বহু কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র যে ইসলামে নিষিদ্ধ

বাংলাদেশের সংবিধানেই বলা আছে “আল্লাহর উপর পূর্ন আস্থা ও বিশ্বাস”। তাছাড়া আমাদের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার এবং সকল সম্প্রদায়ের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামকে প্রধান ধর্ম ঘোষণা করে বাংলাদেশকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম ঘোষণা করে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী নাগরিকদের মধ্যে কিছুটা বৈষম্যও সৃষ্টিও করা হয়েছে। যা মোটেও ২১ শতাব্দীতে এসে গ্রহণ করা যায় না।

যা হোক, ইসলামী আইনে পরিচালিত ইসলামিক রাষ্ট্রগুলোতে যেমন গনতন্ত্রকে মেনে নেয়া যায় না; ঠিক তেমনি আধুনিক গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ইসলামী রাজনীতিও সম্পূর্ণ বেমানান। সুতরাং বাংলাদেশে ইসলামী আইন চালু করলে, বাংলাদেশ যে পাকিস্তান-আফগানিস্তানে পরিনত হবে এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই।

নীচে ইসলামী আইন ও গনতন্ত্রের মধ্যকার কিছু পার্থক্য তুলে ধরছি-

মুহাম্মদ (স.) ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গণতন্ত্রকে বা প্রচলিত অন্য কোনো ব্যবস্থাপনাকে মেনে নেননি। মেনে নেয়ার প্রশ্নই আসে না, কারণ তিঁনি আসমানি কিতাব প্রাপ্ত হয়েছেন আল্লাহর তাআলার কাছ থেকে। এ্যারিষ্টটলের কাছ থেকে নয় বা রোমের কোন বাদশাহের কাছ থেকেও নয়। তাই ইসলামী শাসন ব্যবস্থায় এবং ইসলামী রাজনীতিতে গনতন্ত্রকে মেনে নেয়া যায় না। গণতন্ত্র যে ইসলামী শাসন ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা।

অন্যদিকে, গণতন্ত্রের জন্মদাতা হলেন এ্যরিষ্টটল এবং তিনি প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এ রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা তৈরী করেছেন। এরপর তারই পথ ধরে যুগে যুগে গণতন্ত্রের অনেক প্রবক্তা এসেছেন এবং গণতন্ত্রের মূল সূত্র ঠিক রেখে তাকে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।

আমরা যদি ইসলামিক আইনের স্বরূপ উন্মোচন করি, তাহলে বলতে হয়-

ইসলামী আইনে সার্বভৌমত্ব মানুষের হাতে থাকবে না, সার্বভৌমত্ব থাকবে আল্লাহর। আইন মানুষ বানাবে না, আইন হবে আল্লাহর এবং মানুষ এটি কার্যকর করবে মাত্র। একটি দল রাষ্ট্র শাসন করবে না, এটি করবে একজন নির্বাচিত নিরপেক্ষ ব্যক্তি এবং তার অনুগত বিভিন্ন বিষয়ে যোগ্য ব্যক্তি বিশেষ।

অন্যদিকে, ইসলামিক আইনে একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তিত হবে না বরং যে ব্যক্তি যোগ্যতার সাথে শাসন করবে সে আমৃত্যু করতে পারবে (যদি শারিরীক, মানুষিক সমস্যা না থাকে)। গণতন্ত্রের পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে না, ইসলামী শরিয়া আইন সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। দেশে কোন সরকারী দল-বিরোধী দল থাকবে না, এক উম্মাহকে ভাগ করবে না, ইত্যাদি।

ইসলামিক আইনের সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা গণতন্ত্রের অন্যান্য যে সমস্ত মৌলিক পার্থক্য রয়েছে তা হলো, আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ-

(১) “আল্লাহ তায়ালাই হচ্ছেন তোমাদের মালিক,সার্বভৌমত্ব তারই।”(আল-কুরআন, ৩৫:১৩) “অতএব পবীত্র ও মহান সে আল্লাহ,যিনি প্রত্যেকটি বিষয়ের উপর সার্বভৌম ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিপতি।” (আল-কুরআন, ৩৬:৮৩) “তুমি কি জাননা যে, আসমানসমূহ ও যমীনসমূহের যাবতীয় সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্য নির্দিষ্ট,তিঁনি ছাড়া তোমাদের কোন বন্ধু নেই, কোন সাহায্যকারী নেই ?” (আল-কুরআন, ২০:১০৭)

কিন্তু গণতন্ত্রে বলা হয়েছে “সকল ক্ষমতা এবং সার্বভৌমত্বের একমাত্র মালিক জনগণ।”

(২) গণতন্ত্রে দলীয় শাসন থাকে অর্থাৎ নির্ধারিত মেয়াদে রাষ্ট্র একটি দলের লোকেরা শাসন করে। কিন্তু ইসলামিক রাষ্ট্রে বহু দলের উপস্থিতি থাকলেও, কোন এক দল শাসন ক্ষমতা পরিচালনা করতে পারবে না, কারণ এতে পক্ষপাতিত্বের সম্ভাবনা খুব বেশী এবং আমরা তা বর্তমান ব্যবস্থাপনায় দেখতে পাই। খলিফা যদি ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান বা জনগণের প্রতিনিধি হয় তাহলে তিনি স্বীয় দল ত্যাগ করবেন। দলের সাথে তার কোন সংযোগ থাকবে না এবং তিনি যোগ্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্য থেকে বিভিন্ন বিষয়ে কর্মকর্তা নিয়োগ করবেন। লক্ষণীয়, তিনি বিভিন্ন কর্মকর্তা বাছাই করবেন নিজের ইচ্ছামত, পছন্দমত। জনগণের ভোটাভোটিতে নির্বাচিত হয়ে আসা কোন জনপ্রতিনিধিকে নয়। যা আধুনিক সভ্য সমাজের কাম্য হতে পারে না।

(৩) গণতন্ত্রে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বা একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত জনগণের নির্বাচিত শাসক ক্ষমতায় থাকে। কিন্তু ইসলামী খিলাফতে শাসক যতক্ষণ যোগ্যতার সাথে শাসনকার্য পরিচালিত করতে পারবেন ততক্ষণ থাকবেন, তিনি ব্যর্থ হলে ঐ মুহুর্তেই বিদায় নিবেন বা বিদায় করা হবে (খিলাফতকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং খলিফাকে নির্বাচিত করা যেমন ফরজ তেমনিভাবে তিনি কুরআন সুন্নাহ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ হলে তাকে হটিয়ে দেওয়াও ফরজ দায়িত্ব, যা জনতা ইবাদত হিসেবে পালন করে)। কিন্তু তা বাস্তবে আদৌ কি পালন করা হয়ে থাকে? না। স্বয়ং সৌদি আরবকেই উদাহারন হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। যেখানে রাজবংশের লোকেরাই বংশ পরম্পরায় রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় অধিষ্ঠিত থাকে।

(৪) গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে একটি আইন পাস হয় এবং তা যেকোন রাষ্ট্রীয় ইস্যুতেই হতে পারে। কিন্তু ইসলামে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতের কোন মূল্যায়ন করা হয় না বললেই চলে। কিন্তু আধুনিক শাসন ব্যবস্থা গণতন্ত্র বলে সকল ক্ষমতার উৎস জনগন, যুগোপযোগী আইন তৈরী করবে জনগণের প্রতিনিধিরা।

সুতরাং সবকিছু পর্যালোচনা করে এটা স্পষ্ট করেই বলা যায় যে ইসলামিক শাসন ব্যবস্থায় গণতন্ত্র নিষিদ্ধ। যা এই আধুনিক, সভ্যতার যুগ ২১শ শতাব্দীতে এসে মোটেও মেনে নেয়া যায় না। রাজা- বাদশাদের শাসন ব্যবস্থা মানব সভ্যতা বহু আগেই পিছনে ফেলে এসেছে। এসব শাসন ব্যবস্থা সেকেলও বটে। বর্তমান আধুনিক যুগে এসে মধ্যযুগীয় কায়দায় পরিচালিত শাসন ব্যবস্থা যে রীতিমত অকার্যকর। আল-কুরআনের সংক্ষিপ্ত কিছু আয়াত, একটি আধুনিক রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার সকল সমস্যার সমাধান কখনও দিতে পারে না। এক্ষেত্রে জনগণের প্রতিনিধি এবং জ্ঞানী-গুণীদের মতামতের ভিত্তিতেই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। এতেই যে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে বসবাসকারী সকল নাগরিকদের মঙ্গল নিহিত এবং এ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাই যে যুগোপযোগী শাসন ব্যবস্থা।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “বহু কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র যে ইসলামে নিষিদ্ধ

    1. ধন্যবাদ আপনাকে। এই আধুনিক ২১
      ধন্যবাদ আপনাকে। এই আধুনিক ২১ শতাব্দীতে এসে, সেই প্রস্তর এবং মধ্যযুগীয় রাজা- বাদশাহী শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার কোন যোক্তিকতা নেই। একটি পরিপূর্ণ রাষ্ট্র ব্যবস্থা সম্পর্কে ইসলামে সংক্ষেপে কিছু বলা আছে। কিন্তু তা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। মোদ্দা কথা, মানুষের সুচিন্তিত মতামত ছাড়া শুধুমাত্র কোরআনের কয়েকটি আয়াতে রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব নয়। @ শফিক মিয়া

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 1 =