দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একজন স্কুল ছাত্রী’র সাক্ষাৎকার

শময়িতা পাল গুপ্তা (শ্রেয়া), বয়স ১৬, দশম শ্রেণি পড়ুয়া স্কুলছাত্রী। পড়ালেখা করছেন রাজধানীর টিকাটুলিতে অবস্থিত কামরুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। নিজের শিক্ষাজীবন এবং সাম্প্রতিক দিনকাল কেমন যাচ্ছে জানাতে গিয়ে বলেন, ‘আমাদের দেশের এই শিক্ষাব্যবস্থাকে আমি একদমই সাপোর্ট করি না। প্রশ্ন ফাঁস হইতেছে, পড়ালেখার মূল্যায়ন নাই। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁস না হইলেও যে মেধার খুব মূল্যায়ন হয়, তাও না। ট্যালেন্ট কোনোভাবেই বাহির হয়ে আসতে পারতেছে না। মূল সমস্যাটা হইলো, ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা করে কোনো কিছু করবে, দেশের জন্য ভালো হয় এমন কিছু করার মতো শিক্ষা কেউ পায় না। সবাই পাস করে কীভাবে টাকা আয় করবে সেইটাই ভাবতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইয়া যে আমরা নতুন কিছু করব তেমন কোনো প্রেরণা কারও থেকেই পাই না।’

দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে এই ছাত্রী জানান, ‘দেশের অবস্থা কোনো দিক থেকেই ভালো না অবশ্যই। কী ছেলে, কী মেয়ে, সিক্যুরিটির কোনো গ্যারান্টি নাই। এমনকি রাস্তা দিয়া চলাফেরা করতে গেলেও ভয় লাগে যে, কখন কে কোন দিক থেকে অ্যাটাক করবে! দেশের বড় সমস্যা এখন এইটাই, নিরাপত্তা নাই কারও।’

সমাজে সাম্প্রতিক অপরাধপ্রবণতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে আগে কিন্তু এত খুন-খারাবি, ধর্ষণ ছিল না। তখন ফ্যামিলি বন্ডেজ বলে একটা ব্যাপার ছিল। সমাজে মানুষের মইধ্যে শ্রদ্ধা বলে কিছু ছিল। এই কারণে খুন-ধর্ষণ, এগুলা নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন আমার মনে হয়, অতিরিক্ত ওয়েস্টার্ন কালচার ফলো করতে গিয়া মানুষের মেন্টালিটি এরকম চেইঞ্জ হইয়া যাইতেছে। ওরা অনেক কিছু ডিসক্লোজ করে, সেগুলো দেখে শিখছে। আবার দেশের আইন ব্যবস্থারও কোনো কিছুই শক্ত না যে, একজন দোষ করলে তারে সাথে সাথে শাস্তি দিয়া দিবে। দেখা যাইতেছে ঝুলায়া রাখে তো রাখেই। আর অপরাধ মানুষ কইরাই যাইতেছে, কইরাই যাইতেছে! এই হইলো দেশের অবস্থা!’

জাতীয় নির্বাচন ও সাম্প্রতিক ভোট পর্যবেক্ষণ করছেন কিনা এমন প্রশ্নের প্রেক্ষিতে এই শিক্ষার্থী জানান, ‘বই খাতায় তো আমরা পড়ি যে, আমাদের দেশটা গণতান্ত্রিক দেশ। জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই এইখানে সরকার গঠন হওয়ার কথা। এখন সরকার যদি নিজেই নিজের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় উইঠা যায় তাইলে সেইটারে তো আর গণতন্ত্র বলা যায় না। জনগণের মতামত তো এইখানে দাবায়া রাখা হইল। তারপরেও মানুষ মানতো, যদি তারা ভালোভাবে দেশটা চালাইত। কিন্তু এখন কোনো কিছুতে একগুণ ভালো দেখা গেলে আরেকটায় তার চাইতে তিনগুণ খারাপ দেখা যায়। এইভাবে নির্বাচন হইতে থাকলে ফলাফল ভালো হবে না।’

পুলিশ বাহিনীর তৎপরতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘পুলিশের তো কোনো তৎপরতা নাই। সব দেশেই ক্রাইম হয়। কিন্তু অন্যান্য দেশে দেখি যে কেস সলভ করতে তাদের পুলিশের কিন্তু অত সময় লাগে না। আমাদের দেশের পুলিশরা সরকারের আন্ডারে কাজ করে তো! কাউকে অ্যারেস্ট করার আগে, যেমন মন্ত্রীর ছেলেকে অ্যারেস্ট করতে হইলে সে চিন্তা করে যে আমার চাকরি থাকব তো! এই কারণে তারা ইনজাস্টিস করে। আর তাদের লোভ-লালসা তো আছেই, সেই জন্যেও ইনজাস্টিস করে।’

এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে করণীয় প্রসঙ্গে বলেন, ‘আসলে মানুষের মানসিক পরিবর্তনটা বেশি প্রয়োজন। কিন্তু তারও আগে দরকার হলো, মানুষের ভিতর ভয়ের সৃষ্টি করা। কেউ যদি অপরাধ করে তার জন্য শাস্তি পাওয়া লাগবে এই ভয়টা থাকলেই না সে পরে আর ওই কাজ করবে না। কিন্তু কোনো অপরাধেরই তো এখন বিচার নাই। পাঁচ পার্সেন্টেরও হয় না।’

এই সরকারের ভালো-খারাপ মূল্যায়ন করতে বলা হলে দশম শ্রেণির এই ছাত্রী বলেন, ‘ভালো বলতে এইটা যে, ধর্মভিত্তিক দল ক্ষমতায় আসলে সংখ্যালঘুদের ওপর একটা বড় হামলা হইতে পারে। এই সরকার আছে বলে আমরা সারভাইভ করতে পারতেছি। আর এই যে পদ্মা সেতু বানাইতেছে, উন্নয়ন করতেছে, এইগুলাও ভালো। আর দেশের ক্ষতিও হইছে, মানুষের নৈতিক অবক্ষয় সবচাইতে বড় ক্ষতি। এখান থেকেই তো বাকি সব ক্ষতি দেখা যায়।’

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

64 − = 54