শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন

রাজধানীতে বেড়েই চলছে শব্দদূষণ। নীতিমালা আছে কিন্তু তার কোন প্রতিকার নেই। রাজধানী ঢাকা শুধু নয়। দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরেই বর্তমানে এই শব্দ দূষণের শিকার। ফলে আগামী প্রজন্ম হারাচ্ছে শ্রবণশক্তি। শ্রবণশক্তিই নয়, শব্দ দূষণের কারণে উচ্চরক্ত চাপ, মাথাধরা, অজীর্ণ, পেপটিক আলসার, অনিদ্রা ও ফুসফুসে সহ নানা রকম মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত শব্দ দূষণে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা নষ্ট হয়, সন্তান সম্ভাবনা মায়েদের যে কোনো ধরনের উচ্চ শব্দ মারাÍক ক্ষতিকর। শুধু তাই নয়, যানবাহনের শব্দ দূষণে ষ্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ায় বহুমাত্রায়। এক জরিপে উঠে আসা রাজধানী ঢাকার শব্দ দূষণের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। যা সত্যিই আতংকজনক।

বাংলাদেশে রয়েছে শব্দ দূষণ নীতিমালা। ২০০৬ সালে প্রণীত এই নীতিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ শব্দসীমা হলো ৫৫ ডেসিবেল এবং রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ৪৫ ডেসিবেল। একই ভাবে, নীরব এলাকার জন্য এই শব্দসীমা যথাক্রমে সর্বোচ্চ ৫০ ও ৪০ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকায় ৬০ ও ৫০ ডেসিবেল, বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ও ৬০ ডেসিবেল এবং শিল্প এলাকায় ৭৫ ও ৭০ ডেসিবেল সর্বোচ্চ শব্দসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর উপরে শব্দ সৃষ্টি করা দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু আমাদের দেশে এই বিধিমালা মানা হচ্ছে না।

রাস্তায় বেরুলেই দেখা যায় এই শব্দ দূষণের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। রিক্সা ওভারটেক করতে চায় বাসকে, বাস ওভারটেক করতে চায় প্রাইভেট কারকে, প্রাইভেট কার ওভারটেক করতে চায় এ্যাম্বুলেন্সকে। আর এসব প্রতিযোগিতার মধ্যে আছে প্যাঁ পুঁ শব্দে হর্ণ বাজানো।

উন্নত দেশগুলো অবশ্য শব্দ দূষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং বিশ্বব্যাংক পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায় বাংলাদেশে প্রায় ৩০টি কঠিন রোগের উৎস ১২ রকমের পরিবেশ দূষণ, এর মধ্যে অন্যতম শব্দদূষণ। শব্দদূষণের ফলে সৃষ্ট সমস্যাবলীর ভিতরে রয়েছে কানে কম শোনা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা এবং সামাজিক ভীতি। এছাড়া অস্থিরতা, উচ্চরক্তচাপ ও শব্দভীতি অন্যতম।

রাজধানীতে শুধু গাড়ির হর্নই নয় জনসভায় ব্যবহৃত মাইকগুলোও একে অন্যের চাইতে জোরে চিৎকাররত। মার্কেটে বাজছে উচ্চশব্দের গান। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ রাজধানীর একটি ভি,আই,পি সড়কে হর্ণ বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও তা বেশী দিন কার্যকর রাখতে পারেনি। শুধুমাত্র একটা শব্দদূষণ বিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন ছাড়া সরকারের আর কোন উদ্যোগই চোখে পড়ে না। এগিয়ে আসছে না কোন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বা এনজিও।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, যদি টানা ৮ ঘন্টা ৯০ থেকে ১০০ ডেসিবেল শব্দ প্রতিদিন শোনা হয়, তাহলে ২৫ বছরের মধ্যে শতকরা ৫০ জনের বধির হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শব্দ দূষণ চোখ ও মাথার বিভিন্ন সমস্যার জন্যও দায়ী। শহরের বেশীরভাগ মানুষই মাথার যন্ত্রণায় ভোগে-যার অন্যতম কারণ শব্দ দূষণ। এছাড়া ক্রমাগত শব্দ দূষণের ফলে মানুষ হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, গ্যাস্ট্রিক এমনকি লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ঢাকা শহরে যেভাবে শব্দ দূষণ বেড়ে চলেছে তাতে এ শহরের অর্ধেক মানুষের শ্রবণ ক্ষমতা আগামী ২০১৭ সালের মধ্যে ৩০ ডেসিবেল পর্যন্ত কমে যাবে।

উচ্চশব্দ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলেও অসচেতনার কারণে রাজধানীতে শব্দ দূষণের শিকার হচ্ছে ৯৫ ভাগ মানুষ। অবশ্য এ শব্দ দূষণের অন্যতম কারণ হিসাবে গাড়ির হর্ণকেই দায়ী করলেন বিষেজ্ঞরা।

শব্দদূষণ বন্ধে বিধিমালা বাস্তবায়নে গাড়িচালকদের মধ্যে সচেতনতার পাশাপাশি পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের মাধ্যমে গাড়ীর হর্ণ বাজানোর জন্য সংশ্লিষ্ট চালক ও গাড়ির বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ গ্রহন করা উচিত। শব্দদূষণ বন্ধে পুলিশ বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআরটিএ এবং জেলা প্রশাসনের পরিচালিত মোবাইল কোর্টগুলোতে নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ণ এর ব্যবহার রোধে আরও কার্যকারী প্রদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানান, অপ্রয়োজনে হর্ণ বাজালে মোটরযান অধ্যাদেশের আওতায় ২শ টাকা জরিমানা করা হয়। তবে এ জরিমানা চালককে দিতে হয় না বলে চালকরা এ অপরাধ করেই যাচ্ছে। শব্দ দূষণ রোধে নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে এর কোন প্রয়োগ নেই।

প্রতিদিনই বাড়ছে মানুষ। রাস্তায় নামছে নতুন নতুন গাড়ি। তৈরি হচ্ছে নতুন স্থাপনা। আর এই বাড়তি মানুষের চাহিদার জোগান দিতে বেড়েছে শব্দ দূষণের মাত্রা এবং বাড়তে বাড়তে এক অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। গাড়ি চালক ও গাড়ির মালিকগণকে শব্দ দূষণের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবহিতকরণসহ জনসচেতনতা সৃষ্টি, ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার মাধ্যমে হাইড্রোলিক হর্ণ ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত বিধান এবং শব্দ দূষণ বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করে, প্রশাসনের শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন

    1. শব্দ দূষণ নীতিমালা ২০০৬ আজও
      শব্দ দূষণ নীতিমালা ২০০৬ আজও কার্যকর করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। শব্দ দূষণের সবচেয়ে বেশী স্বীকার হয় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অর্থাৎ শিশুরা। ধন্যবাদ আপনাকে। @ মোঃ সাইফুর রহমান

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

69 + = 72