ইসলামে বহুগামিতা হারাম: ইহা জাকির নায়েকের আবিস্কার, কারন মুমিনেরা সেটাই শুনতে চায়

দুনিয়াতে জাকির নায়েকের ভক্ত লক্ষ লক্ষ নয়, কোটি কোটি। কারন তারা বিশ্বাস করে- ইহুদি নাসারা কাফেররা ইসলামের যে সমালোচনা করে তার দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয় এই লোক। প্রচলিত আছে যে , ইসলাম নিয়ে বিতর্কে তাকে দুনিয়ার কেউ পরাস্ত করতে পারবে না। তবে কি না , আজ পর্যন্ত তাকে কোন প্রতিষ্ঠিত খৃষ্টান পন্ডিতের সাথে বিতর্কে অংশগ্রহন করতে দেখা যায় নি। ডেভিড উড, স্যাম স্যমুন, রবার্ট স্পেন্সার, জে স্মিথ ইত্যাদির সাথে যদি জাকির মিয়া বিতর্ক করত , তাহলে বোঝা যেত , সে কত বড় পন্ডিত। যাইহোক , জাকির নায়েক কিভাবে ইসলামকে প্রচার করে সেটা দেখা যাক এবার।

একবার তারই এক অনুষ্ঠানে , এক দর্শকের জবাবে জাকির নায়েক বলল – ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা পুরুষ মানুষকে একটা মাত্র বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছে। সুতরাং ইসলাম যে বহুগামিতা সমর্থন করে না , সেটা প্রমানিত। বিষয়টা প্রমান করতে গিয়ে সে নিচের আয়াত দেখাল —

সুরা নিসা -৪: ৩: আর যদি তোমরা ভয় কর যে, এতীম মেয়েদের হক যথাথভাবে পুরণ করতে পারবে না, তবে সেসব মেয়েদের মধ্যে থেকে যাদের ভাল লাগে তাদের বিয়ে করে নাও দুই, তিন, কিংবা চারটি পর্যন্ত। আর যদি এরূপ আশঙ্কা কর যে, তাদের মধ্যে ন্যায় সঙ্গত আচরণ বজায় রাখতে পারবে না, তবে, একটিই অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীদেরকে; এতেই পক্ষপাতিত্বে জড়িত না হওয়ার অধিকতর সম্ভাবনা।

জাকির মিয়ার যুক্তি- যেহেতু একসাথে চারটা বিয়ে করলে , সকলকে সমান দৃষ্টি দিয়ে দেখা সম্ভব হয় না , তাই বাস্তব বিচারে ইসলাম অবশেষে একটাই বিয়ে করতে বলেছে।বলা বাহুল্য, জাকির মিয়ার সভায় উপস্থিত লোকজন , তারা যা আশা করছিল , জাকির মিয়া কায়দা করে সেটা বলাতে , সবাই হাততালি দিয়ে বাহবা জানাল। কিন্তু আসলে বিষয়টা কি তাই ? খেয়াল করুন , এই আয়াতটা কিন্তু বলা হচ্ছে শুধুমাত্র এতিম মেয়েদের ব্যপারে। অর্থাৎ যদি সমাজে অনেক এতিম মেয়ে থাকে , তাহলে তাদের মধ্য থেকে চারটা পর্যন্ত বিয়ে করা যাবে , তবে সবার সাথে সমান ব্যবহার করতে না পারলে মাত্র একটা। সুতরাং এতিম মেয়ে ছাড়া বাকী মেয়েদের ক্ষেত্রে সেটা প্রযোজ্য নয়।

তারপরেও যুক্তির খাতিরে ধরে নিলাম, এটা সকল নারীর জন্যে প্রযোজ্য। তাই যদি হয়, কোরানের অন্য কোন আয়াত এই একাধিক বিয়ের ব্যপারে আর কোন বক্তব্য দিচ্ছে কি না , সেটা পরীক্ষা করা যাক।

সুরা নিসা – ৪: ১২৯: তোমরা কখনও নারীদেরকে সমান রাখতে পারবে না, যদিও এর আকাঙ্ক্ষী হও। অতএব, সম্পূর্ণ ঝুঁকেও পড়ো না যে, একজনকে ফেলে রাখ দোদুল্যমান অবস্থায়। যদি সংশোধন কর এবং খোদাভীরু হও, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়।

এখানেও বলা হচ্ছে , সকল স্ত্রীদের প্রতি সমান ব্যবহার করা সম্ভব নয়, তবে ,কোন এক বিশেষ স্ত্রীর প্রতি সম্পূর্ন ঝুকে না পড়ে একাধিক স্ত্রী রাখা যাবে। অর্থাৎ বাহ্যত: দেখান যাবে না যে কোন নারীর প্রতি বেশী ঝুকে পড়া হচ্ছে, ভিতরে ভিতরে যাই থাকুক না কেন। আর এভাবে একাধিক স্ত্রী রাখা যাবে অতি সহজেই। এখন এটা কিভাবে করা যাবে , সেটাও কিন্তু নবী মুহাম্মদ নিজে দেখিয়ে গেছেন। উক্ত ৪: ১২৯ নং আয়াতের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা যাক।

সুরা নিসা- ৪: ১২৯ আয়াতের প্রেক্ষাপট ( ইবনে কাসিরের তাফসির থেকে):

হযরত সাওদা বিনতে জামআ যখন খুবই বৃদ্ধা হয়ে যান এবং বুঝতে পারেন , রাসুলুল্লাহ তাকে পৃথক(তালাক) দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন তখন তিনি রাসুলুল্লাহ-কে বলেন – আমি আমার রাতের পালা আয়শাকে ছেড়ে দিচ্ছি। রাসুলুল্লাহ এটা স্বীকার করে নেন ও এর উপরেই সন্ধি হয়ে যায়। (সূত্র: ৪র্থ,৫ম,৬ষ্ঠ ও ৭ম খন্ড, তাফসির ইবনে কাসির , http://www.quraneralo.com/tafsir/)

ইংরেজী ইবনে কাসির তাফসির:
And human souls are swayed by greed.) means, coming to peaceful terms, even when it involves forfeiting some rights, is better than parting. Abu Dawud At-Tayalisi recorded that Ibn `Abbas said, “Sawdah feared that the Messenger of Allah might divorce her and she said, `O Messenger of Allah! Do not divorce me; give my day to `A’ishah.’ And he did, and later on Allah sent down,
( সূত্র: http://www.qtafsir.com/index.php?option=com_content&task=view&id=599&Itemid=59)

উক্ত প্রেক্ষাপটের বিষয়টা আচ করা যায়, ১২৯ নং আয়াতের আগের আয়াতেই , সেখানে বলা হচ্ছে –

সুরা নিসা -৪: ১২৮: যদি কোন নারী স্বীয় স্বামীর পক্ষ থেকে অসদাচরণ কিংবা উপেক্ষার আশংকা করে, তবে পরস্পর কোন মীমাংসা করে নিলে তাদের উভয়ের কোন গোনাহ নাই। মীমাংসা উত্তম। মনের সামনে লোভ বিদ্যমান আছে। যদি তোমরা উত্তম কাজ কর এবং খোদাভীরু হও, তবে, আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।

খেয়াল করুন , এখানে বলা হচ্ছে কোন নারী যদি স্বামীর কাছ থেকে অসদাচরন বা উপেক্ষার আশংকা করে তাহলে পরস্পর কোন মীমাংশা করা যাবে। । এখানে কিন্তু বলা হচ্ছে না যে , কোন নারীর মধ্যে অসদাচরন দেখা গেলে তখন কোন মিমাংশা করা হবে। অর্থাৎ নারীটাই স্বামীর এক তরফা অসদাচরন বা উপেক্ষার শিকার হলে , নারীকেই তার সমাধান করতে হবে। যার সোজা অর্থ নারী এখানে নির্দোষ , স্বামীই দোষী , কিন্তু নির্দোষ হয়েও নারীকেই মিমাংশা করে নিতে হবে। আর সেটা কিভাবে ? সেটা ৪:১২৯ নং আয়াতের প্রেক্ষাপটেই বলা হয়েছে যে , তখন নারীকে তার অধিকার বা দাবীর অনেক কিছু ত্যাগ করতে হবে। এমতাবস্থায়, স্বামী প্রবর একাধিক স্ত্রী রাখতে পারবে , আর সেটা দেখিয়ে গেছেন , মুসলমানদের সর্বশ্রেষ্ট আদর্শ পুরুষ মুহাম্মদ। এ সম্পর্কে হাদিস দেখা যাক –

সহিহ মুসলিম :: খন্ড ৮ :: হাদিস ৩৪৫১
যুহায়র ইবন হারব (র)……আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন, সাওদা বিনত যাম”আ (রাঃ)-এর চেয়ে অধিক পসন্দনীয়া কোন নারীকে আমি দেখি নি যার ‘খোলসে- আমি আমার অবস্হান পসন্দ করব- এমন এক নারী যার মাঝে ছিল (ব্যক্তিত্ব সুলভ) তেজস্বীতা । আয়িশা (রাঃ) বলেন, বৃদ্ধা হয়ে গেলে রাসুলুল্লাহ (সা) -এর নিকট তাঁর প্রাপ্য (পালার) দিনটি আয়িশা (রাঃ)-কে হিবা করে দিলেন । তিনি বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা)! আপনার কাছে আমার পালার দিনটি আয়িশার জন্য দিয়ে দিলাম । ফলে রাসুলুল্লাহ (সা) -এর জন্য দু-দিন পালা বন্টন করতেন, তার নিজের (এক) দিন এবং সাওদা (রাঃ)-এর (এক) দিন ।

সহিহ বুখারী :: খন্ড ৩ :: অধ্যায় ৪৭ :: হাদিস ৭৬৬
হিব্বান ইব্ন মূসা (রঃ) ………. আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) সফরের ইচ্ছা করলে স্ত্রীদের মাঝে কুরআর প্রক্রিয়া গ্রহন করতেন। যার নাম আসতো তিনি তাঁকে নিয়েই সফরে বের হতেন। এছাড়া প্রত্যেক স্ত্রী অন্য একদিন এক রাত নির্ধারিত করে দিতেন। তবে সাওদা বিনতে যাম’আ (রাঃ) নিজের অংশের দিন ও রাত নবী (সাঃ) এর স্ত্রী আয়িশা (রাঃ) কে দান করেছিলেন। এর দ্বারা তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর সুন্তুষ্টির কামনা করতেন।

সুনান আবু দাউদ :: বিবাহ অধ্যায় ১২, হাদিস ২১৩৫
আহমাদ ইবন উইনুস –হিশাম ইবন উরওয়া (রহ) তার পিতা হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একদা আয়েশা (রা) বলেন, হে আমার বোনের পুত্র! রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) আমাদের কারো উপর কাউকে ফযীলত ( শ্রেষ্ঠত্ব) প্রদান করতেন না, আমাদের সাথে অবস্থানের ব্যাপারে। আর এরূপ দিন খুব কমই হত, যেদিন তিনি আমাদের সকলের নিকট আসতেন না এবং সহবাস ব্যতীত তিনি সকল স্ত্রীর সাথে খোশালাপ করতেন। এরপর যেদিন যার সাথে রাত্রিবাসের পালা পড়ত, সেদিন তিনি তার সাথে রাতযাপন করতেন। আর সাওদা বিন্ত যাম‘আর বয়স যখন অধিক বৃদ্ধি পায় এবং তিনি এ ভয়ে ভীত হন যে, হযরত রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তাঁকে ত্যাগ করবেন, তখন তিনি বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমি আমার পালার দিনটি আয়েশার জন্য দান করলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তার পক্ষ হতে তা কবূল করেন। তখন আল্লাহ্ তা‘আলা এই আয়াত নাযিল করেনঃ====== যদি কোন নারী স্বীয় স্বামীর পক্ষ থেকে অসদাচরণ কিংবা উপেক্ষার আশংকা করে, তবে পরস্পর কোন মীমাংসা করে নিলে তাদের উভয়ের কোন গোনাহ নাই। মীমাংসা উত্তম। মনের সামনে লোভ বিদ্যমান আছে। যদি তোমরা উত্তম কাজ কর এবং খোদাভীরু হও, তবে, আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।==== (সুরা নিসা-৪: ১২৮)

তার মানে দেখা যাচ্ছে , কোন স্ত্রীকে পছন্দ না হলে , বা তার প্রতি আকর্ষন কমে গেলে, তাকে তালাক না দিয়ে, তার অধিকার কিছু খর্ব করে অন্যান্য স্ত্রীদের সাথে একত্রে রেখে হেরেম তৈরী করা যাবে , যা কোরানের আল্লাহ ও তার নবী মুহাম্মদের বিধান যা স্বয়ং মুহাম্মদ নিজেই দেখিয়ে গেছেন। এভাবেই তিনি নিজে ডজনের বেশী স্ত্রী নিয়ে হারেম বানিয়েছিলেন।

অর্থাৎ সবাইকে সমান ভাবে দেখা যাবে না বলে একসাথে বহু স্ত্রী রাখা যাবে না ব’লে জাকির নায়েক যে ব্যখ্যা দিল, সেটা তার নিজস্ব মনগড়া ও কল্পিত ধারনা। কিন্তু উপস্থিত ধর্ম প্রান মুসলমানরা জাকিরের সেই মনগড়া ও কল্পিত ধারনাকেই গ্রহন করতে চায়, কারন তারা ইসলামের মধ্যে কোন খুত দেখতে চায় না , যদি খুত থাকেও তাকে ঢাকা দিয়ে বা তার মনগড়া ব্যখ্যা দিয়ে আসল সত্যকে গোপন করে যেতে হবে ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

75 − = 65