অনেক বেশিই ভাগ্যবান

ছেলে হয়ে জন্মেছি । অনেক ভাগ্যবান আমি । এই দেশে মেয়ে হয়ে জন্মানো যে কি কষ্টের তা কেবল একটা মেয়েই জানে । প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটা মেয়েকে অনেক প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয় । ছেলে হয়ে জন্মেছি । অনেক ভাগ্যবান আমি । আসলেই ভাগ্যবান ।

ইচ্ছে হলেই যেকোনো জায়গায় ইচ্ছেমতোন ঘুরে বেড়ায় । গলির মোড়ে , চায়ের দোকানে , রাস্তার পাশের হোটেলে বা গার্লস স্কুলের সামনে দাড়িয়ে জমিয়ে আড্ডা দেয় । সপ্তাহে পাঁচদিন কলেজে থাকে তো পাঁচ ঘন্টা থাকে বেইলী রোডে । ইচ্ছে হলেই রাত নয়টা দশটা এগারোটার দিক বাসা থেকে বের হতে পারে । আসলেই অনেক স্বাধীন । ছেলে তো , তাই ।
ছেলে বলেই আমি একটা মেয়ের চেয়ে অনেক বেশী স্বাধীন , অনেক বেশী ভাগ্যবান । তাই না ? আসলেই কতখানি ভাগ্যবান ?

আমি ছেলে । তাই আমাকে হতে হবে হৃদয়হীন । আমার কোনো দুঃখ থাকতে পারে না , কষ্ট থাকতে পারে না । থাকলেও সেটা প্রকাশ করার অধিকার নেই আমার । বুঝতে শেখার পর থেকেই শুনতে হয় ‘ছি বাবা , তুমি কাঁদছো কেনো ? তুমি কি মেয়ে মানুষ ?’ যেন কান্না কেবলই মেয়েদের সম্পত্তি ।যেন ছেলেদের কান্না করা পাপ । যেন চোখের জল মানেই দুর্বলতা । যেন ছেলে বলেই আমার দুর্বলতা থাকতে নেই , দুঃখ থাকতে নেই । কাছের কোনোমানুষ মারা গেলেও শুনতে হয় , ‘বাবা তুমিই যদি এমন ভেঙ্গে পরো , তোমার মা বোনদের কে দেখবে ?’ যেন আমার রক্ত মাংসের শরীর নয় । যেন আমার দুঃখ কম । যেন আমি ছেলে বলেই আমার হৃদয় থাকতে নেই , ভালোবাসা থাকতে নেই । ছেলে বলেই যেন আমার কাঁদতে নেই । কাঁদতেই যদি না দিবে বিধাতা, কেনো দিলে এই অশ্রুজল ??

ঠাকুরসাহেব বলছিলেন তেরো চৌদ্দ বছরের ছেলের মত বালাই আর নাই । এই বালাই টা যে ষোলো সতেরো বছরে পৌছতে পৌছতে মহামুসিবত হয়ে যায় , সেটা বলে গেলেন না । সতেরো বছরের একটা মেয়ে বাসার ভেতর ঘুরঘুর করলে জিভ দিয়ে লালা ঝরে আর সতেরো বছরের ছেলেটা গেটের বাইরে দাড়িয়ে থাকলেও চোখ দিয়ে ঝরে আগুন ।

এমন কিছু সময় আসে যখন কাছের মানুষগুলোকেও অনেক দূরের মনে হয় । যে বন্ধুটার সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তার মোড়ে দাড়িয়ে থেকেছি ওর গার্লফ্রেন্ড রিকশায় যাবে বলে , একটা বিড়ি দুজনে মিলে শেষ করেছি সেই বন্ধুটাকেও হঠাত্‍ অচেনা মনে হয় । পরিবারের সাহায্যটুকু তখন বড় বেশী প্রয়োজন । কিন্তু এমন ছেলে হাতেগোনা যার সাথে তার বাবার সম্পর্ক একটা মেয়ের সাথে তার মায়ের সম্পর্কের মতোন । আমি ছেলে বলে আমি আনন্দের প্রকাশ করতে পারব না , সেটা হবে ন্যাকামি । আনন্দে ওদের জড়িয়ে ধরতে পারব না । শখের বশেও একদিন মা কে বলতে পারব না , ‘ মা আমি তোমাকে সাহায্য করি…?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “অনেক বেশিই ভাগ্যবান

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

47 − = 40