মুক্তমনার মাতাল রাজ্জাক

আমার অনেক মুক্তমনা বন্ধুদের দেখি মাতাল রাজ্জাকের একটি গান সচরাচর মৌলবাদিদের বিরুদ্ধে ব্যাবহার করতে। তাদের হাত ধরে গানটি আজ খুব জনপ্রিয়। এই গানটির গঠন সুর শিল্পমানে মাতাল রাজ্জাক মুন্সিয়ানার ছাপ রেখেছেন। তার পুরো গানটি হলো-
আলেম গেছে জালেম হইয়া, কোরআন পড়ে চণ্ডালে,
সতী-সাধুর ভাত জোটে না, সোনার হার বেশ্যার গলে।
মুখে মুখে সব মুসলমান কাজের বেলায় ঠনঠনা
শোনো মাওলানা, মসজিদ ঘরে আল্লাহ থাকে না।
যদি মক্কায় গেলে খোদা মিলতো নবী মিলতো মদিনায়,
দেশে ফিরে কেউ আইতো না হজ্ব করিতে যারা যায়।
কেউ যায় টাকা গরমেনে, কেউ যায় দেশ ভ্রমণে,
ধনী যায় ধনের টানে আনিতে সোনাদানা
ওরে মাওলানা, মসজিদ ঘরে আল্লাহ থাকে না।
হজ্ব করিতে মক্কায় গিয়া খরচ করলি যে টাকা
বলি, এই টাকা গরীবরে দিলে গরীব আর থাকে কেঠা?
তোর ঘরের ধন খায় পরে, দেশের লোক না খাইয়া মরে,
সত্য কথা বললে পরে দেশে থাকতে পারি না।
ওরে মাওলানা, মসজিদ ঘরে আল্লাহ থাকে না।
দ্বীনহীন রাজ্জাকে বলে, মানুষে মানুষ রতন
বলি, এই মানুষকে ভালোবাসো বেঁচে আছো যতোক্ষণ।
মানুষ চিনতে করিস ভুল তবে হারাবি দুই কূল
ওরে মূল কাটিয়া জল ঢালিলে ঐ গাছে ফুল ফোটে না
শোনো মাওলানা, মসজিদ ঘরে আল্লাহ থাকে না।
বাউল সাধক মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান আমারও অত্যান্ত পছন্দের একজন গীতিকার। তবে তার এই গানের দুইটি লাইন নিয়ে আজকে আমি আলোচনা করবো –
আলেম গেছে জালেম হইয়া, কোরআন পড়ে চণ্ডালে,
সতী-সাধুর ভাত জোটে না, সোনার হার বেশ্যার গলে।
মাতাল রাজ্জাক আসলে এখানে কি বলতে চাচ্ছেন? বেশ্যারা সোনার হার পরতে পারে না। তাদের সে অধিকার বা যোগ্যতা নাই! নাকি শুধু মধ্যবিত্ত স্বামীভক্ত গৃহিনী কিংবা ব্রাক্ষন বা ঠাকুর বাড়ির মেয়েরা অথবা উচ্চ বংশিয় মুসলিম ঘরের নারীরাই শুধু সোনার হার পরবে।আমরা বুঝতে পারছি এখানে সোনার হার একটি রূপক শব্দ যার মানে উচ্চমার্গিয় কোন দামি বস্তু তেমনি বেশ্যা একটি খারাপ এবং ঘৃনিত শব্দ।মাতাল রাজ্জাক এই ভালো মন্দের ডিফারটা করলেন ক্যামনে? ডিফার করার প্রক্রিয়াটা কি? আবার তিনি সতি অসতি নামে দুইটা শব্দ টাইনা আনছে যা প্রথাগত নারী বিরোধি এবং মৌলবাদি ভাবনা থেকে আসছে। তিনি তো এই গানটা করেছেন সম্পূর্ন মৌলবাদ বিরোধি দৃষ্টিকোন থেকে এবং গানে তিনি মোল্লাদের স্ট্রেটলি রিভেন্জও করেছেন কিন্তু মোল্লাদের গড়া গৎবাধা মৌলবাদি চিন্তা থেকে তিনি বেড়িয়ে আসতে পারলেন কই? তিনি এখানে চন্ডালদেরও ছাড়লেন না। চন্ডালের হাতে কুরআনকে তিনি ব্যাপক প্রতিক্রিয়াশীলতা হিসেবে দেখছেন যা সমাজ পতনের লক্ষন হিসেবে বিবেচিত।তার মানে কি তিনি এখানেও মৌলবাদিদের মত সমাজে নির্যিতিত নিপিড়িতদের অচ্ছুৎ এবং অপবিত্র গন্য করছেন? তিনি মৌলবাদিদের মত খুজে খুজে সমাজের সেই অচ্ছুৎ এবং সবচেয়ে নিপিড়িত পেশার মানুষদের পিছনেই লাগলেন।তিনি তাদের জীবনের স্ট্রাগল বন্চনা কিছুই দেখলেন না। মৌলবাদিরা যেমন তিনিবেলা বেশ্যাদের গালি দেয় তিনিও ভদ্র ভাষায় কটাক্ষ করলেন সেই্ বেশ্যাদেরই। তিনি মৌলবাদিদের তৈরি সমাজে প্রচলিত ভালো মন্দের সেই একই ডিফেনিশন টানলেন। আগের দিনের ব্রাক্ষনরা নিম্ন বর্নের হিন্দু নারীদের বুকে কাপড় রাখতে দিত না পায়ে চটি চাপাতে দিত না। তিনি এত বছর পর প্রগতিশীলতার নামে সেই একই ভাবধারা চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন।তার এই গান শুনে তাকে খুব ক্লাস কনসিয়াস বলেই মনে হলো যে কনসিয়াসনেসটা ৪৭এর আগে দেখা যেত।এই লোকটা সমাজের যে পরিবর্তন চায় সেই পরিবর্তনটা আসলে কি? পূজিবাদি ব্যাবস্থা থেকে সামন্তবাদে ফিরে যাওয়া???

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

65 − = 64