সম্প্রচার আইন প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি

সমাজের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে এবং প্রতিটি পেশাতে যেমন আচরণ বিধিমালা বা নিতিমালা আছে, ঠিক তেমনি বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান সম্প্রচারের ক্ষেত্রেও সম্প্রচার নীতিমালা বা বিধিমালা থাকা একান্ত জরুরী হয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে, মন্ত্রীসভায় সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে খসরা তৈরি হওয়াতে এক শ্রেণীর তথাকথিত, স্বঘোষিত এবং স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবীদের আঁতে ঘা লেগেছিল কারন তারা যে টকশোসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভুল তথ্য দিয়ে দালালি করে কিছু টাকাপয়সা রোজগার করত। এখনতো এ সম্প্রচার নীতিমালা তাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভূল তথ্য দিয়ে, যুক্তিতর্কে মেতে উঠে সুশীল বাবুরা এখন আর দেশের সাধারন মানুষদের বিভ্রান্তও করতে পারবে না।

যা হোক, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, “শিগগিরই সম্প্রচার আইন করা হবে। এ নিয়ে হৈ চৈ হতে পারে, তারপরেও করবো”। ২৭ অক্টোবর ২০১৫ রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) আয়োজিত ‘শিশু সংক্রান্ত বিষয়ে সাংবাদিকতার নীতিমালা শীর্ষক’ সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “সম্প্রচার নীতিমালা করতে গিয়ে চারদিকে নানা হৈ চৈ হয়েছে, তাতে কি হয়েছে? আজ পর্যন্ত কোনো ক্ষতি হয়েছে? সম্প্রচার নীতিমালা ঠিকই হয়েছে। আমি সম্প্রচার আইন করতে যাচ্ছি, তা করবো”।

অপরদিকে, এক শ্রেণীর তথাকথিত স্বার্থান্বেষী সুশীল সমাজ বরাবরের মতোই জনমনে গুজব রটিয়ে যাচ্ছে যে সরকার নাকি নাগরিকদের কথা বলার অধিকার এবং গণমাধ্যমগুলোর সম্প্রচার অধিকার খর্ব করছে। আমি তাদের অনূরোধ করবো, আপনারা এসব মিথ্যা গুজব রটানোর আগে আমাদের মহান সংবিধানে বাক স্বাধীনতা এবং সম্প্রচারের স্বাধীনতার পাশাপাশি কি কি সীমাবদ্ধতার কথাও বলা হয়েছে সেগুলো একবার দয়া করে দেখে নিবেন। আসুন, আমাদের রাষ্ট্রীয় সংবিধানে পার্ট ৩, অনুচ্ছেদ ৩৯-এ বাক স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমগুলোর সম্প্রচারের অধিকার নিয়ে কি বলা হয়েছে তা একটু দেখে নিই –

Part (iii)
Article 39 (2)- Subject to any reasonable restrictions imposed by law in the interests of the security of the State, friendly relations with foreign states, public order, decency or morality, or in relation to contempt of court, defamation or incitement to an offence-
a) The right of citizen to freedom of speech and expression; and
b) Freedom of the press,
are guaranteed.

সুতরাং, আমরা স্পষ্টত দেখতে পাচ্ছি যে, যদি কোন ব্যক্তির বক্তব্য এবং গন মাধ্যমগুলোর সম্প্রচার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, অন্য কোন বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক নষ্ট করে, জন নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, সমাজের শালীনতা এবং নৈতিকতা নষ্ট করে এবং কোন বক্তব্য বা সম্পাদনা যদি মহান আদালতের প্রতি অসম্মান বা অবমাননা হিসেবে গণ্য হয়, কারো প্রতি মানহানি এবং উস্কানিমূলক বক্তব্য বা সম্প্রচার না হয়ে থাকে, তাহলে নাগরিকদের বাক স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমগুলোর সম্প্রচার সুনিশ্চিত করা হবে।

এ সম্পর্কে তথ্যমন্ত্রী বলেন, “গণমাধ্যমকে মনে রাখতে হবে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র এবং দেশের অধিকার চর্চা করতে গিয়ে তাদেরও একটি দায়বদ্ধতা আছে। সেই দায়বদ্ধতার রশি টানতে হবে। এখানে মনে রাখা দরকার অধিকার চর্চা করতে গিয়ে যেন রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষতি হয় এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার না করা হয়। গণতন্ত্রের যেমন দায়বদ্ধতা আছে, গণ্যমাধ্যমেরও তেমনি দায়বদ্ধতা আছে”।

তথ্যমন্ত্রী আরো বলেন, “সাংবাদিকদের কাজ মানুষের কল্যাণে দেশের স্বার্থে সত্যকে খোঁজা, সত্যকে প্রকাশ করা। তবে সেই প্রকাশের ক্ষেত্রে অবশ্যই বিচার বুদ্ধির প্রয়োগ ঘটাতে হবে। কোনটি প্রকাশ করবো, কোনটি করবো না- এক্ষেত্রে গণতন্ত্রের যেমন ঘাটতি আছে, গণ্যমাধ্যমেরও মূল্যবোধের ঘাটতি আছে। গণতন্ত্রে যেমন ক্ষমতা, দুর্নীতি, স্বৈরাচারী প্রবণতার দিকে ঝোঁক, তেমনি ব্যক্তিরও ঝোঁক দুষ্টুমির দিকে। মানুষের ঝোঁক বদকর্মের দিকে। ব্যক্তির অধিকার চর্চা করতে গিয়ে আইনের দ্বারা ঘেরাও করতে হয়। সেরকমি গণমাধ্যমের জন্য নীতিমালা ও আইন থাকা দরকার”।

সম্প্রচার নীতিমালা আইনের খসড়া প্রকাশ করেছে তথ্য মন্ত্রণালয়। যাতে আইন লঙগণের দায়ে রাখা হয়েছে জেল জরিমানার বিধান। এই খসড়া অনুযায়ী সম্প্রচার আইনের অধীনে সাত সদস্যের একটি কমিশন গঠন করা হবে। কমিশন সম্প্রচারকারীদের জন্য একটি সহায়ক নির্দেশিকা তৈরি করবে। এ ছাড়া জাতীয় সম্প্রচার নীতি এবং ‘কোড অব ইথিকস’ যথাযথভাবে প্রতিপালিত হচ্ছে কিনা তা নজরদারি করবে কমিশন। দেশের নিরাপত্তা এবং অখণ্ডতার প্রতি সম্ভাব্য হুমকি, শান্তি, ঐক্য বা জনশৃঙ্খলা বিনষ্টের আশংকা সৃষ্টি, অশ্লীল এবং মিথ্যা ও বিদ্বেষমূলক তথ্য পরিবেশন করলে কমিশন নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নেবে। এ ক্ষেত্রে নিয়ম না মানলে তিন মাস কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব রয়েছে খসড়ায়। এছাড়া লাইসেন্স ছাড়া কেউ সম্প্রচার করলে সাত বছর কারাদণ্ড এবং ১০ কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডেরও প্রস্তাব রাখা হয়েছে এতে।

সর্বোপরি, গণমাধ্যমগুলোর খেয়াল রাখা উচিত, তাদের সম্প্রচারিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান আবার আমাদের রাষ্ট্রীয় সংবিধান লঙগণ করছে না-তো? কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশের সাধারন জনগন তাদের ভুল তথ্যে ভরা মিথ্যা সংবাদে বিভ্রান্ত হচ্ছে। তাই বিভিন্ন টিভি চ্যানেলসহ-গনমাধ্যমসমূহকে নিয়ন্ত্রন করার জন্য জাতীয় স্বার্থে জাতীয় সম্প্রচার আইন প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “সম্প্রচার আইন প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 3 =