বাংলাদেশের অদম্য নারীদের সফল অগ্রযাত্রা

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য ঈর্ষণীয় পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সনের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ এখন ‘দ্যা ইমাজিং টাইগার’ হয়ে উঠেছে। নিক্সনের তলাবিহীন ঝুড়ির তলা আমরা সোনা দিয়ে মুড়ে দিতে পারলেও সেই ঝুড়িতে আবারও এখন রাজনৈতিক অস্থিরতায় নতুন ছিদ্র তৈরি হচ্ছে। প্রতিদিন গণমাধ্যমের সংবাদে মনটা ভেঙে যায়। বিএনপি-জামায়াত জোটের পোড়া মানুষের গন্ধ এবং চাপাতির কোপে নিশংসভাবে হত্যাকৃত মানুষের রক্তের গন্ধ যেন টেলিভিশনের পর্দা অথবা সংবাদপত্রের পাতা থেকে নাকে এসে লাগে।

তবে এত হতাশার মধ্যে সম্প্রতি বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের নারী সৈনিকদের সমাপনী কুচকাওয়াজ দেখে আবেগে আপ্লুত হয়েছি। এত সংঘাত ও সহিংসতার মধ্যে বাংলাদেশের এই অর্জনে গর্বে বুক ভরে গেছে। বাংলাদেশের মেয়েদের এই চ্যালেঞ্জিং পেশায় নিযুক্ত লাভ সত্যি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও সেদিন প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত ওই সমাপনী কুচকাওয়াজের প্রতিটি অনুষ্ঠান বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখেছি। বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, সেতারা বেগম, প্রীতিলতা প্রমুখ মহীয়ী নারীর নামে কোম্পানীগুলোর নামকরণ করাই বলে দিচ্ছে যে, ওই মহীয়সী নারীরা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই পথেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তেঁতুল শফি হুজুরের নারীদের কেবল ক্লাস ফাইভ পাশ করার তত্ত্ব যে বাংলাদেশের নারীরা গ্রহণ করেনি এটা তার বড় প্রমাণ। জঙ্গিবাদ-ধর্মান্ধ শক্তির উত্থানে সারাবিশ্ব যখন আতঙ্কিত, সেই সময়ে আমাদের মেয়েদের এই অর্জন নিঃসন্দেহে অন্যদের প্রগতিশীলতার পথ দেখাবে। আর এই অর্জন শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, তা নয়। জাতিসংঘ শান্তি মিশনে কাজ করা এদেশের নারী পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি এই নারী সৈনিকরাও বহির্বিশ্বের শান্তি রক্ষায় যুক্ত হলে এই গৌরব ছড়িযে যাবে দেশ থেকে দেশান্তরে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি মিশনে কাজ করতে যেয়ে বাংলাদেশকে তারা নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেবে। প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ও আধুনিক মনস্ক মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের বুঁকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। সৃষ্টি হবে নতুন ইতিহাস। পাশাপাশি ওই শান্তি মিশন থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে তারা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে। দেশের ভেতর অন্য নারীদের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জিং কর্মে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে তারা হয়ে উঠবে রোল মডেল। আমরা এতদিন সেনাবাহিনীর পোশাকে পুরুষদের দেখতে অভ্যস্ত হলেও এখন থেকে ওই পোশাকে নারীদের দেখতে পাব। যা আমাদের সামাজিক জীবনে গভীর ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। নারীর ক্ষমতায়নে যা কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।

ঔপনেবেশিক শাসনামলে ইংরেজ নারীদের সংস্পর্শে বাংলার উচ্চবৃত্ত নারীরা নিজেদেরকে স্বাধীনচেতা ভাবতে শুরু করে। অনেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে সাহসী কর্মেও যুক্ত হয়। তবে তাদের ওই অগ্রযাত্রা অনেকটা সমাজসেবার গন্ডিতে আবদ্ধ থেকেছে। আর ওই সময় তাদের ওই অগ্রযাত্রা সমাজের নিবৃত্ত নারীদের স্পর্শ করেনি। ফলে পুরুষ শাসিত সমাজে নারীরা কেবল পুরুষের সেবাদাসী হয়েই বেঁচে থাকাকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছে। তবে পাকিস্তান শাসনামলে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে নারী জাগরণ বেশ গতি পেয়েছে। এর আগে এক সাথে এত নারীর পুরুষের পাশাপাশি মিছিল-মিটিং এ প্রকাশ্য অংশ নিতে দেখা যায়নি। ঢাকার নারীদের পাশাপাশি ওই আন্দোলনে জেলা শহর বা উপ-শহরের নারীরাও নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৪৮ সালে যশোর ভাষা সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হামিদা রহমান ও নারায়ণগঞ্জের আন্দোলনের অগ্নিকন্যা মর্গান বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মমতাজ বেগম তার বড় প্রমাণ।

এভাবে সিলেট, কুমিল্লা, খুলনা, দিনাজপুর, রাজশাহী, বরিশাল প্রভৃতি অঞ্চলে নারীরা ভাষা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রথম শোভাযাত্রাতে মেয়েরাই প্রথম ছিলেন। জাতীয় অধ্যাপক সুফিয়া আহমদসহ অনেক নারী সেদিন রাজপথে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান তুলেছে।

ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে স্বাধীকার অন্দোলনের প্রতিটি পর্বে নারীর অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মত। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে ও নয় মাসের প্রত্যক্ষ সংগ্রামে নারীরাও মা-মাতৃভূমির রক্ষায় অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। স্বাধীনতার পর অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নারীর অগ্রযাত্রা থেমে গেলেও গত এক দশকে নারী শিক্ষাসহ নানা ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। ১৮৭৬ সালে প্রথম বাঙ্গালি নারী হিসেবে চন্দ্রমুখী বসুর এন্ট্রান্স বা প্রবেশিকা পাশ করার মাধ্যমে যে নারী শিক্ষাযাত্রা শুরু হয়েছিল তারা এখন ছেলেদের সাথে সমান তালে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করছে। এসএসসি ও এইচএসসির গত কয়েক বছরের ফলাফল বলে দেয় ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সাফল্যর হার বেশি। বিসিএস পরীক্ষায়ও প্রথম হওয়ার কৃতিত্ব রয়েছে তাদের। ৩১তম বিসিএস পরীক্ষায় ১ লাখ ৬৪ হাজার ১৬৭ জন পরীক্ষার্থীকে পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অর্জন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর ছাত্রী ফারহানা জাহান।

গবেষণার ক্ষেত্রেও নারীরা বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে। পাটের জিন উদ্ভাবন থেকে শুরু করে ইতিহাস গবেষণায় নারীরা বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। পাটের জিন আবিষ্কারক বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের প্রধান সহযোগী ছিলেন ঢাবির অধ্যাপক হাসিনা খান। অন্যদিকে, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আয়শা বেগম তাঁর মৌলিক গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন পুরস্কার এবং বিশ্ব ভারতীয় পুরস্কার পাওয়ার মত সম্মানে ভূষিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। নারীরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বও পালন করছেন। জাবি ও বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম ও খালেদা একরাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য নাসরিন আহমদের দায়িত্ব গ্রহণই প্রমাণ করেছে নারীরা শুধু শিক্ষকতায় নয়, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের চ্যালেঞ্জিং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনেও পারদর্শী। সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রেও নারীরা পিছিয়ে নেই। তাই ফেসবুক-টুইটারের যুগে নারী লেখিকা সেলিনা হোসেনের পাঠক সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। নারী উদ্যোক্তারা সফল ব্যবসায়ে। পারসোনার মত বিশ্বমানের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নারীদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

দুর্গমগিরি কান্তার মেরুতেও বাংলাদেশী মেয়েদের পায়ের ধূলা পড়েছে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ এভারেষ্ট থেকে আফ্রিকার কিলিমাঞ্জারো পর্যন্ত তারা ছুটে চলেছে। প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে মুসা ইব্রাহিমের এভারেষ্ট বিজয়ের আনন্দ মুছে যেতে না যেতেই প্রথম বাংলাদেশী নারী হিসেবে নিশাত মজুমদার বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন এভারেষ্টে। নিশাত মজুমদার হিমালয়ের পাদদেশে ফিরতে না ফিরতেই দ্বিতীয় বাংলাদেশী নারী হিসেবে ওয়াসফিয়া নাজরীন পা রেখেছেন এভারেষ্টে। পৃথিবীর সাত মহাদেশের সাতটি চূড়া জয়ের লক্ষ্যে তিনি এখন ছুটে বেড়াচ্ছেন দেশ থেকে দেশান্তরে। আধুনিক নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত মুন্নী সাহার পদাঙ্ক অনুসরণ করে সংবাদ মাধ্যমগুলোতে কাজ করছেন একঝাঁক উচ্চ শিক্ষিত মেধাবী তরুণী। নারী সাফল্যের আর একটি অর্জন নাজনীন সুলতানার বাংলাদেশের প্রথম নারী ডেপুটি গর্ভনর নিযুক্তি। কানাডার নিউ ফাউন্ডল্যান্ডে এসটি জোনস শহরে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব উইমেন পুলিশের ৫০তম বার্ষিক সম্মেলনে ‘আইএডব্লিউপি-২০১২’ পুরস্কারে ভূষিত হন আর এক বাংলাদেশী কৃতী নারী আবিদা সুলতানা। শুধু পুলিশে নয়, সেনাবাহিনীর প্রথম ছত্রী নারী সেনা হওয়ার গৌরব অর্জন করে ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌস নারীর অর্জনকে নিয়ে গেছেন নতুন উচ্চতায়।

রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নতুন নয়; এদেশের নারীরা প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেছেন বহুবার। এখন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রধান, স্পিকার, মন্ত্রী সংসদ সদস্যসহ নানা পদে দায়িত্ব পালন করে রাজনীতিতে কেবল তাদের সরব উপস্থিতি নয়; প্রভাব বজায় রেখেছেন। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে যে নারীর নবযাত্রা শুরু হয়েছিল সেনাবাহিনীর গর্বিত সদস্য হওয়ার মাধ্যমে তা পরিপূর্ণতা পেয়েছে। নারীর এই অদম্য পথ চলা ততদিনই সম্ভব হবে, যতদিন ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বেঁচে থাকবে। আর অসম্প্রদায়িক-ধর্মান্ধ-জঙ্গিবাদ মুক্ত বাংলাদেশই কেবল সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “বাংলাদেশের অদম্য নারীদের সফল অগ্রযাত্রা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 53 = 54