসে এবং ৫ জুলাই সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শহীদ জননীর কফিন রাখা হয় জনগণের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্যে। দুপুরে যোহরের নামাযের পর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে নামাযে জানাযা শেষে শহীদ জননীকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযোদ্ধা গোরস্থানে সমাহিত করা হয় এ সময় মুক্তিযুদ্ধের ৮জন সেক্টর কমান্ডার শহীদ জননীকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।

আমাদের জন্যও মুক্তির মূল্যবোধের একটি সবুজ ডাল পুঁতে রেখে গেছেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম- এবং আমরা জানি সে আছে কোথায় পোঁতা। আমরা যেন সে চেতনা ভুলে না যাই, আমরা যেন সে সন্ধান থেকে পিছিয়ে না আসি। একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচার এখনো হয়নি কিন্তু জাহানারা ইমাম অন্তত সন্তুষ্টি নিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ফেলতে পেরেছেন যে, তাঁর বাণী দেশের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে, একাত্তরের চেতনা নতুন প্রজন্মকে নাড়া দিয়েছে। এবার দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের। যুদ্ধাপরাধী মুক্ত বাংলাদেশই হোক জাহানারা ইমামের জন্য নতুন প্রজন্মের শ্রদ্ধার্ঘ।

( অসংখ্য মানুষের লেখার কাছে কৃতজ্ঞ এই লেখা।)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “শুভ জন্মদিন জননী

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 3 =