জরুরী ভিত্তিতে সড়ক দুর্ঘটনা আইনের সংস্কার করা প্রয়োজন

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কাতারে প্রতিদিন যোগ হচ্ছে নতুন নতুন নাম এবং অনেককেই পঙ্গুত্ববরণ করতে হচ্ছে সারাজীবনের মতো। অথচ সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ থাকলেও কোনোভাবেই তা সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারছে না। এতে সড়ক-মহাসড়কে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল।

সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন, সাম্প্রতিককালে সড়ক দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চালকের ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা এবং চালকদের ব্যক্তিগত চারিত্রিক স্খলনের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। সবকিছু মিলিয়ে আদালত মনে করে দৃষ্টান্ত হিসেবে আসামি সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার উপযুক্ত। বাদীপক্ষকে আসামির বিরুদ্ধে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে মৃত্যু ঘটানো এবং গুরুতর জখম করার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে। যা পেনাল কোড ১৮৬০ এর ধারা ৩০৪ (খ) এবং ৩৩৮ লঙগণ করে।

বহুল আলোচিত মিরসরাইয়ের দুর্ঘটনায়, তদন্তে পুলিশের গাফিলতিতে সাজা কম হয়েছে। মিরসরাইতে ট্রাক উল্টে ৪৪ স্কুলছাত্রের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় পুলিশের গাফিলতির কারণে ঘাতক চালকের সর্বোচ্চ সাজা হয়েছে পাঁচ বছর। পুলিশ বাংলাদেশ দণ্ডবিধির যথাযথ ধারায় মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণী (এফআইআর) পূরণ করলে ঘাতক চালককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং জরিমানার দণ্ডে দণ্ডিত করা যেত বলে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি অভিযোগ করেছেন।

চালকদের বেপরোয়া গাড়ী চালানো, দ্রুত গাড়ী চালিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা, সরকারী অব্যবস্থাপনায় গাড়ী চালানোর অনুমতিপত্র প্রদান ইত্যাদি সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারন। এইসব দুর্ঘটনার দায় কি শুধুমাত্র চালকদের উপরই বর্তাবে? নাকি সংশ্লিষ্ট পরিবহন কোম্পানিগুলোকেও দুর্ঘটনার দায়ভার নিতে হবে?

কোম্পানির অধীনে যেসব চালকরা গাড়ি চালান সেসব ক্ষেত্রে পরিবহন কোম্পানিগুলোও তাদের দায় থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন না। দেখতে হবে তাদের গাড়ির ফিটনেস ছিল কিনা? চালক যথেষ্ট দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিল কিনা? চালক মাদক সেবন করে গাড়ি চালাচ্ছে কিনা? এবং চালকদের পর্যাপ্ত ঘুম হয়েছে কিনা? তারা কতোটা শারীরিকভাবে এবং মানসিকভাবে গাড়ি চালানোর জন্য প্রস্তুত? এ বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট পরিবহন কোম্পানিগুলোকে যাত্রার পূর্বে অবশ্যই যাচাই করে নিতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনে চালকের অবহেলায় দুর্ঘটনার শাস্তি রীতিমত হাস্যকর। একজন গাড়ি চালক বেপরোয়াভাবে গাড়ি (যেমন বাস) চালিয়ে ৫০-৬০ জন যাত্রীর জীবন হুমকির মুখে ফেলে দিবে তা কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বাংলাদেশ পেনাল কোড ১৮৬০-এর ৩০৪ (খ) অনুযায়ী শাস্তি তিন (৩) বছরের জেল বা জরিমানা। এই দুর্বল আইন এবং তার অপ্রতুল প্রয়োগের ফলেই সড়ক দুর্ঘটনার প্রবণটা দিন দিন ভয়ানকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বর্তমানে প্রচলিত আইন, ধারা ৩০৪ (খ) দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুযায়ী, কোন লোক বা অনুমতিপ্রাপ্ত চালক বেপরয়াভাবে অথবা অবহেলামূলকভাবে গাড়ী চালিয়ে কোন মানুষকে হত্যা করলে সেই হত্যাকারী, অপরাধী চালক সর্বাধিক ৩ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত বা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। এতো বড় অপরাধের জন্য কত ছোট হাস্যকর শাস্তির বিধান যা ভাবাই যায় না।

উল্লেখ্য, অতীতে দণ্ড বিধির এ ধারায় শাস্তির পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ১৪ বছর এবং এটি জামিন অযোগ্য অপরাধ। ১৯৮৪ সালে বাস-ট্রাক মালিক ও চালকদের আন্দোলনে এটিকে জামিনযোগ্য এবং এ শাস্তি সাত বছরে নামিয়ে আনা হয়। ১৯৮৫ সালে আরেকটি সংশোধনীর মাধ্যমে এ শাস্তি কমিয়ে করা হয় তিন বছরে।

যা হোক, এ ধরনের হত্যা বা মানুষ খুনের শাস্তি ১০ বছর থেকে যাবতজীবন বা ফাঁসি পর্যন্ত হওয়া উচিত। চিহ্নিত অপরাধী চালকদের গাড়ী চালানোর অনুমতিপত্র প্রয়োজনে আজীবনের জন্য বাতিলও করে দেওয়া উচিত।

জরুরী ভিত্তিতে সরকারের, এই দুর্বল আইনটি সংস্কার করে আবারো আরও কঠোর এবং যুগোপযোগী কঠিন আইন প্রণয়ন করা উচিত। উল্লেখযোগ্য, কে ক্ষতিপূরণ দেবে এবং কাকে দেবে সেসব নিয়ে সুনির্দিষ্ট করে বলা নেই সড়ক পরিবহন আইন ২০১৫-তেও। যদিও আইনটি ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ জাতিসংঘে অঙ্গীকার করেছিল। এরপরও যথাযথ উদ্যোগের অভাবে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ২০১৪ এর তুলনায় বেড়েছে। ২০১৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছিল ৫ হাজার ৯২৮টি। দিন দিন সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মৃত্যুর মিছিল যেন বেড়েই চলছে।

অপরদিকে, বর্তমান সরকার ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ২০২০ সালের মধ্যে মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি সড়ক বিভাগ মহাসড়কের ১৪৪টি স্থানকে দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করে এর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৬৫ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য বিভাগীয় এলাকায় ‘ইমপ্রুভমেন্ট অব রোড সেফটি অ্যাট ব্যাক স্পটস অন ন্যাশনাল হাইওয়েজ’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে বলে জানানো হয়।

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে গঠিত জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল, সড়ক ও জনপথ অধিদফতর এবং বিআরটিএর প্রতিরোধ সেলগুলোর কার্যকর ভূমিকা থাকার কথা থাকলেও আদতে তা নেই। সম্প্রতি এ নিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিআরটিএর উপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং তাদের দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

অবশেষে, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল, সড়ক ও জনপথ অধিদফতর এবং বিআরটিএর প্রতিরোধ সেলগুলোর কার্যকর ভূমিকা পালন করবে আশা করছি। প্রচলিত দুর্বল আইন অতিসত্বর সংস্কার করে ধারা ৩০৪ (খ) দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুযায়ী শাস্তির পরিমাণ সর্বোচ্চ কারাবাস ১০ থেকে ১৪ বছর এবং মালিক পক্ষের উপর অর্থদণ্ডও আরোপ করার জোড় দাবী জানাচ্ছি। মনে রাখতে হবে, একটি দুর্ঘটনা যে সারা জীবনের কান্না!

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “জরুরী ভিত্তিতে সড়ক দুর্ঘটনা আইনের সংস্কার করা প্রয়োজন

  1. Excellent post. কিছুদিন আগে
    Excellent post. কিছুদিন আগে একটি মামলায় মালিকপক্ষকে জরিমানা দেয়ার জন্য আদালত নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু পরিবর্তীতে কি হল তা আর আমার জানা নেই।

    1. এই রায়টি সব সড়ক দুর্ঘটনার
      এই রায়টি সব সড়ক দুর্ঘটনার মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। ক্ষেত্র বিশেষে, চালকদের গাড়ী চালানোর অনুমতিপত্র আজীবনের মত বাতিলের আইনও চালু করা উচিত। @ মুনতাসির আহমেদ

  2. সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের জাতীয়
    সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একমাত্র প্রশাসনই পারে তা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে। লেখাটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

77 − = 67