রানা প্লাজা এবং আমার ব্যক্তিগত কথা।

অনেকেই ভাবছেন আমি হয়তো সাভারের ঘটনায় অতটা ক্ষুব্ধ নই কারণ সেটা আওয়ামীলীগের নেতার ভবন বলে। এরকম যদি কেউ ভেবে থাকেন তাহলে সম্পূর্ণ ভূল ধারণায় আছেন।
আমি অবশ্যই যেই ব্যক্তির ভবন এবং এর সাথে যারা জড়িত তাদের প্রত্যেকেরই কঠোর শাস্তি চাই, কেননা আমার দেশের মোট আয়ের ৭৮ ভাগ আসে ঐ গার্মেন্টস ক্ষেত্র থেকে আর সেখানে নারী কর্মীর সংখ্যা বেশি এবং যাদের আমি যথেষ্ট সম্মান করি।

বৃষ্টির সময়েও দেখেছি শীতের সময়েও দেখেছি একদম ভোর বেলায় যখন তারা অফিসে যায় অর্থের অভাবে ছাতা কিনতে পারে না বলে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে কিনবা অর্থের কারণেই ফিনফিনে কাপড় গায়ে দিয়ে শীতের সকালে ঠকঠক করে কাপতে কাপতে কর্মস্থলে তারা যায়।

দিনভর গার্মেন্টসের ভিতরে থাকার ফলেও দেখেছি কতটা পরিশ্রম করেন তারা, কেউ সারাদিন দাঁড়িয়ে কাপড় যাচাই-বাছাই করছে আবার কেউ হয়তো তীক্ষ্ম কাচি দিয়ে কাপড় কাটছে বা সেলাই করছে সুচালো সুই দিয়ে, যেকোন মুহুর্তেই তাদের বিপদ ঘটে যেতে পারে। এরকম অবস্থায় তারা পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতি সচল রাখছে আমাদের সকলের চাইতে বেশি অথচ আমরা তাদের তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে গণ্য করে ভীষণ অন্যায় করছি প্রতি মুহুর্তেই।

অথচ এদের মৃত্যু হলে সেটি নিয়ে শোক করা তো দূরে থাক সেটির জন্য জোর আন্দোলনের পথেও পা বাড়াতে পারি না। কেননা এরা শুধুই পণ্য, বেঁচে থাকলেও পণ্য মরে গেলেও পণ্য, আর রাজনৈতিক পণ্য হিসেবে এদের কদরটাও ভালো। এদের নিয়ে সবাই বাণিজ্য করে হিরো বা জনদরদী নেতা সাজতে চায়, কিন্তু পাশে গিয়ে তারাই দাঁড়ায় যারা আড়ালেই থাকে প্রকৃত মানবতা নিয়ে।

ফটিকছড়িতে যখন নারকীয়ভাবে হামলা হলো সেসময় এতোটা পণ্য হয়নি সে (মৃত/আহত) দেহগুলো। কেননা সেগুলোর উপর সিল ছিলো। অথচ কেদে গুমরে মরেছে অনেকে। অন্যের কথা বাদ দেই আমি নিজে বাচ্চার মতো কেঁদেছিলাম। এও স্বীকার করছি কান্না করা ছাড়া কিছুই করতে পারি নাই, কেননা নিজেই বর্তমানে তীক্ষ্ম করাতের উপর চলছি জীবনটাকে এক প্রকার বাজি করেই।

ফেব্রুয়ারী মাসে যখন দু’দুবার হামলা হল সেইসময়ের ভিডিও ফুটেজগুলো দেখে একইরকম ভাবে কেঁদেছিলাম। এরপর ফটিকছড়িরগুলো আবারো কেঁদেছিলাম তাই আজ সাহস হয় নাই রানা প্লাজার মানুষগুলোর দিকে তাকাতে। দুপুরে খবরে যখন সময় চ্যানেলের রিপোর্টার লাইভ রিপোর্ট করছিলেন তার কন্ঠ শুনেই তাকানোর সাহস একেবারেই হয়নি।

ফটিকছড়ির হামলাগুলো টিভি চ্যানেলগুলোতে লাইভ দেখাতে পারে নাই, পারে আনি মুহুর্তে মুহুর্তে সংবাদ দিতে। সেখানে আমি তো আরো নগন্য। সেসময়ে দেখেছি মানুষের চাপা ক্ষোভ কিন্তু তখন কোন উদ্ধারকর্মী গিয়ে বা প্রশাসন নিয়ে সাথে সাথে নিয়ন্ত্রন করতে পারে নাই। হ্যাঁ মানছি সেটি ছিলো রাজনৈতিক বিষয় কিন্তু সব কিছুর পরেও তো মানুষ মরেছিলো, নাকি বলবেন কুত্তালীগ?

সেসময়ে দেখি নাই মানবতার বাণিজ্যকারীদের কোন প্রতিবাদ সমাবেশ/সভা। আজকের অনলাইন পত্রিকাগুলোতে দেখুন পুরো পাতাজুড়ে রানা প্লাজা, কিন্তু ফটিকছড়ির সময় সেটি ছিলো না।

এইগুলোই হচ্ছে দুঃখ, এই দুঃখবোধ থেকে কি রাগ, ক্ষোভ, ক্রোধ জন্ম নেয় না? আর নিলে সেটা কি খুব অস্বাভাবিক? দুঃখবোধ থেকেই এই তুলনা আর কথাগুলো বলছি আর তার জন্যেও যদি পাঁড় আওয়ামীলীগার, কট্টর আওয়ামীলীগার, আন্ধা আওয়ামীলীগার উপাধি দেয়া হয় তখন মানসিক অবস্থাটা কেমন হয় বলতে পারেন?

আর বেশিকিছু বলব না শুধু বলব আমি একজন মানুষ, তার উপর এমন একটি দেশের মানুষ যেটি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ত্রিশ লক্ষ লোকের জীবন, রক্ত, দুইলাখেরও বেশি মা-বোনের ইজ্জত দিয়ে স্বাধীন করা এবং প্রকৃত স্বাধীনতার উদ্দেশ্যে বিশ্বাস একজন মানুষ সুতরাং এখানে ব্যক্তি ক্রোধ, রাগ ইত্যাদি স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার একটা অধিকারতো আছেই। সেইদিক থেকেই এই ক্রোধ বা রাগটুকু প্রকাশ করলাম।

রানা প্লাজায় যারা নিহত বা আহত হয়েছেন তারাও মানুষ ফটিকছড়িতে যারা নিহত এবং আহত হয়েছে তারাও মানুষ। সুতরাং উভয়ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রতিবাদী হতে হবে। উভয়ক্ষেত্রের দোষীদের শাস্তি পেতে হবে কঠোরভাবে। কিন্তু রানা প্লাজা ঘটনায় যে হারে মানবতা ঝরে পড়ছে সেই হারে ফটিকছড়ির জন্য ঝরে নাই দেখে আমার এই রাগ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “রানা প্লাজা এবং আমার ব্যক্তিগত কথা।

  1. ফটিকছড়ির ঘটনা মিডিয়াতে না
    ফটিকছড়ির ঘটনা মিডিয়াতে না আসার পেছনে সরকারের হাত আছে বলে আমার ধারণা। কারন, আমাদের মিডিয়াগুলো নিউজের জন্য যেরকম ক্ষ্যাপা কুত্তার মতন হয়ে থাকে সেখানে এতো বড় ঘটনা চেপে যাওয়ার কোন যুক্তিসঙ্গত কারন দেখি না। রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস।

    1. আতিক ভাই চট্টগ্রাম গণজাগরন
      আতিক ভাই চট্টগ্রাম গণজাগরন আন্দোলন নিয়ে চট্টগ্রামের মিডিয়ার কর্মীদের সাথে ভালোই একটি সম্পর্ক স্থাপন হয়েছে এমনকি দুটি চ্যানেলে আমার বাল্য বন্ধুও আছে। সেই সুত্রেই বলছি জীবনের ভয় বলে যে ব্যাপারটি আছে তার জন্যই সেখানে কাভারেজ দেওয়া সম্ভব হয় নাই, ঠিক যেমন সাঈদীর রায়ের পর বিভিন্ন স্থানে হয়েছিল। শুনেছিলাম কিন্তু দেখতে পারি নাই।
      আশা করি বুঝতে পেরেছেন

  2. বিশ্বজিৎ কে মনে আছে? তাকে
    বিশ্বজিৎ কে মনে আছে? তাকে কুপিয়ে খুন করার ফুটেজ চ্যানেল গুলো লাইভ দেখাচ্ছিলো, অথচ সেই ২৫/৩০ জন মিডিয়া কর্মী পারতো তাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে! আজ সাভারের ভিডিও লাইভ দেখিয়েছে, কারণ, পাব্লিক খাবে! এরা রাজনীতিবিদ এর থেকেও খারাপ

    1. ছাত্রলীগের সেই সন্ত্রাসীদের
      ছাত্রলীগের সেই সন্ত্রাসীদের তুলনায় আমি ছি বলি ঐসব মিডিয়া রিপোর্টারদের, এতোগুলো মানুষ শুধু লক্ষ্য রেখেছে কিভাবে মৃত্যুর দৃশ্যটা আরো নান্দিনিক ভাবে নেয়া যায়, কেউ কেউ ক্লোজ আপ শট নেয়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, সেখানে উপস্থিত ক্যামেরাম্যানরা নিজেদের সুনাম আর চ্যানেলে টি আর পি বাড়ানোর জন্য চেয়ে চেয়ে খুনটি দেখেছে !

      আমি থু দিচ্ছি সেসকল রিপোর্টারদের, তারা তো সন্ত্রাসীরা চলে গেলেও বিশ্বজিৎ কে একটা রিকশাতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যায়নি, থু !!!

    2. যেদিন বিশ্বজিতকে খুন করা হলো
      যেদিন বিশ্বজিতকে খুন করা হলো সেদিন ফুঁসে উঠতে গিয়েও থেমে গিয়েছিলাম, কেননা বিশ্বজিত ততক্ষনে পণ্য হয়ে গিয়েছে। সবাই মানবতার ঝোলা ঝুলিয়ে একাকার অবস্থা অথচ একইদিনে বিশ্বজিতের আগে অসহায় এক কাভার্ড ট্রাক চালককে খুন করা হয়েছিলো যার ছবি সহ দেখানোর পরেও সেটি নিয়ে কিছুই হয়নি।
      তাই ইচ্ছা থাকলে মানবতার বাণিজ্যকারীদের জন্য কিছু করবার ইচ্ছা থাকলেও করা সম্ভব হয়ে উঠে না।

  3. মখার মন্তব্যটি বা
    মখার মন্তব্যটি বা প্রধানমন্ত্রীর সংসদে দেয়া মন্তব্যটি কি এই পোষ্টের সাথে প্রাসঙ্গিক?যদি হয় তবে আপনার বিশ্লেষন আশা করছি।

    1. মখার মন্তব্যটি এই বিষয়টাকে
      মখার মন্তব্যটি এই বিষয়টাকে নিয়ে আওয়ামীলীগের রাজনীতি করার চরিত্র প্রকাশিত হয়ে গেছে। একজন মন্ত্রীর এই ধরনের মন্তব্যের পর সরকারের পক্ষে কোন ধরনের সাফাই গাওয়া হাস্যকর। এমন একটি দুর্যোগে সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর এই ধরনের দায়িত্ব জ্ঞানহীন মন্তব্যের পর সরকার ভাবমুর্তি বেড়েছে নাকি কমেছে? আপনার কাছে উত্তর আশা করছি মিঃ সুমিত চৌধুরী। আশাকরি বলবেন মখা এই বক্তব্য সরকারের বক্তব্য নয়। যদি এটি সরকারের মনোভাব না হয়েই থাকে, তবে মখা’কে এমন অসভ্য ধরনের মন্তব্য করার জন্য প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রীসভা থেকে বহিষ্কার করুক। তারপর সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন করতে চিন্তা-ভাবনা করব। না হলে আওয়ামীদের মুখ বন্ধ করে অনলাইনে বসে বসে আঙ্গুল চোষা উচিত।

  4. দ্যা চুদির ভায়ে মিডিয়া কি
    দ্যা চুদির ভায়ে মিডিয়া কি চ্যাটের বাল ছিড়ে কে জানে।ধ্যাৎ……
    :মানেকি: :মানেকি: :মানেকি: :মানেকি: :মানেকি:

  5. বিশ্বজিৎ কে মনে আছে? তাকে

    বিশ্বজিৎ কে মনে আছে? তাকে কুপিয়ে খুন করার ফুটেজ চ্যানেল গুলো লাইভ দেখাচ্ছিলো, অথচ সেই ২৫/৩০ জন মিডিয়া কর্মী পারতো তাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে! আজ সাভারের ভিডিও লাইভ দেখিয়েছে, কারণ, পাব্লিক খাবে! এরা রাজনীতিবিদ এর থেকেও খারাপ

    শতভাগ সহমত….

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1