জাকির নায়েকের দুষ্টচক্র থেকে ধর্ম প্রান মুসলমানদেরকে উদ্ধার করার উপায় কি ?

জাকির নায়েক সাধারন মুসলমানদের মনস্তত্ব বোঝে, তাই সে তাদের মনমত কথা বলে তাদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয়। একজন ধর্মপ্রান মুসলমান মাত্রই বিশ্বাস করে ইসলাম হলো দুনিয়ার একমাত্র সত্য ধর্ম , এতে অমানবিক বা অনৈতিক কিছুই নেই। জাকির তাদের এই মনোভাবকে কাজে লাগিয়েই , ধর্মপ্রান মুসলমানদেরকে এক কঠিন দুষ্টচক্রের ফাঁদে ফেলে, ইসলাম নিয়ে পুজিবিহীন ব্যবসা করে চলেছে। এর থেকে মুসলমানদেরকে উদ্ধারের উপায় কি ? উদাহরন সহ বিষয়টা দেখা যাক——

একবার এক অনুষ্ঠানে জনৈক ব্যাক্তি জাকির নায়েককে , কোরানের সুরা তাওবার ২৯ নম্বর আয়াত ও সেই সাথে সংশ্লিষ্ট হাদিস উল্লেখ করে , প্রশ্ন করল -কোন মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহন না করলে যদি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়, আর তারপর তাকে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করতে বাধ্য করা হয় বা হত্যা করা হয়, তাহলে ইসলাম শান্তির ধর্ম হয় কিভাবে ? এর উত্তরে , জাকির নায়েক কি বলেছিল তা জানার আগে সংশ্লিষ্ট আয়াত ও হাদিস দেখা যাক –

সূরা তাওবা -৯: ২৯: তোমরা যুদ্ধ কর আহলে-কিতাবের ঐ লোকদের সাথে, যারা আল্লাহ ও রোজ হাশরে ঈমান রাখে না, আল্লাহ ও তাঁর রসূল যা হারাম করে দিয়েছেন তা হারাম করে না এবং গ্রহণ করে না সত্য ধর্ম, যতক্ষণ না করজোড়ে তারা জিযিয়া প্রদান করে।

সহিহ মুসলিম :: খন্ড ১ :: হাদিস ৩০
আবু তাহির, হারমালা ইবন ইয়াহইয়া ও আহমাদ ইবন ঈসা (র)……আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই – এ কথার সাক্ষ্য না দেওয়া পর্যন্ত লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আমি আদিষ্ট হয়েছি । সূতরাং যে কেউ আল্লাহ ছাড়া ইলাহ নেই স্বীকার করবে, সে আমা হতে তার জানমালের নিরাপত্তা লাভ করবে; তবে শরীআতসম্মত কারণ ব্যতীত । আর তার হিসাব আল্লাহর কাছে ।

সহিহ মুসলিম :: খন্ড ১ :: হাদিস ৩১
আহমাদ ইবন আবদ আয-যাবিব (র)………আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই,-এ কথার সাক্ষ্য না দেওয়া পর্যন্ত এবং আমার প্রতি ও আমি যা নিয়ে এসেছি তার প্রতি ঈমান না আনা পর্যন্ত লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি । এগুলো মেনে নিলে তারা তাদের জানমালের নিরাপত্তা লাভ করবে, তবে শরীআতসম্মত কারণ ছাড়া ।আর তাদের হিনাব-নিকাশ আল্লাহর কাছে ।

সহিহ বুখারী :: খন্ড ১ :: অধ্যায় ২ :: হাদিস ২৪
আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন মুহাম্মদ আল-মুসনাদী (র) ………… ইব্‌ন উমর (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্(সা) ইরশাদ করেনঃ আমি লোকদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য আদিষ্ট হয়েছে, যতক্ষন না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই ও মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ্(সা) আল্লাহ্‌র রাসূল, আর সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয়। তারা যদি এ কাজগুলো করে, তবে আমার পক্ষ থেকে তাদের জান ও মালের ব্যাপারে নিরাপত্তা লাভ করল; অবশ্য ইসলামের বিধান অনুযায়ী যদি কোন কারন থাকে, তাহলে স্বতন্ত্র কথা। আর তাদের হিসাবের ভার আল্লাহ্‌র ওপর ন্যস্ত।

জাকির নায়েকের উত্তর – এটা হলো যুদ্ধের সময়কার আয়াত, ইহুদি খৃষ্টানরা মুসলমানদেরকে আক্রমন করতে যাচ্ছিল , আর তাই এই আয়াত নাজিল হয়। সুতরাং এটা হলো আত্মরক্ষার জন্যে যুদ্ধ , যা হলো পবিত্র জিহাদ। বলা বাহুল্য, উপস্থিত সবাই এই ধরনের উত্তরই আশা করছিল, আর তাই সবাই এই উত্তরে তুমুল করতালি দিয়ে স্বাগত জানায়। এর উত্তরে , প্রশ্নকারী কিছু বক্তব্য দিতে যাচ্ছিল , কিন্তু তার কথাকে তেমন আর আমল না দিয়ে , অন্য একজনকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়া হয়।

এবারে উক্ত আয়াত ও হাদিসের ব্যখ্যা করা যাক। যদি সরাসরি উক্ত আয়াতের আক্ষরিক অর্থ করা হয় ,তো দেখা যাচ্ছে , ইহুদি ও খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যেতে হবে , যতক্ষন পর্যন্ত তারা ইসলাম গ্রহন না করে , অথবা করজোড়ে অর্থাৎ দাসের মত জিজিয়া কর দিতে স্বীকার না হয়। এই আয়াতে কোনভাবেই দেখা যাচ্ছে না যে ইহুদি ও খৃষ্টানরা মুসলমানদেরকে আক্রমন করতে যাচ্ছিল। তার অর্থ , শুধুমাত্র মুহাম্মদকে নবী স্বীকার না করার কারনেই তাদেরকে আক্রমন করতে হবে। কোরানের সর্বশ্রেষ্ট ব্যখ্যাকার মুহাম্মদ নিজেই অনেক হাদিসে উক্ত ৯:২৯ আয়াতের ব্যখ্যায় সেটা বলে গেছেন যা উপরে উল্লেখ করা আছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে , জাকির নায়েক যা বলছে তা ভুল অথবা , সে মুহাম্মদের চাইতে বেশী ইসলাম জানে। এবার যদি উক্ত আয়াতের প্রেক্ষাপট দেখি তাহলে এই আয়াতের কি অর্থ দাড়ায় ?

প্রথমেই জেনে রাখতে হবে , এই সুরা তাওবা হলো মুহাম্মদের নাজিল করা সর্বশেষ আয়াত। তার মক্কা বিজয়েরও এক বছর পর এই আয়াত নাজিল হয়। ইতোমধ্যেই মক্কা ও মদিনা তো বটেই তার আশপাশের সকল গোত্র মুহাম্মদের করতলগত বা অধীন। কেউই মুহাম্মদ বা মুসলমানদেরকে আক্রমন করতে যাচ্ছিল না। সেটা কিন্তু বোঝা যাবে উক্ত ৯:২৯ আয়াতের আগে ও পরের আয়াত দেখলে –

সুরা তাওবা – ৯: ২৮: হে ঈমানদারগণ! মুশরিকরা তো অপবিত্র। সুতরাং এ বছরের পর তারা যেন মসজিদুল-হারামের নিকট না আসে। আর যদি তোমরা দারিদ্রের আশংকা কর, তবে আল্লাহ চাইলে নিজ করুনায় ভবিষ্যতে তোমাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

ঘটনাটা হলো , মুহাম্মদ মক্কা বিজয়ের পরেও হজ্জ পালনের সময় কাবা ঘরের প্রাঙ্গনে আরবের পৌত্তলিকরা জড় হতো , সেটা নিষেধ না করেই তিনি মদিনা গমন করেন। কিন্তু এক বছর পরে হঠাৎ করে মুহাম্মদ এই প্রথা বন্দ করার জন্যে উক্ত ৯:২৮ আয়াত নাজিল করেন। তাতে বলা হচ্ছে , অমুসলিমরা হলো অপবিত্র তাই তারা আর কাবা প্রাঙ্গনে আসতে পারবে না। এতে করে মুসলমানরা আশংকা প্রকাশ করে যে তাহলে তারা দারিদ্রের কবলে পড়বে। কেন সেটা ঘটবে ? কারন হজ্জের সময় কাবা প্রাঙ্গনে যে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সেখানে লোকজন জড় হতো , এর ফলে কুরাইশরা সেখানে ব্যবসা বানিজ্য করার সুযোগ পেত , যা তাদের অর্থ উপার্জনের একটা ভাল পথ ছিল। সুতরং ৯:২৮ আয়াত মোতাবেক , তাদেরকে যদি কাবা প্রাঙ্গনে আসার সুযোগ না দেয়া হয়, তাহলে তারা অর্থ কষ্টে পড়বে। আর এই অর্থ কষ্ট দুর করার জন্যেই নাজিল করা হচ্ছে ৯:২৯ নং আয়াত , আর তাতে বলা হচ্ছে , ইহুদি ও খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে , তাদেরকে ইসলাম গ্রহনে বাধ্য করতে হবে , তাহলে , তারা যাকাত দেবে , আর যদি ইসলাম গ্রহন না করে , তাহলে জিজিয়া কর দিয়ে দাস দাসীর মত বসবাস করবে। কিন্তু কোন অপরাধে ইহুদি ও খৃষ্টানদের ওপর আতর্কিতে আক্রমন করতে হবে ? সেটা বলা আাছে ২৯ নং আয়াতের পরের আয়াতেই , সেটা দেখা যাক —

সুরা তাওবা – ৯: ৩০: ইহুদীরা বলে ওযাইর আল্লাহর পুত্র এবং নাসারারা বলে ‘মসীহ আল্লাহর পুত্র’। এ হচ্ছে তাদের মুখের কথা। এরা পূর্ববর্তী কাফেরদের মত কথা বলে। আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন, এরা কোন উল্টা পথে চলে যাচ্ছে।

ইহুদিদের অপরাধ হলো – তারা ওযাইরকে আল্লাহর পূত্র বলে , আর খৃষ্টানদের অপরাধ হলো- মসীহ বা যীশুকে আল্লাহর পূত্র বলে। যা ইসলামে ভয়াবহ শিরক। আর এই শিরকের কারনেই মুহাম্মদ বলছে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যেতে হবে , যতক্ষন পর্যন্ত তারা হয় ইসলাম গ্রহন না করে , অথবা জিজিয়া কর দিতে সম্মত না হয়। আর বলা বাহুল্য , এটা কোন যুদ্ধের সময়কার আয়াত নয়, বা বিধানও নয়। এই যুদ্ধ ঘোষনার বিধান হলো – শুধুই মাত্র ইসলাম গ্রহন না করার জন্যে। এটা কোন আত্মরক্ষার যুদ্ধ নয়। সম্পূর্ন আগ বাড়িয়ে আক্রমন করে যুদ্ধ।

অথচ জাকির নায়েক তার অনুষ্ঠানে বসা সকল ধর্মপ্রান মুসলমানদেরকে ভোদাই বানিয়ে ( যারা এসব জানত তারা নিজেরাও ভোদাই সাজতে চেয়েছিল ) দিব্বি নিজের মনগড়া ব্যখ্যা দিয়ে গেল, আর সবারই তুমুল করতালি পেল।

এই মত অবস্থায়, কিভাবে ধর্মপ্রান মুসলমানদেরকে আসলেই সভ্য ও উদার মন মানসিকতার মানুষ বানান যায়, তা মোটেই বোধগম্য নয়। তারা সত্য জানতে চায় না , জানাতে গেলে ক্ষেপে ওঠে , যারা সত্য জানে তারা সেটা গোপন করে যায়, তাহলে মুসলমানদেরকে প্রকৃত মানুষ কিভাবে বানান যাবে ? আর তাদের এই মানসিকতাটাকে ব্যবহার করে , কিছু ধর্ম ব্যবসায়ী দিব্বি পুজিবিহীন ব্যবসা করে যাচ্ছে। এই দুষ্ট চক্র থেকে মুসলমানদেরকে উদ্ধার করার উপায় কি ?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “জাকির নায়েকের দুষ্টচক্র থেকে ধর্ম প্রান মুসলমানদেরকে উদ্ধার করার উপায় কি ?

  1. যে ধর্মপ্রান মুসলমান সে
    যে ধর্মপ্রান মুসলমান সে কিভাবে সভ্য ও উদার মন মানসিকতার মানুষ হবে ? কোরআন ও হাদিস মেনে ? নাকি কোরআন ও হাদিস অস্বীকার করে ? কোরআন ও হাদিস মেনে নিলে সে ধর্মপ্রান মুসলমান হিসাবেই থাকে , কিন্তু সে সভ্য ও উদার মন মানসিকতার মানুষ হতে পারে না । আর সভ্য ও উদার মন মানসিকতার মানুষ হতে হলে কোরআন ও হাদিস অস্বীকার করতে হবে ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

65 − 63 =