ইব্রাহিম কাকে কোরবানী দিয়েছিল – ইসহাক, নাকি ইসমাইলকে ?

প্রতি বছর মুসলমানরা মহা সমারোহে কোরবানীর নামে লক্ষ লক্ষ পশু হত্যা করে, তারা বিশ্বাস করে, এভাবে পশু হত্যা করলে আল্লাহ খুশি হয়। নির্মমভাবে উৎসব সহকারে পশু হত্যা করলে দয়াময় আল্লাহ কিভাবে খুশি হয় সেটা বোধগম্য নয়। কিন্তু সেটা আসল কথা না। আসল কথা হলো – যে কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে এই পশুহত্যার উৎসব , সেটা কতটা সঠিক বা যৌক্তিক। মুসলমানরা বিশ্বাস করে , আল্লাহ ইব্রাহীমের পরীক্ষা নিতে তার পুত্র ইসমাইলকে জবাই করেছিল , কিন্তু বিষয়টা কি ঠিক ? কোরান হাদিস তাফসির কি বলে ?

সুরা আস সাফফাত- ৩৭: ১০২-১০৩: অতঃপর সে যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হল, তখন ইব্রাহীম তাকে বললঃ বৎস! আমি স্বপ্নে দেখিযে, তোমাকে যবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি দেখ। সে বললঃ পিতাঃ! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে সবরকারী পাবেন। যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইব্রাহীম তাকে যবেহ করার জন্যে শায়িত করল।

ইসলামী পন্ডিতরা কোরানের উক্ত আয়াত থেকে আবিস্কার করেছে , ইব্রাহিম যে পূত্রকে কোরবানী দিল সে হলো ইসমাইল। কিন্তু কোরানের আয়াতে কি ইসমাইলের নাম উল্লেখ আছে ? ইব্রাহিমের দুইটা পুত্র ছিল – ইসমাইল ও ইসহাক। তাহলে এখানে ইসমাইলকেই যে কোরবানী দিল সেটা কোথায় উল্লেখ আছে ?

উক্ত আয়াত থেকে যা বোঝা যাচ্ছে , যে কথিত সেই পূত্র যখন কিশোর অর্থাৎ বয়স ১২/১৩ তখন তাকে কোরবানী দেয়া হয়। আয়াতের বিবরন কতটা অবাস্তব সেটা দেখা যাক , পুত্রকে কোরবানী দিতে চাওয়ায় পুত্র বলছে- যদি এটাই আল্লাহর ইচ্ছা হয় তাকে জবাই করা হোক। দুনিয়ায় কোন কিশোর পুত্র যদি শোনে তার পিতা তাকে জবাই করতে চায়, তাহলে সেই পূত্র তার পিতাকে কি উন্মাদ বা পাগল সাব্যাস্ত করবে না ? আর তারপর সে বাড়ী থেকে পালিয়ে যাবে না ? ইব্রাহীম নবী হতে পারে , কিন্তু সেই কিশোর পুত্র তো নবুয়তের কিছুই বোঝে না। কিন্তু ঘটনার এখানেই শেষ নয়, এ সম্পর্কে হাদিস কি বলে সেটা দেখা যাক –
======================================================
বুখারী :: খন্ড ৪ :: অধ্যায় ৫৫ :: হাদিস ৫৮৩
আবদুল্লাহ ইব্নে মুহাম্মদ (র) ……… সাঈদ ইব্নে জুবায়র (রা) থেকে বর্ণিত ইব্নে আব্বাস (রা) বলেন, নারী জাতি সর্বপ্রথম কোমরবন্দ বানানো শিখেছে ইসমাঈল (আ)-এর মায়ের (হাযেরা) নিকট থেকে । হাযেরা (আ) কোমরবন্দ লাগাতেন সারাহ (আ) থেকে নিজের মর্যাদা গোপন রাখার জন্য । তারপর (আল্লাহর হুকুমে) ইব্রাহীম (আ) হাযেরা (আ) এবং তাঁর শিশু ছেলে ইসমাঈল (আ)-কে সাথে নিয়ে বের হলেন, এ অবস্থায় যে, হাযেরা (আ) শিশুকে দুধ পান করাতেন । অবশেষে যেখানে কা‘বা ঘির অবস্থিত, ইব্রাহীম (আ) তাঁদের উভয়কে সেখানে নিয়ে এসে মসজিদের উঁচু অংশে যমযম কূপের উপরে অবস্থিত একটি বিরাট গাছের নীচে তাদেরকে রাখলেন । তখন মক্কায় না ছিল কোন মানুষ না ছিল কোনরূপ পানির ব্যবস্থা । পরে তিনি তাদেরকে সেখানেই রেখে গেলেন । আর এছাড়া তিনি তাদের কাছে রেখে গেলেন একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর এবং একটি মশকে কিছু পরিমাণ পানি । এরপর ইব্রাহীম (আ) ফিরে চললেন । তখন ইসমাঈল (আ)-এর মা পিছু পিছু ছুটে আসলেন এবং বলতে লাগলেন, হে ইব্রাহীম ! আপনি কোথায় চলে যাচ্ছেন ? আমাদেরকে এমন এক ময়দানে রেখে যাচ্ছেন, যেখানে না আছে কোন সাহায্যকারী আর না আছে (পানাহারের) ব্যবস্থা । তিনি একথা তাকে বারবার বললেন । কিন্তু ইব্রাহীম (আ) তাঁর দিকে তাকালেন না । তখন হাযেরা (আ) তাঁকে বললেন, এ (নির্বাসনের) আদেশ কি আপনাকে আল্লাহ্দিয়েছেন ? তিনি বললেন, হাঁ । হাযেরা (আ) বললেন, তাহলে আল্লাহ্আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না ।——————————অবশেষে (ইয়ামান দেশীয়) জুরহুম গোত্রের একদল লোক তাদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করচিল । অথবা রাবী বলেন, জুরহুম পরিবারের কিছু লোক কাদা নামক উঁচু ভুমির পথ ধরে এদিক আসছিল । তারা মক্কার নিচু ভুমিতে অবতরণ করল এবং তারা দেখতে পেল একঝাঁক পাখি চক্রাকারে উড়ছে । তখন তারা বলল, নিশ্চয় এ পাখিগুলো পানির উপর উড়ছে । আমরা এ ময়দানের পথ হয়ে বহুবার অতিক্রম করেছি । কিন্তু এখানে কোন পানি ছিল না। তখন তারা একজন কি দু’জন লোক সেখানে পাঠালো । তারা সেখানে গিয়েই পানি দেখতে পেল । তারা সেখান থেকে ফিরে এসে পানির সকলকে পানির সংবাদ দিল । সনবাদ শুনে সবাই সেদিকে অগ্রসর হল । রাবী বলেন, ইসমাঈল (আ)-এর মা পানির নিকট ছিলেন । তারা তাঁকে বলল, আমরা আপনার নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করতে চাই । আপনি আমাদেরকে অনুমতি দিবেন কি ? তিনি জবাব দিলেন, হাঁ । তবে, এ পানির উপর তোমাদের কোন অধিকার থাকবে না । তারা হাঁ, বলে তাদের মত প্রকাশ করল । ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, নবী (স) বলেছেন, এ ঘটনা ইসমাঈলের মাকে একটি সুযোগ এনে দিল । আর তিনিও মানুষের সাহচর্য চেয়েছিলেন । এরপর তারা সেখানে বসতি স্থাপন করল এবং তাদের পরিবার –পরিজনের নিকটও সংবাদ পাঠাল । তারপর তারাও এসে তাদের সাথে বসবাস করতে লাগল । পরিশেষে সেখানে তাদের কয়েকটি পরিবারের বসতি স্থাপিত হল । আর ইসমাঈলও যৌবন উপনীত হলেন এবং তাদের থেকে আরবী ভাষা শিখলেন । যৌবনে পৌছে তিনি তাদের কাছে অধিক আকর্ষণীয় ও প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন । এরপর যখন তিনি পূর্ণ যৌবন লাভ করলেন, তখন তারা তাঁর সঙ্গে তাদেরই একটি মেয়েকে বিবাহ দিল । এরই মধ্যে ইসমাঈলের মা হাযেরা (আ) ইন্তেকাল করেন । ইসমাঈলের বিবাহের পর ইব্রাহীম (আ) তাঁর পরিত্যক্ত পরিজনের অবস্থা দেখার জন্য এখানে আসলেন । কিন্তু তিনি ইসমাঈলকে পেলেন না । তিনি তাঁর স্ত্রীকে তাঁর সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলেন । স্ত্রী বলল, তিনি আমাদের জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে গেছেন । এরপর তিনি পুত্রবধুকে তাদের জীবন যাত্রা এবং অবস্থা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলেন । সে বলল, আমরা অতি দুরাবস্থায়, অতি টানাটানি ও খুব কষ্টে আছি । সে ইব্রাহীম (আ)-এর নিকট তাদের দুর্দশার অভিযোগ করল । তিনি বললেন, তোমার স্বামী বাড়ী আসলে, তাঁকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, সে যেন তার ঘরের দরজায় চৌকাঠ বদলিয়ে নেয় । এরপর যখন ইসমাঈল বাড়ী আসলেন, তখন তিনি যেন (তাঁর পিতা ইব্রাহীম (আ)-এর আগমনের) কিছুটা আভাস পেলেন । তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদেরকে কাছে কেউ কি এসেছিল ? স্ত্রী বলল, হাঁ । এমন এমন আকৃতির একজন বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন এবং আমাকে আপনার সম্বন্ধে জজ্ঞাসা করছিলেন । আমি তাঁকে আপনার সংবাদ দিলাম । তিনি আমাকে আমাদের জীবন যাত্রা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি তাঁকে জানালাম, আমরা খুব কষ্ট ও অভাবে আছি । ইসমাঈল (আ) জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কি তোমাকে কোন উপদেশ দিয়েছেন ? স্ত্রী বলল, হাঁ । তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন আপনাকে তাঁর সালাম পৌছাই এবং তিনি আরো বলেছেন, আপনি যেন আপনার ঘরের দরজায় চৌকাঠ বদলিয়ে ফেলেন । ইসমাঈল (আ) বললেন, ইনি আমার পিতা । এ কথা দ্বারা তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, আমি যেন তোমাকে পৃথক করে দেই । অতএব তুমি তোমার আপন জন্দের কাছে চলে যাও । এ কথা বলে, ইসমাঈল (আ) তাকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং ঐ লোকদের থেকে অপর একটি মেয়েকে বিবাহ করলেন । এরপর ইব্রাহীম (আ) এদের থেকে দূরে রইলেন, আল্লাহ্যতদিন চাইলেন । তারপর তিনি আবার এদের দেখতে আসলেন । কিন্তু এবারও তিনি ইসমাঈল (আ)-এর দেখা পেলেন না । তিনি ছেলের বউয়ের নিকট উপস্থিত হলেন এবং তাঁকে ইসমাঈল (আ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন । সে বললো, তিনি আমাদের খাবারের খোঁজে বেরিয়ে গেছেন । ইব্রাহীম (আ) জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কেমন আছ ? তিনি তাদের জীবনযাত্রা ও অবস্থা জানতে চাইলেন । তখন সে বলল, আমরা ভাল এবং স্বচ্ছলতার মধ্যেই আছি । আর সে আল্লাহর প্রশংসাও করলো । ইব্রাহীম (আ) জিজ্ঞাসা করলেন , তোমাদের প্রধান খাদ্য কি ? সে বলল, গোশ্ত্। তিনি আবার জানতে চাইলেন, তোমাদের পানীয় কি ? সে বলল, পানি । ইব্রাহীম (আ) দু’আ করলেন, হে আল্লাহ্! তাদের গোশ্ত্ও পানিতে বরকত দিন ।
========================================================
উক্ত হাদিসে বলছে , ইসমাইল যখন দুধের শিশু , তখন হাজেরা সহ তাকে ইব্রাহিম মক্কাতে নির্বাসন দেয়। এরপর ইসমাইল যখন যুবকে পরিনত হয়ে বিয়ে করে ঘর সংসার করছে , তখন ইব্রাহীম তাকে প্রথম দেখতে আসে। এই যদি হয় অবস্থা , তাহলে ইব্রাহিম, ১২/১৩ বছরের কিশোর বয়সী ইসমাইলকে কোরবানী দিল কখন ?

বিষয়টা আরও ভালভাবে বুঝতে হলে জেরুজালেম ও মক্কার দুরত্ব জানতে হবে। ইব্রাহীম তার ধর্ম প্রচার করত , জেরুজালেম, সিনাই ও মিশর অঞ্চলে। সেখানে থেকে মক্কার উড্ডয়ন দুরত্বই হচ্ছে ১৩০০ কিলোমিটার। মাঝের পুরো পথটাই ভয়ংকর মরুভূমি। সুতরাং মন চাইলেই জেরুজালেম থেকে মক্কায় খোশ গল্প করতে যাওয়া যেত না।

সুতরাং কিসের ভিত্তিতে মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে ইসহাককে নয় ,বরং ইসমাইলকেই কোরবানী দেয়া হয়েছিল ?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “ইব্রাহিম কাকে কোরবানী দিয়েছিল – ইসহাক, নাকি ইসমাইলকে ?

  1. ইস্মাইল কে কোরবানি দেয়ার
    ইস্মাইল কে কোরবানি দেয়ার বিষয়টা বিশ্বাস না করলে ইসলাম ও নবী মুহম্মদ কেই অস্বীকার করা হয়।তাই….

  2. ইব্রিহীম ইসহাককেই কোরবানী
    ইব্রিহীম ইসহাককেই কোরবানী দিতে গেছিলেন আদি পুস্তক মতে (ওল্ড টেস্টামেনট), কোরানে কোন পুত্র সেটা বলা নেই, তবে মুসলমানদের কোরবানী দিতে হলে তাকে ঈসমাইলই হতে হবে কেন? সব ইব্রাহামিয় পথপ্রদর্শকেরা ইসলামেরও নবী, তাদের কাউকে অনুসরন করে অনেক কিছুই ইসলামে প্রবর্তীত, এটা নিয়ে অযথা বিতর্কের কোন সৎ উদ্দেশ্য নেই।

    1. সেমিটিক ধর্ম মতে ইব্রাহিমের
      সেমিটিক ধর্ম মতে ইব্রাহিমের বংশধর ব্যতিত কেউই কখনো নবী হতে পারবেন না বলে নির্দেশনা আছে। মুহাম্মদ নিজেকে ইসমাইলের বংশধর হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য হাদিসে এই গল্প পেতেছে। ইব্রাহিমের দাসীর ছেলেকে গুরুত্বপূর্ণ করার জন্যই এই গল্প। নবী হিসাবে ইসমাঈলের কোন ভুমিকা সেমিটিক ধর্মে নাই। মুহাম্মদের হাতেই তার যাত্রা।

      1. সেমিটিক ধর্ম মতে ইব্রাহিমের

        সেমিটিক ধর্ম মতে ইব্রাহিমের বংশধর ব্যতিত কেউই কখনো নবী হতে পারবেন না বলে নির্দেশনা আছে।

        সেই নির্দেশনা কোন গ্রন্থে আছে? একটু রেফারেন্স দেয়া যাবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

89 + = 91